জ্বলদর্চি

শিক্ষক: শুধু পাঠদাতা নন, ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর/সুদীপা চৌধুরী



শিক্ষক: শুধু পাঠদাতা নন, ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর

সুদীপা চৌধুরী 

   শিক্ষক দিবস এলেই চারপাশে শুভেচ্ছার বন্যা নামে। হাতে ফুল, উপহার, সামাজিক মাধ্যমে আবেগঘন কয়েকটি কথা—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি বিশেষ উপলক্ষ। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন শিক্ষককে সত্যিই সম্মান করা কি এত সহজ? বছরের একটি দিনে তাঁকে স্মরণ করলেই কি একজন শিক্ষকের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?

শিক্ষক আসলে শুধু একটি পেশার নাম নয়। একজন শিক্ষক একটি শিশুর জীবনে এমন একজন মানুষ, যিনি তার অজানা পৃথিবীর দরজা খুলে দেন। বাবা-মা সন্তানকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন, কিন্তু শিক্ষক তাকে পৃথিবীকে চিনতে শেখান। কোন প্রশ্ন করতে হয়, কেন প্রশ্ন করতে হয়, নিজের ভুলকে কীভাবে স্বীকার করতে হয়, অন্যের মতকে কীভাবে সম্মান করতে হয়—এই শিক্ষা কোনো বইয়ের পাতায় সম্পূর্ণ লেখা থাকে না। একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর আচরণ, চিন্তা ও মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে এই শিক্ষাটুকু দেন।
🍂

আজকের সময়ে শিক্ষকের ভূমিকা আরও কঠিন হয়েছে। তথ্য পাওয়া এখন অত্যন্ত সহজ। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুহূর্তের মধ্যে আমাদের সামনে অসংখ্য তথ্য এনে দিতে পারে। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞানের মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে, সেটি বোঝানোর মানুষটির প্রয়োজন এখনও আছে। একটি শিশু কী জানবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—সে যা জানছে, তা নিয়ে কীভাবে ভাববে। সেই চিন্তার ভিত তৈরি করেন শিক্ষক।

কিন্তু আমরা কি শিক্ষকদের সেই কাজের সুযোগ দিচ্ছি? অনেক সময় শিক্ষককে শিক্ষাদানের চেয়ে প্রশাসনিক কাজ, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিংবা নানা চাপের মধ্যে বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। আবার কোথাও শিক্ষককে এমনভাবে বিচার করা হয়, যেন পরীক্ষার ফলই তাঁর সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি। অথচ একটি পরীক্ষার নম্বর দিয়ে একজন শিক্ষকের প্রকৃত অবদান কখনও মাপা যায় না। যে শিক্ষক একজন ভীতু ছাত্রকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন, যে শিক্ষক একটি ব্যর্থ শিশুকে আবার চেষ্টা করতে শিখিয়েছেন, যে শিক্ষক একটি বিপথগামী কিশোরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে এনেছেন—তাঁদের কাজের হিসাব কোনো মার্কশিটে লেখা থাকে না।

অবশ্য শিক্ষকেরও দায়িত্ব কম নয়। শিক্ষকতা কেবল চাকরি হিসেবে দেখলে এই পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। একজন শিক্ষককে নিজের বিষয়ের পাশাপাশি নিজের ছাত্রদের মনও বুঝতে হয়। কারণ প্রতিটি ছাত্র একই রকম নয়। কারও প্রতিভা প্রকাশ পায় পরীক্ষায়, কারও সৃজনশীলতায়, কারও আচরণে, আবার কারও নীরবতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। সেই অদৃশ্য সম্ভাবনাটুকু খুঁজে বের করাই একজন প্রকৃত শিক্ষকের বড় সাফল্য।

তাই শিক্ষক দিবসে শুধু ফুল দিয়ে শিক্ষককে সম্মান জানানো নয়, তাঁর কাজের মর্যাদা বোঝাও জরুরি। সমাজ যদি সত্যিই উন্নত ভবিষ্যৎ চায়, তবে তাকে তার শিক্ষকদের সম্মান করতে হবে, তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে এবং শিক্ষাকে কেবল চাকরি পাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।

কারণ একটি প্রজন্মের হাতে আমরা যে ভবিষ্যৎ তুলে দিই, তার অনেকটাই তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষের ভিতরে। আর সেই ভবিষ্যতের প্রথম নির্মাতাদের একজন হলেন শিক্ষক।

তাই শিক্ষক দিবস আসলে শুধু শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানানোর দিন নয়; নিজেদের মনে করিয়ে দেওয়ার দিন—যে সমাজ তার শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে জানে, সেই সমাজই তার ভবিষ্যৎকে মর্যাদা দিতে জানে।

Post a Comment

0 Comments