জ্বলদর্চি

গুচ্ছ কবিতা /এক ফোঁটা রোদ/কমলিকা ভট্টাচার্য

গুচ্ছ কবিতা 
এক ফোঁটা রোদ
কমলিকা ভট্টাচার্য


ভালোবাসার অনাথ আশ্রম

সে ছিল এক আকাশ— নিজের নীলটুকু কেটে কেটে সবার জানালায় ভোর ঝুলিয়ে দিত। কিন্তু সন্ধ্যা নামলে তার নিজের আকাশে একটিও প্রদীপ জ্বলত না।

সে ছিল এক নদী, যে নিজের জল ধার দিত অগণিত তৃষ্ণার্ত তীরে। অথচ তার বুকের ভাঙা চর জুড়ে কেউ এক মুঠো বৃষ্টিও রেখে যায়নি।

সে ছিল এক গাছ, ডালে ডালে পাখিদের জন্য নিঃস্বার্থে বাসা বানিয়ে রেখেছিল। ঋতু শেষে সব পাখি উড়ে গেল, ফিরে তাকাল না কেউ— গাছটি দাঁড়িয়ে রইল নিজেরই ছায়াহীন হয়ে।

তার জন্মদিন এলে ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটি নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে। পৃথিবী ব্যস্ত থাকে অসংখ্য উৎসবের আতশবাজিতে, আর তার দরজায় ডাকপিয়নও ভুল করে আসে না।

সে কখনও নাম চায়নি, যশ চায়নি, উপহারের মোড়কে বাঁধা কোনো বিস্ময়ও নয়— সে শুধু চেয়েছিল, কোনো এক মানুষ তার নামটা উচ্চারণ করুক যেমন ভোর নরম করে ডাকে প্রথম শিশিরকে।

সবাই ভাবে, ভালোবাসা বুঝি অফুরন্ত। কেউ জানে না— সবচেয়ে উদার হৃদয়ও একদিন ফুরিয়ে যাওয়া প্রদীপের মতো নিজের আলো সইতে সইতে নিভে যায়।

হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ জায়গাটার নাম কোনো মরুভূমি নয়, কোনো নির্জন দ্বীপও নয়— সেটার নাম সেই হৃদয়, যে সবাইকে ঘর দেয়, কিন্তু যার জন্য কেউ কোনোদিন একটুখানি "বাড়ি" হয়ে ওঠে না।


কোলাজ

কবিতারা হারিয়ে গিয়েছিল— ক্ষতবিক্ষত কয়েকটি পাতা পড়ে ছিল সময়ের ধুলোয়।

আমি সেগুলো কুড়িয়ে তোমার স্মৃতির আঠা দিয়ে একটা কোলাজ বানিয়েছিলাম—

ভাবছিলাম, এবার বুঝি ভালোবাসার একটা সম্পূর্ণ ছবি হবে।

হলোও বটে...

শুধু দুঃখ এই, ছবিটা কেউ নিজের ঘরে টাঙায়নি— কারণ, ভাঙা হৃদয় দিয়ে বানানো শিল্প সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখে, কিন্তু কেউ তাকে নিজের দেয়ালে জায়গা দেয় না।


চরণামৃত

তলানিতে এসে ঠেকেছে
জুড়ে থাকার সমস্ত আয়োজন।

দিনের শেষে
চরণামৃতের মতো ঠোঁটে ছুঁইয়ে নিই
অবশিষ্টের এক ফোঁটা আলো—
তাতেই ভোরের ভিত গড়ে ওঠে।

সেই একফোঁটাতেও
এত কার্পণ্য কেন?

তোমার নীরবতা 
শত্রুতার মত কষ্টের
শব্দের চেয়েও স্পষ্ট।

তবু বিস্ময় জাগে—
যদি এতটাই অস্বীকার ছিল,
তবে কেন গড়ে তুলেছিলে আমায়?


অপেক্ষার ঋতু

আড়াল থেকে তুমি চুপিচুপি দেখো আমায়, বৃষ্টির ফোঁটায় লিখে রাখো আমাকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছে।

দেখো, আমার নামের উচ্চারণটুকু তোমার বুকের ভেতর গোপন প্রদীপের মতো জ্বলে, আর এক মুঠো স্পর্শের জন্য তোমার সমস্ত সন্ধ্যা জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে।

আমি কি এত সহজে ধরা দেব? অভিমানও তো ভালোবাসার সবচেয়ে গোপন অলংকার।

আমার অপেক্ষা জমে জমে একদিন শীত হয়ে যায়, জানালার কাচে কুয়াশা নামে— তবু তুমি আসো না।

তুমি কি জানো ?তৃষ্ণা হয়ে বেঁচে থাকা কত কঠিন, অপেক্ষার প্রতিটি ক্ষণ কীভাবে বুকের ভেতর নিঃশব্দে পুড়ে যায় ...

তাই আমিও বৃষ্টির ভেতর ভিজি, কিন্তু তোমার দিকে এক ফোঁটা রোদও পাঠাই না— তুমিও তো একবার বুঝে দেখো, তড়পাতে ঠিক কেমন লাগে।

🍂

Post a Comment

12 Comments

  1. গৌতম বাড়ইJuly 17, 2026

    খুব ভালো লাগলো। প্রতিটি কবিতাই মনকে নরম করে দেয়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJuly 21, 2026

      ধন্যবাদ।🙏

      Delete
  2. Mukul MukherjeeJuly 17, 2026

    প্রত্যেকটা কবিতাই অনবদ্য। জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। কবির সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবন কামনা করি। আরও অনেক কবিতা ও গল্প পড়ার আশায় রইলাম। ভালো থাকবেন।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJuly 21, 2026

      ধন্যবাদ 🙏

      Delete
  3. AnonymousJuly 18, 2026

    ভাঙা হৃদয় দিয়ে বানানো শিল্প সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখে, কিন্তু কেউ তাকে নিজের দেয়ালে জায়গা দেয় না -----🙏🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJuly 21, 2026

      ধন্যবাদ🙏

      Delete
  4. AnonymousJuly 18, 2026

    কবিতা গুলি মন ভরিয়ে দিল।প্রতিটি শব্দই জীবনের সত্যি টা কে তুলে ধরেছে। জন্মদিনে র
    শুভেচ্ছা রইল।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJuly 21, 2026

      ধন্যবাদ 🙏

      Delete
  5. AnonymousJuly 18, 2026

    অজস্র ফুলের বৃষ্টির মত ঝরে পড়ে শব্দরাশি, বারিকণার মত অশ্রুর নোনতা স্বাদ শুষে নেয় মাটি। পাঠক মুহ‍্যমান। আলোচকের ভাষায় কুলোচ্ছে না। কবিতাগুলি ছড়িয়ে যাক বাঁশীর সুরের হাত ধরে। আরো লিখুন।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাJuly 21, 2026

      ধন্যবাদ 🙏

      Delete
  6. AnonymousJuly 18, 2026

    Khub bhalo laglo ❤️

    ReplyDelete
  7. কমলিকাJuly 21, 2026

    ধন্যবাদ 🙏

    ReplyDelete