সুদর্শন নন্দী
কঠিন প্রশ্ন। বেশই কঠিন। প্রশ্নটা "কেন লিখি" না হয়ে যদি "কেন পড়ি" হত তবে উত্তর সোজা হত । আরো সোজা হত "কেন আর লেখেন না" প্রশ্নটি এলে। আসলে এ প্রশ্ন কখনো ভেবেই দেখি নি। ছাইপাশ যাই লিখি না কেন, মনে কোনোদিনই প্রশ্ন আসে নি যে কেন লিখি? নিজেকে কখনো প্রশ্ন করি নি লেখার কারণটা কি? লিখি কারণ লিখতে ইচ্ছে করে, লিখে বেশ তৃপ্তি পাই, লিখতে ভালো লাগে। কিন্তু "লিখি কেন" প্রশ্নের উত্তরে এই উত্তরটাই কি সব? বোধ হয় নয়। অসম্পূর্ণ উত্তর।
সাহিত্য জগতে লেখকের লেখার বিষয় বিভিন্ন। অনেক সময় লেখার বিষয় প্রেক্ষিতে কেন লিখির উত্তরটা আলাদা হয় । যেমন প্রিন্টিং মিডিয়ায় চাকুরীরত যারা খবরের কাগজে লেখেন তারা লেখেন জীবিকার কারণে। অথবা জীবিকা বা শখ এই দুই কারণে। আবার পাঠক হিসেবে যারা পাঠকের কলমে লেখেন তারা লেখেন কোন একটি বিষয়ে জনসাধারণের বা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। আবার অনেকে লেখেন অন্য কোন প্রকাশিত নিবন্ধ বা প্রতিবেদনের ভুল, ত্রুটি ধরানো বা কিছু সংযোজনের জন্য। সেটাও পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য লেখেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার লেখার শুরুর দিকে কারণও ছিল বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সেই লেখা জনকল্যাণের জন্য অথবা সরকারের কোন ভুলের প্রতিবাদ স্বরূপ। মনে হত লেখার মাধ্যমে মানুষের অনেক উপকার করা সম্ভব। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রথম প্রথম লিখতাম আরেক কারণে। তা হল কাগজে নিজের নামটি বেরোবে। অসংখ্য মানুষ নামের সাথে পরিচিত হবেন এই লোভে। এক্ষেত্রে কেন লিখি'র উত্তর হল নাম দেখার লোভে লিখি। পরে মনে হল, কাগজে পাঠকের কলমে লেখার সাথে প্রবন্ধ নিবন্ধ গল্প রম্যরচনা ভ্রমণ এসব লেখা চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রচুর পত্র পত্রিকা, বই, ম্যাগাজিন, লিটল ম্যাগাজিন পড়া শুরু করলাম, অনুপ্রাণিত হলাম সেসব লিখতে। সেও আজ তিন সাড়ে তিন দশক আগের কথা। কিন্তু লিখব বললেই তো লেখা হয় না। কথায় আছে কালি কলম মন, লেখে তিনজন। আমার কেন সবার কাছেই প্রথম দুটি সহজলভ্য কিন্তু লেখার জন্য মন সেতো স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কলমের ডগায় আসতে হবে। আমার ক্ষেত্রেও তাই। আমার মন কিছুতেই আর কলমকে সাহায্য করে না। এখন তো কালি কলম মনের যুগ শেষ। তার জায়গায় এসে বসেছে ল্যাপটপ আর স্মার্টফোন। আর কিছুদিন পর হয়তো মনের জায়গাটাও এ আই (AI) দখল করবে। কিছু লেখক মনকে কাজে লাগানোর সাথে যন্ত্রকে কাজে লাগাবেন। বা ইতিমধ্যেই AI কে লেখালিখির জন্য কাজে লাগানো হচ্ছে।
নিজের কথায় আসি।
খাপছাড়া ভাবে কিছু ছোটদের গল্প, নিবন্ধ, ভ্রমণ, রম্যরচনা লেখার চেষ্টা করি। সেসব লেখার মধ্যে নিজের অনুভূতি, জীবনদর্শন, বক্তব্য থাকত তবে তা পাঠকদের কাছে কতটা উপদেয় হত বা আদৌ এখনো হয় কিনা জীবনের এই শেষ পিরিয়ডে এসে বুঝতে পারি নি।
সামগ্রিকভাবে বললে, একজন লেখক মূলত নিজের অব্যক্ত অনুভূতি প্রকাশ করতে, সমাজকে বার্তা দিতে, নতুন জগৎ সৃষ্টি করতে বা অবচেতন মনের ভাবনার জট ছাড়াতে লেখেন। লেখকদের লেখার পেছনে প্রধান কারণগুলো হল নিজের আবেগ, রাগ, ভালোবাসা বা অভিজ্ঞতাকে কাগজের মাধ্যমে অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়া, বলা যেতে পারে আত্মপ্রকাশের অভিপ্সা । সমাজের অন্যায়, অসঙ্গতি তুলে ধরে মানুষের চিন্তাধারা পরিবর্তন করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কল্পনার আশ্রয় নিয়ে এমন এক জগৎ তৈরি করা যেখানে লেখক নিজের মতো করে আশা ও স্বপ্নকে রূপ দিতে পারেন। আমারও কেন লিখি'র উত্তরেও অনেকটা সেরকম কারণ রয়েছে। অনেক লেখকের লেখালেখি একটি নেশা এবং সহজাত অভ্যাস , যা তাদের মানসিক শান্তি ও তৃপ্তি দেয়। এছাড়া অনেক লেখক লেখেন সময়ের গল্প, ঐতিহ্য এবং জ্ঞানকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লিখে সংরক্ষণ করা।
একসময় অনেক লেখকের লেখালিখির অন্যতম কারণ ছিল জীবিকা নির্বাহ। তখন লাইব্রেরির রমরমা ছিল, অসংখ্য পত্র পত্রিকা ছিল, সেসব পত্রিকায় গুণী সম্পাদক ছিলেন। মানুষের অন্যতম প্রধান শখ ছিল পড়া। বই ছিল অন্যতম সঙ্গী। কিন্তু মনে হয় এখন কেউ শুধু জীবিকার জন্য লেখেন না। আজকের এই স্মার্ট ফোন আর গুগুলের যুগে এক জন লেখক লেখালিখি করে সংসারের ভরণপোষণ তো দূর, কাগজ-কলমের পয়সাই জোগাড় করতে পারবেন না। গাঁটের পয়সা খরচ করে তাঁকে বই ছাপাতে হয়, প্রচার ও বিক্রি নিজেকেই করতে হয়। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিছু কুলীন লেখক বাদ দিলে লেখকের করুণ অবস্থা লেখকই জানেন।
বই প্রকাশের প্রয়োজন হলেই প্রকাশকের মাথায় হাত। কে কিনবে লেখকের বই? ক’টি সংখ্যা বিক্রি হবে? প্রকাশকের লগ্নিই বা কি করে লাভের মুখ দেখবে? তখন প্রকাশক লেখকের কাছেই তাঁর বই প্রকাশ করে দেওয়ার নানা রকম কৌশলী ফাঁদ পাতেন। লেখক এক বার শুধু ধরা দিলেই হল। প্রকাশকের লাভ নিশ্চিত। তোমারই পয়সা। তোমারই বই। আমি শুধু লাভের পুরোটা রেখে বই ছাপিয়েই ক্ষান্ত। তার পর তোমার বই বিক্রি হোক, না-হোক, মাথাব্যথা আমার নয়।
শুনেছি, কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখালেখি করেই অন্নসংস্থান করতেন। নিজেকে বলতেন ‘কলম-পেষা মজুর’। যেমন আজকের দিনে অনেক লেখক নিজেকে লেখোয়াড় বলেন।
হঠাৎ কোন লেখকই গজিয়ে ওঠেন না। লেখক হবার জন্য প্রস্তুত হয়ে লিখতে লিখতেই কেবল একজনের পক্ষে হঠাৎ একদিন লেখক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা সম্ভব।
আমার ক্ষেত্রে লেখার মাধ্যমে অন্ন সংস্থানের প্রশ্নই ছিল না। চাকুরী ছিল জীবিকা, আর লেখা ছিল এক কথায় শখ বা নেশা বলা যেতে পারে।
অস্বীকার করার উপায় নেই আমি আজও আত্মপ্রকাশ করে উঠতে পারি নি। আবার বলি,উপরোক্ত কারণ ছাড়া এককথায় বললে আমি লিখি কারণ ভালো লাগে বলে। ঠাকুর বলতেন দাগ রেখে যা। অর্থাৎ এমন কাজ করে যা যেটা ইতিহাস আগলে রাখবে। তেমনি বাংলা সাহিত্যে দাগ রাখার ব্যাপারে ভাবাটাই যেন আমাদের মতো লেখকের কাছে দুঃসাহস। আজকের প্রজন্মের পাঠক এমনকি লেখকও বাংলা সাহিত্যের বিগত দিনের নক্ষত্র লেখকদের চেনেন না বা লেখাই পড়েন নি। সেখানে আমরা জলের বুদবুদ ছাড়া কিছুই নই। তবু লিখি। লিখে নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করতে পারি, এক আনন্দের রেশ জমে মাথায়, ভালো লাগে বেশ। কিন্তু এটাও ঠিক লিখলেই ছাপছে কে? লেখা যদি ছাপার অক্ষরে প্রসবিত না হল, তখন আর "কেন লিখি" মনের আনন্দে বলা সম্ভব হয় না। এই ভাসা ডোবার মাঝেই আমাদের মতো চুনোপুটি লেখকদের বেঁচে থাকা!
🍂
1 Comments
সুদর্শন বাবুর কেন লিখি পড়তে বেশ লাগলো। অকপট কথাগুলোর জন্যই 'কেন এটা পড়লাম' --- ভেবে তৃপ্তি পেলাম
ReplyDelete