ভোট রঙ্গে গুচ্ছ ছড়া/ ভাস্করব্রত পতি


মুখ খোলা বারণ আছে

ভাস্করব্রত পতি

'চুপকথা'দের গল্পগাথা
শুনলে পরে লাগবে ব্যাথা!
         রক্তচক্ষু রাখছে নজর
                     মুখটি কভু খুলবে না!!

রক্তলোলুপ হিংস্র মানব
আচরণে আস্ত দানব!
          সব জেনেও আটকে রেখো 
                 জিভখানা বের করবে না!!

চোখের জল আর পেটের খিদে
স্বপন হারা আঁখির নিদে!
         হায় কি হ'ল চাপড়ে কপাল
                      তবুও কিছুই বলবে না!!

সোনার চামচ দিয়েই মুখে
যাঁরা থাকে বেদম সুখে!
         শোষন শাষন দেখেও তুমি
                  আঙুল মোটেও তুলবে না!!

কাঁদলে শিশু জঠর জ্বালায়
মায়ের চোখের ঘুম চলে যায়!
               গুমরে মরো যতো খুশি
                         তবুও জোরে কাঁদবে না!!

খাটছে চাষি ফেলছে ঘাম
মেলেনা তবু উচিত দাম!
          নিচুপ থেকো মড়ার মতো
                         আন্দোলনে নামবে না!!

বিদ্যে বোঝাই ডিগ্রি নিয়ে
ঘুরছে কত বেকার হয়ে!
          স্বপ্নগুলো ঠুকছে মাথা
                        তবুও লড়াই চলবে না!!

আজকে যাঁরা অর্থশালী
এই সমাজটা তাঁদের খালি!
          দীন দরিদ্র ম'রবে কেবল
                   ফিরেও কেউ দেখবে না!!

এটাই এখন আসল নিদান
'চুপকথা'টাই সবার বিধান!
            ফাটবে বুক চড়চড়িয়ে
                          মুখটা তবু ফুটবে না!!


চাইনা ঘাটের মড়া

ভাস্করব্রত পতি

লগবগে নয়
লজঝড়ে নয়,
টগবগে চাই 
চকচকে চাই,
       সতেজ প্রাণের সাড়া !!
সবার মনে
সবার প্রাণে,
       একটাই সুর বাজছে জোরে 
       কাজের মানুষ আসুক দোরে,
"চাইনা ঘাটের মড়া" !!

খরখরে নয়
ঢরঢরে নয়,
ফুরফুরে চাই
কুড়মুড়ে চাই,
         লম্বা রেসের ঘোড়া !!
সবার সাথে
সবার হাতে
         হাত মিলিয়ে কোমর বেঁধে
         জোরসে বলো উচ্চনাদে, 
"চাইনা ঘাটের মড়া" !!

খড়বড়ে নয়
নড়বড়ে নয়,
প্যাঁকপেঁকে চাই
স্যাঁকসেঁকে চাই,
        এক পায়ে যে খাঁড়া !!
সবার বুকে
সবার সুখে,
        সবার হৃদয় উছল হয়ে
        উন্নয়নের জোয়ার চেয়ে,
"চাইনা ঘাটের মড়া" !!


চপে চুল বেছে খাও

চাকরিটা হতে গেলে
     ডিগ্রিটা বড় নয়!
ট্যাঁকে কত জোর আছে
     এটাই আসল হয়!!
ঝাণ্ডাটা বাম হাতে ডাণ্ডাতে বেঁধে নাও!
না হলেই কেটে পড়ে --
                          'চপে চুল বেছে খাও'!!
ঘর ভাঙা টাকা নেবে
     কমিশন দেবে না!
আমরা তো বসে বসে
     আম আঁটি চুষি না!!
বখরাটা আগে ভাগে চুপচাপ দিয়ে যাও!
নাই যদি মানো তবে ---
                              'চপে চুল বেছে খাও'!!
পিচ হবে রাস্তাতে
     স্কুল হবে এলাকায়!
টেণ্ডার পাবে তুমি
     আমাদের জমানায়!!
কড়কড়ে কাটমানি পকেটেতে ভরে দাও!
দিল খুশ না করালে ---
                               'চপে চুল বেছে খাও'!!
রেগা খাতে পাবে কাজ
      যবকার্ড মিলবে!
কথা যদি নাই শোনো
      ঘরে বসে থাকবে!!
ভেবে দ্যাখো এখানেতে সর্বদা কি কি পাও!
বাঁকা পথে চললেই ---
                                  'চপে চুল বেছে খাও'!!

আমার পায়ে চোট

লড়বো আমি
ছুটবো আমি
গড়বো আমি
       সোনার জোট!
হঠাৎ করে
পটাং ছিঁড়ে
সটাং তেড়ে
        লাগলো চোট!!

খেলবো আমি
মারবো আমি
মুছবো আমি
          তোদের ঘোঁট!
কিন্তু রে বাপ
কপাল খারাপ
জমে থাকা পাপ
          লাগলো চোট!!

ছাড়বো আমি?
কাটবো আমি
কাড়বো আমি
             এবার ভোট!
ধোঁকায় সেঁধে
কাপড় বেঁধে
নাটক ফেঁদে
             লাগলো চোট!!


আমরা তো বুড়ো হয়ে গেলাম দাদা

জানেন আমি এম এ বি এড
কিন্তু এখন সব কিছু 'ডেড'।
চাকরি তো নেই, বেকার খাসা
হারিয়ে গেছে সকল আশা। 
মিছেই ডিগ্রি নিলাম শুধু
আজব রাজ্যের আজব যাদু।
          সত্যি বলছি --
আমার মনে, হুতাশ গাদা গাদা!
আমরা তো বুড়ো হয়ে গেলাম দাদা!!

জানেন আমি ইঞ্জিনিয়ার
পড়াশোনা করেই কাবার।
ঘাস কাটছি ঘরে বসে 
গামছা দিয়ে কোমর কষে।
শুনছি বাড়ির গালাগালি
দিচ্ছে সবাই মুখে কালি।
         সত্যি বলছি ---
প্রেস্টিজটায়, একটুও নেই সাদা!
আমরা তো বুড়ো হয়ে গেলাম দাদা!!

জানেন আমি এম বি এ পাশ
লাঙ্গলে এখন করি চাষবাস।
হতাশাতেই মরছি ডুবে
চাকরিটা যে পাবো কবে।
সব অফিসেই বন্ধ কুলুপ
সেথায় নেতার দৃষ্টি লোলুপ।
         সত্যি বলছি --
আমার মতো, নয়কো কেউই হাঁদা!
আমরা তো বুড়ো হয়ে গেলাম দাদা!!

জানেন আমি ডক্টরেট আজ
তবুও আমার জোটেনি তো কাজ।
পেট চালাতে কি দুর্দশা
ডোমের কাজেও প্রবল আশা।
মেডেলগুলো আমায় দেখে 
মিটমিটিয়ে তাকিয়ে থাকে।
         সত্যি বলছি --
আমার নাকি, কপালখানাই ছাঁদা!
আমরা তো বুড়ো হয়ে গেলাম দাদা!!


শুঁটিয়ে লাল করে দেবো

চাওয়া চলবে না চাকরি বা কাজ
চলবে না কোনো দাবি!
মেনে নিতে হবে যেটুকুই দেবো,
যতই খাওনা খাবি!!
মনে রেখো খুব নজর রেখেছি
হিসেবটা বুঝে নেবো!
নইলে তো জানো, আমার দাওয়াই,
"শুঁটিয়ে লাল করে দেবো"!!

চাওয়া চলবেনা গরিবী রেশন,
চলবেনা চাওয়া ভাত!
আধপেটা খেতে পাও কি না পাও,
কিছুতে হবোনা কাত!!
যতদিন আছি চুপচাপ আমি,
একাজই করে যাবো!
মুখ খোলা বড় না পসন্দ মোর,
"শুঁটিয়ে লাল করে দেবো"!!

চাওয়া চলবেনা বাড়ি ঘর দোর,
চলবেনা গলাবাজি!
যেটুকুই পাবে সেইটুকুতেই,
মনেপ্রাণে থেকো রাজি!!
কোনও রূপ উঁচু আওয়াজ দেখলে,
কড়মড় করে খাবো!
একটাই কথা জপে যাও সবে,
"শুঁটিয়ে লাল করে দেবো"!

চাওয়া চলবেনা পথ আলো জল,
চলবেনা বেশি সুখ!
এই বঙ্গেতে হাসিঠাট্টায়,
থেকো ভুলে সব দুঃখ!!
সব কাজ শেষ করেছি আগেই,
এবার একটু শোবো!
ভাঙিওনা ঘুম, নচেৎ আমি,
"শুঁটিয়ে লাল করে দেবো"!!


একটা বেড দিতে পারো? 

একটাই ছেলে আমাদের বুকে,
রেখেছি যে তাঁকে মোটামুটি সুখে।
হঠাৎ কষ্ট একরাশ ভয়,
মন যেন বলে কি হয় হয়।
যন্ত্রনাতে কঁকিয়ে বলে --
'মাগো আমায় ধরো'!!
একটা বেড দিতে পারো??

হাসতো খেলতো আপন মনে,
পড়তো ভালো একা নির্জনে।
বড় হতে হবে এই ভাবনা,
মনের কোনে অনেক বাসনা।
হঠাৎ কি যে হয়ে গেলো আজ --
কাঁপছে থরো থরো!!
একটা বেড দিতে পারো??

জ্বর কাশি আর শ্বাসকষ্ট,
আমাদের কাছে সব স্পষ্ট।
যে করেই হোক বাঁচাতেই হবে,
আমাদের ছেলে আমাদের রবে।
কিন্তু খুবই কপাল মন্দ --
কান্না ঝরো ঝরো!!
একটা বেড দিতে পারো??

চার হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে,
মিললোনা ঠাঁই ছেলেটার তরে।
অক্সিজেনের নল জোটেনি,
প্রাণবায়ু তাই আর টানেনি।
তোমরা কেবল জানিয়ে দিলে --
কাঠের কফিনে পুরো!!
একটা বেড দিতে পারো??

চারিদিকে নাকি পরিষেবা ভরা,
ডাক্তার, নার্স, মেডিসিনে ঘেরা।
সব ব্যবস্থা পাকা করা আছে,
অসুবিধা নেই রোগীদের কাছে।
তবে কেন বলো আমার ছেলেটা -- 
অকালেই হোলো 'হেরো'??
একটা বেড দিতে পারো??


সব সত্যি কথা বলতে নেই

এই যে আমি চাকরি পেলাম
দশ লক্ষ দাদায় দিলাম,
পরীক্ষাতে পাশ না করেও 
          নাচছি তা ধেই ধেই!!
          সব সত্যি কথা বলতে নেই!!

কোটি কোটি কাজের বরাত
দেবেই যাঁরা নেতাদের সাথ,
'বখরা' শুধু পৌঁছে দিলে
          কাজ খানা জুটবেই!!
          সব সত্যি কথা বলতে নেই!!

বদলী চাই যে বাড়ির কাছে
আরে আমার 'দাদা' আছে,
যেকোনও কাজ হবেই হবে
           মাল কিছু খাওয়ালেই!!
           সব সত্যি কথা বলতে নেই!!

চুরি করে পড়েছি ধরা
থানা পুলিশ সব হতচ্ছাড়া,
আমি যে খুব 'কাজের ছেলে'
           জানে যে সব্বাই!!
           সব সত্যি কথা বলতে নেই!!

জমি দখল, সিণ্ডিকেটে
বুদ্ধি আমার পেটে পেটে,
এই বাজারে সাত খুন মাফ
           কেউ পাবেনা খেই!!
           সব সত্যি কথা বলতে নেই!!

মনটা আমার 'ট্রিগার হ্যাপি' 
তুললে মাথা আলতো চাপি,
ভোটের বাক্স উপচে পড়ে
            আমার কথাতেই!!
            সব সত্যি কথা বলতে নেই !!

বেশ তো চলছে সরকার

হাসপাতালে নেই বেড,
ইসকুলেতে নেই শেড!!
          বলো কার কি দরকার?
সবাই জানে
সবাই মানে,
          বেশ তো চলছে সরকার!!

এম এ বি এড করেও পাশ,
রাস্তাঘাটে কাটছে ঘাস!!
           কিভাবে কাটছে তাঁর?
কানের খাঁজে
তুলো গুঁজে, 
           বেশ তো চলছে সরকার!!

রাস্তাগুলো হতচ্ছাড়া,
কাটমানিতে নজরকাড়া!!
            বলার আছে কি আর?
মুখে কালি
চোখে ঠুলি,
            বেশ তো চলছে সরকার!!

রুজি রুটির দরজা বন্ধ,
আমরা সবাই সেজেছি অন্ধ!!
              কার মাথায় কটা ঘাড়?
বলো জোরে
রাতে ভোরে,
               বেশ তো চলছে সরকার!!


লাগলে বোলো

বাবু আমি গরিব ভীষণ 
দ্যান না কিছু চাল!
ভুখা পেটে চারখানা লোক
নেই উনুনে জ্বাল!!
দিতেই পারি সবকিছু তো 
মাল্লু কিছু ফ্যালো!
আরে, আমি হোলাম জননেতা --
'লাগলে বোলো'!!

নতুন বাড়ি হচ্ছে আমার
কাঁচা থেকে পাকা!
কুড়ি পার্সেন্ট কাটমানিতো
আগে থেকেই রাখা!!
বললে 'দাদা', রোসো রোসো
একটু চেপে চলো!
দানছত্তর খুলিনি হেথা --
'লাগলে বোলো'!!

এম এ বি এড ডিগ্রি নিয়েও
জীবনখানাই নষ্ট!
চাকরি পেতে সেই ভরসা 
এম এল এ ফাটাকেষ্ট!!
ষোলো লাখের কড়কড়ে নোট
বস্তাভরে ঢালো!
এই বাজারে একটাই সুর --
'লাগলে বোলো'!!

ঝড়ের টাকা, ত্রাণের টাকা
কৃষির ক্ষতিপূরণ!
একশো দিনের কাজেও তোমার
জুটবে ভরণ পোষণ!
শুধু তোমায় দুটি চোখে
থাকবে ঠুলি কালো!
সব কাজে তাই শুনতে পাবে --
'লাগলে বোলো'!!

পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি