দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
শ্রদ্ধার আনুষ্ঠানিকতার বাইরে যে মানুষটি ভবিষ্যৎ গড়েন তিনি হলেন আমাদের শিক্ষক।
প্রতি বছর ৫ই সেপ্টেম্বর ভারতে পালিত হয়, শিক্ষক দিবস। দিনটি এলেই বিদ্যালয়-কলেজে নানা অনুষ্ঠান, শুভেচ্ছা, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি এবং শিক্ষকদের সম্মান জানানোর আয়োজন হয়, কিন্তু শিক্ষক দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদ্যাপনের দিন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের শিক্ষা-ভাবনা, দর্শন এবং একজন অসাধারণ শিক্ষকের জীবনদর্শন, আরও মজার বিষয়, শিক্ষক দিবসের সঙ্গে যুক্ত কিছু তথ্য সাধারণ আলোচনায় খুব বেশি উঠে আসে না।
ভারতে ৫ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস পালনের কারণ হলো,এই দিনটি ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন। ১৮৮৮ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির তিরুট্টানিতে তাঁর জন্ম। তিনি শুধু রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, ছিলেন একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক ও দার্শনিক। তাঁর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে দর্শনশাস্ত্রের গভীর সম্পর্ক ছিল এবং ভারতীয় দর্শনকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করাতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
🍂
শিক্ষক দিবসের ইতিহাসের একটি অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত ঘটনা হলো,রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিনকে তাঁর নিজের জন্মদিন হিসেবে উদ্যাপন করার প্রস্তাব এলে তিনি নাকি ব্যক্তিগত জন্মদিন পালনের পরিবর্তে দিনটিকে শিক্ষকদের সম্মান জানানোর জন্য উৎসর্গ করার কথা বলেছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই ৫ই সেপ্টেম্বর ভারতে শিক্ষক দিবস হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পায়, অর্থাৎ দিনটির কেন্দ্রে ব্যক্তি রাধাকৃষ্ণন থাকলেও এর আসল উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষকসমাজকে সম্মান জানানো, আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, বিশ্বজুড়ে শিক্ষক দিবস একই দিনে পালিত হয় না। ভারতে ৫ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস পালিত হলেও আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস পালিত হয় ৫ই অক্টোবর। ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ই অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা এবং সমাজে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়, ফলে ভারতীয় শিক্ষক দিবসের ঐতিহাসিক ভিত্তি যেমন একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাবিদকে কেন্দ্র করে, আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসের পরিসর তেমনই অনেক বেশি বৈশ্বিক।
শিক্ষক শব্দটির অর্থও কেবল পাঠ্যবই পড়ানোয় সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষক কখনও জ্ঞান দেন, কখনও প্রশ্ন করতে শেখান, আবার কখনও ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সাহস জোগান। একটি ভালো শিক্ষক শিক্ষার্থীর মনে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেন না, তিনি তৈরি করেন যুক্তিবোধ, মূল্যবোধ এবং নিজের মতো করে ভাবার ক্ষমতা। আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে শিক্ষকের ভূমিকা আরও পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় কোনো তথ্য জানার জন্য শিক্ষক বা বই ছিল প্রধান ভরসা। এখন কয়েক সেকেন্ডে অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়, ফলে আধুনিক শিক্ষকের কাজ শুধু তথ্য সরবরাহ করা নয়, কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কোনটি ভুল, কীভাবে যুক্তি দিয়ে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে হয়, সেটিও শেখানো। এই কারণে ডিজিটাল যুগে শিক্ষকের গুরুত্ব কমেনি, বরং তাঁর ভূমিকা আরও গভীর হয়েছে। শিক্ষক দিবসের আরেকটি অজানা দিক নিয়ে ভাবা যায়, একজন শিক্ষকের প্রভাব অনেক সময় তাঁর শ্রেণিকক্ষের সীমানা ছাড়িয়ে বহু প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করেন, সেই শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, প্রশাসক কিংবা শিক্ষক হয়ে আরও বহু মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারেন, অর্থাৎ একজন শিক্ষকের কাজের ফলাফল কখনও কখনও কয়েক দশক পরেও দৃশ্যমান হয়।
তবে শিক্ষক দিবসে শুধু শিক্ষকদের প্রশংসা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন শিক্ষকের প্রকৃত সম্মান তখনই সম্ভব, যখন সমাজ তাঁর পেশাকে যথাযথ মর্যাদা দেয়, শিক্ষার পরিবেশকে উন্নত করে এবং শিক্ষার্থীদের শেখার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের শিক্ষাদানের পদ্ধতি বদলাতে হয়।
আজকের দিনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কও নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। ভয় দেখিয়ে শিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং আলোচনার পরিবেশ শিক্ষাকে আরও প্রাণবন্ত করে। একজন শিক্ষার্থী যখন নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, তখনই প্রকৃত শিক্ষার সূচনা হয়।
তাই শিক্ষক দিবস আসলে ফুল, কার্ড কিংবা শুভেচ্ছাবার্তার একটি দিন নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গভীর। একজন ভালো শিক্ষক হয়তো ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখতে পারেন না, কিন্তু তাঁর হাতে তৈরি মানুষগুলোই একদিন ইতিহাস লেখে।
0 Comments