জ্বলদর্চি

আমার শিক্ষক /স্বাগতা পাণ্ডে

আমার শিক্ষক 

স্বাগতা পাণ্ডে

"আমার শিক্ষক", এই শব্দবন্ধটি  অনেকগুলো ছবি একসাথে সামনে এনে দাঁড় করালো। সেই ছোট্টবেলার অ আ লিখতে শেখার সময়কার দিদিমণি, কিম্বা  প্রাইমারী স্কুলের, হাইস্কুলের, কলেজের, ইউনিভার্সিটির এমনকি বাড়ির প্রাইভেট টিউটর , এককথায় এখনো পর্যন্ত চলতে থাকা বিদ্যা চর্চার সমস্ত প্রণম্য শিক্ষক শিক্ষিকা, সবাই এসে সার করে দাঁড়ালেন স্মৃতির হাত ধরে। এঁরা সবাই আমার ভালোবাসার অথবা আতঙ্কের স্মৃতি হয়ে মনের স্মৃতি আর বিস্মৃতির পাতায় থেকে গেছেন। ছোটবেলার সেই লজেন্স দেওয়া দিদিমণি অথবা পিঠে পাখার ডাঁটি ভেঙে ফেলা মাস্টারমশাই  সবাই আমার শিক্ষাগুরু। আজ আমি নিজে একজন  শিক্ষিকা হয়ে প্রতিনিয়ত অনুভব করছি, একজন স্টুডেন্ট এর জীবনে, মনে থেকে যাওয়ার মতো শিক্ষক বা  শিক্ষিকা হয়ে সারাজীবন  থাকতে  পারাটা সত্যিই কতটা কঠিন আর কতটা সৌভাগ্যের ও। 
🍂

বাবা ও মা প্রায় সবার কাছেই প্রথম আর অন্যতম শিক্ষক। তবে খুব কম জনের কাছেই তাঁরা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক এর আসন পেয়ে থাকেন। জীবনের সত্যিকারের পাঠ পড়ানোর আর শেখানোর মতো শিক্ষকের দেখা পাওয়াটা সত্যিই খুব দুর্লভ আর সৌভাগ্যের। যে শিক্ষক বদলে দেবে জীবন কে, শিখিয়ে দেবে জীবন এর আসল মানে, যার উপস্থিতি খুঁজে এনে দেবে বেঁচে থাকার আসল মিসিং লিঙ্ক গুলো। হতে পারে, হয়তো সেই শিক্ষক সবার কাছে সমান আদর্শ হয়ে থাকতে পারেননি , হতে পারে কারো গল্পে তিনি হিরো, আবার অন্য কারো গল্পে তিনি ই হয়ে আছেন জিরো অথবা ভিলেন। এমনটা হতেই পারে। আমার অভিজ্ঞতায় যিনি পিঠে পাখার ডাঁটি ভেঙে ফেলা কঠিন প্রাণ, তিনি ই হয়তো বা অন্য কোনো স্টুডেন্ট এর জীবনের পরশপাথর। শিক্ষকের প্রেমে পড়ে জীবন কে মধুর অথবা কদর্য দুইই করতে দেখেছি বাস্তবে। আবার ভুল মানুষের দেওয়া  ভুল শিক্ষা জীবন কে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে , এটাও দেখেছি। 
তবে শিক্ষকের ঈশ্বর হয়ে ওঠার গল্পের , উদাহরণটা  দেখেছি নিজের জীবনে। প্রায় নিভে আসা , ফুরিয়ে আসা, ধ্বংস হয়ে যেতে থাকা একটা জীবন কে, দক্ষ হাতে দাঁড় বাইয়ে ঘাটে এনে ভিড়িয়ে দিতে পারার মতো মহান এক শিক্ষকের দেখা পেয়েছি আমার জীবনে। বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায় ভরা আমার এই জীবনে  মহান সেই শিক্ষক আজকের এই  আমিকে গড়ে দিয়ে গেছেন। মাতৃ ঋণ, পিতৃ ঋণের মতোই সেই শিক্ষকের ঋণ শোধ করার ধৃষ্টতা এবং ক্ষমতা কোনটাই আমার নেই। তাই প্রতিটি দিন শুধু চেষ্টা করে যাচ্ছি সেই আদর্শের বীজটাকে, এই সজীব , নিষ্কলঙ্ক, আশায় আর সম্ভাবনায় ভরা ছোট্ট ছোট্ট মানুষ গুলোর মধ্যে জীবিত রাখার। 
আমার জীবনের সেই মহান প্রণম্য শিক্ষক কে,  মহান বা আদর্শ মানুষ হিসেবে নয়, একজন  আদর্শ শিক্ষক হিসেবে প্রায় ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে পূজা করি আমি প্রতিদিন। শুধু গুরু পূর্ণিমা অথবা শিক্ষক দিবসে নয়, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এই পূজা উদযাপন করি প্রতিদিন  ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতায় মুড়ে।
জীবনের প্রত্যুষ লগ্নে, আমার জীবন যখন বিভিন্ন পারিবারিক কারণে ঘনঘোর তমসাচ্ছন্ন, আগামীকাল বেঁচে থাকার মতো মনের জোর টুকুও যখন প্রায় শেষ হতে বসেছে, সেই সন্ধিক্ষণে প্রায় দেবদূতের মতো আমার ভেঙে পড়া নৌকার হাল ধরলেন আমার সেই পরম পূজ্য পিতৃপ্রতিম মাস্টার মশাই। মাধ্যমিক দেবার পর পারিবারিক কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলো। চার বছর পার হবার পর হঠাৎ করেই অন্য কোন সূত্র ধরে মাস্টারমশাই এর দেখা পেলাম। শুরু হলো রেফারির নির্দেশনায় আমার সাধনা কাল। সেই প্রথম কেউ আমাকে শোনালো জীবন যাপনের অন্য রকম কথা, অন্য রকমের জীবনের কথা। যে জীবনে  থাকবে অমোঘ স্ব-অধীনতা , সেই স্বাধীনতা হাত ধরে থাকবে মুক্তির আর জ্ঞানের । ছাপার অক্ষরের পাশাপাশি থাকবে আনন্দের মুক্ত আকাশ। স্বাধীন ইচ্ছা গুলোকে ডানা কিনে দেবার   ধৈর্য আর অধ্যবসায়। সাংসারিক জীবনের বাইরের মুক্ত পৃথিবীর মধ্যে থাকা জ্ঞান সাগরের মুক্তির আশ্বাস। 
উচ্চ মাধ্যমিকের প্রতিটি সাবজেক্ট পড়লাম মাস্টারমশাই এর কাছেই। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করলাম, তিনি নিজেই আমাকে ভর্তি করে দিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর আন্ডারে প্রাইভেট এ গ্র্যাজুয়েশন করার জন্য। আবার সমস্ত সাবজেক্ট পড়ালেন তিনি নিজেই। মাস্টারমশাই ছিলেন সায়েন্স এর মানুষ। তাই আর্টসের কিছু বিষয় পড়ানোর আগে দেখতাম, তিনি কয়েক দিন মাত্র সময় নিয়ে আগে নিজে আয়ত্ত করে তারপর আমাদের পড়াতেন। অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হতাম তাঁর যে কোনো বিষয়কেই সহজ করে পড়ানোর দক্ষতায়। আমার পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ই জুটিয়ে দিলেন বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য প্রাইভেট স্কুলে র চাকরি আর টিউশনি। হাতের কাজ আমি ভালোবাসতাম, তাই সেই সঙ্গে আমাকে জোর করে ভর্তি করালেন লেডি ব্রাবোন কলেজে। মাস্টারমশাই এর তত্ত্বাবধানে সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগলো কম্পিউটার আর স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম। প্রায় ডুবতে থাকা একটা মানুষের সামনে তখন বাঁচার এক চিলতে আশা। অত্যধিক পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত হলেও মন কে শক্ত করে বেঁধে রাখতে পেরে ছিলাম শুধুমাত্র মাস্টারমশাই এর টকিং থেরাপির জোরে। কেন যে এতগুলো কাজ একসাথে করছি কোনদিন মাস্টারমশাই কে সে প্রশ্ন করিনি, কারণ আমার প্রশ্নের উত্তর তিনি আগেই দিয়ে রেখে ছিলেন। কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় ই আমাকে আর আমার বাবাকে একটাই কথা  বলেছিলেন মাস্টারমশাই, আজ থেকে পাঁচ বছর পর সব কেন র উত্তর পেয়ে যাবে। এম এ শেষ করার সময় লেডি ব্রাবোন এর চার বছরের ডিপ্লোমা, ইংরেজি তে কথা বলতে পারার জড়তাহীন অভ্যাস, কম্পিউটার এ ও লেভেল শেষ। এমনকি আমার কবিতার প্রতি ভালোবাসা লক্ষ্য করে তিনিই আমাকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন কবিতা শেখার ক্লাসে। আর এটাই  কাজে লেগেছিল এস এস সি র ইন্টারভিউ এ। অবশেষে বসলাম স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার। এস এস সি র প্রস্তুতি দিলেন মাস্টারমশাই নিজেই, এমনকি ইন্টারভিউ এর প্রস্তুতি ও। দুর্বল ছিলাম অঙ্কে। আবার নতুন করে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পঞ্চম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সমস্ত অঙ্ক শেখালেন এমন দক্ষতায়, যে ভেঙে গেল আমার অঙ্কের চিরকালীন  ভীতি। এস এস সি তে যখন প্রথম সারিতে জায়গা করে নিয়ে কাছাকাছি স্কুলে জয়েন করলাম, সেদিন আমার সাথে সাথে তিনি কেঁদেছিলেন  আনন্দে। সেদিন অনুভব করেছিলাম আমার জীবনে মাস্টারমশাই ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বর। যাঁর আশির্বাদ , সাহায্য, মনের জোর বাড়ানো প্রতিটি বাক্য, সঠিক পথ নির্দেশ, অগাধ পরিশ্রম করার অভ্যাস গড়ে দেওয়া, পরামর্শ, এই সব কিছু ছাড়া সেদিনের আমি আজকের এই সাফল্য, আত্মবিশ্বাস কোথায় পেতাম ?
 মাস্টারমশাই এর ছত্রছায়ায় একাডেমিক বিদ্যা ছাড়াও প্রথম জেনেছি বাইরের জগৎ কে। শিখেছি গ্রাফোলজি, শিখেছি নিউমারোলজি। আরো শিখেছি সব সময় নিজেকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবার, জ্ঞান এর আলো থেকে সরে না আসার,  জীবনের কোন পরিস্থিতিতেই হার না মানার, অদম্য জেদ ধরে রাখার শিক্ষা। 
আমার জীবনের আলোকবর্তিকা যে শিক্ষক নিজে হাতে বয়ে নিয়ে এসেছিলেন, তিনি মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন কখনো বিচার করিনি। অসম্ভব বুদ্ধিমান, বিদ্যাবান, স্মৃতিধর মানুষ টি আমার জীবনে ঈশ্বর স্বরূপ কান্ডারী হয়ে এসেছিলেন। এমন কান্ডারী কত জন মানুষ তাদের জীবনে পেয়েছেন জানিনা। যারা পান তারা সত্যিকারের সৌভাগ্যবান। জীবনের ধারা বদলে দেবার, জীবনের দিক পরিবর্তন করে দেবার ক্ষমতা সবার থাকে না, যাদের থাকে, তাঁরা যদি একজন মানুষের ও জীবন বদলে দিতে পারেন, তবে তাঁরা ঈশ্বর স্বরূপ মহান শিক্ষক। ভাবলেই মাথা নত হয়ে আসে আপনা থেকেই। আমার জীবনের সেই পরশপাথর সম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন তরুণ বাবু। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে আমি নতমস্তকে স্মরণ করি সেই মহান শিক্ষককে।

Post a Comment

0 Comments