জ্বলদর্চি

বাঁধিনু যে রাখী/আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী



বাঁধিনু যে রাখী

আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী 

মানুষ তার জন্মমুহূর্ত থেকেই প্রিয়সঙ্গ পিয়াসী। মাতৃক্রোড়ের নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে টলোমলো অনিশ্চয় পদচারণায় রূপ-রস-গন্ধময় এই প্রকৃতির সংস্পর্শে যখন সে প্রথম আসে, তখন থেকেই তার প্রত্যাশা থাকে একটি ভরসার হাতের—যে হাত তাকে আড়াল দেবে, সঙ্গ দেবে, দেবে হৃদ্যতার আশ্রয়।
ক্রমে বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে শেখে, সে একা নয়। সম্পূর্ণ অপরিচিত এই পৃথিবীতে অস্তিত্ব রক্ষা এবং সুস্থভাবে জীবনযাপনের জন্য ছোট-বড়ো অনেকগুলি ছায়া সুতোর মতো,মায়ার মতো তাকে ঘিরে থাকে। রক্তের বন্ধনে, ভ্রাতৃত্ববোধে, কামনায়, প্রেমে, স্নেহে ও বন্ধুত্বে মানুষ পরস্পরকে জড়িয়ে বাঁচে। হয়তো একেই সম্পর্ক বলে। এবং এই বন্ধন উদযাপনের জন্য উৎসবের আয়োজন হয়। প্রতিদিনের আদর-সোহাগ, সহানুভূতি ও সমানুভূতির সামাজিক দায়বদ্ধতায় যার বিকাশ ও পরিনতি।
পৃথিবীর সব দেশের, সব কালের সভ্যতার ইতিহাসেই এই সম্পর্ক-বন্ধন মানুষের জীবনের এক অনিবার্য সত্য। ভারতীয় সংস্কৃতির ধারাবিবর্তনেও তার অন্যথা হয়নি। তাই রাখি উৎসবের উৎস খুঁজতে গিয়ে আমরা খুঁজে পাই নানা পৌরাণিক কাহিনি, লোকবিশ্বাস ও সামাজিক রীতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ ঐতিহ্য।
প্রাচীন লোকপ্রচলিত কাহিনিতে আছে, শ্রীকৃষ্ণের আঙুলে ক্ষত হলে দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে সেই ক্ষতস্থান বেঁধে দিয়েছিলেন। এবং কৃষ্ণ তাঁর এই স্নেহ-শুশ্রূষায় আপ্লুত হয়ে দ্রৌপদীকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সে দিনটিও ছিল শ্রাবণ পূর্নিমা। সেই থেকে শ্রাবণ পূর্ণিমার সঙ্গে রাখিবন্ধনের সম্পর্ক।
🍂

আবার ভবিষ্যপুরাণের একটি প্রচলিত কাহিনিতে দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ-প্রসঙ্গে পাওয়া যায়, ইন্দ্রের যুদ্ধযাত্রার আগে তাঁর স্ত্রী শচী তাঁর হাতে একটি পবিত্র রক্ষাসূত্র বেঁধে দেন,যা তাঁকে সমস্ত বিপদ,আখাত ও পরাজয়ের গ্লানি মুছে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল। পররবর্তীতে এই ধরনের রক্ষাসূত্র বাঁধার প্রথা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতির সঙ্গে মিশে বিস্তার লাভ করে। রাজান্তঃপুরের নারীরা যুদ্ধযাত্রার আগে তাঁদের প্রিয় রাজপুরুষদের হাতে মঙ্গলসূত্র বা রক্ষাসূত্র বেঁধে দিতেন—এমন লোকবিশ্বাসও প্রচলিত ছিল। ক্রমে এই রীতি ভাই-বোন, বন্ধু ও সুজনের পারস্পরিক স্নেহ ও সম্প্রীতির বন্ধনে বিস্তৃত হয়। ‘রাখি’ তখন কেবল রক্ষার প্রতীক নয়, হয়ে ওঠে প্রেম, স্নেহ ও আত্মীয়তার এক উষ্ণ প্রকাশ।
সময়ের স্রোতে মধ্যযুগীয় ইতিহাসের পাতায়ও রাখির নানা কাহিনি ছড়িয়ে আছে। জনপ্রিয় ঐতিহাসিক কাহিনিতে আছে, মেবারের রানি কর্ণাবতী মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের কাছে রাখি পাঠিয়ে বিপদের সময় সাহায্য ও সুরক্ষার আবেদন করেছিলেন। যদিও এই ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে আধুনিক ইতিহাসচর্চায় প্রশ্ন রয়েছে, তবু লোকস্মৃতিতে এটি রাখির প্রতীকী শক্তির এক বহুল পরিচিত দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
 সাহিত্যেও রাখিবন্ধনের এই আবেগঘন প্রতীকী তাৎপর্য নানা রূপে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “হোরিখেলা” কবিতার প্রতীকী প্রতিশোধে অথবা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজকাহিনী-সহ বাংলা সাহিত্যের নানা রচনায় আত্মীয়তা, আনুগত্য, স্নেহ ও আত্মত্যাগের যে আবহ সৃষ্টি হয়েছে, তার সঙ্গে রাখির গভীরার্থের একটি আনন্দময় সাদৃশ্য অনুভব করা যায়।

অর্থাৎ ভারতীয় সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতিতে রাখিবন্ধন আবেগঘন আত্মীয়তা প্রকাশের এক উষ্ণ মাধ্যম হয়ে রয়ে গিয়েছে। পুরাণ ও মহাকাব্যের নানা কাহিনিতে সুরক্ষা, মঙ্গলকামনা এবং বন্ধনের প্রতীক হিসেবে পবিত্র সূত্র ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আজকের পরিচিত ‘রাখি’ এবং ভাই-বোনের সম্পর্ককেন্দ্রিক রাখিবন্ধন মূলত দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফল। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই আচার নানা নামে, নানা রূপে পালিত হয়েছে। কোথাও এটি ভাই-বোনের সম্পর্কের উৎসব, কোথাও পুরোহিতের আশীর্বাদের অনুষ্ঠান, কোথাও আবার সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।
কিন্তু বাংলার ইতিহাসে রাখিবন্ধনের একটি বিশেষ তাৎপর্য সৃষ্টি হয় বিংশ শতাব্দীর গোড়ায়। সে এক বেদনাদীর্ণ অধ্যায়।
আমরা জানি, ১৯০৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। লর্ড কার্জনের শাসনকালে কার্যকর হওয়া এই বিভাজনের সরকারি যুক্তি ছিল প্রশাসনিক সুবিধা। কিন্তু ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের একটি বড়ো অংশ মনে করেছিল, এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য দুর্বল করা এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা। পূর্ববঙ্গ ও আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গ—এই দুই প্রশাসনিক অঞ্চলে বাংলাকে ভাগ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন শুরু হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই আন্দোলনে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক মাত্রা যোগ করেছিলেন। তাঁর কাছে দেশ কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; দেশ মানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং ভালোবাসার এক জীবন্ত বন্ধন। তাই বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদকে তিনি কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। মানুষের হৃদয়ে ঐক্যবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি রাখিবন্ধনের মতো এক সহজ অথচ গভীর প্রতীককে সামনে নিয়ে এসেছিলেন।
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর, বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন, কলকাতায় রাখিবন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষের হাতে রাখি পরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর, এক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের এবং বাংলার এক অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের মানুষের বন্ধনের বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। বিভেদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে পরস্পরকে আপন করে নেওয়ার এই আহ্বানে রাখিবন্ধন একটি নতুন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে।
কারণ রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, কেবল সভা-মিছিল, বক্তৃতা কিংবা রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে মানুষের অন্তরের বিভাজন দূর করা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন এমন একটি প্রতীক, যা সহজেই মানুষের হৃদয়ে পৌঁছতে পারে। রাখির সুতো সেই কাজটিই করেছিল। একটি সাধারণ সুতোকে তিনি রূপ দিয়েছিলেন সামাজিক সংহতির প্রতীকে।
‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ গানটি এবং তাঁর সৃষ্ট অন্যান্য স্বদেশচেতনার রচনা এইভাবে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে মানুষের মধ্যে এক নতুন আবেগ সৃষ্টি করেছিল। কারণ তাঁর স্বদেশপ্রেম বা মানবপ্রেম কখনও সংকীর্ণ বা বিদ্বেষনির্ভর ছিল না। তিনি এমন কোন সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না, যা অন্য জাতি বা সম্প্রদায়কে শত্রু হিসেবে দেখতে শেখায়। তাঁর দেশপ্রেমের ভিত্তি ছিল মানুষের সার্বিক মঙ্গল। 

সুতরাং হয়তো রাখির সুতোটি নরম, কিন্তু তার প্রতীকী শক্তি অপরিসীম। এবং প্রিয়জনের হাতে প্রস্তুত সেই সুতো প্রিয়বন্ধনে আমাদের আজও মনে করিয়ে দেয়—সম্পর্ক বা সম্প্রীতি রক্ষা করার সম্পদ;তাকে আগলে রাখাই মানবিকতা। তাই ইতিহাসের বেদনাতুর সময়ে যে রাখি হয়ে উঠেছিল ঐক্যের আহ্বান, আজও তা যেন অনুভবী মনের সুরে বাঁধে গান: 
“তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দক্ষিণ-হাতে,
সূর্য যেমন ধরার করে আলোক-রাখী জড়ায় প্রাতে॥”

এবং এই অর্থেই “রাখী’ শুধুমাত্র ধর্ম-সম্রদায়-লিঙ্গ নির্বিশেষে একটি সাধারণ মিলন উৎসবের সুখস্মৃতি অথবা প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার রোমন্থন থাকেনা; এটি একটি দেশের ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ এবং মানবিক সম্প্রীতির উজ্জ্বল এক সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে ওঠে, যা এই ঘনায়মান অন্ধকারে উজ্জ্বল আলোর দিশা দেখায়।

Post a Comment

0 Comments