আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী
THE VOICE
-SHEL SIlVERSTEIN.
There is a voice inside of you
That whispers all day long,
"I feel that this is right for me,
I know that this is wrong"
No teacher,preacher, parent, friend
Or wise man can decide
What's right for you- just listen to
The voice that speaks inside.
তোমার ভিতরে সদাজাগ্রত,অস্ফুট ধ্বনিখানি
সারা দিনমান গুঞ্জরে যাহা আপনার মনে মনে
"যা ভেবেছি তাই আমার পক্ষে যথার্থ তাই মানি
সত্য-মিথ্যা,ঠিক বা ভুলের ভাবনার অনুপানে.…."
গুরু-শিক্ষক-বন্ধু-স্বজন,জ্ঞানী মানুষেরা জ্ঞানে
হয়তো দেবেন তথ্যনিষ্ঠ,শ্রুতি-নিবিষ্ঠ দিশা
তবু নির্ভার কান পেতে রেখো প্রাণে
শুনিও কেবলই আপন প্রাণের কথা।
জন্মমুহূর্তে থেকেই মানুষের জীবনে এমন কিছু কিছু ঋণ থাকে, যা কোনোদিন শোধ করা যায় না—আকাশের ঔদার্যের ঋণ, বাতাসের জীবনদায়ী ঋণ,সবুজ বনের সরসতার ঋণ,মায়ের আঁচলের ঋণ, পিতার আশ্রয়ের ঋণ, এবং সর্বোপরি গুরুর জ্বেলে দেওয়া আলোর ঋণ…।
সৃষ্টির সময় থেকেই প্রকৃতি ও পরিবার আমাদের চারপাশের পরিবেশটিকে চিনতে শেখায়; আর শিক্ষক সেই চেনা পৃথিবীর সীমা পেরিয়ে আদিগন্ত আকাশের নিঃসীম চিনতে শেখান। শুধুমাত্র কয়েকটি অক্ষর বা জ্ঞান বিতরণ করেন না, চিনিয়ে দেন জীবন; খুলে দেন বিবেক, মনন ও মানবিকতার উদার অলিন্দ। অন্ধকারের ভিতর একটি ছোট্ট প্রদীপ যেমন দূর পথের দিশা দেখায়, তেমনি একজন প্রকৃত শিক্ষক নীরবে তাঁর ছাত্রের অন্তরে জ্বালিয়ে দেন এক অনিবার্য আলোকবর্তিকা, যার দীপ্তি তার সারাজীবনের পাথেয় হয়ে থাকে।
তাই শিক্ষককে স্মরণ ও বরণ করার জন্য কোনো একটি বিশেষ দিন হয়তো যথেষ্ট নয়। কারণ শৈশবের প্রথম পাঠ থেকে জীবনের প্রতিটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুহূর্তে, সাফল্যের উল্লাসে কিংবা ব্যর্থতার নিঃসঙ্গ প্রহরে—কোথাও না কোথাও কোনো শিক্ষকের উচ্চারিত একটি বাক্য, একটি উপদেশ, একটি স্নেহময় দৃষ্টি আমাদের অন্তরে পথ দেখিয়ে যায়। সময়ের স্রোতে শিক্ষক হয়তো দূরে সরে যান, শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ-চক-ব্ল্যাকবোর্ড হারিয়ে যায়, কিন্তু তাঁর শেখানো মূল্যবোধ থেকে যায় আমাদের চিন্তায়, কর্মে ও চরিত্রে।
🍂
ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটি হলো পাঁচই সেপ্টেম্বর। স্বাধীন ভারতবর্ষের জাতীয় শিক্ষক দিবস। যদিও “আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস” হিসেবে ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। ১৯৬৬ সালে UNESCO ও ILO শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গ্রহণ করে; তারই স্মরণে ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে।
তবে,ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ও জনপ্রিয় শিক্ষাবিদ ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিনটিকেই আমরা জাতীয় শিক্ষকদিবস হিসেবে প্রতিটি বিদ্যা প্রতিষ্ঠানে পালন করে থাকি।শোনা যায় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর ইচ্ছা ক্রমেই এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এবং দিনটি পালনের উদ্দেশ্য ছিল,ছাত্র তথা একটি মানুষের বোধি জীবনের ঋণ শোধ।মনে মনে উচ্চারণ,
“গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর।।
গুরু রেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ ।।”
আরও এগিয়ে গিয়ে দেখলে দেখি,
প্রকৃতপক্ষে,পিতা মাতার স্নিগ্ধ যত্নের অন্তরে আমাদের মনোগঠনে যাঁদের অবদান সর্বাধিক, চেতনে বা অবচেতনে আমরা যাঁদের আদর্শ ভেবেই বড়ো হয়ে উঠি, পঞ্চপিতা বা পঞ্চমাতার শ্রেষ্ঠ আশ্রয় সেই গুরুপদে প্রণাম জানাবার জন্য কোন তিথি বা আয়োজনের হয়তো প্রয়োজন হয় না। প্রতিটি দিনই গুরুদিন, প্রতিটি দিনই শুভদিন। তবু আয়োজন, তবু উদযাপন;ফুল-চন্দনের সুরভিত শ্রদ্ধায় শিক্ষক বরণ।
সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই বিশ্বের অপরাপর সভ্য দেশগুলির মতোই বিদ্যা ভারতবর্ষের শ্রেয়তম সম্পদ,বিদ্যাদাতা গুরু পরম পূজনীয়। বর্ণাশ্রমের প্রথম পর্যায়েই মানবশিশু গুরুগৃহ তপোবনে,প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্যে সমিধ সংগ্রহ সহ সামবেদ গানে কর্মমুখী যে জীবনবীক্ষণ শিক্ষা গ্রহণ করতো, তা তার আজীবনের অর্জন হয়ে থাকতো। ক্রমে দিন গড়িয়েছে,যুগ,কাল। অ্যারিস্টটল, প্লুটো, যাজ্ঞবল্ক্য,ঋষি গৌতম, দ্রোণাচার্যের পথ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে যা কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছে।
পথভ্রষ্ট হতে পারিনি।তাই আমাদের জীবন কর্মপথ আজও আলোকময় হয়ে থাকে তাঁদের উপস্থিতিতে।
যদিও এ পথে কাঁটা প্রচুর।চরম দারিদ্র, উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বঞ্চনার কারণে আমরা প্রায়শই সমস্যায় পড়ি, মানবিক গুণগুলির বিকাশ সাধন সম্ভবপর হয়না।তবু অবাক হয়ে দেখি,ভাঙা ঘরে,এক হাঁটু জল পেরিয়েও শিক্ষক শুধুমাত্র চক-ব্ল্যাকবোর্ডে স্বপ্ন সাজাচ্ছেন, আমাদের ওড়ার আকাশ দিচ্ছেন।
তবে,জ্ঞান তো আলো, আর আলো চিরকাল আনন্দের অভিসারী।এই আলোর পথযাত্রায় আমাদের যা কিছু সঞ্চয়, 'সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে'-এই প্রেরণায়, সর্বস্বত্ব দানের পূণ্যে তা অমৃত পাথেয় হয়ে ওঠে।এই দুর্মূল্য পূণ্য পথে শিক্ষক আমাদের দিশারী।
সুতরাং আজকের পূণ্য দিনে, আমরা নবভারতের ভাবী একলব্যের দল কায়মনোবাক্যে আমাদের আশৈশব সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে চাই,মান রাখতে চাই তাঁদের।
দেশ ও কালের বিভাজন পথ মুছিয়ে
যে পাদপদ্মে নিত্য প্ৰণমে শিষ্য,
শ্রদ্ধা স্নেহের অলক্ষ্য পথ পেরিয়ে,
পূজা করে শেখে জীবনযাপন বীক্ষ্য।
পুরাকাল হতে এমনই সৃষ্টি যজ্ঞ,
তপোবনতলে সামবেদগানে এনে দিয়েছিল মোক্ষ।
সেই ধারা আজও ক্রমবহমান আদরে শাসনে সোহাগে,
তক্ষশীলায় নালন্দা-পীঠে সাধনার সম আভোগে।
যে আবেগে ভাসে একলব্যের ঋণ,
দুর্গমপথে হিউয়েন সাঙ শুনেছিলো সেই বীণ; অ্যরিস্টটল টলষ্টয়ের ঋষিদুর্লভ জ্ঞানে,
ঋদ্ধ হয়েছে মানবহৃদয় রাধাকৃষ্ণান দানে।
ওগো দেবোপম,মর্ত্যমায়ায় স্বর্গের সুখ এনেছ,
স্নেহ প্রীতি প্রেম সাদরে বিলিয়ে মানবরত্ন গড়েছ।
0 Comments