শ্যামল জানা


শ্যা ম ল  জা না


আমার অসুস্থ মা

মাঝে মাঝে খুব সরু আনন্দের স্ট্রাইপ দেওয়া একটা দুঃখকে
দুটো উলের কাঁটা দিয়ে বুনতে বুনতে
একদম শেষে এসে আমার মা যখন দেখেন--
অজান্তে কখন যেন অনেকগুলো ঘর পড়ে গেছে,
আমার দিকে তাকান তিনি...

আমি তখন,
এতদিন ধরে পুষে রাখা তাঁর ভাঁজকরা স্বপ্নটিকে খুলে
মাদুরের মতো গুটিয়ে সিন্দুকে তুলে রাখছিলাম৷
মা বললেন— ভাঁজের দাগটা তো থেকেই গেল ?

তারপর জিজ্ঞেস করলেন—
ভাঁজের দাগ কী দিয়ে তৈরি হয় ?
আলো দিয়ে , না অন্ধকার দিয়ে ?

মধ্যবিত্ত

যখন—
একটা নদী ছোটো হতে হতে সাপ হয়ে যায় ,
একটা সাপ বড় হতে হতে নদী হয়ে যায় ,
তখন—
আমার আর স্নান করতেও ইচ্ছে করে না ,
ছোবল মারতেও ইচ্ছে করে না ,
আমি মধ্যবিত্ত হয়ে যাই...


একুশে ফেব্রুয়ারি

এই সেই অশ্রু চলাচলের চাতাল ৷ তার—
করতল এবড়ো-খেবড়ো ৷ ফাটলে ফাটলে নির্জনতা,
নির্জনতার ভেতরে চাপাপড়া ক-টি রক্তমাখা অক্ষর...

ওপরে টোল খাওয়া নিজস্ব আকাশ— ২১শে ফেব্রুয়ারির...
মাঝে মাঝে পূর্ণ আর ঘোলাটে চাঁদ আসে সেখানে,
দু-হাতে মেঘ সরিয়ে সরিয়ে সেই চাঁদকে স্পষ্ট করি ৷ দেখি—
অজস্র মনখারাপ গিঁথে আছে তার শরীরে ! থাক্
আমি শুধু তার জ্যোৎস্না থেকে খুলে নিই
মাপমতো একটি শাদা চিৎকার !
তারপর রাখি আমার খাতার শূন্যতার ওপরে। 
থাকে না সে! কয়েকটি অক্ষর তখনও অনুপস্থিত!
অথচ শাদা শূন্যতাকে খায় রাত্রির অন্ধকার !

সব অক্ষর না থাকায়,
এখনও আমার আর লেখা শেষ হল না... ... 


সংগীত
( করোনা পরিস্থিতি মাথায় রেখে )

একটি অনমনীয় সকাল৷
তখনও গায়ে তার ইতস্তত ভোর লেগে আছে: 
লেগে আছে উচ্চারণ হওয়ার মতো
একটা-দুটো মৃদু সম্ভাবনা।

মাত্র যে কটা ভোর তখনও সকালের গায়ে লেগেছিল,
আমি দ্রুত তাদের কুড়িয়ে নিই, আর
বাড়ি এসে মায়ের মলিন মুখে
ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির মতো মাখিয়ে দিই ৷

তারপর, ওই সামান্য কটা শব্দ দিয়েই আমি
পৃথিবীর এই ভয়াবহ অসুখকে
সংগীতের মতো উচ্চারণ করি ,
আর ম্যাজিক ঘটে যায়... ... !

আমাদের বাড়ির উঠোনে তৎক্ষণাৎ
গজিয়ে ওঠে সূর্যের ডালপালা৷ তাতে,
কিছু অলৌকিক পাখি এসে বসে৷ আর
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নানান রকমের কান্নার শব্দ
জুটিয়ে এনে , এক অদ্ভুত আঁধারের গান গায় ৷

সেই গান আমাদের বাল্যকাল ছাড়িয়ে ,
যৌবন ছাড়িয়ে , বৃদ্ধ বয়েস ছাড়িয়ে,
এক নিরুদ্দেশের দিকে
আমাদের চোখের সামনে দিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে,
ওই দ্যাখো... ওই দ্যাখো... চলে যাচ্ছে কেমন... ...

আমরা ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি... ...
মিউজিয়াম

ধর্ষণ করে মেরে ফেলার আগে
শেষ যে চিৎকারটি নাবালিকার মুখ থেকে বেরিয়েছিল,
সেটি নোংরা জলকাদা মেখে
একাকী পড়ে ছিল নির্জন জলাশয়ের ধারে৷

আমি তাকে কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসি ;
কেচে, ইস্তি্রি করে, বাঁধিয়ে,
আমার ড্রইংরুমে টাঙিয়ে রাখি সেই চিৎকার...

তারপর থেকে প্রত্যেকদিন, আমার পূর্বপুরুষেরা নয়,
আমার পূর্ব-মহিলারা একজন একজন করে,
আলাদা আলাদা ভাবে
আমার ড্রইংরুমে আসতে শুরু করেন !

আর, প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা করে
একইভাবে জিজ্ঞেস করেন—

এ চিৎকার তুমি কোথায় পেয়েছো ?
এ তো আমার চিৎকার ... ...

------

Comments

  1. অসাধারণ সব কবিতা, মিউজিয়াম একটু বেশি ভাল লাগলো।

    ReplyDelete
  2. খুব ভালো কবিতা। কোনটা আগে রাখি আর কোনটা পরে রাখি, বুঝতে পারছি না। যেমন 'মধ্যবিত্ত'-এ আছে মনখারাপ, তেমনি'মিউজিয়াম'-এ আছে সমাজের চিরন্তন কান্না। কবির সংবেদনশীল মনকে প্রণাম জানাই। আরো কিছুর জন্য অপেক্ষায় থাকলাম।

    ReplyDelete
  3. একজন মহিলা হিসেবে প্রথমেই রাখবো মিউজিয়ামকে, অসাধারণ!করোনা ,তারপর,এছাড়া বাকিগুলোও খুব ভালো।

    ReplyDelete
  4. সুন্দর সাবলীল সব কবিতা। মিউজিয়াম বেস্ট। কবিকে অভিনন্দন।

    ReplyDelete
  5. কবির দৃষ্টি অনেক ব‍্যাপ্ত বেশ বোঝা গেল। প্রতিটি কবিতায় স্বতন্ত্র বিষয় কে ধরেছেন কবি। ভালো লাগল।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯