বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৪০
ভেটিভার
ভাস্করব্রত পতি
"বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি"।
--- জসিমউদ্দিন
কবির লেখা 'ভেন্না' হল ভেটিভার ঘাস। ভূমিক্ষয় রোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাস। এই 'ভেটিভার' শব্দটি তামিল শব্দ 'ভেট্টিভার' থেকে উদ্ভূত। ভারতে এটি Khus Khus ঘাস হিসেবে পরিচিত। ভেটিভার তথা Khus Khus ঘাসের বাংলা নাম বেন্না, ভেন্না, বিন্যা। অঞ্চলভেদে উচ্চারণ ভিন্ন। ভেটিভারকে হিন্দিতে বলে খস (खस) বা Khas khas। সংস্কৃতে ঊশির, ঊশিরা বা সুগন্ধীমূল, মালয়লামে বলে ভেট্টিভেরু বা রামাচাম, কন্নড়ে মুডিভালা বেরু বা লাভাঞ্চা, মারাঠীতে ভালা বা খস খস (Khas-khas) বলে। পোয়েসী (Poaceae) পরিবারের ভেটিভার ঘাসের বিজ্ঞানসম্মত নাম Chrysopogon zizanioides(L)।
ভেটিভার ঘাস
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে (৬০৬–৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ) কনৌজ ছিল সুগন্ধি বাণিজ্যের অন্যতম বৃহত্তম কেন্দ্র। এখনও এটি 'ভারতের সুগন্ধি রাজধানী' তথা Perfume Capital of India নামে পরিচিত। তখন কনৌজ এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ভেটিভার ঘাস থেকে সুগন্ধি তেল ও আতর তৈরির রমরমা ব্যবসা ছিল। হর্ষবর্ধনের আমলে সেসময় সুগন্ধি এবং কৃষিজ পণ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের কর 'ভাগ', 'হিরণ্য', 'বালি' ইত্যাদি বেশ প্রচলিত ছিল। যদিও সুনির্দিষ্টভাবে 'ভেটিভার ট্যাক্স' বা খসখসের ওপর আলাদা কোনও ট্যাক্স লাগু থাকার বিবরণ তেমন মেলেনা। এই ট্যাক্স প্রথা মূলত কনৌজের সুগন্ধি ব্যবসার ওপরেই আরোপিত রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম অংশ ছিল।
১৯৯০ এর দশকে বিশ্ব ব্যাঙ্কের উদ্যোগে ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড সহ বিভিন্ন ক্রান্তীয় এলাকার দেশগুলোতে ভূমিক্ষয় রোধ এবং জল ব্যবস্থাপনার জন্য 'ভেটিভার সিস্টেম' (Vetiver System) চালু করা হয়। কৃষকদের এই ঘাসের চাষে বেশি মাত্রায় উৎসাহিত করা হয়। ভূমিক্ষয় ঠেকাতে বিজ্ঞানীরা দাওয়াই হিসেবে এই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রজাতি ভেটিভারের রোপনের কথাই বলেছেন। ভূমিক্ষয় ঠেকাতে এর অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বের ৫০টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ভেটিভারের ওপর গবেষণা চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল' এর বিজ্ঞানীদের দাবি এরকমই ছিল। ফিজি, ভারত এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ভূমিক্ষয়ের রোধে এই ভেটিভার ঘাস বেশ উপযোগী।
এরাজ্যে ভাঙন প্রতিরোধে বাম আমল থেকে ভেটিভার ঘাস লাগানো শুরু হয় আরামবাগের খানাকুল এলাকায়। এরপর তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যের ১৫ টি জেলায় ভেটিভার লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। নদিয়াতে ৫৫০ কিলোমিটার নদীবাঁধে ভেটিভার লাগানোর কাজ শুরু হয়েছিল। এখানে ভাগীরথী, জলঙ্গি, চূর্ণী, মাথাভাঙা, পদ্মার পাড়ে ২০০ কিলোমিটার এলাকায় বসানো হয়ে গিয়েছে। ঝাড়গ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুরের রূপনারায়ণ, সুবর্ণরেখা, হলদি, কংসাবতী, চণ্ডীয়ার পাড়ে প্রায় ২৫০ কিলোমিটারেরও বেশি নদীপাড়ে ভেটিভার ঘাস লাগানোর পরিকল্পনা অবশ্য বাস্তবের মুখ দেখেনি। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, জলপাইগুড়িতেও এই ঘাস লাগানোর কথা। কতটুকু কাজ হয়েছে, তা কহতব্য নয়।
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকা ছাড়াও অল্প উর্বর এলাকা এবং মরুভূমিতেও জন্মায়। এরা মূলত ভূমিক্ষয় রোধ করে, মাটির উর্বরতা বাড়ায়, মাটির জলশোষণ ও জলধারণ ক্ষমতা বাড়ায়, মাটির আর্দ্রতা বাড়ায়। কোথাও কোথাও জমির ফলনের হার বাড়ানোর পাশাপাশি পোকামাকড়ের উৎপাতও রোধ করে। ভেটিভার ঘাসের শিকড়গুলি খুব দীর্ঘ। যা মাটির গভীরে প্রবেশ করে এবং মাটিকে আলিঙ্গন করে আঁকড়ে ধরে থাকে। ফলে সহজে মাটি আলগা হয়ে যায় না।
ভেটিভারের বেশ কিছু প্রজাতি বন্ধ্যা হওয়ার দরুন এই ঘাসের সারি ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেখা যায় না। বরং একই জায়গায় বছরের পর বছর ধরে টিকে থাকে। সেই স্থানটির মাটিকে সুরক্ষিত করে। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কৃষিবিজ্ঞানী ড. কৌশিক ব্রহ্মচারী লিখেছেন, "অসম ও দক্ষিণ ভারতের কিছু রাজ্যে ভাঙন প্রতিরোধ ছাড়াও নানা ব্যবহার হচ্ছে এই ঘাসের। রাস্তায় ধাতব গার্ডওয়ালের পরিবর্তে, সমুদ্রতটে বালুচরের বিস্তার প্রতিরোধে, সজীব বেড়া বানাতে, মাটির নোনাভাব কমাতে কাজে লাগছে ভেটিভার। পরিবেশের দিক থেকেও এর উপযোগিতা খুব বেশি, কারণ কার্বন আবদ্ধ করার ক্ষমতায় অন্যান্য অনেক উদ্ভিদের চাইতে এগিয়ে ভেটিভার। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট বলছে, এখনই ভারতে যত কার্বন উদ্গত হয়, তার ছেচল্লিশ শতাংশ আবদ্ধ করছে ভেটিভার শস্যপ্রণালী। জল বা মাটি থেকে ভারী ধাতু শুষে নিতেও জুড়ি নেই এই ঘাসের। তাই ল্যান্ডফিল সাইটের পাশে লাগালে দূষণ ছড়ায় কম। পচা, দূষিত পুকুর-ডোবাতে ঘাসের ভেলা তৈরি করে ভাসিয়ে দিলেও জল থেকে ধাতু শুষে নেয়।" (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮)
এই গাছ তার শিকড়কে সোজাসুজি মাটির গভীরে ঢুকিয়ে দেয়। মাটির অভ্যন্তর থেকে নানা ধরনের খনিজ দ্রব্য শোষণ করে সেই শিকড় দিয়ে। শুধু ভূমিক্ষয় রোধ নয়, এই গাছ থেকে সুগন্ধি তেল মেলে। তাছাড়া এদের শিকড় ভিজানো জল পেটের জন্য খুবই উপকারী। শিকড় থেকে তৈরি পাউডার দেহের চামড়াকে ভালো রাখে। খোলা বাজারে ইদানীং মেলে ভেটিভার পাউডার, ভেটিভার সাবান, ভেটিভার পারফিউম, ভেটিভার শরবত, ভেটিভার ক্রিম ইত্যাদি।
🍂
0 Comments