তনুশ্রী কার্তিক
ছায়াবৃত্ত
একা হলেই আমি আমার ছায়ার সঙ্গে কথা বলি।
এতকাল কত সহজে বিশ্বাস করেছিলাম—
সে বুঝি আলোর খেয়ালে গড়া বাধ্য এক প্রতিচ্ছবি।
আলো নিভে গেলেই আমার অর্জিত সমস্ত পরিচয়
জীর্ণ বসনের মতো খসে পড়ে নিঃশব্দে।
মহাজাগতিক অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করি---
ছায়া কোনো অনুগমন নয়;
সে ফিরে যাবে তার আদিম আশ্রয়ে—
যেখানে সময় এখনও শেখেনি প্রথম ক্ষয়।
আমি তো কেবল এই নিস্তব্ধতার বুকে
ভেসে ওঠা মায়াময় এক তরঙ্গ—
যার ভঙ্গুর কাঠামোর মধ্য দিয়ে
অনন্ত আঁধার নিজেকে দৃশ্যমান করে নেয়।
আলো এলে জেগে উঠি, আলো সরে গেলে মুছে যাই।
যেন আমি জন্মাইনি;
অন্ধকারই ক্ষণিকের জন্য আমার নামে জ্বলে উঠেছিল।
পতনের আলো
কখনো কখনো সমস্ত আকাশজুড়ে মেঘ করে
এক প্রাচীন বিষাদ এসে থেমেছে চৌকাঠে,
ঘরের কোণে জমে ওঠে দীর্ঘ ছায়া।
বুকজুড়ে একলা দাঁড়িয়ে থাকি আমি,
যেন শতাব্দীর কোনো নিঃসঙ্গ প্রান্তর!
কালের কোনো এক বাঁকে বটফল খসে পড়ে,
যেন সময় তার জপমালা সঁপছে পৃথিবীর কোলে ---
এ আলতো এক পতন কেবল—
তারপর বহুকাল ধরে
মাটির গভীরে অদৃশ্য শিকড়ের মতো
স্বপ্নেরা হাত ছুঁয়ে থাকে।
বিস্মৃতির ভিতর কেঁপে ওঠে মৃত আলো।
ধীরে ধীরে বুঝি---
বিষাদও এক বীজ;অন্ধকার তার মাটি,নীরবতা তার জল, অপেক্ষা একমাত্র ঋতু।
জলের অন্তরালে
তোমাকে ঘিরে একটি রূপালি নদী অহরহ জেগে থাকে
তার স্রোতে সহস্র বছরের ঘুম---
জলের অন্তরায় সহসা জল কেঁপে ওঠে...
আমার যাবতীয় সংশয়,বেঁচে থাকার দুর্বহ ঋণ,
সহস্র লালসা আর গলিত তৃষ্ণার শবাধার ডিঙিয়ে
ঢেউগুলি চূড়ান্ত বিলয় ও ধ্বংসের আগে
একবার আলো হয়ে জ্বলে!
ক্ষণিকের আলোয় আমার অপূর্ণ প্রেম,জীবনের পুঞ্জীভূত ক্ষয়,অব্যক্ত আর্তি চঞ্চলতা হারিয়ে,
নীরব পাথরের বেশে অনাদি হয়ে ওঠে!
0 Comments