দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর / শিশিরকুমার বাগ


দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর কি কখনও মানববিদ্বেষী হতে পারেন!


শি শি র কু মা র  বা গ

পরের দুঃখ দেখলে বিদ্যাসাগর মহাশয় কিছুতেই স্থির থাকতে পারতেন না। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলতেন। কত শত গরিব মানুষ, অসহায় নারী কিংবা সহায়সম্বলহীন ছাত্রকে তিনি সাহায্য করেছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। চরম বিড়ম্বনার হাতথেকে রক্ষা পেয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৬৪ সালের ১৮ জুনের চিঠিতে বিদ্যাসাগরকে ‘করুণার সিন্ধু’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। ১৮৬৬ সালের মাঝামাঝি চরম দুর্ভিক্ষের সময় বিদ্যাসাগর নিজের গ্রাম বীরসিংহে অন্নছত্র খুলে গরিব দুঃখীদের দু-মুঠো আহারের ব্যবস্থা করেছিলেন। বলা হয় সেই সময় থেকেই তিনি ‘দয়ার সাগর’ হিসাবে সকলের মধ্যে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। ১৮৬৭ সালের শেষ দিকে উত্তরকালের প্রখ্যাত কবি নবীনচন্দ্র সেনকে তিনি পড়াশোনার জন্য অর্থ সাহায্য করেছিলেন। পরবর্তীকালে নবীনচন্দ্র সেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ‘পলাশীর যুদ্ধ’ কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেন। সেই উৎসর্গ পত্রে বিদ্যাসাগরকে ‘দয়ার সাগর’ বলে বর্ণনা করা হয়। 
কত মানুষের যে কত উপকার করেছেন বিদ্যাসাগর, তা বোধ হয় লিখে শেষ করা যাবে না। এ বিষয়ে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী লিখেছেন, “ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কোন্ ব্যক্তির কি উপকার করিয়াছেন, তাহার সম্পূর্ণ তালিকা তৈয়ার করা একরকম অসম্ভব। তাঁহার জীবনচরিত লেখকেরা যেগুলা সংগ্রহ করিয়াছেন তাহাই পড়িতে পড়িতে শ্বাসরোধের উপক্রম হয়।”১ 
কিন্তু মজার বিষয় হল এটাই যে, বিদ্যাসাগর যাদের উপকার করেছেন তাদের মধ্যে অনেকেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর নিন্দায় মুখর হয়েছেন। জীবনের শেষ দশায় বিদ্যাসাগরের মনে হয়েছে, যারা উপকৃত হয় তারাই নিন্দা করে বেশি। নিজের জীবনের এই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তাঁর লেখাতেও (ভ্রান্তিবিলাস) প্রতিফলিত। “মানবজাতি নিরতিশয় কুৎসাপ্রিয়; লোকের কুৎসা করিবার নিমিত্ত কত অমূলক গল্পের কল্পনা করে এবং কল্পিত গল্পের আকর্ষণী শক্তির সম্পাদনের নিমিত্ত উহাতে কত অলঙ্কার যোজিত করিয়া দেয়। যদি কোনও ব্যক্তির প্রশংসা করিবার সহস্র হেতু থাকে,অধিকাংশ লোকে ভুলিয়াও সে দিকে দৃষ্টিপাত করে না; কিন্তু কুৎসা করিবার অণুমাত্র সোপান পাইলে মনের আনন্দে সেই দিকে ধাবমান হয়।”২
‘বিদ্যাসাগর’ গ্রন্থে চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “দীর্ঘকাল ধরিয়া লোকের প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচরণ প্রভৃতি দেখিয়া মানুষের আচরণের প্রতি তাঁহার (বিদ্যাসাগরের) এক প্রকার বিজাতীয় ঘৃণার সঞ্চার হইয়াছিল। একদিকে প্রেমিকহৃদয় বিদ্যাসাগরমহাশয় মানুষের প্রতি মহাপ্রেমে অণুপ্রাণিত, অপর দিকে মানুষের আচরণে ভগ্নহৃদয় ও বিশ্বাসবিহীন।”৩
আক্ষেপ করে বিদ্যাসাগর বলেছেন, “এ দেশের উদ্ধার হইতে বহু বিলম্ব আছে। পুরাতন প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি বিশিষ্ট মানুষের চাষ উঠাইয়া দিয়া সাত পুরু মাটি তুলিয়া ফেলিয়া নতুন মানুষের চাষ করিতে পারিলে, তবে এ দেশের ভাল হয়।”৪
বিদ্যাসাগরের কর্মব্যস্ত জীবনে আপনজনেদের কাছ থেকে যে সহানুভূতি তাঁর প্রাপ্য ছিল, যা বাইরের ঝড় থেকে তাঁকে কিছুটা রক্ষা করতে পারত, তা তিনি পাননি। মৃত্যুর দশ বছর আগে ১৮৮১ সালে বিদ্যাসাগর প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারীকে একটি চিঠিতে লিখেছেন, “আমার আত্মীয়েরা আমার পক্ষে বড় নির্দয়। সামান্য অপরাধ ধরিয়া অথবা কল্পনা করিয়া আমাকে নরকে নিক্ষিপ্ত করিয়া থাকেন।”৫
জীবনের শেষ পর্বে বিদ্যাসাগর বলেছেন, “আগে সকল লোককে সৎ বলে মনে করতাম। কিন্তু সরল ভাবে লোককে বিশ্বাস করেও জীবনে পদে পদে প্রবঞ্চিত হয়েছি। শেষে দেখি যে ‘ঠক বাছতে গাঁ ওজর’, কেউ আর বাদ যায় না।”৬
জীবনের এই পর্বে অসামান্য মানবপ্রেমিক বিদ্যাসাগর বহু দুঃখে কিছুটা মানববিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন। কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য বলেছেন, “শেষাশেষি বিদ্যাসাগর কতকটা misanthrope নরজাতিদ্বেষী হইয়াছিলেন। বিস্তর লোকের ব্যবহার তাঁহার প্রতি এরূপ কদর্য হইয়াছিল যে, অনেক সহ্য করিয়া শেষটা তিনি অসংযতবাক্ হইয়া পড়িয়াছিলেন।”৭
আমরা জানি না সত্যিই তিনি মানববিদ্বেষী হয়ে পড়েছিলেন কি না। কিন্তু আমরা দেখেছি বার বার তিনি নাগরিক সমাজ থেকে, সভ্য সমাজ থেকে দূরে সরে গিয়ে সাঁওতালদের মাঝে, তাদের সাদাসিধে সরল অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার মাঝে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে কিছুটা শান্তি লাভ করার চেষ্টা করেছিলেন। হয়তো শিক্ষিত ও সভ্য সমাজের প্রতি চরম অভিমানে তাঁর এই কার্মাটার জীবনের প্রতি এমন আগ্রহ। 
অবশ্য বিদ্যাসাগর গবেষক ইন্দ্র মিত্র (অরবিন্দ গুহ) মনে করেন, “বিদ্যাসাগরের এই মানব বিদ্বেষ, তাঁর অসামান্য মানবপ্রেমেরই অনিবার্য ফল। মনে রাখা দরকার এই মানব বিদ্বেষ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিদ্যাসাগরকে মানবপ্রেমের উদার ব্রত থেকে তিলার্ধ বিচ্যুত করতে পারেনি।”৮
পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, “. . . বিদ্যাসাগর দুঃসহ আঘাত পেয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত এই বেদনা বহন করেছিলেন। তিনি নৈরাশ্যগ্রস্ত pessimist ছিলেন বলে অখ্যাতি লাভ করেছেন . . . তিনি যদিও তাতে কর্তব্যভ্রষ্ট হননি, তবুও তাঁর জীবন যে বিষাদে আচ্ছন্ন হয়েছিল তা অনেকের কাছে অবিদিত নেই। তিনি তাঁর বড় তপস্যার দিকে স্বদেশীয়ের কাছে অভ্যর্থনা পাননি, কিন্তু সকল মহাপুরুষেরাই এই না-পাওয়ার গৌরবের দ্বারাই ভূষিত হন। বিধাতা তাঁদের যে দুঃসাধ্য সাধন করতে সংসারে পাঠান, তাঁরা সেই দেবদত্ত দৌত্যের দ্বারাই অন্তরের মধ্যে সম্মান গ্রহণ করেই আসেন। বাহিরের অগৌরব তাঁদের অন্তরের সেই সম্মানের টীকাকেই উজ্জ্বল করে তোলে – অসম্মানই তাঁদের পুরস্কার।”৯
আজ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রয়াণ দিবসে আমাদেরও মনে হয়, সত্যিকারের মানবদরদী, দেশহিতৈষী, সমাজসংস্কারকদের নামের সঙ্গে আজও নিন্দা কুৎসা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। ‘অসম্মানই তাঁদের পুরস্কার।’ 

তথ্যসূত্র –
. রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, চরিতকথা, দাশগুপ্ত এণ্ড কোং, সপ্তম সং, ১৩৬৫. পৃ.১১
২. বিদ্যাসাগর রচনাসমগ্র, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় ভাগ, পৃ.৩৯১
৩. চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপোধ্যায়, বিদ্যাসাগর, ষষ্ঠ সংস্করণ, পৃ.৩৭৪
৪. ঐ, পৃ.৩৭৪
৫.ঐ, পৃ.৪৫৭
৬.ঐ, পৃ.৩৭৪
৭. বিপিনবিহারী গুপ্ত, পুরাতন প্রসঙ্গ, প্রথম পর্যায় (কলকাতা ১৩২০), পৃ ২২১
৮. ইন্দ্র মিত্র, করুণাসাগর বিদ্যাসাগর, প্রথম সংস্করণ. ১৯৬৯. পৃ ৮১৮
৯. রবীন্দ্র রচনাবলী, সুলভ সংস্করণ, অষ্টাদশ খণ্ড, ১৪০৭, পৃ. ৬৭-৬৮

Comments

  1. সুন্দর বিশ্লেষণ।তাঁর শেষ জীবনের কথা পড়ে বেদনাহত হই।

    ReplyDelete
  2. সুন্দর তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। কর্মাটাঁড় জীবন সম্বন্ধে আরও কিছু আলোকপাত হলে ভালো লাগতো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল