উপন্যাসের আয়নায় -৭

উপন্যাসের আয়নায় -৭  


হুমায়ূন আহমেদ : মুক্তিযুদ্ধ এবং ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস

প্র শা ন্ত  ভৌ মি ক

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনেক মহৎ সাহিত্য রচিত হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক রচনা করেছেন। এমনকি হুমায়ূন মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে দুটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দুই মাসের মধ্যেই লেখক তাঁর পিতাকে হারান। সেই স্মৃতি নিয়ে ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গে যৌথভাবে রচনা করেছেন ‘একাত্তর এবং আমার বাবা’।

মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় হুমায়ূন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া যুবক। সাহসের অভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারেননি। অকপটে সে কথা স্বীকার করেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র’ বইয়ের ভূমিকায়। লেখকের ভাষায়- “বাঁচার একমাত্র উপায় মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়া। আমি ভীতু ধরণের মানুষ। পারিবারিক বিপর্যয়ে আমার মনোবলও টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। কাজেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ না দিয়ে ছোট ভাইকে নিয়ে চলে এলাম ঢাকায়, কারণ তখন ঢাকা মোটামুটি নিরাপদ এরকম কথা শোনা যাচ্ছে।” 

হুমায়ূন আহমেদের লেখায় মুক্তিযুদ্ধ কেবল বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করায় সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিটি লেখায় মুক্তিযুদ্ধ উপস্থাপিত হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন ব্যঞ্জনায়। মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমি করে হুমায়ূন আটটি উপন্যাস লিখেছেন। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় উপন্যাস ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। বৃহৎ আকৃতির এই উপন্যাসে কেবলমাত্র নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধই স্থান পায়নি, এটি হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের এক প্রামাণ্য দলিল। ছোট ছোট অনেকগুলো ছবি এঁকে সেগুলোকে সুতো দিয়ে গেঁথে তৈরি করেছেন বড় ক্যানভাস। যাতে চরিত্র হিসেবে এসেছেন বাস্তবের চরিত্রগুলো। এক বৈরী সময়ের মানবিক আখ্যান হয়ে থাকবে এই উপন্যাসটি।

‘শ্যামল ছায়া’ এক অস্বাভাবিক যাত্রার গল্প। যে যাত্রা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এক টুকরো শ্যামল ছায়ার খোঁজে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি এমন অনেক সাধারণ মানুষও যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, যাদের সম্বল বলতে ছিল শুধুমাত্র সাহস এবং দেশের প্রতি ভালবাসা। এরকম কয়েকজন দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধার গল্পই উঠে এসেছে ‘শ্যামল ছায়া’য়।

‘নির্বাসন’ যতটা না মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস, তাঁর চেয়েও বেশি প্রেমের উপন্যাস। জরীর প্রেমের আখ্যানে মুক্তিযুদ্ধ গৌণ হয়ে ওঠে। হুমায়ূনীয় ঢঙে জীবন যেন নেচে ওঠে গভীর আনন্দে, বেদনায়। বইটি পড়তে পড়তে বুক মুচড়ে ওঠে বেদনায়। মনে হয়, জীবন এমন কেন?

‘মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র’ বইয়ের ফ্ল্যাপে ‘সৌরভ’ উপন্যাসের পরিচিতি দেয়া আছে এভাবে- “স্বাধীনতা একেক জনের কাছে একেক রকম। ... মতিনউদ্দিন সাহেবের কাছে স্বাধীনতার মানে খুব সম্ভব রাতের বেলায় জানালা খোলা রেখে (এবং বাতি জ্বালিয়ে রেখে) ঘুমানোর অধিকার।” এমনই ভিন্নধর্মীভাবে মুক্তিযুদ্ধ উপস্থাপিত হয়েছে।

‘১৯৭১’ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের এক অন্য আখ্যান। বইটিতে পাকিস্তানি এক মেজরের একটি উক্তি চিরন্তন সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। উক্তিটি হচ্ছে- “অত্যাচারী রাজারা ইতিহাসে বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে সম্মানিত হন। আলেকজান্ডারের নৃশংসতার কথা কি কেউ জানে? জানে না। সবাই জানে আলেকজান্ডার দি গ্রেট।”

‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তিযোদ্ধা বদির গল্প। বদির দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প। তবে গল্পের ট্র্যাজেডি এটাই যে স্বাধীন দেশের সূর্য দেখা হয় না বদির। রাত্রির সাথে হতে হতেও হয় না প্রেম। মুক্তিযোদ্ধাদের যে নিজের কথা ভাবতে নেই। তাঁদের ভাবতে হয় দেশ মায়ের কথা।    

'সূর্যের দিন' মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস, যার কেন্দ্রীয় চরিত্র খোকন। হুমায়ূনের কিশোর উপন্যাসের স্বাভাবিক ধর্ম মেনে এই উপন্যাসেও যৌথ পরিবার আছে, আছেন রাশভারী বড় চাচা। মুক্তিযুদ্ধকে এমন অসাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে কেবল হুমায়ূনই পারতেন৷

‘অনিল বাগচীর একদিন’ অনিল বাগচীর গল্প। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একজন হিন্দু হওয়ার অপরাধে পদে পদে তাকে বিপদে পড়তে হয়েছে। কিন্তু সব কিছুর যেমন শেষ থাকে, সেরকম অনিল বাগচীর হতাশার কালও একসময় শেষ হয়।

 

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ছাড়াও হুমায়ূন চারটি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস লিখেছেন। তার মধ্যে ‘বাদশাহ নামদার’ মোঘল বাদশাহ হুমায়ূনের জীবনী ভিত্তিক। বৃহৎ ক্যানভাসের ‘মধ্যাহ্ন’ ভারত থেকে পাকিস্তানের দেশ ভাগ নিয়ে। এখানে হুমায়ূন কোন পক্ষ না নিয়ে নির্মোহভাবে দেশভাগের ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছেন। কোথাও গিয়ে বুকটা যেন কেঁপে ওঠে অজানা আশঙ্কায়, নির্মমতায়। ‘মাতাল হাওয়া’ ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান নিয়ে রচিত এক মাতাল সময়ের গল্প। আর হুমায়ূন আহমেদ রচিত শেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু নিয়ে রচিত। যদিও হুমায়ূন বইটি শেষ করে যেতে পারেননি, তথাপিও বইটি নিয়ে হুমায়ূনের জীবদ্দশাতেও অনেক বিতর্ক হয়েছিল। তথ্যের বিকৃতি কিংবা সঠিক তথ্যের অভাবে হুমায়ূন লেখাটি পাল্টেছিলেন একাধিকবার।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে হুমায়ূন মানবিকতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। হুমায়ূনীয় ঢঙে লিখে গেছেন একের পর এক আখ্যান। যার মাধ্যমে সময়কে ধরার একটা চেষ্টা করাই যায়।

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি