চিনের লোকগল্প (সোনার দ্বীপে সাবধান)/ চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লােকগল্প (চীন)

চিন্ময় দাশ

সােনার দ্বীপে সাবধান

এক গ্রামে বাস করত এক গরীব চাষী। থাকবার মধ্যে তার ছিল সামান্য খানিকটা জমি। দুটো বলদ। আর, দুটো ছেলে।

দুই ভাই-- কিন্তু একেবারে দু'রকম তারা। বড়টা যেমন লােভী, তেমনি স্বার্থপর। ছােট ছেলেটা একেবারে উলটো। লােভ কী জিনিষ, জানেই না। খুব দয়ালুও সে।

একদিন মারা গেল চাষীটি। মওকা পেয়ে, বড়ভাই করল কী, সাথে সাথে জমি আর বলদ দুটো নিয়ে নিল নিজের জন্য। তার বউ তো ভারি খুশি তা দেখে। দয়া করে একটা কাটারি আর একটা ঝুড়ি হাতে ধরিয়ে দিয়ে, দাদা তার ভাইকে বলল-- বড় হয়েছ। এবার খেটে খেতে শেখাে।

কী আর করে, বনে গিয়ে কাঠকুটো কাটে ছেলেটা। তাই বেচে পেট চালায় সে। এদিকে বাবার জমি আর বলদ দুটো নিয়ে, বড়ভাই আর তার বউ সুখেই আছে।

একদিন বনে এসেছে ছােট। যেমনটা সে নিত্যদিন আসে। নিজের মনে হাঁটতে হাঁটতে, পাহাড়ের একেবারে চুড়ায় উঠে পড়েছে এক সময়। ভারি পা দুটো নিয়ে একটা পাথরের উপর সবে বসেছে, হঠাৎই শোঁ-শোঁ আওয়াজ। একটু বাদেই বিরাট এক পাখি নেমে এল আকাশ ফুঁড়ে। কী বিশাল দুখানা ডানা তার!

পাখি তাকে দেখে বলল-- কে বাছা, তুমি ? একলা বসে কেন?

-- ভারি অভাব গো আমার। পেট চলাই দায়। তাই কাঠ কাটতে আসি। আজই কেবল এতটা উপরে উঠেছি।

পাখি বলল-- তাই বটে। নিত্য দিন যাই এ পথ দিয়ে। কোনও দিন দেখিনি কাউকে।

পাখিটার গলা বেশ দয়ালু। ছেলেটার বেশ ভালো লাগল কথা বলতে। বলল-- কোথায় যাও তুমি ? থাকো কোথায় ?

-- আমি থাকি সে অনেক দূরের এক দেশে। অনেক দূর। সেখানেও অভাব খাবারের। তাই তো যাই সূর্যের দেশে, খাবার খুঁটে খেতে। এবার পাখি বলল-- যাবে তুমি? চলাে আমার সাথে। সত্যি যদি অভাবী হও, উপকারই হবে। পেটের ভাবনা আর থাকবে না তােমার।

ছেলেটার বেশ আশা জাগল মনে। বলল-- কিন্তু যাব কী করে? সামনে তাে সমুদ্র। আমার তাে আর ডানা নাই।
-- তা বটে, তােমার ডানা নাই। কিন্তু আমার তাে আছে। তােমার মত পাঁচ-দশজনকে নিয়ে উড়ে যেতে পারি আমি। এতটাই বড় আর মজবুত ডানা আমার। পাখি বলল-- অতো ভাবতে হবে না, বন্ধু। বিশ্বাস করো আমাকে। চটপট উঠে পড় তাে দেখি। সন্ধ্যা নেমে আসছে।

ছেলেটাকে পিঠে নিয়ে, আবার আকাশে ডানা মেলে উড়ে চলেছে পাখিটা।

বন পিছনে রইল পড়ে
উড়ল পাখি পাহাড় ছেড়ে
জল বিছানাে নীচটা জুড়ে
সূর্যের দেশ অনেক দূরে
             অ-নে-ক দূরে।

নীচে অথৈ সমুদ্র। কোন দিকেই সীমানা দেখা যায় না, এতটাই ছড়ানো। পাখির পিঠে চেপে উড়ে যাচ্ছে ছেলেটা। বাতাসে শোঁ-শোঁ আওয়াজ ভাসছে ডানার।

-- শােন গাে ভালমানুষের ছেলে। সূর্যের দ্বীপে নিয়ে যাচ্ছি তােমাকে। পাখি বলতে লাগল-- সেখানে সােনার টুকরাে ছড়িয়ে আছে চারদিকে। তার থেকে একটা টুকরাে তুলে নেবে তুমি। তাই বেচে, তােমার সারা জীবনের অভাব চলে যাবে। তবে হ্যাঁ, একটাই নিয়ো কিন্তু।

দ্বীপে নেমে, চোখ ধাঁধিয়ে গেল ছেলেটার। চারদিকে সােনা ছড়ানাে। সূর্য এখন ডুবুড়ুবু। তার মরা রোদে জ্বলছে সােনাগুলাে। মিষ্টি আলোয় ভরে আছে চার দিক। স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে পুরাে ব্যাপারটা। অবাক চোখে সেই আলাের জগতটাকে দেখতে লাগল সে।

পাখি চলে গিয়েছিল নিজের খাবারের জোগাড়ে। ফিরে এসে বলল-- কিগাে, কী দেখছ অত? এক টুকরাে সােনা কুড়িয়ে নাও পছন্দ মত। ফেরার সময় হল।

হাতের সামনে যা ছিল, একটা টুকরাে তুলে ঝুড়িতে রেখে দিল ছেলেটা। পাখির পিঠে চেপে বসতেই, ডানা মেলে দিল পাখি।

সােনা পিছনে রইল পড়ে
উড়ল পাখি দ্বীপটি ছেড়ে
জল বিছানাে নীচটা জুড়ে
পাহাড় এখনাে অনেক দূরে
                  অ-নে-ক দূরে।

এক সময় পাহাড়ের মাথায় এসে পৌঁছলাে তারা। পাখি ছেলেটাকে বলল-- চলি, বন্ধু। সুখে থেকো। আর তো দেখা হবে না আমাদের। ভুলে যেও না যেন।
তার চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল ছেলেটা। চোখের কোণ চিকচিক করছে তার।

ঘরে ফিরল ছেলেটা। সােনা বেচে, কতকগুলাে শুকর, বেশ কয়েকটা মুরগীর ছানা কিনল বাজার থেকে। কিনল এক পাল ছাগল, আর দুটো গাইগরুও।

একটু একটু করে অবস্থা ফিরতে লাগল তার। এখন হপ্তায় দুদিন হাটে যায় সে। ডিম, মােরগ, শুকর বিক্রি করে। কলসী করে দুধ-ঘিও বেচে এখন সে।

ছােটর উন্নতি দেখে, বড় ভাইয়ের ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। ব্যাপারটা কী ? গুপ্তধন পেয়েছে নাকি? তার বউ বলল-- একবার জিজ্ঞেস করে দেখাে না তোমার ভাইকে। বড়ভাই গিয়ে জিজ্ঞেস করল-- কী রে, এতসব করলি। পয়সাকড়ি পেলি কোথায় ?

ছােটভাই তাে বরাবরই সরল মানুষ। সব কথা গড় গড় করে দাদাকে বলে গেল সে।

শুনে চোখ জ্বলে উঠল বড়ভাইর। লোভে চকচক করতে লাগল তার চোখ দুটো। ভাবল, তাকেও যেতে হবে সেই দ্বীপে। এক টুকরাে নয়, ঝুড়ি ভরে সােনা আনবে ঘরে। তখন এ মুল্লুকে তার মত বড়লােক আর কেউ থাকবে না। কত খাতির হবে তখন তার গােটা তল্লাট জুড়ে। ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরবে সবাই। 

দেরী সইল না তার। পরদিনই ভাইয়ের ঝুড়ি আর কাটারিটা নিয়ে রওণা হল দাদা। একেবারে পাহাড়ের চূড়ায় এসে, বসে রইল পাখির আসার পথ চেয়ে। সূর্য যখন ঢলে পড়েছে, শোঁ-শোঁ আওয়াজ তুলে নেমে পড়ল পাখিটা।

-- কী বাছা, এখানে একলাটি বসে আছ কেন?

-- সাধে কি আর বসে আছি? অভাবের সংসার। ঘরে কিচ্ছুটি নাই। পেট চলবে কী করে, তাই ভাবছি ?

-- সত্যি বলছ? মিছে কথা নয় তাে ? পাখি জানতে চাইল।

ছেলেটা তাে খুব চতুর। তাড়াতাড়ি বলল-- তােমাকে মিছে বলে লাভ কী আমার ? তুমি কি আর টাকাকড়ি দেবে আমাকে, না সােনাদানা এনে দেবে?

পাখি বলল-- সােনাদানা চাই তােমার ? চলাে আমার সাথে। সমুদ্রের ওপারে একটা দ্বীপ আছে। সােনা একেবারে বিছিয়ে আছে সেখানে। চলো, নিয়ে যাব তোমাকে। তবে একটা টুকরােই নিতে পারবে তুমি। বেশি নয় কিন্তু।

দ্বীপে এসে যখন নামল দুজনে, সূর্য তখন ডুবুডুবু। মাঠময় সােনা বিছানাে। শেষ রােদ পড়ে সােনাগুলাে যেন জ্বলছে। দেখে তাে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার যােগাড় হল ছেলেটার।

পাখি বলল-- যে কোনও একটা টুকরাে বেছে রাখো তুমি। একটাই কিন্তু। আমি ফিরে এসে নিয়ে যাব তােমাকে।

কথাগুলাে কানে গেল কি গেল না ছেলের। সে সোনা কুড়াতে লেগে গেল। একটা টুকরাে তুলে, ভাবল- এটা দিয়ে গরু-বাছু কিনব। আর একটা নিয়ে ভাবল, এটা দিয়ে বাড়ি বানাব ভালাে করে। তিন নম্বর টুকরােটা তুলে ভাবল, একটা ঘােড়া কিনব ভালাে দেখে। এবার মনে হল, অনেকটা জমি কিনলে, তবেই না জমিদার বলে মানবে লােকে। এবার এক আঁজলা সােনা তুলে রেখে দিল ঝুড়িতে। এর পর শুরু করল, বড় বড় টুকরো খুঁজে বেড়ানো। এগুলো সব সিন্ধুকে জমিয়ে রাখব। পায়ের উপর পা তুলে, বসে বসে খাবে নাতি-পুতিরা। 

এই ভাবে খুঁজে খুঁজে এক-একটা বড় টুকরো তোলে, আর ঝুড়িতে ভরে ফেলে। ঝুড়ি ভরে উঠেছে, তবুও সােনা কুড়ানাের খামতি নাই তার। একটাই ভাবনা তার মনে- আরও কয়েকটা নেওয়া যাক। আরও কয়েকটা।

পাখি কিন্তু ফিরে এসেছে। চুপচাপ দেখছিল সব বসে বসে।সাড়াটিও দেয়নি। 
এদিকে সকাল হয়ে আসছে। রােদ উঠলে, আর এক দণ্ড থাকা যাবে না এখানে। ঝলসে গিয়ে অন্ধ হয়ে যাবে চোখ জোড়া। তারপর বাড়বে গরম। জ্বলে পুড়ে মরে যেতে হবে শেষকালে।

সে ব্যস্ত হয়ে ছেলেটাকে বলল-- অনেক হয়েছে। এবার ঘরে চলাে।

ছেলের তখন আরও সােনা চাই। ফিরেও তাকালাে না পাখির দিকে। চোখ না তুলে বলল-- ব্যস্ত হয়াে না তাে। আর দুমুঠো নিয়ে নিই।

কোনও কথা বলল না পাখিটা। মুচকি হাসলাে একটুমাত্র। নীরবে ডানা মেলে, চলে গেল দ্বীপ ছেড়ে। নির্জন দ্বীপে একা, একেবারে একা পড়ে রইলাে ছেলেটা।
ঝলকানি 
ঝুড়ি যখন উপচে পড়ার জোগাড়, তখন থামল সেই ছেলে। সূর্য উঠে গেছে খেয়াল নাই তার। রােদ পড়ে জ্বলে উঠছে সােনাগুলো। যেই না পূব দিকে ফিরেছে, অমনি আলাের ঝলকানি লেগে, দুটো চোখই অন্ধ হয়ে গেল। গভীর অন্ধকার চার দিক জুড়ে। কিছুই দেখতে পেল না আর। কোথায় সােনা ভর্তি ঝুড়ি, কোথায় পাখি, কিছুই না।

চিৎকার করে পাখিকে ডাকতে লাগল। কোন দিক থেকে কোন সাড়া নাই। গা যেন পুড়ে যাচ্ছে রােদের তাতে। রােদ বাড়তে লাগল যত, যন্ত্রনা বাড়তে লাগল সমানে পাল্লা দিয়ে। আতঙ্কে দিশেহারা অবস্থা। পাগলের মত ছােটাছুটি শুরু করে দিল ছেলেটা। তারপর? তারপর এক সময় লুটিয়ে পরে রইল সোনা বিছানো মাটিতে। যাকে বলে একেবারে সোনার বিছানায়।

এদিকে হেসে খেলে দিন চলে যায় এখন ভাইটার। অবস্থা ফিরছে একটু একটু করে। পাড়া-পড়শিদের কারও অভাব দেখলে, নিজের পুরানাে দিনগুলাের কথা মনে পড়ে যায় তার। সবাইকে সাহায্য করে সে। এমনকি, বড়ভাইয়ের বেচারী বউটিকেও নিত্য দু'বেলা খাবার-দাবার দিয়ে আসে সে।

পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি