আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ৩০শে আগস্ট আন্তর্জাতিক গুমের স্বীকার দিবস, গুম কি, কেনই বা এই দিবসটি পালন করা হয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব কতটা আসুন সবকিছুই জেনে নিই বিস্তারিতভাবে।
সত্য, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদার প্রত্যাশায়
প্রতিবছর ৩০শে আগস্ট পালিত হয় আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস। এটি শুধু একটি স্মরণদিবস নয়, বরং গুমের শিকার মানুষ এবং তাঁদের পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার, সত্য জানার অধিকার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি বিশ্বসমাজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১০ সালের ২১শে ডিসেম্বর ৩০শে আগস্টকে এই দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০১১ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
গুম বা জোরপূর্বক অন্তর্ধান বলতে, এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন কোনো ব্যক্তিকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটক, অপহরণ বা অন্য কোনোভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা তাদের সমর্থনকারী কোনো পক্ষ সেই ব্যক্তির আটক বা তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে অস্বীকার করে, ফলে তিনি আইনের স্বাভাবিক সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
গুম একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। এর মাধ্যমে একজন মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, আইনের আশ্রয়, ন্যায়বিচার এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবনের অধিকারও হুমকির মুখে পড়ে, কিন্তু এর প্রভাব শুধু নিখোঁজ ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তাঁর পরিবার ও সমাজও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে। পরিবারের অপেক্ষার যন্ত্রণা একজন মানুষ নিখোঁজ হলে, পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় তিনি কোথায়? তিনি কেমন আছেন? তিনি কি ফিরে আসবেন? স্বাভাবিক শোকের ক্ষেত্রেও কোনো না কোনোভাবে ঘটনার পরিণতি জানা যায়, কিন্তু গুমের ক্ষেত্রে পরিবার অনেক সময় সত্যটুকুও জানতে পারে না। এই অনিশ্চয়তা তাঁদের জীবনকে দীর্ঘ অপেক্ষায় পরিণত করে।
🍂
জাতিসংঘের মতে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ও স্বজনদের সত্য জানার অধিকার রয়েছে। তাঁদের ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও প্রতিকারের অধিকারও রয়েছে, তাই গুমের ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়। এটি একটি সামাজিক ও মানবিক সংকট। একটি পরিবার যখন বছরের পর বছর প্রিয়জনের সন্ধান করে, তখন তার সঙ্গে একটি বৃহত্তর সমাজও সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে জড়িয়ে পড়ে। গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহিত করা। গুমকে অনেক সময় ভয় সৃষ্টি, মতপ্রকাশ দমন বা রাজনৈতিক বিরোধীদের নীরব করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও একটি গুরুতর সমস্যা এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সত্য উদ্ঘাটন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মানুষ নিখোঁজ হলে তাঁর পরিবারের প্রশ্নের উত্তর পাওয়া, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ।
আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা গুম প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০৬ সালের ২০শে ডিসেম্বর এই কনভেনশন গ্রহণ করে। এর উদ্দেশ্য হলো, গুম প্রতিরোধ করা, গুমের শিকার ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা করা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
২০২৬ সালে এই কনভেনশন গ্রহণের ২০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই উপলক্ষে জাতিসংঘের এবারের বার্তায় গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের অধিকারকে সামনে রেখে “Victims first. Actions now” বা “ভুক্তভোগীরা আগে, এখনই পদক্ষেপ” বার্তাটি গুরুত্ব পেয়েছে।
গুম প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই যথেষ্ট নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক অভিযোগের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ, পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মানবাধিকার রক্ষাকারী ব্যক্তি, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাক্ষী এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জাতিসংঘও গুম প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীদের সন্ধান এবং দায়ীদের বিচারের ওপর জোর দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেলে তাঁর অস্তিত্বকে ভুলে যাওয়া যায় না। তাঁর পরিচয়, তাঁর পরিবার এবং তাঁর সত্য জানার অধিকার অম্লান থাকে। একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
৩০শে আগস্ট তাই শুধু নিখোঁজ মানুষদের স্মরণ করার দিন নয়, এটি সত্য অনুসন্ধানের দিন, ন্যায়বিচারের দাবি জানানোর দিন এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে প্রিয়জনের অপেক্ষায় না থাকে, সেই অঙ্গীকারের দিন। গুমের অবসান মানে, শুধু একজন নিখোঁজ মানুষের সন্ধান নয়, এর অর্থ সত্য, ন্যায়, মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা।
0 Comments