আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস - ৪

আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস || পর্ব- ৪


শ্যা ম ল  জা না

পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম ও তার জন্ম

পৃথিবীতে যখন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে, যাকে আমরা বাঁক বলি(Break), তখন তা প্রাথমিক অবস্থায় স্বাভাবিক কারণেই স্বয়ংসম্পূর্ণ, সর্বসম্মত ও অকাট্য (Absolute) হয় না৷ মতবিরোধ থেকেই যায়৷ ইম্প্রেশনিজম-এর ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি৷ বেশ কিছু চিত্রশিল্পী ইম্প্রেশনিজম মতবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে সহমত পোষণ করেননি! শুধু তাইই নয়, তাঁরা ছবি আঁকার সময়েও সেই কয়েকটি ক্ষেত্রে ইম্প্রেশনিজম-এর ধারার বাইরে গিয়ে নিজ-ভাবনা অনুযায়ী ছবি এঁকেছিলেন৷ সেই অর্থে পোস্ট ইম্প্রেশনিজম স্বতন্ত্র কোনো ইজম নয়৷ একে ইম্প্রেশনিজম-এরই পরবর্তী ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷ এ জন্যই এর অন্য কোনো আলাদা নামকরণ করা হয়নি, হয়েছে— পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম৷ আর, যে সব চিত্রশিল্পীরা ইম্প্রেশনিজম-এর ধারার বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্রভাবে নিজ-ভাবনা অনুযায়ী ছবি এঁকেছিলেন, ছোটো আকারে হলেও সেই ভাবনাগুলিরও(আন্দোলনও বলা যেতে পারে) একটি নিজস্ব নামকরণ হয়েছিল৷

স্বাভাবিকভাবেই দুটি প্রশ্ন মনের মধ্যে চলে আসবে৷ ১. ওই শিল্পীরা কারা? ২. কোন কোন প্রশ্নে এঁরা ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন?

পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন ইংলিশ শিল্প-সমালোচক— রজার ফ্রাই( Roger Fry)৷ ১৯১০ সালে লন্ডনের গ্রাফটন গ্যালারিতে তিনি একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন৷ যার শিরোনাম ছিল— “মানে অ্যান্ড দি পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্টস”৷ এখান থেকেই পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম-এর নামকরণ হয়৷ ওই প্রদর্শনীতে যে ছয়জনের সর্বাধিক ছবি ছিল, তাঁরাই পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম-এর পুরোধা শিল্পী হিসেবে বিবেচিত হন ৷এঁরা হলেন— পল সেজাঁ(Paul Cézanne), পল গগ্যাঁ(Paul Gauguin), ভিনসেন্ট ভ্যান গখ্(Vincent van Gogh), এডওয়ার্ড ভিলার(Edouard Vuillard) জর্জেস স্যুরা(Georges Seurat), ও পল সীন্যাক(Paul Signac)৷

একত্রিত হয়ে সাধারণত যেভাবে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়, সেভাবে কিন্তু পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম গড়ে ওঠেনি৷ ইম্প্রেশনিজম-এর যে যে ক্ষেত্রে এই শিল্পীরা দ্বিমত পোষণ করেছিলেন, সেই সেই ক্ষেত্রে তাঁরা নিজ নিজ ভাবনামতো ছবি এঁকেছিলেন৷ এই ছবি আঁকার ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে কারোর সঙ্গে কারোর কোনো মতবিনিময় হয়নি! এ যেন পোস্ট ইম্প্রেশনিজম নামের একটি বড় ছাদের তলায় স্বতন্ত্র এক-একটি ঘরে প্রত্যেকে একা একা নিজের মতো ছবি এঁকেছেন৷ কিন্তু, যে প্রশ্নে এঁরা ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন, সেটি কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এক ছিল৷ তাঁরা বললেন— সূর্য ক্ষণে ক্ষণে আলো পাল্টায় বলে একই প্রকৃতি ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ পাল্টায়, এই আলোর ইম্প্রেশনটি আমরা ক্যানভাসে ধরতে গেলে বাধ্যতামূলক আউটডোর যেতে হবে৷ এ কাজটি যেমন সব সময় সম্ভব নয়, তেমনি একই ছবি আলোর তারতম্য বোঝাতে গিয়ে বার বার আঁকতে যাব কেন? আর, সবচেয়ে বড় ব্যাপার, আমি পেন্টার হলেও সর্বপোরি একজন মানুষ৷ আমার একটি নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি, উপলব্ধি-দর্শন, ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকবে৷ ওগুলো ক্যানভাসে প্রতিফলিত হওয়া দরকার৷ শুধুমাত্র প্রকৃতির অনুকরণের চেয়ে ওগুলো আরও বেশি জরুরি৷ তবে, এই ফোটোগ্রাফিক ডিটেইল থেকে সরে আসা, মোটা মোটা রং চাপানোর পদ্ধতি, তাদের পরস্পরের সঙ্গে না মেশানো, ইত্যাদি... নতুন ভাবনাগুলির সঙ্গে একমত৷

এডভার্ড মুঙ্খ বললেন— প্রকৃতির সব কিছুই কিন্তু চোখে দেখা যায় না৷ আমাদের আত্মার ভেতরেও ছবি তৈরি হয়, সেটাও প্রকৃতি৷

পল গঁগ্যা বললেন— আমার যখন দেখতে ইচ্ছে করে, দেখার জন্য আমি চোখ বন্ধ করি৷

ভিনসেন্ট ভ্যান গখ বললেন— আমি ছবির স্বপ্ন দেখি এবং আমার স্বপ্নের ছবি আঁকি৷

পল সেজাঁ বললেন— যে শিল্প আবেগ থেকে তৈরি হয় না, সেটা শিল্পই নয়৷

    এডোয়ার্ড ভিলার বললেন— শিল্প সম্বন্ধে বলা মানেই কবিতা সম্বন্ধে বলা৷ কবিতার উদ্দেশ্য না থাকলে শিল্প হয় না৷ আবেগের একটি বিশেষ অংশই চিত্রশিল্পে সূক্ষ্মতা তৈরি করে৷ নির্দিষ্ট বিন্যাস, আলোর বিন্যাস, ছায়ার বিন্যাস-এর ওপরেই নির্ভর করে একটি চিত্রশিল্পের হয়ে ওঠা৷ যাকে বলে চিত্রশিল্পের সংগীত৷

এইভাবে, অনেকগুলি বিভিন্ন ধরনের ফুল(ভাবনা)দিয়ে মালা গাঁথার পর, ওই মালাটির নাম হল— পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম৷ আর, ওই বিভিন্ন ধরনের এক-একটি ফুল হল— ছোটো ছোটো একাধিক মতবাদ! পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম-এর ব্যানারের তলায় জন্ম হল ছোটো ছোটো একাধিক মতবাদের৷ এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেগুলি, সেগুলি হল— 

(নিও ইম্প্রেশনিজম) Neo-Impressionism(ছবি-১), 

(পয়েন্টিলিজম)Pointilism, (ক্রোমে-লুমিনারিজম বা ডিভিশনিজম)chromo-luminarism or Divisionism, (সিম্বলিজম)Symbolism, Synthetism(সিন্থেসিজম), (ক্লোইসোনিজম)Cloisonnism, primitivism (পন্ত অ্যাভেঁ স্কুল)Pont-Aven School, (স্ট্রাকচার-অর্ডার-অ্যান্ড দ্য অপটিক্যাল এফেক্টস অফ কালার)Structure-order-and the optical effects of color, (দ্য নবিস)Les Nabis, ইত্যাদি। (ক্রমশ)


-------

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল