সত্যজিতের সাহিত্যপ্রতিভা/সুদর্শন নন্দী

সত্যজিতের সাহিত্যপ্রতিভা

সুদর্শন নন্দী  

বিশ্বখ্যাত চলচিত্র পরিচালক হিসেবে  বেশি পরিচিত, প্রশংসিত ও সম্মানিত হলেও তিনি কবিগুরুর মতোই সাহিত্যে ছাপ রেখে গিয়েছেন বাংলা ও বাঙালি থেকে বিশ্ববাসীর হৃদয়ে।   সত্যি বলতে কি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর এমন আন্তর্জাতিক মানের বহুমুখী প্রতিভা আর দেখা যায়নি। তিনি আর কেউ নন, ফেলুদা, প্রোফেসর শঙ্কু, তারিণীখুড়ো চরিত্রের স্রষ্টা সত্যজিৎ রায় তিনি, বহুমুখী ব্যক্তিত্বের প্রতিভূ। কিন্তু আমরা আত্মবিস্মৃত বাঙালি, সাহিত্য-সংস্কৃতির গর্ব করার কাণ্ডারিরা সেই স্রষ্টাকে কতটা মনে রেখেছি? হ্যাঁ, এই বছরের ২রা মে কিন্তু তাঁর জন্ম শতবর্ষপুর্তির দিন। এবছর সেদিন (২রা মে) আবার হুজুগে বাঙালি মাতবে নির্বাচনের ফলের হার জিত  নিয়ে । সত্যজিৎ কতটা সত্য হয়ে উঠবেন বাঙালি হৃদয়ে তা ভাবার বিষয়।   

  আমরা জানি, সত্যজিৎ রায়  অসামান্য চলচ্চিত্র নির্মাণ  ছাড়াও যে দাগ রেখে যাওয়া সাহিত্যের তিনি সৃষ্টি করেছেন তা বাঙালির গর্বের ।  বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গণে তাঁর পদচারণা যেন তাঁর খ্যাতিমান পূর্বজদের অর্থাৎ দাদু উপেন্দ্রকিশোর ও পিতা সুকুমার রায়ের যথার্থ  উত্তরসূরি হিসেবে । বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের যখন অন্তিম পর্ব চলছিল, ঠিক তখনই তাঁর হাত দিয়ে  আবির্ভাব হয়েছিল ‘‌ফেলুদা’‌র। তিন বয়সের, তিন আলাদা চরিত্র মিলে ফেলুদার মতো মাণিক্য গোটা বিশ্বে অমিল।ফেলুদা তার মগজাস্ত্রর জোরে বিভিন্ন রকম কঠিন থেকে কঠিনতর সমস্যার ও রহস্যের সমাধান করে দিতে পারে। বিখ্যাত ফেলুদার গল্পগুলির মধ্যে অন্যতম হল- “সোনার কেল্লা”, “জয় বাবা ফেলুনাথ”, “শেয়াল দেবতা” রহস্য প্রভৃতি।

  পাঠকদের কাছে লেখা বাহুল্য যে  ফেলুদার আসল নাম প্রদোষ চন্দ্র মিত্র । তিনি ফেলু মিত্তির নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি হলেন কলকাতাবাসী একজন শখের গোয়েন্দা। রহস্যের জট খুলতে তার জুড়ি নেই।    তার সঙ্গী দু'জন: তোপসে (তার খুড়তুতো ভাই- তপেশ রঞ্জন মিত্র) এবং লালমোহনবাবু (লালমোহন গাঙ্গুলী) যিনি জটায়ু  ছদ্মনামে অদ্ভূত সব রহস্য উপন্যাস লেখেন। স্থান কাল পাত্র সম্পর্কে ফেলুদার জ্ঞান গভীর ।  পাঠকরা পড়ে যারপরনাই বিস্মিত হন।  সত্যজিৎ রায় ৩৫টি ফেলুদার গল্প লেখেন, যার সবই খুব জনপ্রিয় হয়। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসের সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ফেলুদা সিরিজের প্রথম গল্প "ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি" ।  উন্মোচিত হয় এক নতুন ঘরানার। 

  ফেলুদার পর আসি প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর কথায়। বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের এটি একটি জনপ্রিয় চরিত্র। ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় এই চরিত্রটি সৃষ্টি করেন। প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু প্রোফেসর শঙ্কু নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি একজন বৈজ্ঞানিক ও আবিষ্কারক। মূলত পদার্থবিজ্ঞানী হলেও বিজ্ঞানের সব শাখায় তার বিচরণ;  ৬৯টি ভাষা জানেন তিনি, হায়ারোগ্লিফিক পড়তে পারেন, হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োর লিপি উনিই প্রথম পড়তে পারেন; এবং বিশ্বের সকল দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্ম, সামাজিক রীতিনীতি ও বিশ্বসাহিত্য বিষয়ে তার জ্ঞান অকল্পনীয় । কল্পবিজ্ঞান, আ্যাডভেঞ্চার, রহস্য, ভ্রমণ, ফ্যান্টাসি,রোমাঞ্চের মিশ্রণে গল্পগুলি জমজমাট।  সত্যজিৎ রায় প্রোফেসর শঙ্কু সিরিজে মোট ৩৮টি সম্পূর্ণ ও ২টি অসম্পূর্ণ গল্প লিখেছেন। এই সিরিজের প্রথম গল্প ব্যোমযাত্রীর ডায়রি ১৯৬১ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।  গল্পগুলির মধ্যে  প্রোফেসর শঙ্কু ও গোলক-রহস্য, প্রোফেসর শঙ্কু ও ভূত বিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রোফেসর শঙ্কু ও গোলক-রহস্য গল্পে অবিনাশবাবুর কুড়িয়ে পাওয়া আশ্চর্য গোলকটির মধ্যে কি এমন আছে, যাতে গোলকটির নিকটবর্তী সব প্রাণী মারা পড়ছে। উত্তর খুঁজতে গিয়ে শঙ্কু জানতে পারেন, গোলকটি আসলে সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম গ্রহ টেরাটমের উন্নত জীবেরা পৃথিবীর সকল জীবকে হত্যা করতে চাইছে। শঙ্কু এই গ্রহের সকল প্রাণী সহ গ্রহটি ধ্বংস করে দিতে বাধ্য হন।

  আবার প্রোফেসর শঙ্কু ও ভূত গল্পে গিরিডিতে শঙ্কুর মতো দেখতে একটি "ভূতের" আবির্ভাব হয়। নিজের আবিষ্কৃত ভূত দেখার যন্ত্র নিও-স্পেকট্রোগ্রাফের সাহায্যে শঙ্কু জানতে পারেন, এই ভূত আর কেউ নন, চারশো বছর আগে মৃত তার পূর্বপুরুষ তান্ত্রিক বটুকেশ্বর শঙ্কু, যিনি শঙ্কুর বিজ্ঞান ও নিজের তন্ত্রশক্তির সাহায্যে কয়েকটি অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য কিছু সময়ের জন্য পার্থিব শরীর ধারণ করতে সক্ষম হন। অসাধারণ রোমাঞ্চে ভরা সত্যজিতের এই সৃষ্টি পড়ে ছোট বড় সব পাঠকই যেন সমবয়সী হয়ে ওঠে। 
 সত্যজিৎ রায়ের আরেকটি চরিত্র হল তারিনীখুড়ো। তারিণীখুড়ো হলেন একজন চিরকুমার (অবিবাহিত) মজলিশি বৃদ্ধ যিনি  নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প বলতে ভালোবাসেন। তার অনেক গল্পই রোমাঞ্চকর ভয়ের বা ভুতের গল্পের মত হয়ে যায় আবার অনেক গল্পে তার উপস্থিত বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার প্রমাণ পাওয়া যায়। তারিণীখুড়ো সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যের একটি অবিস্মরণীয় চরিত্র। তারিণীখুড়োর গল্পের শ্রোতা মূলতঃ পাঁচজন - পল্টু আর তার চার সঙ্গী ন্যাপলা, ভুলু, চটপটি আর সুনন্দ। তারিণীখুড়ো পল্টুদের বাড়িতে এলেই খবরটা পল্টুর বন্ধুদের কাছেও পৌঁছে যায় এবং তারা সবাই খুড়োর কাছ থেকে আশ্চর্যজনক গল্প শুনতে জড়ো হয়। সত্যজিতের সৃষ্টি সেই অনন্য গল্প আবেশ করে রাখে তরুণ থেকে আবালবৃদ্ধবনিতা, এককথায় আট থেকে আশি সব পাঠককে ।  উল্লেখযোগ্য গল্পগুলি হল গণৎকার  তারিণীখুড়ো, গল্পবলিয়ে তারিণীখুড়ো, টলিউডে তারিণীখুড়ো, খেলোয়াড তারিণীখুড়ো, মহারাজা তারিণীখুড়ো প্রভৃতি। 

  তিনি এই তিনটি চরিত্র ছড়াও ফটিকচাঁদ, মাস্টার অংশুমান উপন্যাস এবং হাউই শীর্ষক নাটক, অনেক ছোট গল্প রচনা করেছেন। লিখেছেন অনুবাদ গল্প , কবিতা ও লিমেরিক অনেক ছোটগল্প ইংরাজী থেকে অনুবাদও করেন তিনি যেগুলি বেশীরভাগই রোমাঞ্চকর গল্প যাদের মধ্যে  ব্রাজিলের কালো বাঘ,মোল্লা নাসীরুদ্দীনের গল্প,ইহুদির কবচ,মঙ্গলই স্বর্গ,ঈশ্বরের ন লক্ষ কোটি নাম উল্লেখযোগ্য। 
সত্যজিৎ রায় বেশ কিছু কবিতা অনুবাদ করেন ও কয়েকটি লিমেরিক রচনা করেন যেগুলির সংকলন - 'তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম' নামে প্রকাশিত হয়। তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম একটি ননসেন্স ছড়ার বই । এই বইয়ে লুইস ক্যারল, এডওয়ার্ড লিয়র এবং হিলেয়ার বেলকের কিছু লেখার অনুবাদ রয়েছে। তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম  বইটিতে মোট আটটি অনূদিত ছড়া ও একটি গল্প স্থান পেয়েছে। সেগুলো হচ্ছে ‘পাপাঙ্গুল’, ডং, লিমেরিক, পিপলি বিলের ধারের সাতটি পরিবারের ইতিকথা, জবরখাকি, রামপাগলের গান, মেছো গান, আদ্যি বুড়োর পদ্যি, হেসরি কিং-এর অকালমৃত্যু এবং তিন ভিখিরি। এর মধ্যে ‘পিপলি বিলের ধারের সাতটি পরিবারের ইতিকথা’ ছাড়া বাকিগুলো ছড়া l লিমেরিকে রয়েছে আটাশটি ছড়া। কিন্তু ছড়াগুলো অনূদিত হলেও ঠিক আক্ষরিক অনুবাদ নয়, অনুসরণ করে সত্যজিৎ রায়ের নিজস্ব  মজার সৃষ্টি। সত্যজিতের সেরকম একটি সৃষ্টির উল্লেখ করলাম যা শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারই বারবার পড়তে ইচ্ছে করে।
এক যে সাহেব তার যে ছিল নাক
দেখলে পরে লাগত লোকের তাক
            হাঁচতে গিয়ে হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ
            নাকের মধ্যে লাগল প্যাঁচ
সাহেব বলে, ‘এইভাবেতেই থাক।’
আগেই বলেছি, সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্পগুলি যেকোনো বয়সের মানুষের মনকে আকর্ষণ করে আজও। খুবই সহজ সরল ভাষায় লিখেছেন সেসব ছোটগল্প। সত্যজিৎ রায়ের কয়েকটি বিখ্যাত ছোটগল্প হলো বঙ্কুবাবুর বন্ধু, আমি ভুত,জুটি,কুতুম-কাটাম,সুজন হরবোলা, টেলিফোন, রতন আর লক্ষ্মী ইত্যাদি।
  সত্যি বলতে কি, সব ছাড়িয়ে কল্পবিজ্ঞানে তার রচিত “ফেলুদা” কিংবা ‘’প্রোফেসর শঙ্কু’র মতো কাল্পনিক চরিত্রগুলো আজও বাংলার তরুণ সমাজের হৃদয়ে চির ভাস্বর। 
বুদ্ধদেব বসুর একবার মনে হয়েছিল বাংলা সাহিত্যে রায়চৌধুরি পরিবারের যেন মৌরসি পাট্টা। কল্পবিজ্ঞান কাহিনী,গোয়েন্দা কাহিনী, উপন্যাস,গল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা,চিত্রনাট্য,অনূদিত সাহিত্যকর্ম মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ষাটের বেশি।  তাঁর সাহিত্যকর্ম বুদ্ধদেব বসুর উক্তিকে যথার্থ প্রমাণ করেছে বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন        http://www.jaladarchi.com/2021/04/atheist-religion-1.html         

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি