জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার : সপ্তম খণ্ড/পর্ব ৫ : ভাঙন/কমলিকা ভট্টাচার্য


বাঁচার উত্তরাধিকার : সপ্তম খণ্ড
পর্ব ৫ : ভাঙন
কমলিকা ভট্টাচার্য

প্রথম দিন।
তারপর দ্বিতীয়।
তারপর তৃতীয়।
সময় ধীরে ধীরে অর্থ হারিয়ে ফেলল।
আদর জানত না সে কোথায় আছে। জানত না কতদিন কেটে গেছে। জানত না বাইরে দিন না রাত। ঘরটার কোনো জানালা নেই। কোনো ঘড়ি নেই। কোনো শব্দ নেই। শুধু কংক্রিটের দেয়াল। হলুদ আলো। আর নীরবতা। অসহ্য, অবিরাম নীরবতা।
প্রথম কয়েকদিন সে সময় গুনতে চেষ্টা করেছিল। ঘুম থেকে ওঠা। খাবার আসা। আবার ঘুম। কিন্তু ধীরে ধীরে সবকিছু গুলিয়ে যেতে লাগল।
একদিন দরজা খুলে হারগ্রিভ ঢুকল। হাতে একটা ট্যাবলেট। মুখে সেই চিরচেনা শান্ত হাসি। যে হাসিটা আদরের কাছে এখন বিষের মতো লাগে।
হারগ্রিভ সামনে এসে বসল।
— "আজ কেমন আছ?"
আদর কোনো উত্তর দিল না।
হারগ্রিভ যেন সেটাই আশা করেছিল। সে ট্যাবলেটের স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে একটা ছবি খুলল।
অনির্বাণ।
ল্যাবের মধ্যে দাঁড়িয়ে। বহু বছর আগের ছবি।
হারগ্রিভ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "চেনো?"
আদর ঠান্ডা গলায় বলল,
— "আমার বাবা।"
হারগ্রিভ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "না।"
— "তোমাকে এই কথাটাই বুঝতে হবে, আদর্শ।"
সে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
— "ও তোমার বাবা নয়।"
আদর মুখ ফিরিয়ে নিল।
— "ও তোমাকে তৈরি করেছে।"
— "চুপ করুন।"
— "তোমাকে ব্যবহার করেছে।"
— "চুপ করুন!"
প্রথমবার আদরের গলায় রাগ শোনা গেল।
কিন্তু হারগ্রিভ শুধু হাসল। একটা অদ্ভুত, ধৈর্যশীল হাসি। যেন সে জানে এই লড়াইটা দীর্ঘ হবে। আর শেষ পর্যন্ত সে জিতবেই।
পরের দিন।
ঘরে একটা স্ক্রিন বসানো হলো। বড়। কালো।
হারগ্রিভ নিজে এল না। দুজন লোক এসে স্ক্রিনটা চালু করল।
🍂
ভিডিও চলতে শুরু করল।
পুরোনো গবেষণাগার। নিউরাল ইন্টারফেস। মানুষের মস্তিষ্কের স্ক্যান। কৃত্রিম নিউরাল ম্যাট্রিক্স। বায়ো-সিন্থেটিক মডেল।
তারপর—
অনির্বাণ।
ঋদ্ধিমান।
তাদের আলোচনা।
কিছু পুরোনো রেকর্ডিং।
বিচ্ছিন্ন অংশ। সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ ছাড়া। এডিট করা। কাটা। জোড়া লাগানো।
ভিডিওর এক জায়গায় অনির্বাণ বলছেন—
"যদি প্রজেক্ট সফল হয়, তাহলে ও অসাধারণ কিছু হতে পারে।"
অন্য জায়গায়—
"আমাদের ওকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।"
আরেক জায়গায়—
"ওকে সাধারণ মানুষের মতো বড় করা দরকার।"
ভিডিও থেমে যায়।
দরজা খুলে হারগ্রিভ ঢোকে।
— "দেখলে?"
আদর চুপ।
— "কেউ কোনো শিশুকে এভাবে বর্ণনা করে?"
— "আপনি মিথ্যা বলছেন।"
— "আমি?"
হারগ্রিভ হেসে ওঠে।
— "আমি তো শুধু সত্যিটা দেখালাম।"
সে ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকে আসে।
— "তুমি কি নিশ্চিত তুমি কোনো বানানো মানুষ নও?"
আদর কিছু বলে না।
কিন্তু প্রথমবার— খুব সামান্য— তার ভিতরে একটা প্রশ্ন জেগে ওঠে।
এক মুহূর্তের জন্য।
তারপর সে প্রশ্নটাকে জোর করে চাপা দেয়।
আরও দিন কেটে যায়।
অথবা সপ্তাহ।
সে জানে না।
ঘুম ভাঙলেই নতুন ভিডিও। নতুন ছবি। নতুন কথা।
একই বার্তা।
বারবার।বারবার।বারবার।
"তুমি সত্যি মানুষ নও।"
"তোমার স্মৃতি মিথ্যা।"
"তোমার জীবন একটা পরীক্ষাগার।"
"তোমাকে ব্যবহার করা হয়েছে।"
"অনির্বাণ তোমাকে তৈরি করেছে।"
"ঋদ্ধিমান তোমাকে লুকিয়ে রেখেছে।"
"তুমি তাদের প্রকল্প।"
প্রথম দিকে আদর প্রতিবাদ করত। চিৎকার করত। তর্ক করত।
পরে সে শুধু চুপ করে থাকত।
আরও পরে— সে নিজেই নিজের মনে প্রশ্ন করতে শুরু করল।
যদি...
যদি সত্যিই...
না।অসম্ভব।
অনির্বাণ আমার বাবা ...কখনও...না
কিন্তু...
হারগ্রিভ যে ভিডিওগুলো দেখাচ্ছে?
সেগুলো কোথা থেকে এলো?
কেন তার শৈশবের এত তথ্য হারগ্রিভের কাছে?
কেন?কেন?কেন?
প্রশ্নগুলো মাথার ভিতর ঘুরতে থাকে।
দিনরাত।
ঘুমের মধ্যেও।
একদিন হারগ্রিভ একটা আয়না নিয়ে এল। বড়। লম্বা। চেয়ারের সামনে বসিয়ে দিল।
— "নিজেকে দেখো।"
আদর তাকাল না।
— "তাকাও।"
— "না।"
— "তাকাও!"
হারগ্রিভের গলায় হঠাৎ বজ্রপাতের মতো কঠোরতা নেমে এল।
আদর বাধ্য হয়ে তাকাল।
ক্লান্ত মুখ। চোখের নিচে কালি। দাড়ি। অগোছালো চুল।
নিজেকেই চিনতে কষ্ট হচ্ছে।
হারগ্রিভ খুব আস্তে বলল,
— "ওই মুখটা কি সত্যি?"
— "নাকি তৈরি করা?"
— "কখনও ভেবেছ?"
আদর চোখ বন্ধ করে ফেলল।
কিন্তু কথাগুলো মাথায় থেকে গেল।
এরপর শুরু হলো আরও ভয়ংকর কিছু।
নিঃসঙ্গতা।
কখনও টানা দুই দিন কেউ আসে না।
কখনও তিন দিন।
কখনও চার।
শুধু খাবার রেখে যায়।
কোনো কথা নয়।
কোনো মানুষ নয়।
কোনো শব্দ নয়।
শুরুতে আদর অপেক্ষা করত।
পরে দেয়ালের সঙ্গে কথা বলা শুরু করল।
নিজের সঙ্গে কথা বলল।
পুরোনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করল।
মায়ের মুখ।
ইরার রান্নাঘর।
দৃষ্টির ভায়োলিন।
নোয়ার প্রথম শব্দ।
কিন্তু আশ্চর্যভাবে— সবকিছু ঝাপসা হতে শুরু করল।
যেন কুয়াশার ভিতর হারিয়ে যাচ্ছে।
সে দৃষ্টির মুখ মনে করতে চাইল।
পারল না।
শুধু একটা সুর মনে পড়ল।
মুখ না।
সে নোয়ার মুখ মনে করতে চাইল।
পারল না।
শুধু ভাঙা একটা শব্দ।
"আ...দর্শ..."
তারপর সেটাও হারিয়ে গেল।
একদিন হারগ্রিভ আবার এল। হাতে একটা ফাইল।
সে ফাইলটা খুলে টেবিলে রাখল।
ভিতরে লেখা—
SUBJECT : কৃত্রিম মানুষ।
হারগ্রিভ ধীরে ধীরে পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে লাগল।
— "এই ফাইলটা আমি তিরিশ বছর ধরে তৈরি করছি, তোমার জন্মের ও আগে থেকে।"
আদর ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে রইল।
— "জানো এর সবচেয়ে মজার অংশ কী?"
কোনো উত্তর নেই।
হারগ্রিভ বলল,
— "তোমার জীবন সম্পর্কে সবকিছু এখানে আছে।"
সে থামল।
তারপর ফিসফিস করে বলল—
— "তোমার চেয়েও বেশি আমি তোমায় জানি।"
আদরের বুকের ভিতর হঠাৎ একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হলো।
সে আর নিশ্চিত নয়।
কোনটা সত্যি।
কোনটা মিথ্যা।
কোনটা স্মৃতি।
কোনটা গল্প।
আরও কিছুদিন পরে।
এক সকালে ঘুম ভেঙে আদর বুঝল— সে একটা নাম মনে করতে পারছে না।
খুব পরিচিত একটা নাম।
খুব গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু মনে পড়ছে না।সে মাথা চেপে ধরল।চেষ্টা করল।
আবার।আবার।আবার।
কিছুতেই না।
দুপুরে হারগ্রিভ এল।
দেখল আদর অস্থির।
সে হাসল।
— "কিছু খুঁজছ?"
আদর ধীরে মাথা তুলল।
— "আমি..."
— "হ্যাঁ?"
— "আমি একটা নাম ভুলে গেছি।"
হারগ্রিভের চোখে বিজয়ের ঝলক দেখা গেল।
— "কার নাম?"
আদর অনেকক্ষণ ভেবে বলল—
— "জানি না।"
হারগ্রিভ উঠে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে দরজার দিকে হাঁটল।
তারপর থেমে বলল—
— "দেখলে?"
— "স্মৃতি কত সহজে ভেঙে যায়।"
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
সেই রাতে আদর একা বসে ছিল।
চোখ খোলা।
অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে।
তার মাথার ভিতর অসংখ্য ছিন্নভিন্ন স্মৃতি ভাসছে।
কোনোটার শুরু আছে।
শেষ নেই।
কোনোটার মুখ আছে।
নাম নেই।
হঠাৎ তার মনে হলো— তার নিজের নাম কী?
সে কপাল চেপে ধরল।
চেষ্টা করল।
অনেক চেষ্টা।
কিন্তু শব্দটা যেন কুয়াশার ওপারে।
ধরা যাচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত সে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— "আমি কে?"
কোনো উত্তর এল না।
শুধু দূরে কোথাও একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
প্রথমবার ভিক্টর হারগ্রিভের মুখে সম্পূর্ণ তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
কারণ সে জানত— শরীর ভাঙা কঠিন নয়।
আত্মা ভাঙাই আসল কাজ।
আর আদর্শ সেনের ভিতরে প্রথম বড় ফাটলটা আজ তৈরি হয়ে গেছে।

Post a Comment

6 Comments

  1. AnonymousJuly 05, 2026

    পঞ্চম পর্বটি অসাধারণ। মনস্তত্ত্ব, ভাষা আর গল্প বলার দক্ষতার এমন মেলবন্ধন বাংলা সাহিত্যে সত্যিই বিরল। প্রতিটি পর্ব পড়া মানেই নিজেকে আরও একটু সমৃদ্ধ করা। কমলিকা ভট্টাচার্যকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJuly 05, 2026

      অনেক ধন্যবাদ 🙏

      Delete
  2. AnonymousJuly 05, 2026

    অসাধারণ একটি পর্ব

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJuly 05, 2026

      অনেক ধন্যবাদ🙏

      Delete
  3. AnonymousJuly 05, 2026

    আমি কি একজন পাঠক? জীবন্ত? না আমাকে তৈরী করে চলেছে এক নিষ্ঠুর লেখক। আমি শুধুই এক চরিত্র? এই পর্বের পরে আরশভরসা রাখতে পারছি না আমার বোধের ওপর। সাংঘাতিক লেখা রে বাবা। 🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJuly 05, 2026

      আমিই বোধহয় এই পৃথিবীর প্রথম লেখক, যে পাঠকের কাছ থেকে 'নিষ্ঠুর' খেতাব পেল! 😄 এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! যদি গল্পটা আপনার বোধকে নাড়িয়ে দিতে পারে, প্রশ্নের ভেতর ফেলে দিতে পারে, তবে লেখক হিসেবে আমি সত্যিই ধন্য। এত মন দিয়ে পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ও ভালোবাসা। 🙏❤️

      Delete