চৌত্রিশ পর্ব
রতনতনু ঘাটী
হেডস্যার নবনীতবাবু আজ একটু বেশি সকাল-সকাল স্কুলে চলে এসেছেন। ওঁকে জরুরি কোনও কথা কখনও মনে করিয়ে দিতে হয় না। তেমনই আজ সকালে ছোট জগৎপুরের অভিরূপ দলুইয়ের মরদেহ জেলা হাসপাতাল থেকে গগনজ্যোতি স্কুলে নিয়ে আসা হবে, একথা তাঁর মনে আছে। মাধবগঞ্জের অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্ত হেডস্যারের সঙ্গে সেরকমই কথা বলে রেখেছেন গত কাল থেকে। হেডস্যার নিজে সাইকেল চালিয়ে গিয়ে শিমুলতলির বাজার থেকে ফুলের মালা এবং কিছু চূর্ণ ফুলও কিনে নিয়ে এসেছেন।
হেডস্যার ঘন্টিদাদুকে বলে রেখেছিলেন গতকালই। ঘন্টিদাদু সম্মতিচরণ দাস অ্যাসেম্বলি হলের ডায়াসের উপর দুটো টেবিল জোড়া দিয়ে বেদি মতন করে ফেলেছেন। তার উপর ফুল ছড়িয়ে দিয়েছেন। পেতে দিয়েছেন একটা সাদা রঙের চাদর। ধূপদানিতে ধূপ দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন। এ ছাড়া আরও গোটা পাঁচেক ফুলের মালা এক পাশে রেখে দেওয়া আছে। মরদেহ স্কুলে এসে পৌঁছলে নিয়ে আসা হবে প্রথমে অ্যাসেম্বলি হলে। দেবোপমস্যার নিজে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছেন। প্রথমে বড়রা কেউ-কেউ অভিরূপ দলুইয়ের মরদেহে মাল্যদান করবেন। সব কিছু রেডি। গগনজ্যোতি স্কুলের সব স্যার এবং ম্যামরাও আজ প্রেয়ারের আগেই স্কুলে পৌঁছে গেছেন। আগেভাগে স্কুলে পৌঁছে গেছেন মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতিও।
কখন কীভাবে অভিরূপ দলুইয়ের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল ছোট জগৎপুর গ্রাম ছাড়িয়ে আরও বেশ কয়েকটা গ্রামে। সে সংবাদ পেয়েই গ্রামবাসীরা অনেকে অভিরূপ দলুইকে শেষ দেখা দেখতে চলে এসেছেন স্কুলে। বিজনডিহি গ্রাম থেকেও অনেকে পৌঁছে গেছেন। ভিড়ের মধ্যে দেখা যাচ্ছে নিধিভূষণ প্রাইমারি স্কুলের হেডস্যার দেবেন্দ্রলাল সামন্তকে। এ ছাড়া দেখা যাচ্ছে তিথিবকুল গ্রামের অমূল্য ধরকে। বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে আছেন কাঁকনকুষি গ্রামের একাদশী পাল। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে লোকনের দিদি পারুলমণি দাসও। লোকনের মুখে খবরটা পেয়েই পারুলমণি অনেকটা আগে গগনজ্যোতি স্কুলে পোঁছে গেছে একা-একাই!
এবার মরদেহ নিয়ে স্কুলে পৌঁছে গেলেন মাধবগঞ্জের অঞ্চলপ্রধান সেঁজুতি সামন্ত। সঙ্গে তাঁর অফিস স্টাফদের অনেকেই
এসেছেন। অভিরূপ দলুইকে আশপাশের গ্রামের অনেক মানুষজন ভালবাসতেন। উনি বড় পরোপকারী মানুষ ছিলেন। কত মানুষের বিপদে যে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন! তাই যিনি শুনেছেন অভিরূপবাবুর সংবাদ, তিনি সব কাজ ফেলে ছুটে এসেছেন।
বেদির উপর শায়িত করা হয়েছে অভিরূপবাবুর মরদেহ। স্কুলের ছেলেমেয়েরা সকলে এসে গিয়েছে। প্রথমে ঘন্টিদাদু ধূপদীপ জ্বালিয়ে দিলেন। তারপর হেডস্যার নবনীতবাবু মরদেহে মাল্যদান করলেন। এর পর মাল্যদান করলেন একে-একে সেঁজুতি সামন্ত, মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি, দেবোপমস্যার। অভিরূপ দলুইয়ের সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বক্তব্য রাখলেন হেডস্যার। ছাত্রছাত্রীরা পাশে রাখা কুচো ফুলের রাশি থেকে মরদেহের উপর ফুল ছড়িয়ে দিতে লাগল অঞ্জলি ভরে। ততক্ষণে এসে পৌঁছে গেছেন কনট্রাক্টর মনোজ চাকলাদারও।
এর পর নবনীতস্যার বাংলার গীতিকাম্যামকে কিছু একটা ইঙ্গিত করলেন। একটি ফুলের মালা পাশে রাখা ছিল। সেই মালাটি মরদেহে সমর্পণ করলেন গীতিকাম্যাম। তারপর তিনি দু’ হাত জড়ো করে গান গেয়ে উঠলেন—‘এ কি মায়া, লুকাও কায়া জীর্ণ শীতের সাজে/আমার সয় না, সয় না, সয় না প্রাণে, কিছুতে সয় না যে/কৃপণ হয়ে হে মহারাজ, রইবে কি আজ/আপন ভুবন-মাঝে।’ কোথাও পিন-পতনের শব্দ হল না। গান শেষ হল। কখন এসে দাঁড়িয়েছিলেন অভিরূপ দলুইয়ের পরিবারের লোকজনও। তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হল মরদেহ। তাঁর বাড়ি হয়ে অভিরূপ দলুইয়ের মরদেহ যাত্রা করবে শ্মশানের দিকে শেষকৃত্যের জন্য।
অ্যাসেম্বলি হলে স্কুল শুরুর প্রেয়ার হল। প্রেয়ারের পর দেবোপমস্যার ঘোষণা করে দিলেন, আজ আর অনীকবাবুদের উঠোনে ক্রিকেট কেচিং হবে না। তারপর ক্লাসের ঘন্টা বাজিয়ে দিলেন ঘন্টিদাদু।
হেডস্যার লোকলনকে ডেকে বললেন, ‘লোকন, যাও, দিদিকে নিধিভূষণ প্রাইমারি স্কুলে পৌঁছে দিয়ে তারপর স্কুলের ক্লাস অ্যাটেন্ড করো!’
ডেহস্যারের কথা শুনে পারুলমণি বলে উঠল, ‘আমি একলাই এখন আমার কাজের জায়গায় মানে নিধিভূষণ স্কুলে পৌঁছে যেতে পারব স্যার! আমি রোজই তো একাই যাই। লোকন ক্লাস করুক!’
লোকন দিদিকে কিছু বলতে যাচ্ছিল। পারুলমণি গলায় জোর এনে বলল, ‘তুই থাম তো লোকন! তোকে কিছু বলতে হবে না। তুই ক্লাসে যা!’
পারুলমণি কিছুটা জোর করেই এগিয়ে গেল মাঠের দিকে। মাঠের বাঁ দিকে শেড তৈরির কাজ চলছে জোর কদমে। সেসব পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলল পারুলমণি। কেমন করে যে পারুমণি সেসব আন্দাজ করে নিধিভূষণ স্কুলের রাস্তা ধরল, সেদিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকলেন হেডস্যার, মুকুলবাবু, অমূল্য ধর, একাদশী পাল এবং আরও কতজন।
ধীর গলায় মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘জানেন নবনীতস্যার, এক সময় ক্রিকেটের নেশা তখনও ধরেনি আমাকে। বই পড়ার নেশায় তখন পাগল ছিলাম। আমার ভবানীপুরের মেসবাড়ি থেকে সোজা চলে যেতাম চিড়িয়াখানার পাশে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। বই ইসু করে আনতাম। একবার একটা বইয়ে পড়েছিলাম মিশরের একজন দৃষ্টিহীন পণ্ডিতের কথা। তিনি বিশ্বাস করতেন, যখন চোখের দৃষ্টি কেড়ে নেন ঈশ্বর, তখন তিনি মানুষের ভিতরের দৃষ্টি খুলে দেন। তিনি বলেছেন, ভিতরের সেই শক্তি দিয়েই মানুষ জীবনের সব বাধা অতিক্রম করতে পারে। নবনীতস্যার, ঈশ্বরের এ এক অপার করুণা!’
হেডস্যার গলায় আবেগ নিয়ে বললেন, ‘আপনি হেলেন কেলারের নাম জানেন তো? এক সময় আমি হেলেন কেলারের লেখা ‘দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ’ বইটি পড়েছিলাম। তিনি চোখে দেখতে পেতেন না, কানে শুনতে পেতেন না, কথাও বলতে পারতেন না। তবু সাহিত্য রচনার পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অসহায় প্রতিবন্ধীদের পাশেও গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এমনকী, কথা বলতে পারতেন না, কানে শুনতেও পেতেন না, এমন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষদের অভিশপ্ত বিড়ম্বনা নিয়ে তৈরি হয়েছিল একটা সিনেমা। সিনেমাটির নাম ‘ডেলিভারেন্স’। সেই সিনেমায় অভিনয়ও করেছেন হেলেন কেলার। হেলেন কেলার স্পর্শের সাহায্যে পৃথিবীকে চিনতে শিখেছিলেন। আলোর ছোঁয়া ও অন্ধকারের স্নিগ্ধতা তিনি বুঝতে পারতেন।’
এতখানি বলে থেমে গেলেন নবনীতস্যার। পরিবেশটা থমথমে হয়ে উঠল। ততক্ষণে পারুলমণি সকলের দৃষ্টির আড়াল হয়ে নিজের নিধিভূষণ প্রাইমারি স্কুলের দিকে এগিয়ে গেছে। এমন সময় একজন এসে একটা চিঠি হেডস্যারের হাতে দিয়ে বলল, ‘ডি এম সাহের এই চিঠিটি পাঠিয়েছেন।’
তাড়াতাড়ি করে হেডস্যার খাম খুলে চিঠিটি বের করে পড়তে লাগলেন। ছোট চিঠি। চিটিটা পকেটে রেকে মুকুলকৃষ্ণবাবুর দিতে মুখ তুলে হেডস্যার বললেন, ‘চলুন মুকুলবাবু, ডেকে পাঠিয়েছেন ডি এম সাহেব তাঁর অফিসে। আপনাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেছেন। মনে হয়জরুরি কোনও খবর আছে।’
‘চলুন! আমি তো তৈরি হয়েই এসেছি। সন্ধের আগে বাড়ি ফিরব না, বলেই এসেছি মন্দাকিনীকে। ও আর চিন্তা করবে না।’
হেডস্যার বললেন, ‘চলুন মুকুলবাবু। আমরা শেডের কাজটা কী রকম এগোচ্ছে একবার দেখে নিয়ে অফিসে আমার ঘরে ফিরে আসি। স্কুলের প্রথম দিকের কাজ সামলে নিই। আপনি ততক্ষণে আমার রুমে বসে চা খান আর আজকের খবরের কাগজটা পড়ুন! তারপর আমরা দু’জনে বেরিয়ে পড়ব।’
স্কুলের মাঠের মাঝখানে গিয়ে দু’জনে দেখলেন কাজের অগ্রগতি। তখনও ওখানে দাঁড়িয়েছিলেন কন্ট্রাক্টর মনোজ চাকলাদার। ওঁদের দু’জনকে দেখে এগিয়ে এলেন মনোজবাবু। হেডস্যার মনোজবাবুকে দেখে ্বার গলায় বলে উঠলেন, ‘মনোজবাবু, আপনি এখনও আমাদের কাজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন? আমি ভেবেছিলাম, আপনি আপনার অন্য কাজের সাইটে চলে গেছেন।’
মনোজবাবু মুচকি হেসে বললেন, ‘নবনীতস্যার, আমার এখন আপনাদের স্কুলের মাঠের এই শেডের কাজটা শেষ না করা পর্যন্ত আমি আক্ষরিক অর্থে নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেছি। দেখছি তো, আপনাদের কেমন তোড়জোড় চলছে ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনাল নিয়ে। বনগোপালপুরে আমার একটা বড় কনস্ট্রাকশান চলছে। বেশ বড় কাজ। ওখান থেকে পাঁচজন ঢালাই মিস্ত্রিকে তুলে আনলাম। এখানে ওরা ঢালাইয়ের আগের কাজের তদারক করে এগিয়ে নিক। কারণ, আপনাদের পিলার তোলার কাজ শেষ করে ফেললেই, ধরে নেব ছাদ-ঢালাইয়ের কাজ। দেখুন না, আমার বেস্ট অ্যাফোর্ট লাগিয়ে কাজটা কেমন চটপট দাঁড় করিয়ে ফেলি।’
এসব শুনে নবনীতস্যার মনে-মনে আনন্দিত হয়ে উঠলেন। গলা নামিয়ে মুকুলকৃষ্ণবাবুকে বললেন, ‘মুকুলবাবু, আমাদের ফান্ডের কিছু টাকা তুলে আজ না হয় মনোজবাবুকে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আমি ততক্ষণে অফিসের কিছু কাজ এগিয়ে নিই? আপনি বরং একবার ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে নিয়ে এসে মনোজবাবুর হাতে দিন।’ তারপর হাসতে-হাসতে নবনীতস্যার বললেন, ‘আমাদের স্কুলের অ্যানেক্স বিল্ডিং তৈরি করার সময় কনট্রাক্টর তমোঘ্নবাবুকে যখন মাঝে-মাঝে পাওনা টাকা না চাইতে তাঁর হাতে তুলে দিতাম, তিনি হাসিমুখে তখন বলে উঠতেন, ‘টাকা দিচ্ছেন দিন! জানেন তো হেডস্যার, কনট্রাকদের পেটের খিদে মিটলেও, টাকার খিদে কখনও মেটে না।’ বলে হা-হা করে হেসে উঠে নবনীতস্যার স্কুলের ওঁর রুমের দিকে হাঁটা দিলেন। মাঠ থেকে মুকুলকৃষ্ণবাবুও সোজা চললেন, কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের দিকে।
তারপর মুকুলবাবু ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে এনে মনোজবাবুর হাতে দিয়ে চললেন হেডস্যারের রুমে। ঢুকেই একটা চেয়ারে বসে ডাক দিলেন, ‘ঘন্টিদাদু, জমিয়ে আমাদের দু’কাপ চা হয়ে যাক!’ ঘন্টিদাদু চা আনতে চলে গেলেন।
তারপর হেডস্যারের ব্যস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মুকুলবাবু বললেন, ‘জানেন তো হেডস্যার, আমি তো গ্রামের মানুষ ছিলাম! সকালে চায়ের নেশাটেসা ছিল না। কলকাতায় চাকরি করতে গিয়ে মেসে গিয়ে উঠলাম। আমাদের মেসের নিয়ম হল, সকালে ভবদা চা দিয়ে যাবেই। প্রথম প্রথম চা ফিরিয়ে দিতাম। বলতাম, ‘ভবদা, আমি তো গ্রামের মানুষ! চা-টার নেশা নেই। নিয়ে যাও!’ এর পর ভবদা একদিন বলল, ‘মুকুলদাদাবাবু, এ মেসে যখন যা পাবেন, কক্ষনো ফিরিয়ে দেবেন না। এটা এই মেসের নিয়ম নয়।’ এর পর চা আর ফিরিয়ে দিতাম না। আমার ধরে গেল চায়ের নেশা! তারপর ক্রিকেটের নেশা যখন আমাকে ধরে ফেলল, তখনকার দিনে স্টেডিয়ামে অত কড়াকড়ি ছিল না। ফ্লাস্কে করে এক ফ্লাস্ক চা নিয়ে খেলা দেখতে ঢুকে পড়তাম। সেই থেকে বারংবার আমাকে চা দিন, আমি নিষেধ করব না।’
হেডস্যার মুকুলবাবুর কথা শুনতে শুনতে হাসতে লাগলেন। তখন মুকুলবাবু বললেন, ‘জানেন তো স্যার, উনিশ শতক থেকেই টেস্ট ক্রিকেটে মধ্যাহ্নভোজের মতো অফিসিয়াল ‘টি-ব্রেক’ বা চা পানের বিরতি চালু রয়েছে। খেলা থামিয়ে মাঠের মাঝে খেলোয়াড়দের চা খাওয়ার এই নিয়ম ক্রিকেট ইতিহাসে বেশ জমজমাট।’
গল্পের লোভে একধারে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল ঘন্টিদাদু। সে কথা বুঝতে পেরে মুকুলবাবু বললেন, ‘ঘন্টিদাদু আমাদের আজ অত সুন্দর চা খাওয়ালেন যখন, তা হলে চা নিয়ে ক্রিকেটারদের একটা গল্প বলি? সচিন তেন্ডুলকরের একটি চমৎকার ও মজার অভ্যাস ছিল ম্যাচের আগে নিজের চা নিজে তৈরি করতেন। তিনি নিজেই হোটেল বা ঘরের কামরায় কেটলিতে জল ফুটিয়ে গ্রিন টি বানান। সচিন বলেন, কেউ এসে ‘স্যার, আপনার চা তৈরি’ বলুক—এটা তাঁর একদম পছন্দ ছিল না। খেলা শুরুর আগে মন শান্ত রাখতে তিনি এই কাজটি নিজেই করতে ভালবাসতেন।’
ঘাড় নাড়িয়ে বেশ মজা ফুটিয়ে হাসল ঘন্টিদাদু। মুকুলবাবু বললেন, ‘অবসর নেওয়ার পর রসক বিস্কুট ডুবিয়ে রাস্তার ধারের সাধারণ চায়ের দোকানে চা খাওয়ার মজার ভিডিও সচিন শেয়ার করেছেন, আমি দেখেছি!’
নবনীতস্যার অফিসের কাজ গুছিয়ে মুখ তুলে তাকালেন মুকুলস্যারের দিকে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক্রিকেট খেলায় চা-পানের বিরতি শুরুর গল্পটা বলুন না!’
‘চা-পানের বিরতি শুরুর গল্প? বলছি শুনুন! যদিও ক্রিকেট খেলার আবিষ্কারক ইংল্যান্ড। তা হলেও ক্রিকেটে লাল বলের খেলার মাঝে যে চা-পানের বিরতি দেওয়া হয়, সেটি কিন্তু মোটেও ইংলিশদের মাথা থেকে আসেনি স্যার।’
‘তবে এটি কার মাথা থেকে এসেছিল? নিশ্চয়ই ইংলিশম্যান কারও মাথা থেকেই এসেছিল, আমার মনে হয়।’
‘না স্যার! এটি প্রথম শুরু করেন অস্ট্রেলিয়ানরা। আরও ঠিকঠাক করে বললে বলতে হয়, এর প্রবক্তা ছিলেন জো ডার্লিং। জো ডার্লিং ছিলেন একজন বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার এবং তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান টেস্ট দলের অধিনায়ক। তিনি আঠারশো চুরানব্বই থেকে উনিশশো পাঁচ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে চৌত্রিশটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি একুশটি টেস্টে দলের নেতৃত্বও দিয়েছেন। তিনি ছিলেন টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করা প্রথম বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান।’ একটু থামলেন মুকুলবাবু। যেন খানিক দম নিলেন। তারপর বললেন, ‘আর একটা কথা বলি স্যার, তিনিই প্রথম ব্যাটসম্যান যিনি টেস্ট সিরিজে তিনটি সেঞ্চুরি এবং মোট পাঁচশো রান করেছিলেন। আঠারোশো নিরানব্বই সালে ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে তিনিই প্রথম খেলা চলাকালীন চা-পানের বিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন।’
‘আপনার মধ্যে কত যে ক্রিকেটের অজানা গল্পের ভাণ্ডার জমে আছে, শুনতে থাকলে শেষই হবে না!’
তক্ষুনি হেডস্যার দেবপমস্যারকে ডেকে বললেন, ‘দেবোপম, আমাদের দু’জনকে কেন যেন ডি এম সাহেব ডেকেছেন ওঁর অফিসে। মনে হয় ক্রিকেট নিয়ে কোনও নতুন খবর শোনাবেন! আমরা এখন বেরোচ্ছি?’
দুই ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ চললেন, দুটো সাইকেল নিয়ে। স্কুলের মাঠটা পেরোতে গিয়ে শেডের কাজের দিকে তাকিয়ে নবনীতস্যার মাটিতে পা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দেখাদেখি মুকুলস্যারও দাঁড়িয়ে পড়লেন। নবনীতস্যার পরম পরিতৃপ্তিমাখা গলায় বলে উঠলেন, ‘মুকুলবাবু, স্কুলের মাঠের উপর শেডের কাজটা বেশ ভালই হচ্ছে বলুন? দেখে মনটা ভরে উঠছে!’
তখনই কর্পূর গাছের ডালে কোথাও লুকিয়ে বসে থাকা কোকিলটা ভারী মিষ্টি গলায় ‘কু-উ কু-উ’ করে ডেকে উঠল। দু’জনেই মোহিত হয়ে কর্পূর গাছটার দিকে তাকিয়ে কোকিলটাকে খুঁজতে লাগলেন।
(এর পর ৩৫ পর্ব)
0 Comments