নজরুল ইসলাম / মধুমিতা মহাপাত্র


ম ধু মি তা  ম হা পা ত্র 


নজরুল সৃষ্টি: কঠিন-কোমলের অপরূপ মেলবন্ধন

"আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন"-
কবিগুরুর লেখনি নিঃসৃত এই চিরন্তন সত্য তাঁর অনুজপ্রতিম কবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে একটু বেশিই খাটে। দুঃখের পরশমনির ছোঁয়ায় তিনি তিল তিল করে খাঁটি সোনা হয়ে উঠেছেন, অথবা নীলকণ্ঠের মতোই জীবন মন্থন জাত গরলকে কণ্ঠে ধারণ করে আগামী প্রজন্মকে দিয়ে গেছেন কঠিন কোমলের অপূর্ব মেলবন্ধনে সৃষ্ট তাঁর সৃষ্টিসুধা। যার অমৃত ধারায় সিক্ত ও উজ্জীবিত হয়েছে পাঠককুল।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দশকে অর্থাৎ ১৮৯৯সালের ২৫ শে মে বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে কবি নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ফকির আহমদ ও মাতা জাহেদা খাতুন। আজন্ম দুঃখী বাবা-মা সদ্যজাতের নাম রাখেন দুঃখু মিঞা।দারিদ্র্যকে নিত্যসঙ্গী করে জীবনের পথ চলা, আর তার শুরুতেই আসে বিপর্যয়, অতি শৈশবেই পিতৃহারা হলেন তিনি।মক্তবে পড়া শেষ হতে না হতেই পারিবারিক দায়ভার বর্তায় তাঁর উপর, অর্থ উপার্জনের জন্য নেমে পড়েন কঠোর জীবন সংগ্রামে। গ্রামে মোল্লাগিরি থেকে লেটো নাচের গান, পালা রচনা অবশেষে রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রাক্কালে তিনি সৈন্য বাহিনীতে যোগ দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনের সৈনিক হিসেবে।১৯২০ সালে বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে গেলে তাঁর সৈনিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। জীবন অভিজ্ঞতার পূর্ণ ঝুলিটিকে মহাযুদ্ধের বাস্তবতা অনেকখানি ঋদ্ধ করে। তাঁর সৃষ্টিশীলতা নামক মহৎ গুণটি যুদ্ধক্ষেত্রেও থেমে থাকেনি তাই সৈন্যবাহিনীতে থাকাকালীনই লিখতে থাকেন একের পর এক গল্প-কবিতা-গান। 'বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য' পত্রিকায় 'মুক্তি' কবিতা দিয়ে তাঁর কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ লিখলেও কবি গীতিকার ও সুরকার হিসেবে  তাঁর সমধিক পরিচিতি। ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হলো প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা ওই বছরই দেশ-জাতি -সমাজের যাবতীয় অসাম্যের অচলায়তনের মর্মমূলে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা 'ধুমকেতু'যে পত্রিকায় জন্য তাঁর রাজরোষে পড়ে কারাবাস হয়। যদিও নির্ভীক এই সাহিত্য সাধক, যিনি আদালতে তাঁর জবানবন্দিতে বলেছিলেন---"সত্য স্বয়ং প্রকাশ তাহাকে কোন রক্তআঁখি রাজদণ্ড নিরোধ করতে পারবে না।"
সাহিত্যিক মাত্রই সত্য ও সুন্দরের উপাসক। বাংলা সাহিত্যের সাহিত্যিকগণ ও তার ব্যতিক্রম নন। তবে নজরুলের সাহিত্যে প্রথম সত্যের জয়ধ্বনি ধ্বনিত হলো উচ্চকণ্ঠে ,বিদ্রোহের আকারে।---
মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না ,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না।
তৎকালীন ইংরেজ শাসক তাঁকে কারারুদ্ধ করলেও  থামাতে পারেনি তাঁর অমিত ক্ষমতাশালী লেখনীকে। জেলে বসেই লেখেন' আজি সৃষ্টি সুখের উল্লাসে' ও 'দারিদ্র্য 'নামক কিছু কবিতা সেইসঙ্গে শিকল ভাঙার গান, ভাঙার গান এর মত কালজয়ী গান। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ গুলি হল--দোলনচাঁপা, বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, ছায়ানট, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফনিমনসা, সিন্ধু হিল্লোল, চক্রবাক এছাড়াও রয়েছে উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ গ্রন্থ।
কবি নজরুল ইসলামের কবি সত্তার মূল সুরটি ছিল স্বদেশপ্রেম  ও মানবপ্রীতি।দেশমাতার পরাধীনতার শৃংখল মোচনে তাই তরবারির মত তাঁর লেখনী ঝলসে উঠে-
 কারার ঐ লৌহকপাট 
ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট।
কখনো কবির আক্ষেপ--
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা।
মানবপ্রেমী কবি মানবতার হীন অপমানে ব্যথিত হন । তাই কবিকণ্ঠে ধ্বনিত হয়-- 
 প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস/ যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ। আবার' ধর্ম কারার প্রাচীরে' আঘাত হেনে বলতেও পারেন -'মন্দির আর মসজিদ ওই শয়তানের মন্ত্রণাগার।'
আশাবাদী কবি বিশ্বাস রাখেন যুব শক্তির উপর, সবুজ প্রাণ যুবশক্তি ই পারে কালবৈশাখী ঝড় হয়ে এসে  সবকিছুকে ভেঙ্গে 'নতুনের কেতন' ওড়াতে।  যে মানবপ্রেম কবিকে মানবতাবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার করেছে সেই মানবপ্রেম ই তাঁকে দান করেছে প্রেম সৌন্দর্যের অনুভূতি আর সেজন্যই এক হাতে 'রণ-তূর্য্য' এর সঙ্গে অন্য হাতে 'বাঁশের বাঁশরী' নিয়ে আবির্ভূত হতে পারেন ।পৌঁছে যেতে পারেন দূর দ্বীপবাসিনীর কাছে, রোমান্টিক  আবেশে বলতে পারেন--মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল।
 কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল।

বিদ্রোহ ও রোমান্টিকতার পাশাপাশি দুঃখ ছিল কবির চিরসাথী। তাই জীবনের শেষ সময় ও তাঁকে ছেড়ে যায়নি। মাতৃহারা, সন্তানহারা হয়ে মন যখন হাহাকার করে ওঠে- 'শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয় 'তখন নেমে আসে আঘাত ,পত্নী প্রমীলা দেবী  পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী হয়ে যান। 'দুঃখে- দারিদ্র্যে-অসুখে-অশান্তিতে'  বিহ্বল কবি ১৯৪২ সালে সমস্ত রকম সৃষ্টিশীলতা হারিয়ে বাকশক্তিহীন হয়ে পড়েন। সুদীর্ঘকাল এভাবে দুঃখ যন্ত্রণার মধ্যে কাটিয়ে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট চির শান্তির দেশে পাড়ি দেন।

--------

Comments

  1. কবিকে জন্মদিনে প্রণাম..

    ReplyDelete
  2. কবিকে শ্রদ্ধা। লেখককে ধন্যবাদ। লেখকের অন্য লেখা পড়ার প্রতীক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯