আমার শিক্ষা ও শিক্ষকেরা
বিশ্বজিত্ ঘোষাল
প্রতি বছর ইংরেজি ক্যালেণ্ডারে সেপ্টেম্বর মাসে একটি দিন বরাদ্দ থাকে যেটি আমরা শিক্ষক দিবস হিসাবে পালন করে থাকি। স্কুলজীবন থেকে এখনো অবধি বহু শিক্ষকের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছে, আশা করি ভবিষ্যতে আরো হবে। আমার ছাত্রজীবনে যাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছি সবার কথা এখানে বলার সুযোগ হবে না, কারণ পরিসর খুবই অল্প। আমার কাছে তাঁরাই প্রকৃত শিক্ষক যারা শিক্ষার্থীদের যথাযথ দিশা এবং জীবনের মূল্যবোধ সম্পর্কে অবহিত করে। এটা একদিনে পাওয়া কখনো সম্ভব নয়, যুগের পর যুগ অপেক্ষা করলেও এই জিনিস সবার আয়ত্তে আসবে তাও জোর দিয়ে বলা যায় না। একটা ছোট ঘটনা মনে পড়ে গেল এই সূত্রে। কোনো একটা পত্রিকাতেই পড়েছিলাম রামায়ণ-এর ঘটনা। ঘটনার হুবহু বিবরণ আমার মনে নেই, আমি আমার মতো করে সেই ঘটনাটি বলছি। রাবণ যখন অন্তিম শয্যায় অবস্থান করছে তখন রাম তার অনুজ ভাই লক্ষ্মণকে বলে যে, রাবণের অন্তিম সময় আগত তুমি রাবণের কাছে গিয়ে তাঁর কিছু মূল্যবান জ্ঞান গ্রহণ কর। লক্ষ্মণের মনে দ্বিধা থাকলেও সে এই অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারে না। সে যায় রাবণের কাছে এবং তাঁকে বলে- তুমি জীবনে অনেক অন্যায় করেছ, তোমার শেষ সময় আগত। তোমার উচিত তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া। এখন তার সময় এসেছে; তাই সেই কারণে তোমার অর্জিত জ্ঞান তুমি কিছুটা আমায় প্রদান করে তোমার পাপের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত কর। রাবণ এই কথা শোনার পর লক্ষ্মণের নির্দেশ শোনার পরিবর্তে তাকে প্রায় দূর করেই দেয়। ফিরে এসে লক্ষ্মণ তাঁর দাদাকে অনুযোগ জানালে রাম এবার নিজে যায় এবং প্রায় নতজানু হয়ে প্রার্থনা জানায়-হে মহামতি রাবণ, তুমি প্রকৃত একজন জ্ঞানী পুরুষ; তোমার জ্ঞানের কিঞ্চিৎ ভাগ আমাকে তুমি প্রদান কর। তখন রাবণ সন্তুষ্ট হয়ে রামের উদ্দেশ্যে বলে, হ্যাঁ আমি তোমাকে আমার জ্ঞানের ভাগ দেব। গল্পটা আমি নিজের মতো করে বললাম, যাঁর থেকে এই গল্পটি ধার করেছি তিনি নিশ্চয় এমনভাবে লেখেননি। তাহলে এই গল্পের মূল সারমর্ম কী? তা হল এই-জ্ঞান যার কাছে নিতে আসছি অর্থাৎ গুরু বা শিক্ষকের কাছে, তার কাছে অহংকার সর্বস্ব হয়ে আসলে চলবে না কিংবা ‘মুখেন মারিতং জগৎ’ হলেও চলবে না। তার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে বিনয়ের সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে। রামের মধ্যে সেই নিষ্ঠা রাবণ লক্ষ্য করেছিল, তাই তার জ্ঞানের ভাগ দিতে সে স্বীকৃত হয়েছিল। জ্ঞান পাওয়ার জন্য যে কষ্টটুকু স্বীকার করা প্রয়োজন সেটা না করলে কখনোই তা প্রকৃত অর্থে জ্ঞানলাভ হয় না। শিক্ষার্থীর যেমন আগ্রহ থাকা প্রয়োজন তেমনি শিক্ষকেরও দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন। শিক্ষকের কথা বিশ্বাস ভরে মানতে হবে শিক্ষার্থীদের এবং বুঝতে হবে যে তিনি আমাদের খারাপ চাইছেন না। এই বিশ্বাসটুকু থাকলেই অনেকাংশে সফল হওয়া যায় বলে আমি মনে করি।
এবারে আমি আমার ‘প্রকৃত’ শিক্ষকদের কথা বলার চেষ্টা করব। এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে তিনজন মানুষের কথা বলব যাঁদের থেকে আমি শেখার সুযোগ পেয়েছি। আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করে থাকবেন আমি ‘প্রকৃত’ শব্দটি ব্যবহার করেছি। ‘সকলেই শিক্ষক নন, কেউ কেউ শিক্ষক।’ কবি জীবনানন্দ দাশের উক্তি ধার করে আমি এখানে উদ্ধৃত করেছি। আমার জীবনে আজ পর্যন্ত যে ক’জন প্রকৃত শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি তাঁরা হলেন- অধ্যাপক বিজয় পাল, ড. স্মৃতিকণা চক্রবর্তী এবং আরেকজন হলেন ড.নির্মাল্যকুমার ঘোষ। প্রথম মাস্টারমশায়ের কাছে আমি টিউশনে ভর্তি হয়েছিলাম বাংলা অনার্স পড়ার জন্য। স্কটিশচার্চ কলেজের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। যখন ওঁনার কাছে ভর্তি হই ততদিনে তিনি কর্ম থেকে অবসর নিয়েছেন। স্যারের কাছে পড়ার সূত্রে জেনেছি সহজ করে কোনো বিষয়কে বলা একটা আর্ট। কত সুন্দরভাবে ব্যক্ত করা যায় সেটাই স্যারের কাছ থেকে জেনেছি। পড়ার বাইরে তিনি অন্য জগতের মানুষ; বলা যেতে পারে জটিল পৃথিবীতে একমুঠো অক্সিজেন। যার যত বড় সমস্যাই হোক না কেন, স্যারের সঙ্গে কথা বললে কিছু না কিছু তার সমাধান বেরোত; অন্তত কথা বলে মানসিক শান্তি পাওয়া যেত। বহুদিন হল তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁর শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়।
স্নাতক কোর্সে কলেজে পড়াকালীন অধ্যাপিকা স্মৃতিকণা চক্রবর্তী-র ক্লাস পাই। সেখানে প্রথম শিখি কী পড়ছ সেটার থেকেও বড় বিষয় কেন পড়ছ, তার প্রাসঙ্গিকতা কী। গ্রন্থাগারে কোন বই আছে বা কীভাবে তার ব্যবহার করতে হবে সেটিও ম্যামের কাছ থেকে শেখা। আজকাল আর গ্রন্থাগারে বিশেষ কেউ যায় না, তাই এই নিয়ে কথা বাড়ালাম না। একটি শিশু যখন পৃ্থিবীতে ভূমিষ্ঠ হয় তখন তার মাকেই প্রথম চেনে, তার মূল্যবোধকেই আপন করে সারা জগতকে চেনার সুযোগ পায়। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। ড. স্মৃতিকণা চক্রবর্তী আমার জীবনে সেই জায়গাই নিয়ে আছেন এবং তিনি হাতে ধরে না শেখালে কোনোদিনই আমি শিখতে পারতাম না।
তৃতীয়জন হলেন ড. নির্মাল্যকুমার ঘোষ। এঁনার সঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স পড়াকালীন আমার পরিচয় হয়। ওঁনার কাছেই প্রথম গবেষণার পাঠ পাই। গবেষণা করতে গিয়ে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে পড়ার জগৎকে কীভাবে দেখতে হয় তিনি শেখান। অনেক সময় ঠিকমতো কাজ না পারলে কটূ কথা বলতেন, তাতে কিছুটা রাগ হলেও পরে বুঝেছি-পণ্ডিতমাত্রেই মৃদুভাষী হন না, রূঢ় শাসনই তাঁর শেখানোর পন্থা। তিনি যদি সবকিছু সহজেই হাতের কাছে দিয়ে দিতেন তাহলে কীভাবে সোর্স খুঁজতে হয় সেটা জানা হত না। এই তিনজন প্রকৃত মানুষের কাছেই আমি চিরকৃতজ্ঞ, আমার মতো অক্ষমকে তাঁরা তাঁদের ছাত্র হবার সুযোগ দিয়েছেন।
প্রকৃত শিক্ষক মাত্রই চায় যে তার ছাত্র-ছাত্রী তাকে মনে রাখুক; নারায়ণ গাঙ্গুলী-র ‘দাম’ গল্পে অঙ্কের মাস্টারমশাই সুকুমার-এর লেখা স্মৃতিকথায় নিজের নাম দেখতে পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়েছিলেন, কারণ অনেক মানুষের মধ্যে সুকুমার তাকেই নির্বাচন করেছে। যেকোন শিক্ষকই চাইবেন তার ছাত্র বা ছাত্রীর স্মৃতিতে একটু ঠাঁই পেতে, এইটুকুই তার পরম চাওয়া।
0 Comments