জ্বলদর্চি

চিন দেশের গল্প: ৭ ( সুখপাখি)/ বাংলা ভাষান্তর : নিখিলেশ ঘোষ



চিন দেশের গল্প: ৭ (সুখপাখি )                                             
বাংলা ভাষান্তর :  নিখিলেশ ঘোষ

(একটি তিব্বতীয়  লোককথা। মূল চিনা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন : 
জন মিনফোর্ড)
      

বহু বছর আগের কথা। তিব্বতের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে না ছিল  কোনো নদী, না ছিল কোনো উর্বর জমি। চারিদিকে শুধু রুক্ষ পাথর আর ধূ-ধূ মরুভূমি। সেখানে কোনো গাছপালা জন্মাত না, ফুটত না কোনো তাজা ফুল। সবুজ ঘাসের দেখাও মিলত না কোথাও।সেই অঞ্চলের মানুষজন সারা বছর তীব্র খিদে আর কনকনে ঠাণ্ডায় কষ্ট পেত। অভাব আর অনটনে তাদের জীবন ছিল বিপর্যস্ত। তারা এতটাই দুঃখে থাকত যে, 'আনন্দ'আর 'সুখ' কাকে বলে, তা তারা কোনোদিন জানতেই পারেনি।

সেই গাঁয়ের বয়স্করা রাতের বেলা আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে যুবকদের এক মায়াবী রূপকথা শোনাতেন। তাঁরা বলতেন, সুদূর পূব দিগন্তে, যেখানে মেঘেরা বরফ হয়ে ঝরে পড়ে, সেই এক রূপালি পাহাড়ের চূড়ায় বাস করে এক মায়াবী  সুখপাখি। সেই পাখিটিই হলো স্বয়ং ‘আনন্দ’। পাখিটি তার রঙিন ডানা মেলে যেখানেই উড়ে যেত, সেখানকার মাটি শস্যে ভরে উঠত, নদী ফুলে উঠতে জলে, আর মানুষের ঘর ভরে উঠত সুখের হাসিতে। প্রতি বছর সেই পাখির খোঁজে দেশের সাহসী যুবকেরা দুর্গম অচিন দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হতো। কিন্তু কী রহস্যজনক ব্যাপার! যে-ই একবার সেই বরফ পাহাড়ের দিকে পা বাড়াত, সে আর কোনোদিন নিজের ভিটেমাটিতে ফিরে আসত না। 
🍂
লোকমুখে শোনা যেত, সেই মায়াবী পাখির বাসা পাহারা দেয় তিন ভয়ানক বুড়ো দানব। তাদের জাদুকরী ক্ষমতা অসীম। মানুষ শিকার করার জন্য তাদের কোনো অস্ত্র লাগত না; তারা কেবল নিজেদের লম্বা লম্বা দাড়ির মধ্য দিয়ে ফুঃ দিত, আর সেই বিষাক্ত ফুঁয়ের চোটে যেকোনো জ্যান্ত মানুষ নিমেষের মধ্যে পাথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত! তবুও মানুষের বুক থেকে আশা ফুরোত না। আশায় বাঁচে চাষা।প্রতি বছরই নতুন কোনো সাহসী প্রাণ সেই পাখির খোঁজে যাত্রা করত।

সেই গাঁয়ে ওয়াং-জিয়া নামে এক অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সৎ ছেলে বাস করত। গ্রামের করুণ অবস্থা দেখে ওয়াং-জিয়ার খুব কষ্ট হতো। তাই সে একদিন ঠিক করল যে তাকে  খুঁজে আনতে হবে সেই আনন্দের পাখি। সারা গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়ল তাকে বিদায় জানাতে।  তরুণী মেয়েরা তার হাতে তুলে দিল সুস্বাদু বার্লির মদ। মায়েরা তিব্বতি প্রাচীন রীতি মেনে তার মাথায় ছড়িয়ে দিল যবের দানা, যাতে তার যাত্রা শুভ ও নিরাপদ হয়। সবার ভালোবাসা আর আশিস বুকে নিয়ে ওয়াং-জিয়া রওনা দিল অচিন দেশের পথে। 

দিন যায়, রাত যায়।  দীর্ঘ পথ এক 
নাগাড়ে চলার পর হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল দূর দিগন্তে।  মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পাহাড়। সেই পাহাড়ের চূড়া রুপোর মতো ঝকঝকে সাদা বরফে ঢাকা।ওয়াং-জিয়া যেই না সেই পাহাড়ের কাছে পৌঁছাল, অমনি চারদিক অন্ধকার করে এক ভয়ংকর কাণ্ড ঘটল! তার পথ আগলে আচমকা হাজির হলো এক বুড়ো রাক্ষস। তার মুখে ঘন কালো দাড়ি, চোখ দুটো উনুনের মতো জ্বলছে।সে একটা দাঁড়কাকের মতো কর্কশ ও গম্ভীর গলায় চিৎকার করে উঠল, "ওখানে কে যায় রে? মানুষের এত বড় সাহস যে আমার রাজ্যে পা বাড়ায়! ওয়াং-জিয়া ভয় পেল না। সে বুক চিতিয়ে বীরের মতো জবাব দিল, "আমার নাম ওয়াং-জিয়া। আমি এখানে এসেছি সুখপাখির খোঁজে।"


হাঃ হাঃ হাঃ!" বুড়ো রাক্ষসটি অট্টহাসিতে ফেটে  পড়ল। সেই হাসির শব্দে পাহাড়ের বরফ কেঁপে উঠল। সে উপহাসের সুরে বলল, "কী দুঃসাহস! একটা ডিমের চেয়ে বড় নোস তুই,আর তুই কিনা এসেছিস সুখের পাখি খুঁজতে! যদি সেই পাখির দেখা পেতে চাস, তবে আমার একটা শর্ত পূরণ করতে হবে। তোকে এখনই গিয়ে লুও-সাংয়ের মাকে হত্যা করতে হবে! আর যদি তা না করিস, তবে এমন শাস্তি পাবি যা তুই কল্পনাও করতে পারবি না। আমি কেবল তোকে এই ধারালো পাথুরে ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে নয়শত মাইল হাঁটাব।" 

রাক্ষসের এই ভয়ংকর হুমকি শুনেও ওয়াং-জিয়ার বুক কাঁপল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, "আমি আমার নিজের মাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। নিজের স্বার্থের জন্য আমি কখনো অন্য কোনো মানুষের মাকে হত্যা করতে পারব না। আপনার মনে যা ইচ্ছে আপনি তা-ই করতে পারেন!"

বুড়ো রাক্ষসটি এইবার রাগে ফেটে পড়ল। সে তৎক্ষণাৎ তার দাড়ির মধ্য দিয়ে ফুঁ দিতে শুরু করল; এবং, এক পলকের মধ্যে, মসৃণ রাস্তাটি হয়ে গেল একটি বিশাল পাথুরে পথ। এর প্রতিটি পাথর ছিল একটি ছুরির মতো ধারালো।প্রথম একশ মাইল যাওয়ার পর, ওয়াংজিয়ার বুট জুতোর তলা পাথরগুলোতে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল; এরপর দ্বিতীয় একশত মাইলে, তার পা কেটে টুকরো টুকরো হয়ে গেল; এবং তৃতীয় শত মাইল অতিক্রম করার পর, তার হাত দুটো ছিঁড়ে কুটি কুটি হয়ে গেল।“ 

এই পথ চলা সত্যিই কঠিন!” সে মনে মনে ভাবল।“আমি কি কখনো সফল হব? আমার কি এখন ফিরে যাওয়াই ভালো? না, কখনই নয় কারণ এত পথ কষ্ট করে এসেছি !" 
সে কোনোভাবেই নিজেকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতে পারল না। সে জানত যে বাড়ির মানুষজন তার জন্য অপেক্ষা করছে যাতে সে সুখ ফিরিয়ে নিয়ে আসে। ওয়াং-জিয়া মাটিতে শুয়ে পড়ল এবং হামাগুড়ি দিয়ে সামনের দিকে এগোতে লাগল। তার জামাকাপড় ছেঁড়া ছিল; তার হাঁটু এবং কাঁধের ছাল উঠে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল।

 ওয়াং-জিয়া যখন তার যাত্রার একদম শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছাল, তখন  সে দেখতে পেল এক বিশাল, বুড়ো দানব দাঁড়িয়ে আছে—যার দাড়ি ছিল মাটির মতো বাদামী রঙের আর তার গলার গম্ভীর আওয়াজ মনে হচ্ছিল যেন শোঁ শোঁ করে বয়ে যাওয়া তীব্র বাতাসের শিসধ্বনি। দানবটি সেখানে অনেক আগে থেকেই ওয়াং-জিয়ার জন্য ওত পেতে অপেক্ষা করছিল।

ওয়াং-জিয়াকে দেখামাত্রই দানবটি বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠল, “যদি তুমি সেই সোনার সুখের পাখিকে দেখতে চাও, তবে তোমাকে প্রথমে এক কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে! যাও, বুড়ো দাদু সর্দার সিলাংকে বিষ খাইয়ে শেষ করে দাও! আর যদি তুমি এই কাজ না করো, তবে আমি তোমাকে এক ফোঁটা খাবার না দিয়ে, খিদের আগুনে পুড়িয়ে ফেলব!” দানবের এমন ভয়ানক রূপ আর হুংকার দেখেও ওয়াং-জিয়া একটুও ভয় পেল না। সে বুক চিতিয়ে, নির্ভীক দৃষ্টিতে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, “ আমি আমার নিজের দাদুকে যেমন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি, তেমনি পৃথিবীর অন্য কারও দাদুকেও আমি কখনই হত্যা করতে পারব না!”

তখন রাগে-গরগর করতে করতে বুড়ো রাক্ষসটা তার মস্ত লম্বা দাড়ির ভেতর দিয়ে দিল এক জোর ফুঁ! ব্যস, নিমেষের মধ্যে ওয়াংজিয়ার হাতের রুটির পুঁটলিটা সোঁ-সোঁ করে আকাশে উড়ে গেল। চারপাশের সেই সুন্দর নীল পাহাড় আর টলটলে জলের সবুজ নদীগুলো ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল। সেখানে জেগে উঠল এক অন্তহীন, খাঁ-খাঁ ধূসর মরুভূমি—যেখানে প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই, একদানা শস্যও কোথাও খুঁজে পাওয়ার জো নেই।খিদেয় কাতর ওয়াং-জিয়া আবার যাত্রা শুরু করল। প্রথম একশ মাইল যাওয়ার পর, খিদেয় তার পেট ডাকতে শুরু করল; দ্বিতীয় একশ মাইল যাওয়ার পর সে এতটাই ক্ষুধার্ত ছিল যে তার মাথা ঘুরতে লাগল এবং সে চোখের সামনে সর্ষে ফুল দেখতে লাগল। তার যাত্রার তৃতীয় একশ মাইলে, সে এতটাই ক্ষুধার্ত ছিল যে সে তার পেটের ভেতর তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগল, যেন কেউ ছুরি দিয়ে কাটছে। 

অনাহারের যে কী মরণ-কামড়, যার পেটে কোনোদিন অন্ন পড়েনি, সে ছাড়া আর কে-ই বা তা বুঝবে! তবু ওয়াং-জিয়া দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে ধুঁকতে ধুঁকতে একটা নদীর ধারে পৌঁছাল। অঞ্জলি ভরে নদীর সেই হিমশীতল জল খেয়ে তৃষ্ণা মেটাল, তারপর আবার পা বাড়াল সামনের দিকে। যখন সে বহু পথ পেরিয়ে অবশেষে গন্তব্যে এসে পৌঁছাল, তখন শরীরে আর মাংসের লেশমাত্র নেই, কেবল চামড়া আর হাড় ক'খানা খাঁচা হয়ে টিকে আছে!


সেখানে, তার পথে আরেকটি সাদা দাড়িওয়ালা বুড়ো রাক্ষস এসে পথ আটকেট দাঁড়াল।
" বেপরোয়া ছোঁড়া কার হুকুমে এসেছিস এই যমপুরীতে?" ওয়াং-জিয়া বুক ফুলিয়ে জবাব দিল, "আমার নাম ওয়াং-জিয়া, এবং আমি এখানে সুখের পাখি খুঁজতে এসেছি!" শুনে রাক্ষসটা হোহো করে হেসে উঠল, "সুখের পাখি দেখতে চাস? তবে যা, ওই সুন্দরী বাইমা-র চোখের মণি দুটো উপড়ে নিয়ে আয় আমার কাছে! আর যদি ‘না’ বলিস, তবে এই মুহূর্তেই তোর নিজের চোখ দুটো আমি উপড়ে নেব!"

ওয়াং-জিয়া এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে মনে মনে ভাবল। তারপর মাথা উঁচু করে তেজস্বী গলায় বলল, "তোর ওই অন্যায় হুকুম আমি মানব না রাক্ষস! কোনো নিষ্পাপ মেয়ের সুন্দর চোখ নষ্ট করার অধিকার কারও নেই। নিজের স্বার্থের জন্য আমি কখনোই বাইমা-র চোখ উপড়ে নেব  না!"

বুড়ো রাক্ষসটি রাগে চিৎকার করে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে তার লম্বা দাড়ির মধ্য দিয়ে ফুঁ দিতে শুরু করল এবং ওয়াংজিয়ার চোখ দুটো কোটর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো। চারপাশের সবকিছু নিমেষেই ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল।

"তখন ওয়াংজিয়া মনে মনে ভাবল, "বিধাতার এ নিশ্চয়ই শেষ অগ্নিপরীক্ষা! আমি পথ হারাব না। উদীয়মান রাঙা সূর্যের পানেই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে, ওখানেই নিশ্চয়ই বাস করে সেই মায়াবী সুখের পাখি।"

মাটিতে হাত দিয়ে পথ হাতড়ে হাতড়ে, ওয়াংজিয়া আরও ন'শ মাইল হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চলল। অবশেষে সে একটি বরফাবৃত পাহাড়ের চূড়ায় এসে পৌঁছল। ঠিক তখনই সেই তুষারশৃঙ্গ কাঁপিয়ে ভেসে এল এক অলৌকিক ও সুমধুর সুর—সে আর কারোর নয়, স্বয়ং সুখের পাখির কণ্ঠস্বর!

পাখিটি পরম স্নেহে ডেকে বলল, " তুমি কি তবে আমারই খোঁজে এত দূর ছুটে এসেছ?" ওয়াংজিয়া আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। সে জোড়হাতে কেঁদে উঠে বলল, "হ্যাঁ সুখপাখি, আমি এসেছি! আমার দেশের অভাগা মানুষগুলো দিন-রাত শুধু তোমার পথ চেয়ে বসে আছে।  দোহাই তোমার, তুমি আমার সাথে আমাদের দেশে চলো!"

"সুখপাখিটি  পরম মমতায় তার ডানা দুটি দিয়ে ওয়াং-জিয়াকে আলতো করে আদর করল এবং তার শ্রান্ত হৃদয়ের জন্য এক জাদুকরি গান গাইল। সেই গানের সুর বাতাসে ভেসে যাওয়া মাত্রই ওয়াং-জিয়ার হারিয়ে যাওয়া চোখের মণি দুটি আবার তাদের কোটরে ফিরে এলো। এখন সে আগের চেয়েও অনেক বেশি স্পষ্ট আর উজ্জ্বলভাবে এই পৃথিবীর রূপ দেখতে পাচ্ছিল। শুধু তাই নয়, তার সারা শরীরের সমস্ত গভীর ক্ষত নিমেষেই মিলিয়ে গেল এবং সে হয়ে উঠল আগের চেয়েও অনেক বেশি বলবান ও শক্তিশালী।এরপর সুখপাখিটি ওয়াং-জিয়ার খিদে মেটানোর জন্য কিছু সুস্বাদু শুকনো মাংস এবং নরম ক্রিম কেক খেতে দিল। 

সে খাওয়া শেষ হতেই পাখিটি  মুহূর্তের মধ্যে  মেঘের সমুদ্র পার হয়ে ওয়াং-জিয়াকে নিয়ে ফিরে এলো তার নিজের চেনা গ্রামে। তারা গিয়ে অবতরণ করল গ্রামের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়। তখন সুখপাখিটি ওয়াং-জিয়াকে জিজ্ঞেস করল, "ওহে বীর যুবক, তুমি নিজের জীবন বাজি রেখে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছ। বলো, কী তোমার মনের শেষ ইচ্ছা?" 

ওয়াংজিয়া তখন দুহাত জোড় করে বিনীত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, "হে সুখপাখি, আমি নিজের জন্য কিছুই চাই না। আমরা শুধু চাই আমাদের এই রুক্ষ গ্রামে ফিরে আসুক একটু উষ্ণতা, অনাবিল আনন্দ, চিরন্তন সুখ আর শান্তি। আমাদের চারপাশ ভরে উঠুক বুনো ফুলের সুবাসে, মাঠের পর মাঠ ফসলের ক্ষেতে আর কলকলিয়ে বয়ে যাওয়া এক রূপালী নদীতে।"

ওয়াংজিয়ার মুখে সেই নিঃস্বার্থ প্রার্থনার কথা শুনে সুখপাখিটি পরম তৃপ্তি পেল। সে তার বিশাল ডানা দুটি মেলে আকাশ পানে মুখ তুলে তিনবার জোরে শিষ দিল। পাখিটি যখন প্রথমবার ডাক দিল, তখন আকাশের বুকে জমে থাকা সমস্ত কালো মেঘের বুক চিরে এক পরম দীপ্তিতে উঁকি দিল সোনালী সূর্য যা মুহূর্তের মধ্যে গ্রামবাসীদের বুকের ভেতরের সব জড়তা আর ভয়কে দূর করে দিল। 

যখন পাখিটি দ্বিতীয়বার ডাক দিল, তখন চোখের পলকে চারপাশের ধূসর পাহাড়গুলো এক ঘন সবুজ বনাঞ্চলের রূপ নিল। মাইলের পর মাইল জুড়ে জেগে উঠল এক বিস্তীর্ণ বনভূমি। সেখানে ফুটে উঠল অজস্র পাহাড়ি পিচ ফুল এবং নাম না জানা হাজারো বুনো ফুল। বনের সেই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে থ্রাশ, লার্ক আর চাতক পাখিরা দল বেঁধে গেয়ে উঠল আনন্দের এক সুর।

 অবশেষে, সুখপাখিটি যখন তার তৃতীয় ডাকটি দিল, তখন পাহাড়ের কোল বেয়ে নেমে এলো কলকল শব্দ করা এক রূপালী নদী। চোখের সামনে ভেসে উঠল দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ফসলের মাঠ। সেই নরম সবুজ ঘাসের গালিচার ওপর ছোট ছোট তুলতুলে সাদা খরগোশগুলো মনের আনন্দে নেচে-কুঁদে বেড়াতে লাগল। পুরো গ্রামটি যেন এক নিমেষেই রূপকথার এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হলো।সেই শুভ দিনটির পর থেকে, সেই অঞ্চলের মানুষদের আর কোনো দুঃখ-কষ্ট বা অভাব থাকলে না। ওয়াং-জিয়ার ত্যাগ আর সুখপাখির আশীর্বাদে তারা চিরকালের জন্য এক শান্তিময় ও সুখী জীবন লাভ করল।

Post a Comment

0 Comments