জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ২৯১/রাজার জ্যোতিষী / ইরান (এশিয়া) /চিন্ময় দাশ

 

দূর দেশের লোকগল্প— ২৯১

রাজার জ্যোতিষী 

ইরান (এশিয়া) 

চিন্ময় দাশ


রাজধানী ইস্পাহান শহর। তার এক্কেবারে একটেরে একটা কুঁড়েঘর। বউ জামিলকে নিয়ে আহমেদ বাস করে সেখানে।

আহমেদের সম্বল বলতে একটা ছেনি আর হাতুড়ি। খাটাখাটনি করে সংসার চালায় লোকটা। সামান্য দু’-চার পয়সা আয়। মানুষটা তাতেই সন্তুষ্ট। কিন্তু তার বউ এতে খুশি নয়। 

একটা সুন্দর স্নানঘর আছে মহল্লায়। গরম জল পাওয়া যায় সেখানে। সবাই স্নান করতে যায়। স্নান হয়। সেই সাথে পাড়ার মহল্লার মেয়েদের সাথে গল্প গুজব করে সময়ও কাটে কিছুটা। সেজন্যই মেয়েরা ভীড় করে সেখানে। 

কাপড়-চোপড় নিয়ে, একদিন জামিল গিয়েছে স্নান করতে। ফটকে এক জমাদারনি বসে থাকে। সে বলল-- আজ তোমার ভেতরে যাওয়া হবে না গো। 

--কেন, আজ আবার কি হলো? 

আজ সুলতানের রাজজ্যোতিষীর বিবি আসবে স্নান করতে। আজ ভেতরে অন্য কেউ যেতে পারবে না। 

জামিল জবাব দিল-- তাতে কী হয়েছে? সেও স্নান করবে। আমরাও স্নান করবো। 

--আচ্ছা বুদ্ধ তো তুমি। জমাদারনি খেঁকিয়ে উঠল-- সুলতানের নিজের জ্যোতিষী বলে কথা। তার বিবি করবে তোমাদের সঙ্গে স্নান? ভালোয় ভালোয় ঘরে ফিরে যাও। ঝামেলা বাড়িও না এখানে।

কী আর করে? অগত্যা ঘরে ফিরে আসতে হল জামিলকে। সারাটা রাস্তা নিজের মনে গজ গজ করতে করতে ফিরলো মেয়েটি। 

সন্ধ্যায় ঘরে ফিরেছে আহমেদ। যেমন প্রতিদিন ফেরে। সেদিনের উপার্জনের কয়েকটা টাকা বিবির হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। জামিল বলল-- এই ক’টা টাকা? এতে দুজনের সংসার চলে?

--আমার যা ক্ষমতা, আয় তো তেমনিই হবে। এর বাইরে কী করতে পারি? 

বিবি বলল—আসল কথা কী জানো? তুমি একটা অলস লোক। বড় হওয়ার কোন ইচ্ছেই নেই তোমার। কোনও রকমে দিনটা কাটিয়ে দিতে পারলেই, তোমার চলে যায়। 

--আমার মত মানুষের এর বাইরে আর কী করবার আছে? আহমেদ বিবিকে বোঝায়।

গলা নরম করে জামিল বলল-- একটা কথা বলছি, শোন। কাল সকালে উঠে বাজারে যাও। সেখানে একটা জায়গা দেখে, জ্যোতিষ হিসেবে বসে পড়ো গিয়ে।

এমন কথা শুনে, আহমেদ তো পড়লো আকাশ থেকে। সে বলল-- তুমি কি পাগল হয়ে গেলে না কি? আমি জ্যোতিষী হব? ভবিষ্যৎ বলবার কোন ক্ষমতা আছে আমার? 

জ্যোতিষ হতে আবার ক্ষমতা লাগে না কি? বুদ্ধি লাগে, বুঝলে? মাথা খাটাতে হয়। কথা বলতে হয়। এক কাজ কর। বাজারে গিয়ে ছেনি-হাতুড়ি বেচে, একটা বোর্ড কিনে নাও।

--বলছ কী তুমি? আহমেদ ভাবতেই পারছে না ব্যাপারটা।  

জামিল ঝামটে উঠল—বলছি, বাজারে গিয়ে বসো। নইলে, আমি বাক্সপ্যাটরা গুছিয়ে বাপের বাড়ি চললাম। 

বউকে ভালো মতোই চেনে আহমেদ। তার কথার হের ফের হয় না। কী আর করে বেচারা? পরদিন বাজারে গিয়ে ছেনি-হাতুড়ি বিক্রি করে, একটা ডাইস আর বোর্ড কিনে ফেলল। বাজারের একেবারে এক কিনারায় একটা জায়গা দেখে, বসেও পড়ল তাই নিয়ে। 

বেলা তখন দূপুর। সূর্য মাথার উপরে উঠে গেছে। এক মহিলা এসে হাজির। সে মহিলা আর কেউ নয়। সুলতানের এক উজিরের বেগম। হন্তদন্ত হয়ে এসেছে। বলল-- নতুন দেখছি তোমাকে। সেজন্যই তোমার কাছে এলাম। পুরাণোগুলো সব ফেরেব্বাজ। বদের ধাড়ি এক একটা। উল্টোপাল্টা সব কথা বলে। তুমি নিশ্চয়ই আমার আংটি খুঁজে দিতে পারবে। 

🍂

মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়লো আহমেদের। উজিদের বেগম আংটি হারিয়েছেন। সে জিনিষ খুঁজে দেওয়া কি তার ব্যাপার? কিন্তু ধরা দিলে চলবে না। বিবি বলেছে, এ কাজে বুদ্ধি লাগে। মাথা খাটাতে হয়। মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করল-- কোথায় হারিয়ে ফেলেছেন আংটিটা, মনে করতে পারবেন?  

বেগম বলল-- আর বোল না। স্নানের ঘরে গিয়েছিলাম। ঘরে ফিরে এসে খেয়াল হল, হাতে আংটি নাই। খুব দামি জিনিষ। তুমি যে করে হোক উদ্ধার করে দাও। ভালো ইনাম দেবো তোমাকে।

মাথা কাজ করছে না আহমেদের। কী করে রেহাই পাওয়া যায় এ ঝামেলা থেকে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সামনে। তার অবস্থা চোখে পড়েছে বেগমেরও। জানতে চাইল—অমন করে তাকিয়ে আছো কেন? 

আহমেদের মুখ থেকে বেরিয়ে গেল—গর্ত। একটা গর্তই কেবল চোখে পড়ছে। গর্ত ছাড়া আর কিচ্ছুটি দেখতে পাচ্ছি না আমি। 

চমকে উঠল মহিলা—এক্কেবারে ঠিক বলেছ। একটা গর্তই। কথা শেষ হোল কি হোল না, ছিটকে বেরিয়ে গেল হন্তদন্ত পায়ে।

কিছু সময় বাদে ফিরেও এল আবার। আলো খেলা করছে মহিলার সারা মুখে। বলল—তোমার এখান থেকে সোজা স্নান ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। পেয়েও গেলাম আংটিটা। আসলে কী হয়েছে জানো? হাতের আংটি নিয়ে স্নান করা ঠিক নয়। নিরাপদ ভেবে, দেয়ালের একটা ফুটোর মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম আংটিটা। স্নান সেরে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম জিনিষটার কথা। আংটি থেকে গেল গর্তের মধ্যে। সে কথা ভুলে, বাড়ি চলে গিয়েছিলাম আমি। 

একটু দম নিয়ে, বলল-- খোদাতলা তোমার মঙ্গল করুন। তুমি সঠিক ধরতে পেরেছ। ঠিক যেখানটায় ছিল, সেই গর্তটাই তোমার চোখে পড়ে গেছে। 

আহমেদ একেবারে হতভম্ব। আবার তার হতভম্ব দশা, বেগম সাহেবা আস্ত একটা সোনার মোহর ধরিয়ে দিল তার হাতে।

বাড়ি ফিরে বিবির হাতে মোহরটা ধরিয়ে দিল আহমেদ। জামিল তো আহ্লাদে চৌষট্টিখানা। বলল-- দেখলে তো, জ্যোতিষ হওয়াটা কোন সমস্যার কাজই নয়। শুধু একটু মাথা খেলাতে হয়, এই যা। তোমার সারা বছরেও একটা মোহর উপার্জন হোত না। 

আহমেদ  বলল-- খোদার রহমতে আজ রক্ষা পেয়েছি।    প্রতিদিন তাঁকে পরীক্ষা করা ঠিক নয়।

--এক্কেবারে বোকার বেহদ্দ একটা। যদি বিবিকে ঘরে রাখতে চাও, তাহলে কাল আবার গিয়ে বাজারে বসবে। এই আমার শেষ কথা।

বেচারা আহমেদ। পরদিন আবার বাজারে গিয়ে বসেছে। সেদিন গোটা বাজার জুড়ে তোলপাড়। স্বয়ং সুলতানের বাড়িতে ডাকাতি হয়ে গেছে কাল রাতে। তাই নিয়ে বলাবলি করছে বাজার শুদ্ধ লোক। 

ডাকাতি বলে ডাকাতি। গুনে গুনে চল্লিশটা মোহর ভরা সিন্দুক তুলে নিয়ে গেছে ডাকাতেরা। দরবার ডেকে দিয়েছেন সুলতান। হুকুম করেছেন, সব গুলোকে এক্ষুনি এনে হাজির করো। 

তলব পেয়ে বড় থেকে ছোট সমস্ত জ্যোতিষী হাজির হয়েছে দরবারে। ডাইস ঘোরায়।  মাথা চুলকায়। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে। কিছুতেই কিছু সুবিধা করতে পারলো না। বলতেই প্রল না, কে কখন চুরি করে নিয়ে গেছে।

সুলতান রেগে অগ্নিশর্মা। বললেন-- সবকটা ফেরেব্বাজ। মিথ্যুকের ধাড়ি সব। সবকটাকে গারদে ভরে দে। 

এক উজির বলল—হুজুর, নতুন এক জ্যোতিষী এসে বাজারে বসেছে। তাকে একবার তুলে আনলে হয় না? আমার বিবির আংটি উদ্ধার করে দিয়েছে লোকটা।

সুলতান খেঁকিয়ে উঠলেন-- জানো তো, তুলে আনো না কেন? আমাকে বলবার কী আছে? 

দুই সেপাই গিয়ে বাজার থেকে আহমেদকে তুলে আনল। আহমেদ তো ভয়ে কাঠ। আজ আর রেহাই নাই। গরাদেই যেতে হবে। 

সুলতান বললেন-- তুমি নাকি ভালো গণনা করতে পারো। কাল রাতে আমার তোষাখানা থেকে মোহর ভরা ৪০টা সিন্দুক চুরি গেছে। তার হদিশ দিতে হবে তোমাকে। 

এমন হুকুমই তার উপর আসবে, এটা ভেবেই এসেছে আহমেদ। সুলতানের হুকুম শুনে, খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে নীরবে খাড়া দাঁড়িয়ে রইল। একসময় চোখ খুলে বলল—আমি কেবল ৪০ সংখ্যাটা দেখতে পাচ্ছি। চল্লিশটা সিন্দুক। ডাকাতও চল্লিশটা।  

সুলতান আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন-- আমার নিজের এতগুলো জ্যোতিষী কেউ পারেনি। এলেম আছে তোমার। তাহলে, এক কাজ কর। চল্লিশটা সিন্দুক উদ্ধার করে দাও আমার। সেইসাথে চল্লিশটা ডাকাত। পাকড়াও করে দিতে হবে। শূলে চড়াব সব কটাকে।  পারবে তো?

আহমেদ বলল—পারব, হুজুর। জ্যোতিষ শাস্ত্রে আমার যত ক্ষমতা, আপনার জন্য সব উজাড় করে দেব আমি। তবে... 

এর মধ্যে আবার তবে কী? সুলতান জানতে চাইলেন। --সময় লাগবে, হুজুর। ডাকাতগুলো তো আর এক জায়গায় বসে নাই আমার অপেক্ষায়। সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে হতভাগার দল। হাত জড়ো করে মিনতি করল আহমেদ-- আমাকে একটু সময় দিন কেবল। আপনার সব রত্ন উদ্ধার করে দেবো আমি। 

সুলতান বললেন-- কতদিন সময় লাগবে তোমার? আহমেদ বলল-- ৪০ দিন, হুজুর। এক একটা ডাকাতের জন্য এক একটা দিন। আপনি দুশ্চিন্তা রাখবেন না মাথায়। মোহর উদ্ধারের সমূহ দায়িত্ব আমার। 

সুলতান বললেন-- ঠিক আছে, তাই নাও। যদি পারো, তোমাকে আমি ধনী বানিয়ে দেব। আর, যদি না পারো, তোমার জন্যও একটা শূল পোঁতা হবে। 

ঘরে ফিরে এলো আহমেদ। মাথায় এক আকাশ দুশ্চিন্তা। বউকে বলল-- ছেনি হাতুড়িই ছিল ভাল। জ্যোতিষগিরি কাল হোল।। এখন গারদের রুটি খাও, বা শূলে চড়ো।

সব কথা শুনে, বিবি ধমকে উঠল—সত্যিই, ভীতুর ডিম একটা তুমি। অত ভাববার কী আছে? যেভাবে আংটি উদ্ধার করেছিলে, সেই ভাবেই লেগে পড়ো। খোঁজ করতে থাকো। নিশ্চয়ই পেয়ে যাবে। কোন কাজে হাল ছাড়তে নাই। 

 আহমেদ বলল-- আমার কেরামতিতে কিছু হয়নি। আল্লাহর দয়া কাজে লেগে গিয়েছিল। এবার রেহাই নাই আমার। 

কাজ শুরুর আগেই ভেঙে পড়ছো কেন? চেষ্টা করতে থাকো। 

জামিলের কথায় আহমেদ বলল-- চেষ্টা তো করব। কিন্তু কখন ৪০ দিন পার হয়ে যাবে, সেটাই মনে থাকবে না। ---কেন থাকবে না? মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল জামিল--ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। গোণাগুণতি তোমার নিজের হাতেই থাকবে। 

৪০টা শুকনো খেজুর এনে, একটা জারের মধ্যে রেখে দিল জামিল। আহমেদকে বলল-- প্রতিদিন একটা করে খেজুর খেয়ে নেবে। সেই সাথে হিসেব করবে, ১টা দিন চলে গেল। দেখবে, ৪০ দিনের হিসাব তোমার হাতের মুঠোতেই থাকবে। 

কথাটা বেশ মনে ধরল আহমেদের। 

এদিকে হয়েছে কি, ডাকাতদের দলে সুলতানের এক সেপাইও ছিল। তোষাখানা আর সিন্দুকের খবর সেই দিয়েছিল ডাকাতদের। সুলতান যে আহমেদকে ডাকাত ধরার দায়িত্ব দিয়েছে, সেপাইটা সব জেনেছে। সোজা গিয়ে ডাকাত সর্দারের কাছে সমস্ত কথা বলে দিয়েছে সেপাইটা। 

সর্দার বলল-- জ্যোতিষীগুলো সব ধাপ্পাবাজ। ওদেরকে ভয় পেতে নাই।

একজন ডাকাতকে ডেকে সর্দার বলল-- আহমেদের বাড়িটা তো নজর রাখ তুই। কী করে, কী বলে, সব এসে আমাকে বলবি। 

সেদিন রাতে শুতে যাওয়ার আগে, একটা খেজুর মুখে ভরে দিল আহমেদ। বলল-- এই হল একটা। 

ডাকাতটা তো আড়ি পেতে ছিল আহমেদের খিটকির জানলায়। তার কানে গিয়েছে কথাটা। ভয় পেয়ে, চমকে উঠেছে লোকটা। দৌড়ে গিয়ে ডাকাত সর্দারকে বলেছে—সর্দার, আল্লাহর দোয়া আছে নিশ্চয়ই লোকটার উপর। অনেক ক্ষমতা। আমি তো একেবারে আড়ালেই ছিলাম। সে ঠিক বুঝতে পেরেছে আমাকে। আমি নিজের কানে শুনে এলাম-- এই হল একটা।


 সেদিন রাতে আরেকজন সাগরেদকে সাথে নিয়ে গিয়ে ডাকাতটা। রাত হয়েছে। এক সময় শুনতে পেল, আহমেদ বলছে-- আজ দুটো হল। 

দুই ডাকাত ফিরে গিয়ে, সর্দারকে সব জানিয়েছে। তাতেও সর্দারের বিশ্বাস হচ্ছে না। পরের দিন তিনজনকে পাঠালো। তারাও ফিরে গিয়ে, একই সংবাদ দিয়েছে। এরপর চার জন, পাঁচ জন, ছয় জন-- এই ভাবে একেক জন করে ডাকাতকে দলে জুড়ে পাঠাতে লাগলো। 

এদিকে প্রত্যেক দিন একটা করে খেজুর খাচ্ছে আহমেদ। আর মুখে বলছে, আজ এতটা হোল। ডাকাতগুলো শুনছে তার কথা। আর ফিরে গিয়ে, সেই কথা জানাচ্ছে ডাকাত সর্দারকে।। 

একটা একটা করে যত দিন যাচ্ছে, সর্দারেরও কিন্তু মাথায় দুশ্চিন্তা চেপে বসছে। ভয়ও করছে খানিকটা। ভয় করছে আহমেদেরও। দিন দিন খেজুরের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তার মানে, সুলতানকে দেওয়া সময়ও কমে যাচ্ছে। অথচ ডাকাত বা সিন্দুকের কোন হদিশই পাওয়া যাচ্ছে না। গরাদে যে ঢুকতেই হবে, ভালোই বুঝে গেছে আহমেদ। 

বিপদ বুঝেছে জামিলও। স্বামীর হাত ধরে বলল-- না গো, ভুল আমারই হয়েছিল। বেশ ছিলাম আমরা। কেন যে আরও সুখের খোঁজে গেলাম। তোমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছি আমি। আমাকে ক্ষমা করতে পারবে তুমি? 

--ভুল তো আমারও হয়েছে, জামিল। আমার উচিত হয়নি নতুন রাস্তায় হাঁটা। আহমেদ  বলল-- কিন্তু এখন আর ভেবে কী হবে? বিপদের হাত থেকে তো রেহাই হবে না।

এসব ভাবতে ভাবতে, এক দিন খেজুরের সংখ্যা কমে শেষটাতে এসে ঠেকল। সেদিন রাতে ৪০ জন ডাকাতের সকলকেই পাঠিয়েছে সর্দার। তারা সেদিন এসে বসেছে আহমেদের ছাদের ওপর।

নিত্যদিন যেমনটা করে, সেদিনও রাতের খাওয়া শেষ হোল আহমেদের। শুতে যাবার আগে, শেষ খেজুরটা মুখে পুরে দিল। খাওয়া শেষ করে, বলল—৪০টার হিসাব শেষ। গোণাগুণতি সেরে ফেলেছি আমি। ৪০টা হয়ে গিয়েছে। এখন বাকি শুধু সুলতানের দরবারে গিয়ে কবুল করা। 

সব কথাই কানে গিয়েছে ৪০টা ডাকাতের। তাদের তো প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। সুলতানের যে সেপাইটা তাদের দলে ছিল, সে তো আগেভাগেই জানিয়ে রেখেছে সবাইকে। তেল মাখানো শূল পোঁতা হয়েছে দরবারের সামনের মাঠে। বড় বড় কড়াইতে তেল গরম করার কাজও শুরু হয়েছে। যার যেটা পছন্দ বেছে নিয়ে পারবে ডাকাতরা। জ্যোতিষী সন্ধান দিনেই, তাদের পাকড়াও করে আনা হবে। গরম তেলে ফোটানো হবে। বা শূলে চড়ানো। চুরির দণ্ড হিসাবে। 

ছাদ থেকে নেমে, ৪০ জন লোক পড়ি-কি-মরি করে দৌড়ে গিয়েছে সর্দারের বাড়ি।  ফুটন্ত তেলে সেদ্ধ হয়ে বা শূলে চড়ে মরবার ভয় সবার মনে। সবাই একসাথে কথা বলতে লেগেছে। কারও কথাই ভালো করে কানে যাচ্ছে না সর্দারে। ভারি একটা হুলুস্থুল কাণ্ড সেখানে।

এদিকে, আহমেদের বাড়িতে শ্মশানের নীরবতা। সকাল হলেই সুলতানের দরবারে হাজির হতে হবে। চুরির কোনও কিনারাই হয়নি। সুলতান নিশ্চয়ই শূলে চড়াবেন তাকে। কথা সরছে না আহমেদের মুখে। সান্ত্বনা দেবার ভাষা জোগাচ্ছে না তার বিবির মুখেও।

তখন মাঝরাত। হঠাৎই সদর দরজায় ভারি একটা গোলমালের আওয়াজ। আহমেদ বুঝে গিয়েছে, সুলতানের সেপাইরা এসেছে তাকে ধরে নিয়ে যেতে। ভয়ে থর থর করে কেঁপে উঠল বেচারা। বিছানা ছেড়ে উঠে, দরজা খুলতে খুলতে বলল—জানি আমি, কেন এসেছ তোমরা। জানতে আমার বাকি নাই। 

পাল্লা দুটো খুলে দিয়েছে। সামনে তখন এক পরম বিস্ময়। সুলতানের সেপাইরা কেউই আসেনি। ৪০টা ডাকাত তার সামনে দাঁড়িয়ে। 

৪০ জন মানুষ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে আহমেদের সামনে। বার বার মাথা ঠুকছে মাটিতে। সর্দার ককিয়ে উঠেছে—আমি জানি তুমি সব ধরে ফেলেছ। তোমার চোখকে কিছুই ফাঁকি দেওয়া যায় না। দয়া করো আমাদের। সুলতানের হাতে তুলে দিও না আমাদের। 

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল আহমেদ। কিন্তু চটপট বুঝে গেল, এই হারামজাদাগুলোই কোষাগারে ডাকাতি করেছে। মেজাজ চড়িয়ে বলল—অনেক হয়েছে। আর মড়া কান্না কাঁদতে হবে না, হতভাগার দল। আর, জায়গা পেলি না? একেবারে বাঘের গুহায় গিয়ে মাথা গলিয়েছিস। এবার আর কী? মর সব কটা। 

হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠেছে সর্দারটা— দোহাই তোমার। বউ বাচ্চা আছে আমাদের সবার ঘরে। না খেয়ে শুকিয়ে মারা পড়বে সবাই। যে করেই হোক, বাঁচাও আমাদের। যা হুকুম করবে তুমি, মাথা পেতে নেব। 

মওকা পেয়ে গেল আহমেদ। গম্ভীর গলায় বলল--তাহলে, এক কাজ কর। যেখানের মাল, সেখানেই আবার জমা করে দিয়ে আয়। যেটা যেমনটি ছিল, ঠিক তেমনটি।

রাত পোহাতে পেল না। ৪০ জন ডাকাত ৪০টা সিন্ধুক রাজার কোষাগারে জমা করে দিল। 

সুলতানের পেয়াদা আসার আগেই, আহমেদ নিজেই দরবারে গিয়ে হাজির হয়েছে। সেদিন ভরা দরবার। সবাই হাঁ করে বসে আছে জ্যোতিষীর কেরামতি দেখবার জন্য। আহমেদ ভেতরে ঢুকেছে বেশ সাহসীর মতো। ভয়-ডরের আমান্য ফোঁটাটুকুও নাই চোখেমুখে। সুলতান খুশি হয়েছেন তা দেখে। নিশ্চয় একটা হিল্লে করতে পেরেছে। এই ভেবে জানতে চাইলেন—হদিস করতে পেরেছ কিছু।

--হাঁ, হুজুর। আল্লাতালাহর কৃপায় পেরেছি। 

--কোথায় সেই হতভাগাগুলো? হাজির করো দরবারে। তেল ফুটছে কড়াইতে। 

সুলতানকে থামিয়ে, আহমেদ বলল—যে কোনও একটা পাবেন আপনি। ভরা সিন্ধুক, না কি ৪০টা ডাকাত? বেছে নেবার অধিকার আপনার।

৪০টা সিন্ধুক ভরা ধন-রত্ন। চাট্টিখানি কথা না কি? সাত পুরুষের জমানো ধন সেসব। এদিকে ভয়াণক ডাকাতগুলো! মুণ্ডু চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে সুলতানের। একটু ভেবে নিয়ে বললেন—সিন্দুকগুলোই ফেরত চাই। কোথায় আছে, বলো। এক্ষুণি সেপাইদের পাঠিয়ে দিচ্ছি। 

--না, হুজুর। কিচ্ছুটি করতে হবে না আপনাকে। যা কিছু করবার, সে ভার তো আপনি আমাকে দিয়েছেন।

বলেই চোখ বুজে ফেলল আহমেদ। হাত দু’খানা দু’দিকে ছড়িয়ে, বাতাসে দোলাতে লাগল। মুখে একটু শব্দ করে দুর্বোধ্য কিছু শব্দ আউড়ে যেতে লাগল। পুরো দরবার হাঁ হয়ে দেখছে লোকটার কাণ্ডকারখানা। 

একটু বাদে। বিড়বিড় শব্দ থেমে গেল তার। হাত নাড়াও। চোখের পাতা খুলল মহান জ্যোতিষীর। 

লম্বা করে একটা সেলাম ঠুকল সুলতানকে-- মাফ করবেন, হুজুর। মেহেরবানি করে নিজের চোখে দেখে আসুন সব কিছু। আপনার ৪০টা সিন্দুক আমি আপনার কোষাগারে পৌঁছে দিতে পেরেছি। 

সুলতানের চোখ গোল গোল। গোটা দরবার থ’ হয়ে গিয়েছে। এমনটা কেউ পারে না কি? বিশ্বাসই হচ্ছে না কারও। গোটা দরবার নীরব। একটা পিঁপড়ে হেঁটে গেলেও শব্দ হয়, এমন অবস্থা। 

খানিক বাদে সুলতানের মুখে আলো ফিরে এসেছে। আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠেছেন। বললেন—চলো, কোষাগারে। সিন্দুক দেখাবে আমাকে। 

আহমেদের মুখে বিনয়ের হাসি—না, হুজুর। এই কাজটি আমি পারব না। অন্যের কোষাগারে ঢোকা, আমার গুরুর বারণ। এই হুকুমটি করবেন না আমাকে। আমাকে সেপাইদের জিম্মায় রেখে, আপনি নিজে ঘুরে আসুন। 

নিজের দেওয়ান আর খাজাঞ্চিকে নিয়ে কোষাগারে পৌঁছে যা দেখলেন, সুলতানের চোখ এবার ছানাবড়া। এই চল্লিশটা দিন খাঁ-খাঁ করছিল এই ঘরটা। আজ একেবারে সিন্ধুকে ঠাসা! খাজাঞ্চিকে হুকুম করলেন। বুড়ো মানুষটা হন্তদন্ত হয়ে, সবগুলো সিন্দুক খুলে খুলে পরখ করে নিল। সবই ঠিক আছে, হুজুর। একেবারে যেমনটি ছিল।

সুলতান দরবারে ফিরে এলেন। মুখখানা আলোয় ঝলমল করছে। বললেন—আজকের এই ভরা দরবারে যারাই হাজির আছো, সব্বাই শোন। দুটো ফরমান জারি করা হোল—আমার যে দশটা জ্যোতিষী বসে বসে মোহর বাগাচ্ছিল, সব কটাকে গরাদে ভরে দেওয়ার হুকুম হোল। আমার দ্বিতীয় ফরমান—আজ থেকে একে আমি রাজজ্যোতিষী নিয়োগ করলাম। আমার প্রাসাদেই আলাদা একটা মহল দেওয়া হবে এই মহান গ্ণৎকারকে। 

আকাশের বাজ এসে ভেঙে পড়ল আহমেদের মাথায়। এই বারটা বরাত জোরে, কোন রকমে রেহাই পাওয়া গিয়েছে। বারবার কি আর তা সম্ভব? পরের বারেই হয় শূলে চড়তে হবে। নয়তো গরম তেলের কড়াই। 

সে হাত জড়ো করে বলল—আমাকে মার্জনা করবেন, হুজুর। রাজজ্যোতিষী আমি হতে পারব না। আমাকে আপনি রেহাই দিন।

সারা দরবার অবাক। এমন সৌভাগ্য কেউ ফিরিয়ে দেয়? অবাক সুলতানও—কেন? এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় কেউ? 

আহমেদ বলল—তা হলে সত্যি কথাটা বল, হুজুর। এত বড় একটা ডাকাতির ফয়সলা করা সোজা কাজ নয়। সেই সাথে নগরীর সেরা ৪০টা ডাকাতকে পাকড়াও করা-- সেও খুব কম কঠিন নয়। পুরো চল্লিশটা দিন ধরে আল্লাতালাহর ধ্যানই করে গিয়েছি আমি। অবশেষে, কালই সাক্ষাত পেয়েছি তাঁর। কথা দিয়েছি, সুলতানের সম্পদের সন্ধানটুকুই দাও আমাকে। জীবনে আর কখনও গ্ণনা করব না আমি। তাতেই তিনি আমাকে দোয়া করেছেন। আমার সমস্ত জ্ঞাণ উজাড় করে, তবেই আমি আপনার হুকুম পালন করতে সক্ষম হয়েছি।

সভাশুদ্ধ লোক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনল কথাগুলো। সুলতানের মুখেও কথা নাই কোনও। আহমেদ আবার বলল—আপনার ঐ ফুটন্ত তেলে আমাকে ফেলে দিন আপনি। হাসি মুখে সে হুকুম মেনে নিয়ে, দুনিয়া থেকে চলে যাব আমি। কেবল আল্লাতালাহকে দেওয়া কথার খেলাপ করতে বলবেন না। আমাকে মহা পাতক হতে হুকুম করবেন না, হুজুর।

দরবার শুদ্ধ সবাই ধন্য ধন্য করে উঠল আহমেদকে। আনন্দে তৃপ্তিতে চোখের কোণা চিকচিক করে উঠেছে সুলতানেরও। গদগদ কন্ঠে বললেন—আজ আমি ধন্য মনে করছি নিজেকে। আমার নগরীতে এমন একজন মহান মানুষ আছেন, এজন্য।

নিজে মসনদ থেকে নেমে এলেন সুলতান। বললেন—ঠিক আছে। আমার এত বড় উপকার করে দিয়েছ তুমি। সেজন্য নয়। এত বড় মনের পরিচয় দিয়েছে তুমি। সেজন্য তোমাকে পুরষ্কৃত করতে চাই আমি। কোষাগারের ৪০টা সিন্দুকের যে কটা তোমার মন চায়, তুমি নিয়ে যাও। চাইলে, সবকটাও নিতে পারো। তোমার মত একজনকে পুরষ্কৃত করে, আমি তাতে খুশিই হবো। 

মোহর ভরা সিন্দুকের কথা কানে যেতেই, নিজের বিবির মুখ মনে ভেসে উঠল মহান মানুষটার। অভাবের সংসার। কোন দিন ভালো-মন্দ কিছুই দিতে পারেনি জীবনে। আজ সেই সৌভাগ্য হাতের মুঠোয় উঠে এসেছে তার।

মৃদু হেসে, বলল—গোস্তাকি মাফ করবেন, হুজুর। আমি এসব নেব না। খোদার বান্দা আমি। অভাবী মানুষ। খোদার দোয়াতেই দিন চলে যাবে আমার। আর কিচ্ছুটি চাই না। 

--ঠিক আছে। চিনতে পেরেছি আমি তোমাকে। তুমি বাড়ি যাও। আমার সেপাইরা যাচ্ছে তোমার সাথে। একটা সিন্ধুক তোমাকে নিতেই হবে। এটা সুলতানের হুকুম। সেপাইরা বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে সিন্দুকটা।

আর একটু হলে, আনন্দে সেখানেই লাফিয়ে উঠতে যাচ্ছিল আহমেদ। অনেক কষ্টে চেপে রাখল নিজেকে। হাত দুয়েক লম্বা একটা কুর্ণিশ ঠুকে, আহমেদ বলল—আমার একটা নিবেদন আছে আপনার কাছে। 

সুলতান শুনে ভারি খুশি—বলো, তোমার কী নিবেদন। পূরণ করা হবে। 

অভয় পেয়ে, আহমেদ বলল—ডাকাত গুলোকে আপনার সিপাই দলে জুড়ে নিন। সাহসী লোক সব। তবে, ভারি অভাবী। বউ-বাচ্চা আছে ঘরে। আপনারই প্রজা তারা। ডাকাতি ছেড়ে দিলে, না খেয়ে মরতে হবে তাদের। 

কথা সরছে না সুলতানের মুখে। হাসি মুখে মাথা নেড়ে দিলেন। দরবার থেকে বেরিয়ে গেল আহমেদ।। 

একটা সিন্দুকে কম মোহর ধরে না। তা দিয়ে পেল্লায় বাড়ি গড়েছে আহমেদ। কিনেছে বেশ কয়েকটা ঘোড়া আর উটও। আর, অনেক জমিজমা। বনে কাঠ কাটতে যেতে হয় না আর। জামিলও জ্যোতিষ হতে বলে না তাকে। বেশ সুখেই দিন কেটে যায় দুজনের। 


Post a Comment

0 Comments