মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২২৩
গীতারাণী পাল (স্বাধীনতা সংগ্রামী, কাঁথি)
ভাস্করব্রত পতি
প্রাক স্বাধীনতা যুগের মহিয়সী নারী তিনি। লড়াই আন্দোলনের ঘেরাটোপে থেকেই তিনি বড় হয়েছেন। নিজেকে সঁপেছেন দেশের সেবায়। মেদিনীপুরের এই লড়াকু স্বাধীনতা সংগ্রামী গীতারাণী পাল পরবর্তীতে পুরোপুরিভাবে স্বাধীনতার লড়াইয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন জেলার অন্যতম বলীষ্ঠ স্বাধীনতা সংগ্রামী ডাঃ রাসবিহারী পালের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়ে।
১৯১৬ এর ৭ ই মে কাঁথির কিশোরনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গীতারাণী পাল। বাবা ছিলেন শশীভূষণ ভৌমিক এবং মা সুলোচনা দেবী। স্বাধীনতার সমরাঙ্গনে মোহাটির ভৌমিক পরিবারের অবদান উল্লেখ্যনীয়। সেই পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। ফলে দেশসেবার মন্ত্রে প্রথম থেকেই দীক্ষিত হয়েছিলেন।
এই পরিবারের সন্তান পূর্ণেন্দুশেখর ভৌমিক ছিলেন খেজুরী থানা জাতীয় সরকারের সর্বাধিনায়ক। বিহার বিদ্যাপীঠে ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদের স্নেহধন্য এই ছাত্রটি ছিলেন গীতারাণী পালের দাদা। ফলে দাদার অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের আবহে।
নিজের গ্রামে বাবা শশীভূষণ ভৌমিকের প্রতিষ্ঠিত পাঠশালায় প্রাথমিক পাঠগ্রহণ করেন। এরপর তিনি কুমিল্লা অভয় আশ্রমে থেকে নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে পড়া চলাকালীন তিনি দ্বিতীয় আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নেন। এজন্য ১৯৩২ এর ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে গ্রেফতার করে ব্রিটিশ পুলিশ। বিচারের রায়ে গীতারাণী পালের এক বছরের কারাদণ্ড এবং তিন বছরের জন্য অন্তরীণ থাকার শাস্তি দেওয়া হয়।
এরপর ১৯৩৫ সালে তিনি ডাঃ রাসবিহারী পালের সহধর্মিনী হিসেবে পরিচিত হন। যদিও তার আগেই তিনি দেশের স্বাধীনতা লড়াইয়ের অন্যতম সেনানীরূপে পরিচিতি লাভ করে ফেলেছেন। ইতিমধ্যে নারী সংগঠন পরিচালনায় তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং কর্মদক্ষতা ছিল অবিস্মরণীয়।
১৯৪২ সালে মেদিনীপুর জেলায় ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় জেলাজুড়ে। তখন তিনি দুর্গত মানুষের সহায়তায় ত্রাণসামগ্রী বিলি এবং অসুস্থ, বিপদগ্রস্ত, সবহারানো মানুষজনের সেবার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যা এক অনন্য কীর্তি বলা চলে। একজন প্রান্তিক মহিলা হয়ে সেসময় তিনি যে কাজ করেছিলেন, তা একপ্রকার দৃষ্টান্তমূলক নিদর্শনের অন্যতম উদাহরণ বলা যায়।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে তথা ভারতের স্বাধীনোত্তর পর্বে জেলা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অগ্রণী সেনানায়ক ডাঃ রাসবিহারী পালের পাশে থেকেছেন ঐকান্তিকভাবে। নানা ধরনের সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন গীতারাণী পাল। একাধারে মহিলা সংগঠনের কর্মতৎপর নেত্রী, অন্যদিকে ধর্মীয় সংগঠন প্রজাপিতা ব্রহ্মাকুমারী ঈশ্বরীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য ছিলেন। সেইসাথে তিনি সকলের কাছে একজন কর্মঠ গৃহকর্তী এবং মাতৃসুলভ পরিচিতিতে সম্মাননা পেতেন সকলের কাছে। ১৯৯৮ এর ১৬ ই জুন মেদিনীপুরের 'মানুষ রতন' এই অকুতোভয় নারীর জীবনাবসান ঘটে।
0 Comments