হীরক রাজা : ফ্যাসিবাদ বিরোধী সত্যজিৎ ও সমাজ বাস্তবতা/রাকেশ সিংহ দেব

হীরক রাজা : ফ্যাসিবাদ বিরোধী সত্যজিৎ ও সমাজ বাস্তবতা

রাকেশ সিংহ দেব 

মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে বিশাল এক মূর্তি। কোমরে দড়ি পরানো। আঙুলের ফাঁকে সিগারেট জ্বালিয়ে পরিচালক বুঝে নিতে চাইছেন দৃশ্য। খেরোর খাতা আর চিত্রনাট্য ধরে মিলিয়ে নিচ্ছেন শেষ প্রস্তুত। অ্যাকশন! আর সাথে সাথেই উদয়ন পন্ডিত খনি শ্রমিক কৃষক মজুর সবাই মিলে দড়ি ধরে টান মারবে। খানখান হয়ে ভূলুণ্ঠিত হবে শয়তানি ফ্যাসিবাদের প্রতীক হীরক রাজার মূর্তি। পতন ঘটবে ফ্যাসিবাদের। উত্থান হবে গণআন্দোলনের। বিজয়ী হবে জনগণ। শান্তি! প্রশান্তির হাসি খেলে গেল পরিচালকের ঠোঁটে। তিনি পেরেছেন। পেরেছেন প্রতিবাদের রণদামামা না বাজিয়েও নান্দনিকতার নরম হাতে ফ্যাসিবাদের গালে, অত্যাচারী শাসকের গালে বিরাশি সিক্কার চাপিয়ে দিতে। মানুষ হয়ত হারিয়ে যাবে কালের স্রোতে কিন্তু চিরকাল রয়ে যাবে এই সৃজনশীল প্রতিবাদের বার্তা। সাক্ষ্য দেবে সেলুলয়েডের পর্দা। পরিচালক চোখ রাখলেন ক্যামেরায় - রোলিং এন্ড অ্যাকশন। 

  প্রতিটি সৃজনশীল মানুষের সৃষ্টির গল্প প্রায় একইরকম। পার্থক্য বুনে দেয় হৃদয় ছোঁয়ার স্পর্শগুলি। বাঙালির জীবনে নবজাগরণ এর প্রবর্তক যদি হয়ে থাকেন চিন্তাবিদ রাজা রামমোহন রায় তাহলে তার মুক্তচিন্তার স্রোত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সারস্বত সাধনা বেয়ে থিতু হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের সৃজনশীল উপস্থাপনে। ভারতবর্ষ তথা উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী সত্যজিৎ রায়ের গুনের শেষ নেই। রং-তুলি, কাগজ-কলমের পাশাপাশি সেলুলয়েডের পর্দাতেও তিনি গল্প বুনেছেন সমান মুন্সীয়ানায়। ভারতীয় সিনেমা বিগত দশকে অতিক্রম করেছে তার গৌরবময় একশত বছর। ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক ও পথিকৃৎ হীরালাল সেন নাকি দাদাসাহেব ফালকে তা নিয়ে কিঞ্চিৎ দ্বিমত থাকলেও ভারতীয় সিনেমার যথার্থ পরিচিতি ছিলেন সত্যজিৎ রায় এবিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। সত্যজিতের ছবি প্রথম ভারতীয় জীবন ও সমাজকে যথাযথভাবে সেলুলয়েডের পর্দায় তুলে ধরেছিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে। তিনি ভারতীয় নব্য বাস্তব সিনেমার ভগীরথ, তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতেই ভারতীয় সিনেমার প্রবাহমানতা চাক্ষুষ করেছিল সমগ্র বিশ্ব। 
বক্তব্যের আন্তর্জাতিকতায় এবং জীবন দর্শনের বীক্ষণে তাঁর তৈরি চলচ্চিত্রগুলি বিষয়বৈচিত্র্য এবং প্রয়োগ শৈলীর উৎকর্ষতায় যেন হয়ে উঠেছে এক একটি সমাজ জীবনের বাস্তব দলিল যা রীতিমতো প্রাসঙ্গিক এবং যাদের আবেদন সমকালীন। সিনেমা নির্মাণের কলাকুশলতায় হয়তো কিছু অভাব ছিল কিন্তু তিনি গল্প বলার মাধ্যমে দর্শকদের স্পষ্টভাবে এক গভীর মানবিক জীবন-দর্শনের কথা শুনিয়েছেন।

  ‘পথের পাঁচালী’ যদি হয় গ্রামীণ বাংলার রূঢ় বাস্তব ছবি তাহলে ‘মহানগর’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘গণশত্রু’, ‘শাখা-প্রশাখা’, ‘জনঅরণ্য’, ‘আগন্তুক’, ‘সীমাবদ্ধ’- তৎকালীন নাগরিক জীবনের দলিল। সবচেয়ে আশ্চর্য হতে হয় শিশু-কিশোরদের জন্য বানানো ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিটি দেখে। শিশুদের মন জয় করার উপকরণ এর পাশাপাশি তাতে তিনি রেখেছেন বড়দের জন্য চিন্তার খোরাক। সত্যজিতের কোন ছবিতেই জোরালো বিদ্রোহ ও বিপ্লবের চিল চিত্কার নেই অথচ রয়েছে প্রতিবাদের তীব্র চাবুকের ঝলক। প্রতিবাদের সাথে কাব্যিক নান্দনিকতা মিশে যায় সৃজনশীলতার আবহে। তিনি যখন ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ করেছেন, তখনও তৎকালীন সমাজের সাধারণ মানুষের দিকেও ক্যামেরা ঘুরিয়েছেন, পাশাপাশি আযোধ্যার নবাব, বিদেশি শাসক ও মন্ত্রীদের জীবনযাত্রাকেও সমান ভাবেই ফোকাস করেছেন।এখানেই তাঁর সমাজ ও সময় চেতনার পরিচয়! 
  মৃণাল সেন তাঁর ছবিকে একসময় এক বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের কথা প্রচার করেছিলেন, সত্যজিৎ কখনোই তেমন করেননি। তিনি শিল্পের প্রতি বেশি দায়বদ্ধ ছিলেন, রাজনীতির চেয়ে। না, সেজন্য তাঁকে কখনোই অরাজনৈতিক মনোভাবের শিল্পী বা মানুষ বলা যাবে না। তিনিই প্রমাণ করে গেছেন শিল্পসৃজন ও রাজনৈতিক ভাবধারা, সমাজ সচেতনতা হাত ধরাধরি করে চলতেই পারে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে বহু এই কথাই বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। এসেছে রূপকের আড়ালে। তাঁর কাজের রূপকধর্মিতার আড়ালে গভীর ব্যঞ্জনা, সমাজকে তর্জনী তুলে চোখে আঙুল দিয়ে সত্যিটা দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়াস এই প্রসঙ্গে সবার প্রথম যে সিনেমাটির নাম অগ্রগণ্য তা হল ‘হীরক রাজার দেশে’। ছোটদের ছবির আড়ালে, রূপকথা এবং ফ্যান্টাসির আড়ালে নির্মম বাস্তবকে চরম ভাবে তুলে ধরা। আদতে রূপকের আড়ালে আদ্যোপান্ত একটি রাজনৈতিক ছবি। এক্ষেত্রে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে আইকনিক চরিত্র উদয়ন পন্ডিত। ছবির প্রথমভাগে রাজ অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে সে দীপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করছে  “অনাচার কর যদি রাজা তবে ছাড়ো গদি। যারা তার ধামাধারী, তাদেরও বিপদ ভারী।”  যাঁকে ছবির শেষের দিকে দেখা যায় হীরক রাজা সহ পারিষদদের যন্তরমন্তর মগজধোলাই ঘরে ঢুকিয়ে মগজধোলাইয়ের মন্ত্র দিতে।
 
  প্রসঙ্গত এই ছবি যখন তৈরি হয় তখন দেশে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার। দেশে চলছে ইমার্জেন্সি পরবর্তী থমথমে পরিস্থিতি। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই ছবি কি প্রতিবাদের স্বরূপ হয়ে ওঠেনি? শুধু এটুকুই না, হীরক রাজার দেশের প্রতিটি ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে সমকালীন সমাজে কৃষক শ্রমিক মানুষের যন্ত্রনার কথা। যেমন যন্তর মন্তর মগজধোলাই ঘরে কৃষকের জন্য মন্ত্র হল “বাকি রাখা খাজনা, মোটে ভালো কাজ না’, ‘ভরপেট নাও খাই, রাজকর দেওয়া চাই, ‘যায় যদি যাক প্রাণ হীরকের রাজা ভগবান’। বর্তমান প্রেক্ষিতে প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষক মৃত্যুর সাথে কি মিল তাইনা? ২০১৬ সালে পানামা পেপার লিকের মধ্য দিয়ে সবাই জেনেই গেছে দেশের তথাকথিত বড়লোক আমলারা রাজকর ফাঁকি দেন আর তার বোঝা বয়ে চলে সাধারণ রোজগেরে মানুষ। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়মকানুন থেকে তাদের পালানোর পথ নেই। আবার এই বড়লোক আধিকারিকরা সাধারণ করদাতাদের কানে বিষ ঢেলে বলে - "বাকি রাখা খাজনা মোটে ভালো কাজ না। " আর আজকের তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর দিনে দাঁড়িয়ে মগজধোলাই আরও ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক। সোশ্যাল মিডিয়া, গণমাধ্যমে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের সব স্তরে। গিলছে মানুষ। হচ্ছে মগজধোলাই। বিবেক বুদ্ধি অন্যের জিম্মায় রেখে মানুষ আজ পথভ্রষ্ট। এইভাবেই তো ফ্যাসিবাদের বিষ চারিয়ে যায় সমাজের শিরায় উপশিরায়। 

  আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সারা বিশ্বব্যাপী উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, ফ্যাসিস্ট মনোভাব, রাজার অনাচার, রাজধর্ম পালনে অক্ষমতা, অবহেলিত কৃষক শ্রমিকদের চোখের জল, স্পষ্টবাদীদের শাস্তি প্রদান এই পরিস্তিতিতে দাঁড়িয়ে উদয়ন পন্ডিতের প্রাসঙ্গিকতা কি যথেষ্ট সমকালীন নয়?

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি