দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ৪ঠা সেপ্টেম্বর, বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস। আমাদের এই বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা খুব কম হয়, আসুন এই সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
সুস্থতা, মর্যাদা সচেতনতার কথা। মানুষের সুস্থ জীবন কেবল শারীরিক রোগমুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানসিক শান্তি, নিরাপদ সম্পর্ক, নিজের শরীর সম্পর্কে সঠিক ধারণা এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাও সুস্থ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বৃহত্তর ভাবনাকে সামনে রেখে প্রতি বছর ৪ঠা সেপ্টেম্বর পালিত হয়, বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস। ২০১০ সালে World Association for Sexual Health (WAS) এর উদ্যোগে দিবসটির সূচনা হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত ভয়, লজ্জা ও ভুল ধারণার পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও সচেতনতার পরিবেশ তৈরি করা।
🍂
‘যৌন স্বাস্থ্য’ কথাটি শুনলে অনেকের ধারণা হয়, এটি কেবল যৌনরোগ বা প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাস্তবে ধারণাটি অনেক বিস্তৃত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যৌন স্বাস্থ্য হলো যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক, মানসিক, আবেগীয় ও সামাজিক সুস্থতার একটি অবস্থা। অর্থাৎ শুধু রোগ বা শারীরিক সমস্যার অনুপস্থিতিই যথেষ্ট নয়, নিরাপত্তা, সম্মান, পারস্পরিক সম্মতি এবং বৈষম্য ও সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই যৌন স্বাস্থ্যকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে স্বাস্থ্য ও মানবিক মর্যাদার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। সঠিক তথ্য মানুষকে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে এবং ভুল ধারণা ও কুসংস্কার কমায়।
আমাদের সমাজে যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা এখনও অনেক সময় অস্বস্তি, সংকোচ কিংবা সামাজিক ট্যাবুর মধ্যে আটকে থাকে, এর ফলে মানুষ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর ভুল উৎস থেকে খোঁজে এবং ভ্রান্ত তথ্যের শিকার হতে পারে, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য বয়সোপযোগী ও বৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্যশিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। WHO-ও সঠিক তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দেয়।
বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস, তাই মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা লজ্জার বিষয় নয়, বরং নিজের শরীর, স্বাস্থ্য ও অধিকার সম্পর্কে জানা সচেতন নাগরিকত্বেরই অংশ।
যৌন স্বাস্থ্যের সঙ্গে ‘সম্মতি’ বা consent-এর সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা, সীমারেখা ও সিদ্ধান্তকে সম্মান করা সুস্থ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। সম্মতি হতে হবে স্বাধীন ও স্বেচ্ছায় প্রদত্ত, চাপ, ভয় বা জবরদস্তির মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করানো সম্মানজনক সম্পর্কের লক্ষণ নয়।
২০১০ সালে দিবসটির প্রথম স্লোগান ছিল “Let’s talk about it!” অর্থাৎ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার আহ্বান। পরবর্তী বছরগুলোতে সম্মতি, যৌন অধিকার, সম্পর্ক ও যৌনশিক্ষার মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য ও স্বাস্থ্যসেবা মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যৌনবাহিত সংক্রমণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, প্রজননস্বাস্থ্য, নিরাপদ সম্পর্ক এবং সহিংসতা থেকে সুরক্ষা, এসব ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন রয়েছে। WHO-এর মতে, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সেবা মানুষের স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছে পরিষেবা পাওয়াই যথেষ্ট নয়। সহজবোধ্য, বৈজ্ঞানিক এবং বয়সোপযোগী তথ্য পাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সমাজ সবাই এখানে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে।
২০২৬ সালে বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য “Every Body”। এই ভাবনার মূল বক্তব্য হলো,যৌন স্বাস্থ্য, অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা কোনো নির্দিষ্ট ধরনের মানুষের জন্য নয়, প্রত্যেক মানুষের জন্য। মানুষের শরীর, সক্ষমতা বা জীবনপরিস্থিতিতে বৈচিত্র্য থাকলেও প্রত্যেকের স্বাস্থ্য ও মর্যাদার অধিকার সমান।
এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কাউকে তার শরীর বা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে অপমান, বৈষম্য বা হয়রানির শিকার হওয়া উচিত নয়। পারস্পরিক সম্মান ও মানবিক মর্যাদার পরিবেশই সুস্থ সমাজের ভিত্তি। তরুণ প্রজন্মের জন্য সচেতনতার গুরুত্ব
কৈশোরে শরীর ও মনের নানা পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক,কিন্তু প্রশ্নের উত্তর যদি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে না পাওয়া যায়, তাহলে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।,তাই তরুণদের জন্য নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক ও বয়সোপযোগী নস্বাস্থ্যশিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
এক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভয় দেখিয়ে বা লজ্জা দিয়ে নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত তথ্য, ব্যক্তিগত সীমারেখা, নিরাপত্তা, সম্মান ও দায়িত্বের বিষয়গুলো সহজ ভাষায় বোঝানো উচিত। বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবস শুধু একটি বিশেষ দিন পালনের উপলক্ষ নয়, এটি সারা বছর সচেতন থাকার আহ্বান। যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে হবে, নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সীমারেখাকে সম্মান করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রশ্ন বা সমস্যাকে লজ্জার বিষয় না বানিয়ে প্রয়োজনে বিশ্বস্ত অভিভাবক, শিক্ষক বা যোগ্য স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা নেওয়া। বিশ্ব যৌন স্বাস্থ্য দিবসের প্রকৃত বার্তা তাই এক কথায় সঠিক তথ্য, সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সবার অধিকার। একটি সুস্থ সমাজ গড়তে আমাদের শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার পাশাপাশি একে অপরের অধিকার ও সীমারেখার প্রতিও সমান শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
0 Comments