শিব ঠাকুর একটা বড়ো গাছের নিচে বাঁধানো বেদীর ওপর বসে আছেন । তাঁর চোখ বোজা, ডানহাতে বরাভয় মুদ্রা, মুখে স্মিত হাসি। বোঝাই যাচ্ছে যে তিনি বেশ খোশ মেজাজেই আছেন। এই মুহূর্তে তাঁকে ঘিরে এক উদযাপন পর্ব চলছে – বাবার জন্মমাস উপলক্ষে এই আয়োজন। এই দলে নন্দী,ভৃঙ্গীর সাথে সাথে রয়েছে আরও দুই শিরিঙ্গে চেহারার অনুচর। তাদের একজন উচ্চ স্বরে শিঙ্গায় ফুঁ দিচ্ছে থেকে থেকে, অন্যজন গলায় এক পেল্লাই সাইজের ঢোল ঝুলিয়ে তাল ঠুকছে ড্যাডাং ড্যাং শব্দ তুলে। খানিক তফাতে বসে আছে শিব ঠাকুরের বাহন ষণ্ডদেব। তারও চোখ বোজা। জাবর কাটতে কাটতে সেও মাথা দোলাচ্ছে তালে তালে। এসবের মধ্যেই নন্দী আর ভৃঙ্গী জন্ম মাস উদযাপন উপলক্ষে গান শুরু করে চেনা বার্থডে সঙের সুরে। গান গাইতে গাইতে সকলেই বাবাকে ঘিরে প্রদক্ষিণ শুরু করে।
সমবেত সঙ্গীত –
হ্যাপি জন্মমাস বাবা, হ্যাপি জন্মমাস বাবা,
হ্যাপি জন্মমাস বাবা,টু ইউ।
হ্যাপি জন্মমাস বাবা শিব ঠাকুর
খুশির জন্মমাস তোমাকে।
শিব ঠাকুর
( বেশ খুশির সুরে) বাহ্! বেশ বেঁধেছিস তো গান খানা। শুনে মনের ভেতর কেমন আকুলিবিকুলি করছে।
নন্দী
( কৃতাঞ্জলিপুটে বেশ গদগদ স্বরে) আপনার ভালো লেগেছে বাবা? এ কথা শুনে কি যে আনন্দ হচ্ছে তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না বাবা।
ভৃঙ্গি
( খানিকটা রাগত স্বরে) থাক্! তোকে আর সব বলে বোঝাতে হবে না। ওই তো ইউটিউব ভিডিও থেকে ঝেড়ে টুকে দিয়েছিস। অমন গান আম্মো লিখতে পারি।
শিব ঠাকুর
(হাত তুলে দুজনকে বারণ করেন) এই হলো তোদের মুশকিল। সারাদিন আমার পেছন পেছন ঘুরবি, বাব্বা, বাব্বা করবি আর সুযোগ পেলেই নিজেদের মধ্যে কাজিয়া বাঁধাবি।
অনুচর ১
একদম ঠিক কথা বলেছেন বাবা। এবার এই দুটোকে ছাড়িয়ে আমাদের দু জনকে ওদের জায়গায় বহাল করুন। আমরা সব ঠিকঠাক সামলে নেব।
অনুচর ২
( হাততালি দিয়ে ওঠে) খুব ভালো পোস্তাব বাবা। খুব ভালো পোস্তাব।
শিব ঠাকুর
( ধমকের সুরে) এ্যাই,তোরা থামবি, না আমি থামাবো? আম্মো কোথায় মরছি নিজের জ্বালায়, আর এই ষণ্ড গন্ডের দল সেই থেকে সমানে ঝামিলি করে চলেছে। ( প্রবল শব্দ করে হাঁচি দেন) কৈলাস ছেড়ে এই মর্ত্যে এলেই দেখছি আমার শরীর কেমন বিগড়ে যায়। এই ধুলোবালি ভরা শহরে এলেই আমার ডাস্ট এলার্জিটা বেশ বেড়ে যায়।
🍂
নন্দী
ঠিক বলেছেন বাবা। আমারও তখন থেকে কেমন নাক সুড়সুড় করছে।হ্যাচ্চো, হ্যাচ্চো, হ্যাচ্চো। এই তিন হাঁচি।
শিব ঠাকুর
এই গেলো চোত মাসে নীল ষষ্ঠীর জলে ভিজে ভিজে আম্মোর শরীলডা একেবারে কেমন লড়বড়ে হয়ে গেল, আবার এই শাওনের জো আসছে। গোটা মাস জুড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জলে ভিজতে হবে । একে শাওনের ধারা , তার ওপর ভক্তদের নাগাড়ে জল ঢালা। এতো ভেজাভেজি কি আর এই বয়সে সহ্য হয় ? হ্যাচ্চো, হ্যাচ্চো, হ্যাচ্চো।
মঞ্চের সকলে মিলে
হ্যাচ্চো হ্যাচ্চো হ্যাচ্চো।
আমরা হেঁচেই মরি সকলে।
এবার ট্যুরটা বুঝি যাবে বিফলে!
রিমি ঝিমি,রিমি ঝিমি
শাওনের ধারা, বাবা! শাওনের ধারা
এবার মত্যে এসে,যাই বুঝি মারা ?
আননা ওষুধ যত, আছে ঝুলিতে
অ্যালো,হোমো, কবিরাজি জড়িবুটিতে
তড়িঘড়ি সেরে উঠে চলো আসি ঘুরে
কৈলাস ছেড়ে এসে এই মেদিনীপুরে
রসকুণ্ড গেরামের শিবমন্দিরে।।
২. দ্বিতীয় দৃশ্য
[এখন কুশীলবেরা রসকুণ্ড গ্রামে এসে হাজির হয়। এখানে চারদিকে গাছপালা অনেক বেশি। সবুজের সমারোহ দেখে সকলেই খুব খুশি। কেবল নাদুসনুদুস চেহারার শিব ঠাকুরকে পিঠে বসিয়ে হাঁটতে গিয়ে বাহন ষণ্ডদেব রীতিমতো নাকাল। ]
ষণ্ডদেব
( হাঁপাতে হাঁপাতে ) বাব্বা! গতরখানি এমন খোলতাই করিছো যে টেইনে নিতে বেজায় কষ্ট হচ্ছে। ( স্বগতোক্তি)একেই তো নন্দী ঠাকুরের জায়গায় পক্সি ডিউটি করছি তার ওপর এমন চাপ! বাবার জম্মোদিন থুড়ি জম্মোমাসের সূচনা হলো দেখে ভাবলাম এই মাসটা একটু আরাম করে কাটাবো। কোথায় কি ! এই তোমারে পচ্চিম মেদিনীপুরের রসকুণ্ড গেরামে এনে ফেললাম। এখানেই আমার যাত্তার বিরতি। তুমি বাবা ওই নন্দী আর ভৃঙ্গী দাদারে সঙ্গে নে গেরামটা ঘুরে ফিরে এসো। এখন তোমার একটু হাঁটাচলা করা দরকার। মত্যে রওনা দেবার আগে মা পাব্বতী আমারে পইপই করে বলে দেছে – বাছা ষণ্ড!তোর ভস্যাতেই তোদের বাবারে ছাড়ছি।এট্টু দেইখে শুনে রাখিস বাপ! বাকিদের ওপর আমার বিন্দুমাত্র ভস্যা নেইকো। বিন্দুমাত্র ভস্যা নেই।
ভৃঙ্গি
( ঢড়া গলায়) বলি এ্যাই! সাতসকালেই কি বাবার ছিলিমে টান দেছিস? আমরা নন্দী ভৃঙ্গী, বাবার এতোদিনের সঙ্গী, তাঁদের ছেড়ে মা পাব্বতী শেষে তোকে এসব কথা বলেছেন?
এসব আমারে বিশ্যেস করতি হবে?
ষণ্ডদেব
বিশ্যেস অবিশ্যেস তোমাদের ব্যাপার। আমারে মা যা…..
শিব ঠাকুর
( মৃদু ধমকে) এ্যাই,আর ম্যাও ম্যাও কত্তি হবে না। আম্মি এখুন হেঁটে ঢলে বেড়াবো। তুর যখন মুরে পিঠে নে ঘুরতে গিয়ে গায়ে গতরে ব্যথা হয়েছে তখন তু এখানেই বসে বসে একটু জিরিয়ে নে। আমরা গেরামটা ঘুইরে দেইখে আসি। আমার পাম্মানেন্ট বাহন নন্দী ঠাকুর তো থাকবেই সঙ্গে। প্রয়োজন হলে আমায় বহন করবে। কি নন্দী ঠাকুর পারবে না?
নন্দী
এতোকাল আমার পিঠে চেপ্পে গোটা দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছেন আর আজ এই কথা জিগ্যেস করে আমায় লজ্জা দেন কেন প্রভু। ও নিয়ে একদম চিন্তা করতে হবে না। জয় নন্দী নাথের জয়। (স্বগতোক্তি) ব্যাটা ষণ্ড কোনো কাজের নয়। আমারে ফাঁসায়ে দিল। কইগো ! সক্কলে মিলে বাবার নামে জয়ধ্বনি দাও লিখিনি।
বাকি সকলে মিলে একসাথে
জয় বাবা ষণ্ডেশ্বরের জয় ,জয় বাবা ত্রিশূলধারীর জয়।জয় বাবা ভৃঙ্গীনাথের জয়,জয় বাবা নন্দীনাথের জয়।
[ শিব ঠাকুর বেশ কেতা দেখিয়ে আগে আগে হাঁটতে থাকেন। তাঁর পেছনে রীতিমতো লাইন করে চলে বাকিরা। দুই অনুচর শিঙা আর ঢোল বাজাতে বাজাতে চলে। আশেপাশের লোকজন এমন অভিনব দৃশ্য দেখে আহ্লাদিত হয়। তাদের অনেকেই সামিল হয় এই শোভাযাত্রায়।]
৩. তৃতীয় দৃশ্য
[রসকুণ্ড গ্রামের শ্রাবণী মেলা প্রাঙ্গণ । অনেক লোকজনের ভিড়। তারা নানা কাজে সব মেতে আছে। আবহে ভেসে আসছে মেলা সংক্রান্ত নানান ঘোষণা। বাঁকে জল নিয়ে একদল ব্যোম,ব্যোম তারক ব্যোম করতে করতে চলেছে। একদল বাচ্চা ছেলে হাতে ত্রিশূল নিয়ে নাচছে। ওদের দেখে শিব ঠাকুরেরও নাচার ইচ্ছে করছে। এদিকে গরমের দিনে তেষ্টা মেটাতে ডাব বিক্রি হচ্ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে এক বাচ্চা শিব ডাবের জলে চুমুক দিচ্ছিল। শিব ঠাকুরেরও শখ হলো ভাবের জলে গলা ভিজিয়ে নিতে।সে গিয়ে দোকানির সামনে দাঁড়ায়।]
ডাবওয়ালা
কি গো তুমার আমদানি হলো কুথা থেকে? আমাদের ইলাকায় তুমারে আগে কখুনো দেখেছি বলে তো ঠাওর হয়না! বলি তুমি কোন্ গেরাম থিকা আলা বাপ? ডেরেসখানা তো দারুন হয়েছে।
শিব ঠাকুর
(অবাক হয়ে) আমারে প্রশ্ন কইরছো ? চতুদ্দিকে গণ্ডায় গণ্ডায় শিব ঠাকুর দেইখে আমার যেন কেমন ভিরমি লাগছিলো! ভৃঙ্গি অবশ্য আমার কানে কানে বলেছে যে এরা সব ঝুটো শিব, শাওনি মেলার জন্য সাজুগুজু করে পাব্বনি আদায় কচ্ছে। আমি হলাম আগমার্কা শিব ঠাকুর,কৈলাসপুরীর বাসিন্দা।
ডাবওয়ালা
( অবাক হয়ে) আগমার্কা শিব? কৈ লা স পু রীর বাসিন্দে! বাপজম্মে এই দিগরে এমন গেরামের নাম তো শুনিনি! এই মেলা পাব্বনের দিনে ঢের উটকো জনের আগমন হয় এই রসকুণ্ডে, খুব জাগ্গত আমাদের এই বাবা।সে যাক্! ডাব খাবে বুঝি ? কোনটা দিবো ?
[শিব ঠাকুর কথা বলেন না। হাতের ইশারায় নিজের পছন্দের কথা জানায়। ডাবওয়ালা বুঝে যায় তাঁর ইঙ্গিত। সেই মতো বেশ বড়সড় একটা ডাব কেটে দেয় শিব ঠাকুরের হাতে।]
ডাবওয়ালা
খাস লজর দেখছি বাপু তুমার। এটার দাম কিন্তু ৫০ টাকা পড়বে। এমন মিঠা জল তুমি কুথাও পাবেনা।
ভৃঙ্গি
( অবাক হয়ে ) বলো কি গো? ওই নকুলদানা পানা ডাবের দাম ৫০ টাকা ! চলো বাবা। এখানে লোকজন ঠিক সুবিধের বলে মনে হচ্ছেনা। আরে ! দাঁড়িয়ে রইলে কেন? চলো..
ডাবওঢয়ালা
( রেগে গিয়ে) চলো মানে? একি মামদো বাজি নাকি? সুরুৎ সুরুৎ করে অতখানি জল সাবড়ে নিয়ে এখুন বইলছো চলো? টাকাটা বাইর করো না হলে কিন্তু আমি হেস্তনেস্ত করে ছাড়বো।
নন্দী
তুমি বাপু আচ্ছা আহাম্মক দেখছি। বাবার কাছ থেকে ডাবের দাম চাইছো ? তাও আবার এতোগুলো টাকা?
ডাবওয়ালা
বাবা! কোন্ বাবা? আজ দশ বছর ধরে ডাব বিক্রি কইরছি। কত্তো কত্তো বাবা দেইখলাম আর ইনি এয়েছেন রসকুণ্ডর শাওনি মেলার এক ধেড়ে সঙ্। দাও দাও, আমার ডাবের পয়সা মিট্টে দাও। এখন বিক্রি বাট্টার লগন, আর উনি এয়েছেন ফোকটে ডাবের জলে গলা ভিজোতে।যতোসব ফেরেব্বাজ!
ভৃঙ্গি
এই!খবরদার! বাবারে অকথা কুকথা বুলবে না।তোমাকু মানা করছি।
[এইসব কথা বলে ডাবওয়ালা শিব ঠাকুরের দিকে তাকাতেই এক অবাক কান্ড ঘটে। শিব ঠাকুর দিব্য রূপ ধারণ করেন। তাই দেখে নিজের ভুল বুঝতে পারে ডাবওয়ালা। সে শিব ঠাকুরের পা জড়িয়ে ধরে।]
ডাবওয়ালা
( মিনতির সুরে) মুকে মাপ কইরে দাও ঠাকুর । এ আমি কী দেইখলাম গো, কী দেইখলাম। বাবা!আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ কি বলতে তুমাকে কি বুলেছি। এই আমি গড় করছি। আমাকে তুমি মাফ কইরে দাও ঠাকুর, মাপ কইরে দাও।
ভৃঙ্গি
( ডাবওয়ালাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে।)
আরে, এখন ওঠো । বাবার পা ছাড়ো। এবার থেকে আসল আর নকলের ফারাক বুঝতে শেখো। বাবা আমাদের সত্যিই ভোলানাথ ,তাই এ যাত্রায় রক্ষে পেয়ে গেলে । দুটো পয়সা না চেয়ে তোমার যদি বাবার কাছে কিছু বর চাওয়ার থাকে তো এই বেলা চেয়ে নাও। আমরা চলে গেলে পরে পস্তাতে হবে। (হাতজোড় করে বলে) বাবা! ওকে মাপ কইরে দাও।
শিব ঠাকুর
বেশ,আর কান্নাকাটি করতে হবে না। আমাকে একটা ডাব খাইয়েছো,আমি তার বদলে, তার বদলে- এক গণ্ডা সন্তান লাভের বর দিচ্ছি । এতে তুমার লোকবল বাইড়বে, ছেলেপুলেরা বাপের কাজে লাইগবে। এই বর পেয়ে তুমার জীবন বর্তে যাবে। কি খুশি তো এই বর পেইয়ে?
ডাবওয়ালা
( শিব ঠাকুরের বরের কথা শুনে ডাবওয়ালা একেবারে ভেঙে পড়ে। প্রায় লাফ দিয়ে শিব ঠাকুরের পায়ের ওপর পড়ে)
বাবা! এ কেমন বর দিলে বাপ? যে বর দিয়েছো তা যে আমার কাছে অভিশাপের সমান। তুমি বরং আমারে শাপ দাও,অমন সব্বোনেশে বর দিওনি গো, দিওনি।
[এই সময় মঞ্চে ঢোকে নানান বয়সের এক গণ্ডা শিশু। তারা তাদের বাবাকে ঘিরে ধরে লাফালাফি করতে থাকে।]
ছেলে ১- বাব্বা! তুমি একানে! আমরা তো সবাই সেই থেকে তোমারে সমানে খুইজে খুইজে মরছি।
ছেলে ২- বাবা, পয়সা দাও আমি ফুচকা খাবো। দাও শিগ্গির দাও কুড়ি টাকা।
মেয়ে – আমায় পুতুল কিনে দেবে বলিছিলে বাপ। বাপ, আমি কিন্তু এবার একটা মেম পুতুল কিনবো। ওই দোকানে আমি দেখে এসেছি। চলনা বাবা, আমার পুতুল…
ডাবওয়ালা
( রাগত স্বরে) এই তোরা থামবি? তোদের জ্বালায় তো আমার মরেও শান্তি নেই। বাবা, তুমি তোমার বর ফিরিয়ে নাও। এরপর আরও এক গণ্ডা ঘরে এলে আমাকে আর খুঁজে পাবেনা। ফিরিয়ে নাও বাবা, ফিরিয়ে নাও।
শিব ঠাকুর
( চিন্তিত হয়ে) সত্যিই তো বেজায় মুশকিলের ব্যাপার হলো! এরপরেও যদি একগণ্ডা এই পল্টনে যোগ দেয় তাহলে, তাহলে…..। আচ্ছা আমি বর দিচ্ছি তোমার গণ্ডায় গণ্ডায় ডাব হোক। একটা কাটলে দুটো,দুটো কাটলে চারটে… । কি এবার খুশি তো?
[এই বলে শিব ঠাকুর বরাভয় মুদ্রা দেখাতেই গণ্ডায় গণ্ডায় ডাব এসে হাজির হয়। আহ্লাদে আটখানা হয়ে ডাবওয়ালা এক দুই করে ডাব গুণতে থাকে। এই ফাঁকে শিব ঠাকুর ও অন্যান্যরা উধাও হয়ে যায়। ডাবওয়ালা হন্যে হয়ে শিব ঠাকুরের খোঁজ করে কিন্তু কাউকেই দেখতে পায় না।]
৪. চতুর্থ দৃশ্য
[ডাবওয়ালার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে অনেকটাই স্বস্তি ফিরে এসেছে শিব ঠাকুরের মনে। কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়েছে মাঝে। তাতে গরম কমেছে, মেজাজ হয়েছে ফুরফুরে। মনের খুশি ধরা পড়ছে সবার চলনে। কানে আসে কিছু ঘোষণা – আসুন আসুন। এখানে ঢোল বাজানোর লড়াই চলছে। এই প্রতিযোগিতায় যারা যোগ দিতে চান,তারা এখানে এসে হাজির হোন। শিব ঠাকুরের কানে ঘোষণার কথা ঢুকতেই তিনি উৎসুক হয়ে ওঠেন।]
শিব ঠাকুর
( বেশ মজা করে) আমি যা শুনছি তোদের কানে কি সে সব কথা ঢুকছে ? আমি তাক দুম,তাক দুম বাজাই , বাংলা দেশের ঢোল….
নন্দী
কোন কথা বাবা? ঐ ঢোল বাজানোর লড়াইয়ের কথা? ওখানেও একবার ঢুঁ মারার মতলব ভাজছেন নাকি বাবা?
শিব ঠাকুর
মতলব আবার কি? ঢোলের কথা শুনে আমার হাত দুটো কেমন নিসপিস করছে ঢোলে কাঠি দেবার জন্য। চল চল, একবার ঘুরে যাই। ডম্বরু বাজাতে বাজাতে তো হাতে কড়া পড়ে গেছে। দেখি ঢোলে ঘা দিয়ে।
[সবাই মিলে ওখানে হাজির হয়। ওখানে এক ছোটো ছেলের কাছ থেকে ঢোল নিয়ে শিব ঠাকুর কয়েকটি বোল তুলতেই সবার নজর তাঁর দিকে ঘোরে।]
শিব ঠাকুর
আমি হলাম গিয়ে শিবু ঠাকুর। নিবাস – কৈলাসপুরী। ইখানে এই রসকুণ্ড গেরামের শিবমন্দিরে দিন কয়েকের অতিথি হয়ে এসেছি। সবাই যদি অনুমতি দেন তো আমি আপনাদের মনোরঞ্জন করতে পারি এই ঢোলের তালে। কি! সবাই রাজি তো ? দেরে বাছা, তুয়ার ঢোলটা একটুকুস দাও দেখি। কি! সবাই রাজি তো? জোরে বুলো না কেনে।
উপস্থিত সকলে বলে – হ্যাঁ হ্যাঁ। এতো খুব উত্তম প্রস্তাব। আমরা শিবু ঠাকুরের বাজনা শুনবো।
নন্দী
( কানে কানে বলে ) বাজাবো বলে তো নেচে উঠলে। সাবধানে তাল ঠুকো। ঢোলটা ফেঁসে গেলে আমরা সবাই কিন্তু ফেঁসে যাবো। সেই খেয়াল রেখো। তোমার তো আবার সবেতেই বাড়াবাড়ি।
শিব ঠাকুর
তুই অত চিন্তা করিস না। আমি সাবধানেই বাজাবো।
বোলতা
এই যে ঠাকুর, বাজাতে বাজাতে ঢোলটা যদি ফেটে যায় না, তাহলে কিন্তু আমি হুলুস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়ে দেবো। মনে রেখো, আমার নাম বোলতা। দেখতে টুকুস হইলে কি হবে , আমার ঝাঁঝ কিন্তু ভয়ঙ্কর।
ভৃঙ্গি
( বোলতাকে কাছে টেনে নিয়ে ) তুই এতো ভাবনা করছিস কেন বাপ? বাবার বাজনায় যদি তোর্ ঢোলটা ফেটেই যায়, তাহলে বাবা তোকে দশটা ঢোল এনে দেবে। কোনো চিন্তা করিস নে। আমাদের বাবা আসলে………।
[ভৃঙ্গির কথা শেষ হয়না। একজন ঢেঙা চেহারার লোক লম্বা হুইসেল বাজিয়ে প্রতিযোগিতা শুরুর কথা ঘোষণা করে । ঢাকের তালে তাল মিলিয়ে নাচের জন্য ওখানে হাজির সকলেই। ঢুলিরা কেউ কাউকে ছাড়বে না। সকলেই ওস্তাদ বাজিয়ে। নাচের আসরের এমন জমজমাট ভিড়ে সামিল হয়েছে ষণ্ডদেবও। হাজির দর্শকদের অনেকেই। শিবু ঠাকুরের বাজানোর কেতাই আলাদা। ]
ভৃঙ্গি
( ষণ্ডদেবকে বলে) কি রে ষণ্ড? তুই যে তখন বললি তোর শরীল গতিক ভালো নেই, গা ম্যাজম্যাজ করছে, মাথা টলছে। আর এখন এই গোবদা চেহারা নিয়ে ঢোলের বোলে নেত্য করছিস? বলিহারি বাহানা তোর। নেচেকুদে কাহিল হয়ে যখন বাবাকে নে যাবার কথা উঠলেই কেঁদে কুটে বলবি–
বাবাগো! আমার শরীল বেজায় কাহিল,তোমায় বইতে নারি।
ষণ্ডদেব
তালে তালে অঙ্গ দুলিয়ে গতর এখন গরম হয়ে গেল, আর তুমি প্যানপ্যানানি করে যাচ্ছ সেই থেকে। কথা না বাড়িয়ে নাচতে এসো।
[নাচের পর্ব যখন একেবারে তুঙ্গে, তখনই শিবু ঠাকুরের ঢোল গেল ফেটে। সবাই হৈ হৈ করে উঠলো – আরে ফেটে গেলো, ফেঁসে গেলো শিবু ঠাকুরের ঢোল। আরে শিবু ঠাকুরের ঢোল।]
শিব ঠাকুর
( ঢোল ফেটে যেতেই ) যা শালা! আম্মোর ঢোলটাই ফেঁসে গেলো! এই ভৃঙ্গি আর একটা ঢোল আন দিকিন। সবে টেম্পু উঠেছে আর তখনই ঢোলটা ফেঁসে গেল!
বোলতা
আর ঢোল আনতে হবেনা। এই লাঠি পেটা করে আমি তোমাকে আর তোমার ওই সাকরেদদের এই রসকুণ্ড ছাড়া করবো। ( এই বলে বোলতা হাতে একটা শক্তপোক্ত লাঠি নিয়ে শিব ঠাকুরকে তাড়া করে) আজ তোমার একদিন কি আমার।ভাগো এখান থেকে। (সবাই তাকে টেনে ধরে) । আমার অমন সাধের ঢোলটা! ( ঢোলটা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।)
[বিপদ বুঝে শিব ঠাকুর ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গোরা মঞ্চ ছেড়ে পালায়।]
বোলতা
( মঞ্চের মাঝখানে বসে) বড়োরা কক্ষনোই কথা রাখেনা। সবসময় মিথ্যে কথা বলে আমাদের ভুলিয়ে রাখে। বড়োদের বিশ্বাস করে ঠকে গেলাম। ওরে আমার আমার ঢোল / আমার বন্ধ হলো বোল।
[ এমন সময় মঞ্চের মাঝখানে বোলতা। একটা আলোক বৃত্ত তৈরি হয় বোলতার চারপাশে। বোলতা আস্তে আস্তে মাথা তোলে। তাকিয়ে দেখে আলোক বৃত্তের সীমানা বরাবর সাজানো রয়েছে ঢোলের সারি। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে ওঠে]
বোলতা
তুমি কথা রেখেছু ভোলানাথ, কথা রেখেছু।রাগ করে আমি তুমাকে অকথা কুকথা বইলেছি । আমারে মাপ কইরে দাও বাবা,মাপ কইরে দাও। বড়োরা কথা দিলে কথা রাখে, কথা রাখে, কথা রাখে।
৫.পঞ্চম দৃশ্য
[বোলতার তাড়া খেয়ে সবাই ছুটতে ছুটতে অনেকটা রাস্তা পাড়ি দিয়েছে। সকলেই বেশ ক্লান্ত। শিব ঠাকুরের অবস্থা বেশ সঙ্গীন। খানিকটা সময় বিশ্রামের দরকার। এভাবে একের পর এক কাণ্ড ঘটিয়ে শিব ঠাকুরও খুব বিব্রত । কেন যে এমন ঘটনাগুলো ঘটছে তা স্বয়ং শিব ঠাকুরের কাছেও স্পষ্ট নয়।
মেলার জমজমাটি ভিড় এড়িয়ে সবাই এখন একটু ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন শিব ঠাকুর ও তাঁর সঙ্গীরা। সামনের মাঠে একদল ছেলে ক্রিকেট খেলছে শ্রাবণের বর্ষা ভরা দিনে। শিব ঠাকুরের ইচ্ছে হলো ক্রিকেট খেলার। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ]
অনুচর ১
বাবার পাল্লায় পড়ে আমাদের যে দম ছুটে যাবার জোগাড়।
যেই দেখবে ভিজে মাঠে ছেলেগুলান খেলা কইরছে অমনি হয়তো বায়না কইরবে – আমি খেইলবো।
অনুচর ২
তা যা বুলেছিস। ভাগ্যিস আগে ভাগে কেইটে উঠেছিলাম, না হলে এতোক্ষণে পিটিয়ে পাট কইরতো।
অনুচর ১
আস্তে কথা বল। শুনতি পেলে আর রক্ষে থাকবেনা
[ এমন সময় শিব ঠাকুর দলবল নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করে। ঢুকেই নজর পড়ে সামনের মাঠের দিকে]
শিব ঠাকুর
হ্যাঁরে ভৃঙ্গি , এমন বিষ্টি ভেজা বর্ষার দিনে ওই ছেলেপিলেরা খোলা মাঠে তেকাঠি পুঁতে কী করছে?
ভৃঙ্গি
বাবা ওরা কিরিকেট খেলছে। ওই দেখো গদা হাতে নিয়ে তেকাঠির সামনে যে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে তাকে বলে ব্যাটার, আর উল্টো দিক থেকে ছুটে এসে গোলা দাগছে যে ছেলেটা তাকে বলে বোলার। বোলারের ছোঁড়া গোলাটাকে ওই গদা দিয়ে মারতে হবে। সেই অনুযায়ী লাভের অংক জমা হবে ওই ব্যাটারের খাতায়। একে বলে রান। একদলে খেলা সব ব্যাপারের রান যোগ করলে হয় স্কোর। আর তুমি ভেজা মাঠে শাওন মাসে কিরিকেট খেলছে বলে অবাক হচ্ছো? এ হলো কলিকালের করিশমা, একালে সব সম্ভব। পনসররা যখন চাইবে তখনই খেলতে হবে। এখন এখানে কিরিকেট আর টমেটো সারা বছরই মেলে।
শিব ঠাকুর
ওহ্, এই ব্যাপার? দুনিয়াটা কেমন বদলে গেছে। তোদের পাব্বতী মা এসব দেখলে নির্ঘাত মুচ্ছো যেত। ভাগ্যিস এ যাত্রায় সঙ্গে করে নিয়ে আসিনি। খেলাটা দেখছি খুব একটা কসরতের নয়।ও আমি ঠিক পারবো। চল দেখি ময়দানে নেমে পড়ি।মন যখন চাইছে তখন না খেললে রগড়টা ঠিক জমবে নি। কথায় বলেনা এসেছিস যখুন, তখুন দাগ রেইখে যা।
নন্দী
( রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে) বাবা! আপনি এখন ওই ডাণ্ডা বল খেলবেন? দোহাই আপনার বাবা! এর মধ্যেই অনেক ঝঞ্ঝাট বাঁধিয়েছেন। এই খেলতে গিয়ে আর কোনো বিপদে ফেলবেন না আমাদের।
শিব ঠাকুর
ওরে বাপু। অতো ভয়ডর করলে চলে ? আরে আমি কি আর নকল ভোলা? আমি যে আসলে সেই ভোলা যে সমুদ্র মন্থনের সময় গলগলিয়ে ওঠা হলাহল আকন্ঠ পান করে এই ধরিত্রীকে রক্ষা করেছিলাম । এসব খুচরো হট্টগোলে কি আর আমি হাল ছাড়ি ? তোরা কোনো চিন্তা করিসনা। কইরে ভৃঙ্গি , চল চল মাঠে নেমে পড়ি ।
[ওরা সবাই ধীরে ধীরে মাঠে প্রবেশ করে। এই দৃশ্য দেখে অবাক হয় মাঠের ছেলের দল – পিন্টু, ক্যাবলা, টনি আর ভোলা। ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করে শিব ঠাকুরদের নিয়ে।]
ভোলা
ওই দেখ,মাঠে কারা আসছে? দেখেশুনে তো এলাকার লোকজন বলে মনেই হচ্ছে না।
পিন্টু
সাজপোশাকের যা ছিরি তাতে করে তো মনে হচ্ছে শাওনী মেলার সঙ!
টনি
তাই হবে হয়তো। তা এদের মতলবটা কী ?
ক্যাবলা
তোরা এখানে দাঁড়া। আমি গিয়ে শুধিয়ে আসি।
ভোলা, পিন্টু,টনি তিনজনে একসাথে
না না। তুই একা যাবি কেন? আমরাও যাচ্ছি তোর সঙ্গে।
সবাই মিলে একসাথে শিব ঠাকুরের দলবলের সামনে এসে দাঁড়ায়।
ক্যাবলা
তা বাবা ঠাকুরেরা! কী উদ্দেশ্যে আপনারা দলবেঁধে হেথায় এসে হাজির হলেন? আপনাদের আগমনের হেতুটা কি জানতে পারি?
শিব ঠাকুর
( কথাবার্তা শুনে খুব প্রসন্ন হন ) বাহ্, খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারো দেখছি। ঐ কাছের মেউদিপুর ইস্কুলে পড়া হয় বুঝি? শিখ্যের এই হলো কামাল। পেটে দু ফোঁটা বিদ্যে পড়লেই খোলনলচে বিলকুল বদলে যায়। আমাকে তোমাদের সাথে একটু কিরিকেট খেলতে নেবে?
ক্যাবলা
এই ভোলা, পিন্টু, টনি – তোরা শুনলি এই শিব ঠাকুর আমাদের সাথে খেলতে চান। কি রি কে ট। খেলতে নেবো এই সঙদের রাজাকে?
ভোলা
( হাসতে হাসতে বলে) নিয়ে নে। অমন বাঘ ছাল কোমরে জড়িয়ে খেলতে নামার মজা টের পাইয়ে দেবো ঠাকুর মশাইকে।
পিন্টু
এই যে শিব ঠাকুর। আসুন আমাদের সঙ্গে খেলবেন আপনার ওই কি রি কে ট খেলা। টনি তুই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জোরে বল করিস। তুই বরং যা বল করতে। উইকেট ভেঙে ছত্রাকার হলেই সঙ বাবাজির শখ খতম হয়ে যাবে।
টনি
এই যে ঠাকুর, এদিকে আসুন।ব্যাট ধরতে পারেন তো? ওই উইকেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ান।আমি বল করবো।
শিব ঠাকুর
ও সব নিয়ে তুমি ভেবোনা। ও সব আমি বিলকুল সামলে নেব। আমি ওই তেরকাঠির সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি। ওই গোলা দাগতে তুমি বরং ওদিক পানে যাও দিকিন। আমার যে আর তর সইছে না।
[ব্যাট কাঁধে নিয়ে শিব ঠাকুর উইকেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। নন্দী,ভৃঙ্গী সহ অন্যান্যরা হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করতে থাকে শিব ঠাকুরকে। টনি বল করে। সব বলই শিব ঠাকুর সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন দেখে টনি বেদম হয়ে পড়ে।]
শিব ঠাকুর
কী হলো টনি বাবু? এর মধ্যেই দম ফুরিয়ে গেলো? ওরে ক্যাবলা, এবার না হয় তুমি গোলা ছোড়ো।
পিন্টু
হ্যাঁ হ্যাঁ তুই যা।
নন্দী
ওই টনি বা বনি , যেই গোলা ছুড়বে তাদের সবার হালই এক হবে। আমাদের সাজ পোশাক দেখে তোমরা আমাদের মাপতে চেয়েছো।এটা একদম ভুল। বাইরেটা দেখে কখনোই কাউকে বিচার করতে যেওনা। তাহলে যে বারবার ঠকতে হবে।
[ক্যাবলা বল করে। প্রথম বলটাকেই এতো জোরে ব্যাট হাঁকিয়ে শিব ঠাকুর মারেন যে তা মেঘের আড়ালে চলে যায়। ছেলেরা অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে , কিন্তু বলের দেখা নাই। ]
সব ছেলেরা একসঙ্গে
( বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে) বাপরে বাপ! এ যে দেখছি সূর্যবংশীর বাবা! কি অবাক করা কাণ্ড! না বাবা এমন খেলুড়ে আমাদের দরকার নেই। হাতজোড় করে মিনতি করছি বাঘছাল দাদু, তুমি এবার এসো।
শিব ঠাকুর
( হ্যা হ্যা করে হেসে ) কি বলেছিলাম না যে আম্মো জাতখেলুড়ে। আগে থেকেই নিজেদের বড়ো ভাবতে নেই। মনে রেখো যে করে বড়াই,তারে আম্মো হারাই।( হেসে ওঠে)
পিন্টু
সত্যিই আমরা বুঝতে ভুল করেছিলাম। কিন্তু বলটা কোথায় গেল? ক্লাসে সৌমেন স্যারের শেখানো মাধ্যাকর্ষণের সূত্র যে এখানে খাটছেনা। বলটা তো পৃথিবীর টানে নিচে নেমে আসবে! কই তেমনটা হলো কই ?
অনুচর ১ এবং ২
( একসঙ্গে গেয়ে ওঠে )
ও বল পড়েনা পড়েনা
গেলরে কোথায়?
বাবার ব্যাটের বাড়ি খেয়ে
মহাশূন্যেতে মিলায়,
ও বল মানেনা মানেনা
ন্যুটনেরই বল , বাবা! ন্যুটনের বল,
এদেশে আর থাকা নাই, থাকা নাই
কৈলাসেতেই চল। ও বল পড়েনা, পড়েনা….
[ গানের সুরে সুর মিলিয়ে সবাই মিলে নাচতে থাকে। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য। এদিকে বল না পেয়ে ছেলেদের মনে মহাকষ্ট। তারা বল ফিরিয়ে দেবার জন্য আবদার করে।]
চারজন ছেলে একসাথে
( হাত জোড় করে, কাঁদো কাঁদো গলায় বলে) বাবা! আপনি এক বিরাট ব্যাটসম্যান। আমরা আপনার ফ্যান হয়ে গিয়েছি।
আপনি আমাদের আইডল। মুশকিল হলো কি জানেন বাবা! আপনি যদি ম্যাজিক করে বলটা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন তা হলে বড়ো ভালো হয়।
শিব ঠাকুর
(হেসে ওঠেন) ওহ্! এই কথা! দাঁড়াও ব্যবস্থা করছি। ভৃঙ্গি বাবু, যাও দিকিন, এই বাবু সোনাদের বলটা খুঁজে এনে দাও। সত্যিই তো, বল না হলে ওরা খেলবে কি করে? কথায় বলে ব্যাট বল খেলা। ব্যাটতো আছে,বলটা খুঁজে এনে দাও।
ভৃঙ্গি
যথা আজ্ঞা প্রভু ! আমি এই যাব, আর এই ফিরবো। ( প্রস্থান)
পিন্টু
বাবা,এই যে আপনি বলটাকে ব্যাট দিয়ে মারলেন, সেটা আর মাটির টানে এই মাঠের মধ্যে নেমে এলো না কেন? তার মানে…..
শিব ঠাকুর
( হাসতে হাসতে) তার মানে মারের চোটে ওর পলায়ন বেগটা বোধহয় একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল?
ক্যাবলা
( একটু ভেবে) আচ্ছা ! আপনি কি বস্তুর মুক্তি বেগের কথা বলছেন ভোলাবাবা?
শিব ঠাকুর
( হেসে) ওহ্ তাই হলো।যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন, যাহা পলায়ন তাহাই মুক্তি। ( মজা করে) কি বোঝা গেল, বলটা কেন ফিরে এলোনা!
অনুচর ১ আর অনুচর ২
( সুর করে ছড়া আওরাতে থাকে)
শিব ঠাকুরের ফিজিক্স ক্লাসে
শিখছে পড়া হেসে হেসে।
কেউ যদি ভাই পিছিয়ে পড়ে
ঠাকুর মশাই তারে ধরে,
শেখায় পড়া কাটিয়ে ঘোর
হোকনা রাত্রি, দুপুর,ভোর ।
পড়ার সময় নেইকো ফিক্স্,
অঙ্ক, ভূগোল আর ফিজিক্স।।
সবাই মিলে ঘুরে ঘুরে এই ছড়া বলতে বলতে শিব ঠাকুরের চারপাশে ঘুরতে থাকে।
এমন সময় কোথা থেকে যেন হারিয়ে যাওয়া বলটা টুক করে মঞ্চের মাঝখানে এসে পড়ে।
ছেলেরা সকলে মিলে
( অবাক হয়ে) আরে! এইতো আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া বলটা! কী করে এখানে এলো?
(মঞ্চে প্রবেশ করে ভৃঙ্গী। হাতে আরও কিছু বল।)
নন্দী
হ্যারে ভৃঙ্গী তোর এতোক্ষণ লাগলো কেন? মহাকাশে চলে গিয়েছিলি নাকি! আমরা সবাই কতো চিন্তা ভাবনা করছি।
ভৃঙ্গি
( হাসতে হাসতে) সে এক মজার কাণ্ড! বাবা তো বল হাঁকিয়েই খালাস। এদিকে বলটা গিয়ে পড়েছে সোজা লাদাখে। সেখানকার ছেলেপুলেরা আকাশ থেকে টপাস করে বল পড়তে দেখে বেজায় খুশি। নিজেদের বল ফেলে এই নতুন বল নিয়েই খেলতে লাগলো। আমিও ভিড়ে গেলাম ওদের দলে। হাজার হোক এই বাবারই তো চেলা আমরা। ওরা কিছুতেই ছাড়তে চাইছেনা দেখে খানিকটা সময় ওদের সঙ্গে খেলা করে একটু ঘাম ঝরিয়ে এলাম।
(সবাই হৈ হৈ করে ওঠে দারুন উল্লাসে। এমন সময় চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে ঘন্টার শব্দে। সঙ্গে ঢাক, ঢোল, শিঙার শব্দ। )
ষণ্ডদেব
এবার আমাদের যাবার সময় হলো। কাল পয়লা শ্রাবণ। বাবার জন্মমাসের শুভ সূচনা। বাবাকে এখন এই একমাস ভক্তদের সেবা নিতে হবে মন্দিরে মন্দিরে। আমরা আসি। তোমরা সবাই খুব খুব ভালো থেকো।
ষণ্ডদেব গান গেয়ে ওঠে।
ষণ্ডদেব
চলো রে, চলো রে, ভোলা
ফিরিয়া কৈলাসে,
মর্ত্যে আসি করো কাণ্ড
যতেক উল্লাসে।
আহা মাতিয়া উল্লাসে,
বাবা যতেক উল্লাসে।
শাওন মাসে জনম তোমার
ধন্য হলেম মোরা, আহা ধন্য হলাম মোরা
বাহন হইয়া তোমার সাথে
হয় দুনিয়া ঘোরা,বলি হয় দুনিয়া ঘোরা।
তোমায় নিয়া লেখেন গপ্পো
সৌমেন মাস্টার, মোদের সৌমেন মাস্টার,
নাটকে সাজান তারে সোমনাথ নাট্যকার।
10 Comments
স্বতপ্রণোদিত হয়ে গল্পটির নাট্যরূপ দেওয়ার জন্য নাট্যকারকে অনেক ধন্যবাদ। গল্পের থেকে নাটকটি আরো সরস ।আশা করি মঞ্চায়ন হবে।
ReplyDeleteজ্বলদর্চির পাতায় ' হেরে গেলেন ভোলেবাবা ' গল্পটা প্রকাশিত হবার পর পাঠকদের কাছ থেকে দাবি উঠেছিল গল্পটার নাট্যরূপ দেবার। প্রস্তাবটা খুব মনে ধরেছিল।তাই কাহিনির সামান্য অদলবদল করে একটা নাটক লেখা হলো -- গাজন মেলার ঘটনা বদলে করা হলো শ্রাবণী মেলায়। নাটকের পাঠক কম। লোকজন নাটকের মঞ্চায়ন পছন্দ করে। এটিও সময় সুযোগ মতো মঞ্চায়িত হবে আশাকরি। এই প্রয়াস কতদূর সফল হলো পাঠকরাই তার বিচার করবেন। পাঠকদের মতামতের জন্য অপেক্ষা করবো। আপনাকে ধন্যবাদ এই অধম নাট্যকারের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্য। ধন্যবাদ জানাই জ্বলদর্চির সম্পাদক মশাইকে গোটা নাটকটা একবারে প্রকাশ করার জন্য।
ReplyDeleteকিছু বানানের ভুল থেকে গেছে। তার দায় সম্পূর্ণভাবে আমার। ভালো থাকবেন সবাই।
নাট্যরূপের আশা করেছিলাম,
ReplyDeleteঅসংখ্য ধন্যবাদ জানাই নাট্যকার মহাশয়কে.
এবার মঞ্চস্থ হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম
🙏🙏🙏🙏🙏🙏
ধন্যবাদ রাখী দি আপনাকে। আপনার মন্তব্য পড়েই নাট্যরূপ দেবার ইচ্ছে জাগে। কেমন হলো নাটকায়ন জানালে খুব খুশি হবো। ভালো থাকবেন।
ReplyDeleteঅসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকেও।নাট্য রূপ বড়ই মনোগ্রাহী।আদপে গল্প যেমন জীবন্ত, নাট্য রূপও ঠিক ততখানিই প্রাণবন্ত । আশা রাখছি অতি শীঘ্রই মঞ্চস্থ হবে। ভালো থাকবেন।🙏🙏🙏🙏🙏🙏
Deleteবেশ উপভোগ্য হাসির নাটক। এর সাজ পোশাক জোগাড় করাও আয়াস সাধ্য । অভিনয় হোক।
ReplyDeleteগল্পটা আমার আমার অনুজপ্রতিম মাস্টারমশাই সৌমেন রায়ের লেখা। পাঠকদের মধ্য থেকে রাখী দে অনুরোধ করেছিলেন এর নাট্যরূপ হলে বেশ উপভোগ্য হবে। সেই অনুরোধ রাখতেই গল্প থেকে নাটক তৈরি করা হয়েছে । ভালো লেগেছে জেনে আমারও খুব ভালো লাগলো।
ReplyDeleteপাঠকদের মধ্যে কেউ এই নাটকের মঞ্চায়নে আগ্রহী হলে গল্পকার এবং সম্পাদক মশাইয়ের অনুমতি নিতে হবে।
ReplyDeleteভীষণ সুন্দর। এক অন্য স্বাদের গল্প। শিবঠাকুর মুচকি হাসছেন আশাকরি।🙏🏼
ReplyDeleteপাঠকদের মুচকি হাসিতেই আমি আপাতত তুষ্ট। ভোলানাথ অলক্ষ্যে থেকে হাসলে আমার আর কিছু বলার নেই। নাটকের পাঠক কম, দর্শক অনেক বেশি।তাই নাটকের মঞ্চায়ন খুব জরুরি। ভালো থাকুন।
ReplyDelete