জ্বলদর্চি

জেলা ঝাড়গ্রাম/স্কেচ : সঞ্জীব মিত্র/তথ্য : ফটিক চাঁদ ঘোষ

জেলা ঝাড়গ্রাম
স্কেচ : সঞ্জীব মিত্র
তথ্য : ফটিক চাঁদ ঘোষ


চিল্কিগড়

ঝাড়গ্রাম জেলায় জামবনী থানায় চিল্কিগড়। গড় অর্থে যে রাজার স্থান সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই চিলকিগড় রাজবংশেরই তৈরি এই মন্দির। অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ, অজস্র ভেষজ গাছড়া। আর নিচে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা ডুলুং। যে আপাতত কিশোরী কিন্তু বর্ষায় মত্তযৌবনা। বিশেষত মন্দিরটির গুরুত্ব বেড়েছে তার প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য। মন্দিরটির জন্ম নিয়ে মতভেদের শেষ নেই। প্রায় পাঁচশো বছর পূর্বে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। চিল্কিগড়ের সামন্ত রাজা গোপীনাথ সামন্ত স্বপ্নাদেশ পেয়ে দেবীর নির্দেশ মতো রানীর হাতের সোনার কাঁকন দিয়ে এই মন্দির ও দেবী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন—তাই নাম কনক দুর্গা। কেউ বলেছেন এটির নাম ছিল বনদুর্গা। পরে কোনো তথাকথিত ভদ্র রাজা আদিবাসীদের পরাজিত করে একে কনক দুর্গায় পরিণত করেন। রাজবাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত গৌরব হারিয়ে কিন্তু চিল্কিগড় বেঁচে আছে সাড়ে চারশো ভেষজ, মনোরম জঙ্গল এবং ডুলুৃৃৃৃং নদীর সৌন্দর্য নিয়ে। আবার এও শোনা যায়—ধলভূমগড় রাজবংশের সঙ্গে জামবনীর রাজবংশের লড়াই বাঁধলে জামবনীর রাজা জগদীশচন্দ্র ধবলদের জয়ের জন্য মানত করেন এবং বনদুর্গাকে কনক দুর্গায় পরিণত করেন। ইতিহাস আর প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে কনক দুর্গা, চিল্কিগড় আজও মনে শান্তির প্রবাহ বয়ে আনে।

 ডিয়ার পার্ক 

 অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রামের অন্যতম আকর্ষণ হলো ডিয়ার পার্ক। পরে যার নাম দেওয়া হয় জুলজিক্যাল গার্ডেন বা মিনি জু। তিরিশ বছর আগেও এতে ভিড় ছিল না। শীতল আরণ্যক পরিবেশে জীবন জুড়িয়ে যেত। ধীরে ধীরে পর্যটন ও পর্যটক বাড়লো। নতুন নতুন জিনিস নিয়ে এসে রাখা হলো। আর প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাভাবিক ডিয়ার পার্ক হয়ে উঠলো মিনি জু। ১৯৮০ সালে একেবারে জঙ্গলের মধ্যে এটি ডিয়ার পার্ক বা হরিণ উদ্যান নামে গড়ে উঠেছিল। পরে ২০০৫ সালে সেন্ট্রাল জু-অথরিটির (CZA) স্বীকৃতি পেয়ে এটি মিনি জু হয়। কৃষ্ণসার হরিণ, ময়ূর, ভাল্লুক, হায়না, বাঁদর, চিতা, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, কুমির সবই এনে রাখা হয়। যা আক্ষরিক অর্থেই ছিল ডিয়ার বা হরিণের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র তাই হয়ে উঠলো কৃত্রিম এক পার্ক বা উদ্যান। হয়ে উঠলো পর্যটন কেন্দ্র। রেলস্টেশন কাছেই, পাশ দিয়ে কু-ঝিক-ঝিক রেললাইন বনের মধ্যে বসে  ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন কোথায় নিয়ে গিয়ে হারিয়ে দিত আমাদের। আজ জনারণ্যে সেই অনুভূতি আর আসবে না। তবু বাচ্চাদের জন্য এটি বেশ মজার। হরিণ বা বিভিন্ন পশুপাখি আপনার হাতের খাবার খাবে। জঙ্গলে যা থাকে— তারই একটি খণ্ডাংশের স্বাদ দেবে আপনাকে।


ঝিল্লি পাখিরালয়

 ঝাড়গ্রামের যা কিছু সৌন্দর্য তার অরণ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঝর্ণা, ঝোরা, নদী সব নিয়ে। তেমনি আকর্ষণীয় স্থান ছিল হাতিবাড়ি। তার কিছুটা আগে— ভেতরের দিকে গড়ে উঠেছে ঝিল্লি পাখিরালয়। জলাধার, গাছ, ধান জমি আর অজানা জানা অজস্র পাখি খানিক বিশ্রাম দেবে মনকে। দুপাশে গাঢ় সবুজ। মাটির ঘর আর নিকোনো উঠোনে পাখির মতোই সহজ সরল মানুষ। ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুর এলাকায়— গোপীবল্লভপুর-হাতিবাড়ি রোড ছাড়িয়ে কিছুদূর গেলেই এই পাখিরালয়। পাশেই সুবর্ণরেখা। তার জলেই তৈরি এই 'হ্রদ'। জলাশয়টি একশো একরেরও বেশি হবে। এটিও একটি পিকনিক স্পট এবং এটিও দূষিত হচ্ছে খুব দ্রুতগতিতে। কারণ এর পাশেই তৈরি হয়ে গেছে একটি পার্ক। ওয়াচ টাওয়ার। বিভিন্ন পাখি। দুটি কটেজ আছে। চারপাশে ফুল ফলের গাছ। পাশেই মহুলবন গ্রাম।  হ্রদে আছে বোটিং এর ব্যবস্থা। লাল শালুক, পদ্ম জলের শোভা বাড়িয়েছে বহুগুণ। বন্য গ্রাম আর পাখিদের ওড়া, সাঁতার দেওয়া—মনকে জুড়িয়ে দিতে পারে— যদি পরিযায়ী পাখির মতো পরিযায়ী দায়িত্ব-জ্ঞানহীন পর্যটকরাও কম থাকেন।


রাজবাড়ি

 ঝাড়্গ্রাম রাজবাড়ির ইতিহাস ও রহস্য সত্য-মিথ্যা কিংবদন্তিতে গড়া। বস্তুত এইসব জঙ্গল এলাকায় কোন নিষাদ সর্দাররাই রাজত্ব করতেন। পরে তথাকথিত সভ্য, আর্য কোন বীর বা রাজবংশের লোক এসে এখানে রাজ্য বা গড় নির্মাণ করে রাজ্য শাসন করেন। একটি মতে ১৫৯২ সালে মুঘল সেনাপতি রাজা মানসিংহের নির্দেশে রাজপুত বীর সর্বেশ্বর সিং ঝাড়গ্রাম রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় মল্লরাজাদের পরাজিত করে তিনি এটি জয় করেন। তাহলে রাজ বংশের পদবি মল্লদেব হয় কী করে? বর্তমান রাজপ্রাসাদটি ১৯২২ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে রাজা নরসিংহ মল্লদেবের আমলে ইতালীয় ও ইসলামিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত হয়। অন্য একটি মতে— ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ফতেপুর সিক্রি অঞ্চল থেকে এঁদের পূর্বপুরুষ পুরীর জগন্নাথ ধামে তীর্থ করতে আসেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার সুযোগে রাজ্য দখল করেন। সর্বেশ্বর মল্লদেব ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এঁরা উগালষণ্ডদেব উপাধি ধারণ করেন। এর অর্থ হল উগাল বা আলবেষ্টিত দুর্গের ষণ্ডবিশেষ। এঁদেরই দেবী হলেন সাবিত্রী। পাশেই রয়েছে সাবিত্রী মন্দির। রাজবাড়ির অভ্যন্তরে আজ সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। সরকারি উদ্যোগে এখানে ট্যুরিস্ট লজ তৈরি হয়ে এর ঐতিহ্যের বিকৃতি ঘটিয়েছে।

রামেশ্বর শিবমন্দির

 গোপীবল্লভপুর থেকে পিচের রাস্তা ধরে নয়াগ্রাম যাওয়ার পথে ধনকামড়া নামক স্থানে উত্তর দিকে বাঁধানো রাস্তায় নয় কিলোমিটার গেলেই প্রাচীন রামেশ্বর মন্দির। রামেশ্বরের শিব দ্বাদশ লিঙ্গ শিব এবং গৌরীপট্টে প্রোথিত। কেবল লিঙ্গমুন্ড ও মুন্ডের উপরে বারোটি ছোট ছোট লিঙ্গ গোলাকারে স্থাপিত। এর চারপাশে ঘন বন। অখন্ড নীরবতা, বড় বড় শালের গাছ। শান্ত শীতল সুস্নিগ্ধ পরিবেশ। রয়েছে বাল্মীকির সমাধি। বোল্ডার বা মাকড়া পাথর দিয়ে তৈরি এই সমাধি। সমাধির উপরে একটি চেরা শালগাছ-- ধনুকের মতো। এটা নাকি সীতার দাঁতন। তার পাশে রয়েছে সীতাধুনি। এ নাকি অতীত থেকে এখনো জ্বলছে। এর আগুন নাকি নেভেনা। দেখা যাচ্ছে মুনি সাধুরা ধর্মের নিয়ন্ত্রকরা বেশ পরিবেশ চিনতেন। নদী ঘন বন  হালকা জঙ্গলে, খাল, বিল, ঝিল নির্জন নিরিবিলি দৈব স্থান নির্মাণ করতেন। সহজ সরল মানুষকে বশীভূত করতে এর কোনো বিকল্প নেই। রামেশ্বরের তপোবন অত্যন্ত শান্ত পরিবেশে একটি পর্যটন স্থান হয়ে গেছে যদিও এখানে থাকার কোন ব্যবস্থা না থাকায় এখানে পরিবেশ এখনও শান্ত আছে। শিব নয়-- ধর্ম নয়-- প্রকৃতি। অনাবিল অনবদ্য প্রকৃতি জায়গাগুলোর মাহাত্ম্য বাড়িয়েছে।

কৃতজ্ঞতা: সুষেন মাহাত 
🍂

Post a Comment

0 Comments