আবৃত্তির পাঠশালা-১৬/শুভদীপ বসু

আবৃত্তির পাঠশালা-১৬

শুভদীপ বসু

বিষয়-ছন্দ(প্রথম পর্যায়)

একটা কবিতা আবৃত্তি করার জন্য কোনটি প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন স্বরব্যবহারের জ্ঞান নাকি ছন্দ বিচারের শক্তি? একটা কবিতাকে যখন প্রথম পড়বো,তখন কিভাবে পড়বো? গদ্য করার ভঙ্গিতে নাকি কথোপকথনের ভঙ্গিতে? কবিতাটি পড়ার সময় যেমন খুশি বাক্যগুলো কেটে কেটে বলতে হবে নাকি তাল নয় এসব বলার মধ্যে থাকবে?

  ছন্দ যদিও একটা পুঁথিগত ব্যাপার।যার একটা ব্যাকরণ রয়েছে।তবুও আবৃত্তিকারকে ছন্দ বুঝে নিতে হবে শিল্প প্রকরণ হিসেবে।প্রকৃতি ও পারিপার্শ্ব পুঁথির পাশাপাশি যদি আবৃত্তিকারের শিক্ষক না হয়, তাহলে ছন্দ কে ঘিরে আবৃত্তিকারের সৃষ্টিশীল মন তার কল্পনা শক্তি বিকাশের ও বিস্তারের অবকাশ পাবেনা।
বিশ্ব প্রকৃতি ও ছন্দ: আমাদের বিশ্ব প্রকৃতিও ছন্দে বাধা। দিন-রাত্রি, আলো অন্ধকার, উত্তরায়ন ও দক্ষিনায়ন এই সমস্ত কিছুর মধ্যেই একটা ছন্দ রয়েছে। নিস্তব্ধ দুপুরে ধরুন কোথাও ঢেঁকির পাড় পড়ছে, ১-২-৩-৪-৫বার শোনার পর পরবর্তী পড়ার শব্দের জন্য আপনি অপেক্ষা করে থাকবেন। আবার ধরুন চলন্ত ট্রেনে কোন দোদুল্যমান যন্ত্রের উত্থান পতন আপনাকে ছন্দের কথা মনে করাবে।কিংবা নির্জন বাগানে একটা ঘুঘু ডাকছে।বেশ কিছুটা সময় এর ফাঁক আছে দুটি ডাক এর মধ্যে।অথচ ক্রমশই জেগে উঠছে প্রত্যাশাবোধ। ট্রেনের শব্দের মধ্যে যেরকম দ্রুতলয়ের ছন্দ লুকিয়ে রয়েছে ঠিক একইভাবে ঘুঘুর ডাক শোনার ছন্দের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বিলম্বিত লয় এর ছন্দবোধ। তাহলে এরপর দেখে নেওয়া যাক ব্যাকরণ গত দিক থেকে ছন্দ কি?
  ছন্দ: কবিতার সুপরিমিত ধ্বনি বিন্যাসই ছন্দ। অন্যভাবে বলা যায় ধ্বনির পরিমিত নির্দিষ্ট পর্যায়ক্রমিক বিন্যাস ছন্দ।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বললেন-"কথাকে তার জড়ত্বধর্ম থেকে মুক্তি দেবার জন্যই ছন্দ।
  সেতারের তার বাধা থাকে বটে, কিন্তু তার থেকে সুর পায় ছাড়া। ছন্দ হচ্ছে সেই তার বাধা সেতার, কথার অন্তরের সুরকে সে ছাড়া দিতে থাকে।"
ছন্দের উপকরণ: ছন্দ ভাষার প্রবহমান ধ্বনি সৌন্দর্য। এই ধ্বনি সৌন্দর্য সৃষ্টি করেন কতগুলো উপকরণ।১)ধ্বনি ২)অক্ষর ৩)মাত্রা ৪)ছেদ ও যতি ৫)পর্ব ও পর্বাঙ্গ ৬)পদ ও চরণ ৭)পংক্তি ও স্তবক ৮) মিল ৯)লয়।

১)ধ্বনি:মানুষের ইচ্ছায় তার গলা থেকে স্বর বের হয়ে বায়ুস্তরে শোনার মত যে স্পন্দন তোলে তাকে অর্থাৎ সেই স্বরকে ধ্বনি বলে।যেমন-অ,আ,ই,ঈ,ক,খ উচ্চারণ করার সময় আমাদের গলা থেকে স্বর বেরিয়ে বাতাসে স্পন্দন তুলে ধ্বনি সৃষ্টি করে।
বর্ণ হল ধ্বনির প্রতীক।বস্তুতপক্ষে ধ্বনির কোনো ছবি নেই।কিন্তু যদি তাকে ছবিতে রূপ দেওয়া হয় তবে যা দাঁড়াবে সেটাই হলো বর্ণ।
২) অক্ষর বা দল:বাগযন্ত্রের সামান্য চেষ্টায় বা একঝোঁকে শব্দের যে ক্ষুদ্রতম অংশ উচ্চারিত হয় তাকে অক্ষর বা দল বলে।
ক) মুক্ত দল:এই দল উচ্চারণ করার সময় নিঃশ্বাস এর গতিপথ মুক্ত থাকে।অক্ষরের শেষে সাধারণত স্বরধ্বনি থাকে।
খ) রুদ্ধ দল:এই দল উচ্চারণ করার সময় নিশ্বাসের গতি পথ রুদ্ধ থাকে।অক্ষরের শেষে সাধারণত ব্যঞ্জনধ্বনি থাকে।
৩) মাত্রা বা কলা: একটা অক্ষর উচ্চারণ করতে যে সময় লাগে সেই সময়টাকে বলা হয় মাত্রা বা কলা। একে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়-ক)একটা মুক্ত অক্ষর উচ্চারণ করতে যত সময় লাগে তা একমাত্র।খ)একটা রুদ্ধঅক্ষর উচ্চারণ করতে যে সময় লাগে তা দুইমাত্রা।

 (ছন্দের পরবর্তী পর্যায়ে এর অন্যান্য উপকরণ গুলি নিয়ে আলোচনা করা হবে।)
পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি