দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
কোনও মানুষকে কেবল তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ে বিচার করলে তাঁর জীবনের বহু মূল্যবান অধ্যায় অজানাই থেকে যায়। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ক্ষেত্রেও সেই কথাই প্রযোজ্য। আজও অনেকের কাছে তিনি মূলত একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত। অথচ তাঁর জীবনের শুরু হয়েছিল শিক্ষার আলোয়, গড়ে উঠেছিল জ্ঞানচর্চার পরিবেশে, আর বিকশিত হয়েছিল দেশসেবার এক অনন্য আদর্শে,তাই ৬ই জুলাই তাঁর জন্মবার্ষিকী শুধু একজন নেতাকে স্মরণ করার দিন নয়, বরং একজন অসাধারণ শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ ও কর্মযোগী ব্যক্তিত্বকে নতুন করে জানারও সুযোগ।
১৯০১সালের ৬ই জুলাই কলকাতার ভবানীপুরে তাঁর জন্ম। পিতা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (যাঁকে আমরা বাংলার বাঘ বলে চিনি) ছিলেন ভারতীয় শিক্ষাজগতের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ কখনও পিতার পরিচয়ের ওপর নির্ভর করেননি। ছাত্রজীবন থেকেই নিজের মেধা,অধ্যবসায় ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি আলাদা পরিচিতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর শিক্ষকরা বলতেন, তিনি শুধু পড়াশোনায় ভালো নন, যে কোনও বিষয় গভীরভাবে বোঝার এবং বিশ্লেষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর ছিল।
মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ তাঁর জীবনের এক ঐতিহাসিক ঘটনা। আজও এত কম বয়সে এমন পদে অধিষ্ঠিত হওয়া বিরল, কিন্তু আরও আশ্চর্যের বিষয়, তিনি এই পদকে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে জাতি গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বলে মনে করতেন। তাঁর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ভাষায় উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান গবেষণা এবং নতুন শিক্ষাব্যবস্থার প্রসারে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে জাতি নিজের ভাষাকে সম্মান করতে শেখে না, সে কখনও জ্ঞানে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হতে পারে না।
ড. মুখার্জীর জীবনের একটি কম আলোচিত দিক ছিল তাঁর বইপ্রীতি। রাজনীতি, শিক্ষা কিংবা প্রশাসনের ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় বই পড়তেন। ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, সাহিত্য প্রায় সব ধরনের বই ছিল তাঁর আগ্রহের বিষয়। তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ছিল সমৃদ্ধ। তিনি মনে করতেন, একজন নেতা যত বেশি পড়বেন, তাঁর সিদ্ধান্ত তত বেশি পরিণত হবে।
আরও একটি বিষয় খুব কম মানুষ জানেন। আইনজীবী হিসেবে তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল। ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করার পর তিনি চাইলে ব্যক্তিগত জীবনে বিপুল সাফল্য অর্জন করতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেই পথ ছেড়ে শিক্ষা ও জনজীবনের কঠিন পথ বেছে নেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার চেয়ে জাতীয় কর্তব্য অনেক বড়।
স্বাধীনতার পরে দেশের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। শিল্পোন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আত্মনির্ভর ভারতের ধারণা নিয়ে তিনি কাজ করেছিলেন,কিন্তু ক্ষমতার চেয়ে নীতিকে তিনি বড় বলে মনে করতেন। মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে তিনি মন্ত্রিসভা ছেড়ে দেন। এই ঘটনা তাঁর আপসহীন চরিত্রের পরিচয় বহন করে।
১৯৫১ সালে তিনি ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে এই রাজনৈতিক ধারা ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল জাতীয় ঐক্য, সাংবিধানিক শাসন এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।
🍂
তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল, অত্যন্ত সংযমী। স্ত্রী সুধা দেবীর অকালমৃত্যুর পর তিনি আর বিবাহ করেননি। সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি দেশসেবাকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য করে তুলেছিলেন। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখকে কখনও তিনি জনজীবনের দায়িত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বক্তৃতা ছিল তথ্যসমৃদ্ধ, যুক্তিনিষ্ঠ এবং শালীন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মতভেদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু তা যেন কখনও ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত না হয়। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
১৯৫৩ সালের ২৩শে জুন জম্মু ও কাশ্মীরে আটক অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। তবে বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি বিষয় স্পষ্ট যে তিনি তাঁর বিশ্বাস ও আদর্শের প্রতি শেষ দিন পর্যন্ত অবিচল ছিলেন।
আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে ফিরে তাকালে উপলব্ধি করা যায়, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর প্রকৃত পরিচয় কেবল একজন রাজনীতিবিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি জ্ঞানকে শক্তি, শিক্ষাকে জাতি গঠনের ভিত্তি এবং নীতিকে জনজীবনের সর্বোচ্চ মূল্য বলে মনে করতেন। নতুন প্রজন্ম যদি তাঁর জীবন থেকে অধ্যবসায়, সময়ানুবর্তিতা, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং দেশের প্রতি কর্তব্যবোধের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তবে সেটাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য।
0 Comments