সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
সম্পাদক মশাইয়ের পাঠানো মেসেজ পড়েই মনের আয়নায় ভেসে উঠলো ছোটবেলায় পড়া সেই অবিস্মরণীয় পংক্তি কটি – “একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু…”। এর পরের ঘটনাক্রম সম্পর্কে পাঠকরা নিশ্চয়ই কমবেশি পরিচিত আছেন,তাই সে পথে আর এই মুহূর্তে পা বাড়াচ্ছি না। স্বপ্ন কী? যতই ইনিয়ে বিনিয়ে বলিনা কেন, স্বপ্ন হলো মানুষের অবচেতন মনের একটা বিশেষ অবস্থা যা আমাদের নিরন্তর তাড়িয়ে বেড়ায়। এভাবে স্বপ্নকে সংজ্ঞায়িত করাটা একেবারেই নিজস্ব মস্তিষ্ক প্রসূত। তবে এ কথায় সবাই সায় দেবেন এমন মনে করিনা। তাই মানুষের মনের সবথেকে নিগূঢ় বিশ্লেষক মাননীয় ফ্রয়েড সাহেবের শরণাপন্ন হতেই হয়। স্বপ্ন প্রসঙ্গে ফ্রয়েড সাহেব বলেছেন – “স্বপ্ন হলো মানুষের অবদমিত আশা - আকাঙ্খা এবং লুকনো ইচ্ছার অবচেতন রূপ”।
এসব ভারি ভারি শব্দের জটিল জটলা ছেড়ে একেবারে মেঠো অভিজ্ঞতার কথায় আসি। আমার কর্মজীবনের একেবারে গোড়ার দিকের ঘটনা। দশম শ্রেণির ক্লাস। সামনেই প্রি টেস্ট পরীক্ষা। ক্লাসে জোরকদমে পড়ানোর কাজ চলছে, অসংখ্য আঁকিবুঁকির নকশায় ভরে উঠছে দেওয়ালে টাঙানো ব্ল্যাকবোর্ড। অনেকেই সেইসব আঁকিবুঁকি নিজেদের খাতায় টুকে নিচ্ছে। এক ছাত্রের প্রশ্ন শুনে পেছনে ফিরতেই দেখি বেঞ্চে বসে একছাত্র গাড়ি চালানোর ভঙ্গিতে হাত ঘুরিয়েই চলেছে। খানিক সময় দেখে নিয়ে বল্লাম – ওহে ঋ বাবু! আপনি কী করছেন? উঠে দাঁড়িয়ে ঋ বাবু নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো — আমি স্বপ্ন দেখছি।
– স্বপ্ন! এই ভর দুপুরে? ব্যস্ত ক্লাস ঘরে?
– কেন? দিনের বেলায় বুঝি স্বপ্ন দেখা যায়না? আমিতো দিন রাত সবসময় স্বপ্ন দেখি,আমি সেনাবাহিনীর শক্তিমান ট্রাক চালাবো ।
– তাহলে যে সেনাবাহিনীতে জয়েন করতে হবে ভাই।
– হ্যাঁ, আমার স্বপ্ন আর্মির অফিসার হওয়া। আমার একমাত্র স্বপ্ন - the only dream of mine.
বুঝলাম ঋ আপন স্ফূর্তিতে,আপন স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে তাই ওর কাছে দিন রাতের বেড়া গিয়েছে টুটে। এরপরে অবশ্য আমার ক্লাসে সে কোনোদিন গাড়ি চালানোর কথা ভাবেনি। সেদিনের সেই ছাত্রটি এক রাশ স্বপ্ন বুকে বয়ে সত্যি সত্যিই আজ আর্মির অফিসার। ওর স্বপ্ন সাকার হয়েছে।
আসলে স্বপ্ন তো শুধু দেখার নয়,বয়ে নিয়ে যাবারও।
মনে রাখতে হবে স্বপ্ন দেখারও একটা প্রেক্ষিত আছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কেবলমাত্র আমাদের শরীরী অবয়বের গঠনে পরিবর্তন হয় না, মনোগঠনেরও বদল হয় বিস্তর। মনের ভেতর জমে থাকা ইচ্ছে, স্বপ্নগুলোকে পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো ডানা মেলে যত্রতত্র উড়িয়ে নিয়ে বেড়ালেও গোবদা শরীরটাকে যে কষ্টেসৃষ্টে টেনে নিয়ে যেতে হয় – তাই কখনো মন চাইলেও শরীর তাল মিলিয়ে চলতে চায়না, আবার ঠিক উল্টোটাও ঘটে। এক্ষেত্রে একসঙ্গে মাথায় রাখতে হয় দুটো বিষয়কেই।একাজ খুব সহজ বলে আমার কখনোই মনে হয় না। আর তাই ইচ্ছে, স্বপ্ন, লক্ষ্য, আর পরিকল্পনা – পরস্পর সম্পর্কযুক্ত চারটে বিষয় বা পর্যায়কে নিয়ে আলাদা আলাদা করে ভাবতে হয় আমাদের। এ হচ্ছে অনেকটা সিঁড়ির মতো – ধাপ গুনে গুনে তবেই ওপরে ওঠা। ধাপ ফসকে গেলেই সব কিছুই লেটেঘেঁটে লাবড়া তরকারি হয়ে যাবে। সবকিছু ঘেঁটে ঘ হয়ে গেলে এসময়ের বিকিকিনির হাটে “খোটে সিক্কে” হয়ে চড়ে বেড়াতে হবে।
বিকিকিনির কথাই যখন উঠলো তখন স্বপ্ন বেচাকেনার হাটের কথা বাদ যাবে কেন? অবাক হচ্ছেন নাকি ? স্বপ্ন নাকি জেট ইঞ্জিনের মহার্ঘ ফুয়েল, ইন্ধন। তাকে বুকে নিয়ে রকেট যেমন দৃষ্টি সীমানা পেরিয়ে মহাশূন্যে পাড়ি দেয়, মানুষেরও নাকি তেমনটাই দস্তুর। সবসময় পেটের ভেতর থুড়ি মারার ভেতরটা স্বপ্ন জ্বালানিতে একদম টইটম্বুর থাকা চাই । আর এজন্যই চাই স্বপ্ন ফুয়েলের নিরবচ্ছিন্ন জোগান এবং জোগানদার। একালে চারপাশে ঘুরঘুর করছে অসংখ্য স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। তাঁদের ঝকঝকে বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে ছয়লাপ চতুর্দিক। একটা নমুনা দিই তাহলে সবকিছু খোলাসা হয়ে যাবে।
“আপনি কি বিভ্রান্ত? আপনি কি স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছেন?
আর কোনো সংকোচ না করে সোজা আমাদের কাছে চলে আসুন। আমরা স্বপ্ন দেখি,দেখাই। আমাদের নির্দেশিত পথে চললে আপনার স্বপ্ন সফল হবেই।১০০% গ্যারান্টি। বিফলে মূল্য ফেরত দেওয়া হবে। আপনি আসুন, অন্যদেরও নিয়ে আসুন। যোগাযোগের ঠিকানা : স্বপ্নপুরী এপার্টমেন্ট, ক্ষুদিরাম রোড, পশ্চিম মেদিনীপুর – ৭২১১০১.পরীক্ষা প্রার্থনীয়।”
ফ্রয়েড সাহেব স্বপ্নকে যে ভাবেই ব্যখ্যা করুন না কেন একালে “স্বপ্ন দেখি “ – এমন কথা বলার লোকজন ক্রমশই বুঝি কমে এসেছে , আর হয়তো তাই স্বপ্ন খুঁজে মাথায় গুঁজে দেবার কারবারের এতোটাই রমরমা! হালফিলের শহুরে ছেলেমেয়েরা স্বপ্ন দেখে বাজার চলতি হাইফাই বিষয় নিয়ে। একালে তাই কেউ অমলকান্তির মতো ঝলমলে রোদ্দুর হবার স্বপ্ন দেখেনা,, আশু আর শ্যামকে সঙ্গে নিয়ে রাজগঞ্জের ঘাটে বাঁধা মধু মাঝির নৌকা নিয়ে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে পাড়ি দেবার স্বপ্ন দেখার কথা ভাবতেই পারেনা,চায় না নিঝুম রাতে লন্ঠন হাতে নিয়ে পাগড়ি মাথায় পাড়ার অলিগলিতে টহল দিয়ে ফিরতে। আমরা সবাই সেই স্বপ্নভুবন থেকে চিরকালের জন্য নির্বাসিত হয়েছি – সে ‘সময় গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার’।এমন সব স্বপ্নের সঙ্গে আজকাল আর তাই দেখাই হয়না। এসময়ের অনেক স্বপ্ন তাই অকালে ঝরে পড়ে।
স্বপ্ন যেহেতু আমাদের অবচেতন মনের প্রতিফলন সেহেতু মনের গ্রীন রুমের খবরাখবরের জানান দিতে এর নাকি জুড়ি নেই। অনেক কাল আগে ঘুমের ঘোরে আমাকে কঁকিয়ে উঠতে দেখে বিভ্রান্ত হয়ে মা আমাকে নিয়ে ছুটলেন পাড়ার এক প্রবীণ মানুষের কাছে । তিনি নাকি লোকের মন পড়তে পারেন।তাঁর সামনে বাবু হয়ে বসলেই তিনি চোখ বুজে মানুষটির মনের যাবতীয় চিন্তা ভাবনার হদিস দিতেন। মার কাছে সমস্ত বেত্তান্তটা শুনে তিনি পাশে থাকা এক ঢাউস সাইজের বই বার করে আমাকে এক রাশ প্রশ্ন করা শুরু করলেন ,তবে সবটাই ভাববাচ্যে ।
–বলি, কখন শোয়া হয়েছিল?
– শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কি ঘুমিয়ে পড়া হয়েছিল,নাকি বেশ খানিকটা সময় পরে ?
– পরশ্ব কোন পক্ষ, কোন তিথি ছিল? স্বপ্ন দর্শন কোন প্রহরে হয়েছিল?
– কোন পাশ ফিরে শোওয়া হয়েছিল? ডান না বাম পাশে? স্বপ্নে ঠিক কী দর্শন হয়েছিল?
লাগাতার প্রশ্নের জোয়ারে আমার তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। আমি না আছি প্রশ্নে, না উত্তরে , অথচ আমাকে নিয়েই চলছে “স্বপ্নকল্পদ্রুম”পালা। আমিতো রীতিমতো বোবা হয়ে গেছি সব কিছু দেখে শুনে। আমার মাথা থেকে ততক্ষণে স্বপ্নের স্মৃতি কপ্পুরের মতো বেমালুম উবে গেছে। স্বপ্নদ্রষ্টার কান্ডকারখানা দেখে মা তখন রীতিমতো উদ্বিগ্ন, উদভ্রান্ত। স্বপ্নের ফলাফল জানা তখন আমাদের মাথায় উঠেছে। হঠাৎ কী মনে করে আর একদিন আসার কথা বলতেই মায়ে পোয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
রাত বিরেতে স্বপ্ন দেখা নিয়ে যাঁরা খুব বিব্রত তাঁদের একটা ঘরোয়া টোটকা শিখিয়ে দিচ্ছি। এসব আমার ঠাকুমার মন্ত্রগুপ্তি,মানা না মানা অবশ্য একান্তই আপনাদের ব্যাপার।
টোটকা ১ - বালিশে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করে বালিশের ওপর তিনটে টোকা দিন আর বাকি রাত নির্বিঘ্নে ঘুমান।
টোটকা ২ - এতোসব করেও যদি মাথার ভেতর (দু ) স্বপ্ন ঘুণপোকার মতো ঘুরপাক খায় তাহলে ভোর বেলায় উঠে এক জল পূর্ণ পাত্রের সামনে আপনার স্বপ্নের কথা খুলে বলুন। দেখবেন সব সমস্যা কেটে যাবে। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
স্বপ্ন নিয়ে অনেক কথা বলা হয়ে গেল। স্বপ্ন ছাড়া মানুষ হয় নাকি? পৃথিবীর সমস্ত কীর্তিমান মানুষ স্বপ্ন দেখেছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন আরও অনেক অনেক মানুষকে। “তোমরা আমাকে রক্ত দাও,আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো।”-- এও তো এক স্বপ্নদ্রষ্টার কথা যিনি নিজের দেখা স্বপ্নমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন লাখো কোটি দেশবাসীকে। এ হলো এক সাচ্চা স্বপ্ন প্রেমীর কথা যিনি স্বপ্নের গভীরে ডুব দিতে পারতেন অনায়াসে।
আরও এক স্বপ্নদ্রষ্টার কথা দিয়ে আজকের কথকতা শেষ করবো। যিনি খুব সাধারণ ঘরের মানুষ হয়েও এক অসাধারণ স্বপ্নের রূপকার হয়ে উঠেছিলেন নিজের কর্মগুণে। স্বপ্ন নিয়ে এই মানুষটি যা বলেছিলেন তা সকলের পক্ষেই অনুসরণীয়।
তিনি বলেছিলেন – “স্বপ্ন শুধু ঘুমের মধ্যে দেখা জিনিস নয় – বরং তা হলো সেইসব রূপকল্প যা আমাদের ভাবতে, কাজ করতে এবং একটি উন্নততর ভবিষ্যৎ গড়তে অনুপ্রাণিত করে।”
আসুন কম্পমান জ্বলদর্চির আলোয় আমরা স্বপ্নময় হয়ে উঠি।
1 Comments
এ পর্যন্ত স্বপ্ন নিয়ে লেখা সমস্ত নিবন্ধের মধ্যে অন্যতম সেরা লেখা এইটি। কোনো জটিল কথা নেই, রসে টইটুম্বুর করা আলোচনা। জ্বলদর্চির পাতায় এই লেখকের লেখা খুব বেশি পড়ার সুযোগ হয়নি। আরও বেশি বেশি লিখুন।
ReplyDelete