পথ যখন সঙ্গী -১

ন রে ন  হা ল দা র 

পথ যখন সঙ্গী
পর্ব - ১


ঘর আর পথ দুটিই পরস্পর বিপরীত; দুই ভিন্ন মেরুতে তাদের অবস্থান। কেউ ঘর পিপাসি কেউ বা পথ। কিন্তু পথের যাত্রা শুরু সেই ঘর থেকেই। ঘরকে বাদ দিয়ে পথের সার্থকতা পরিপূর্ণ হয় না। দিনের শেষে একটা আশ্রয়ের খোঁজ সবাইকেই করতে হয়। সকলের মতো আমারও বেড়াতে ভালোলাগে। বেড়ানোর জায়গার তথ্যের থেকে তার স্পর্শ আমাকে বেশি আকর্ষণ করে। তাই সে সব জায়গার কিছু কিছু স্পর্শ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য এ ধারাবাহিকের অবতারণা। 

সারাণ্ডা ভ্রমণ 

বন-জঙ্গল আমার ছোটোবেলা থেকেই ভালো লাগে। মানুষের সমাজের সাথে মানিয়ে নিতে পারি না বলেই হয়তো বন আমাকে এত টানে! তবে সে ক্ষুধাটি শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল কালকূট। তাঁর অরণ্য ত্রয়ী ‘চল যাই বনে’, ‘প্রেম নামে বন’, ‘বনের সঙ্গে খেলা’ আমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। 
এক পুজোর ছুটিতে পাঁচ বন্ধু মিলে বেরিয়ে পড়লাম। খড়্গপুর থেকে ট্রেন ধরে চার ঘন্টার জার্নি শেষ করে পৌঁছে গেলাম মনোহরপুর; ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলার একটি ছোট্ট শহর। চারিদিক বন দিয়ে ঘেরা, পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কোয়েল। কালকূট ও বুদ্ধদেব গুহের লেখায় যে নদী আমার কাছে স্বর্গের অলকানন্দায় পরিণত হয়েছিল। কত স্বপ্ন দেখেছি তাকে নিয়ে। সে-ই আজ আমার হাতের কাছে! ট্রেনে আসার সময় বারবার মনে পড়ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ উপন্যাসটির কথা। তবে সে উপন্যাসে ছিল চার বন্ধু আর আমরা পাঁচ। 
রাতটা সেখানেই থেকে গেলাম। শহরের একপ্রান্তে কোয়েলের কাছাকাছি একটি প্রায় পরিতক্ত বাড়িতে পাঁচজনের থাকার জায়গা পেলাম। আশেপাশে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি আদিবাসিদের বাড়ি। ছাদের উপর থেকে কোয়েলের চড় দেখা যায়। বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম কোয়েলের স্পর্শ পেতে। নদীর বুকে বালির উপর যখন পা রেখেছি, মনে হয়েছে এ কোনো উপন্যাসের মায়া নয়, এ আমারই হাতে বদ্ধ একমুঠো বালি। আমার মতো করে একে আমি ছানতে পারি! উজানে যেখানে এসে মিশেছে কোয়েনা, তার নিশ্চুপ কালো জলে ছড়িয়ে পড়েছে আমার শৈশবের সমস্ত স্বপ্নেরা। কোয়েলের মাঝখান দিয়ে যেন জলস্রোতে বয়ে চলেছে মুক্তির আনন্দ। নদীর দুপাশে বন আর বালির উপর মাঝে মাঝে ছোটো-বড় পাথর পড়ে আছে বর্ষার প্রচণ্ড স্রোতকে প্রতিহত করে। নদীর পশ্চিমপাড়ে সূর্যকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম রাত্রি নিবাসে। বন্ধুরা ভাবে বিভোর। এরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বন্ধুদের মতো বাস্তববাদী নয়, এরাও প্রচ্ছন্ন প্রকৃতি-প্রেমিক। রাত্রির নিবাসে চলল খানাপিনা। বন্ধুরা একসঙ্গে বাইরে কোথাও থাকলে পিনা(সুরা) থাকবে না তাকি হয়! অচেনা জায়গায় কোথা থেকে তারা এ দ্রব্য যোগার করল তারাই জানে। তবে আমার একটু আপসোস হতে থাকল, কেন আমি ও দ্রব্যটির প্রতি আগে থেকে আসক্ত হয়নি! বন্ধুরা জোরজবদস্তিও করেছিল, কেন যে তাদের ডাকে সারা দিইনি আমি জানি না। আমিও চাই ওদের মতো নেশা করতে, ওদের মতো মাতাল হতে – কেন যে পারি না জানি না। 
(ক্রমশ) 
ছবি- লেখক 



Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল