বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৪১
গাজর
ভাস্করব্রত পতি
"গাজরটা ফ্রিজে থাকে, তার বড় কষ্ট
ঠান্ডায় কাঁপে শুধু, জীবনটা নষ্ট।
ঠক ঠক কাঁপে আর
জ্বর কত মাপে তার
থার্মোমিটার সে দেখে না যে পষ্ট!
দৃষ্টিটা ঘোলা বলে থেমে থাকে কাজ ওর
জ্বর বাড়ে, ব্যথা করে বুক পেট পাঁজর।
একে নাকি কয় বাঁচা?
তাই ওর ছয় চাচা
গাজরের নামটাই রেখে দিল ‘গাজ্বর’!"
-- গাজ্বর, মাহফুজ রহমান
অনেকেরই গায়ে জ্বর আসে গাজর খাওয়ার নাম শুনলে। কিন্তু যাঁরা এই গাজরের গুরুত্ব বোঝে তাঁদের কাছে গাজর খুব উপাদেয় এবং উপকারী সবজি। রাঁধুনিদের খুবই প্রিয়। গাজরের হালুয়া, পকোড়া, গাজর আলু ভাজা, গাজর ও বিটের স্যালাড, গাজরের বরফি বা সন্দেশ, ফুলকপি মটরশুটি দিয়ে গাজরের তরকারি, গাজর পায়েস (গাজরেলা), গাজরের কেক বা মাফিন, গাজরের স্যুপ হল গাজর দিয়ে তৈরি হেঁসেলের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাদ্যতালিকা। এছাড়াও খিঁচুড়ি, শুক্তো, রোগীর সেদ্ধ ঝোলেও গাজরের দেখা মেলে। আর খাদ্যরসিকদের মন ভোলায়। সবজি হিসেবে গাজরের গুরুত্ব তাই সহজেই অনুমেয়।
গাজরের হালুয়া
'মনুসংহিতা'র পঞ্চম অধ্যায়ে রয়েছে --
"শ্রূয়তাং যেন দোষেণ মৃত্যুর্বিপ্রাণ জিঘাংসতি।
পলাণ্ডুং গৃঞ্জনংচৈব মত্যা জগ্গ্ধা পতেৎ দ্বিজঃ।।"
অর্থাৎ ব্রাহ্মণ যদি বেদপাঠ অভ্যাস না করে, সদাচারী না হয়, দূষিত অন্ন, রসুন, গাজর, পে'য়াজ, ভূঁইছাতা (চলতি কথায় ব্যাঙের ছাতা) খায়, তবে ঐ ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণত্বের অবসান ঘটে। তখন তাঁকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। এখানে উল্লিখিত 'গৃঞ্জন' হল গাজর।
চরক সূত্রস্থানেও রয়েছে 'গৃঞ্জন' শব্দের উপস্থিতি -- "গ্রাহী গৃঞ্জনকস্তীক্ষা বাতশ্লেষ্মার্শসাং হিতঃ।
স্বেদনেহ ভ্যবহার্য্যেচ যোজয়েৎ তদপিত্তিনাম্।।"
চরকের মতো বাগভট বইতেও লেখা --
"তীক্ষ্ণো গৃঞ্জনকো গ্রাহী পিত্তিনাং হিতকৃৎনসঃ।"
দেহের সর্বস্তরের স্রোতেই বায়ু পিত্ত কফের সৃষ্টি হলে যেসব ব্যাধির জন্ম হয় সেক্ষেত্রে এই গৃঞ্জন বা গাজরের ভূমিকা অনেকাংশেই থাকে। শাস্ত্রে 'গৃঞ্জন' শব্দটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে -- "গৃঞ্জতে রোগেষু, ভক্ষ্যতে গৃজি + লুট।" এই গৃঞ্জন বা গাজর ক্ষয়রোগের ক্ষেত্রেও উৎকৃষ্ট মহৌষধ।
গাজরের পকোড়া
গাজরের দ্বিপদী নাম হল Daucus carota। এটি Apiaceae পরিবারের অন্তর্গত। সংস্কৃতে গর্জর, পিন্ডমূল, শিখামূলম, হিন্দিতে গাজর, তেলুগুতে পিতাকন্দ, তামিলে গার্জার, মালয়লামে কর্ণা, ওড়িয়াতে বাটুলামূলা এবং ইংরেজিতে carrot নামে পরিচিত এই গাজর। এছাড়াও গাজরকে বলা হয় গুঞ্জন, পিজমুল, পীতক, নারঙ্গ, পীতফলক, সুমূলক, স্বাদমূল এবং সুপীত। এই গাজরের কথা পাই কবি সুবোধ সরকারের কবিতাতেও --
"পার্টি অফিস থেকে একটা ছেলে এসে বলল
আপনার ভূগোল বদলে দেব।
আমি পার্টি অফিসে গিয়ে বললাম
সম্পাদক বললেন, হুম, ছেলেটিও আমাদের
আপনিও আমাদের, মানিয়ে নিন।
পরের দিন সেই ছেলেটি আমাকে রাস্তায় বলল
মুখে রড ঢুকিয়ে পেছনের ফুটো দিয়ে
বের করে আনব, শালা দেড়েল!
বিটগাজর যখন রগে উঠে যায়
ভারত মহাসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে মেঘ দেখে
আপনি কী বলবেন?
গুরু গুরু মেঘ গরজে গগনে গগনে…।"
বর্ষজীবী গাছ হলেও গাজর অবশ্য কোথাও কোথাও ২ বৎসর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। মোটামুটি ৩ - ৪ ফুট উঁচু গাছ। পাতাগুলো পক্ষবৎ এবং বহুভাবে বিভক্ত। ধনেপাতার মতো দেখতে বিভক্ত অংশগুলি ২ - ৩ ইঞ্চি লম্বা এবং শক্ত লোমযুক্ত। এদের ফুলের রঙ সাদা কিংবা হলুদাভ গোলাপী। ছত্রাকারে গুচ্ছবদ্ধভাবে ফোটে। ছোট ছোট ফলগুলি রোমশ এবং সাদা রঙের। মূলোর মত মূল। যেটাকে আমরা 'গাজর' বলি এবং খাই। এর বর্ণ গাঢ় অথবা হাল্কা কমলালেবু রঙের। গাজর লম্বায় ১ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। শঙ্কু আকৃতির। গাজরের আদি বাসস্থান ইউরোপ এবং এশিয়াকে বলা হলেও পাশ্চাত্য সমীক্ষা অনুযায়ী এটি কাশ্মীরের গ্রামাঞ্চলে ও পশ্চিম হিমালয় প্রদেশের ৫-৯ হাজার ফুট উঁচুতেও মেলে।
গাজরকে হল সুপার ফুড। শীতকালীন নানা রোগ থেকে মুক্তির সেরা সবজি হল গাজর। গাজরের মধ্যে থাকা ভিটামিন, মিনারেলস দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। গাজর খেলে বুদ্ধি বাড়ে। স্বরভঙ্গ রোগের উপশমকারী গাজর। এছাড়াও হৃদরোগ, ঘুসঘুসে জ্বর, খাবারে অরুচি, অর্শ, কৃমি, সর্দিতেও গাজর উপকারী খুব। গাজরের মধ্যে ক্যারোটিনয়েড অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিটা ক্যারোটিন, আলফা ক্যারোটিন, লুটিন জিয়াক্সানথিন, থায়ামিন, ভিটামিন এ, ননহাইড্রোসস্কোপিক গ্লাইকোসাইড (হলুদ বর্ণের) থাকে। ক্যান্সার প্রতিরোধে এবং রক্ত পরিস্কার রাখতে এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট খুবই কার্যকরী।
🍂
3 Comments
ভালো লাগছে পড়তে। দারুন।
ReplyDeleteধন্যবাদ আপনাকে।।
ReplyDeleteআপনাদের অনুপ্রেরণা আমাকে লিখতে সাহায্য করবে। আশীর্বাদ প্রার্থনা করছি দিদিমনি।
ReplyDelete