নাস্তিকের ধর্মাধর্ম(ধর্ম) পর্ব-৩/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

নাস্তিকের ধর্মাধর্ম 
পর্ব-৩

সন্দীপ কাঞ্জিলাল

ধর্ম

বিশ্বের কয়েকটি প্রধান ও বহু আলোচিত ধর্মে ঈশ্বর থেকে শুরু হয় ধর্মের কথা। আদিতে ঈশ্বর, স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। বাইবেলের প্রথমে পাই এর স্বপক্ষে বক্তব্য। আবার আল্লার নাম দিয়ে শুরু হয়েছে কোরান। ঈশ্বর ছাড়া ধর্মের ভিত্তি নেই, যাদের এই ধারণা তাদের কাছে নাস্তিক ও ধার্মিক নিরীশ্বরবাদ এইসব শব্দ সমার্থক। 
  এই পৃথিবীতে আমরা ধর্মকে দু'ভাবে পেয়ে থাকি। একটি ধর্ম ঈশ্বরনির্ভর, অপরটি প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্যনির্ভর। প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্যনির্ভর ধর্ম হল গুণ, আকার আচার আচরণ স্বাদধর্ম আছে এমন বস্তু। আমরা বিভিন্ন দ্রব্যের ধর্ম দিয়েই বস্তু চিনি। এই ধর্ম দিয়েই আমরা হিমসাগর আর ফজলি আমের পার্থক্য বুঝি, আমরা স্বাদ ও আকৃতি দেখে নিমপাতা আর কেশুতি পাতার পার্থক্য করি, আমরা আমলকি ফল আর সবেদা ফলের পার্থক্য ধর্ম দিয়ে বুঝি। প্রথমত আমাদের আলোচ্য বিষয় প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্যনির্ভর। ঋকবেদে প্রায় ৬০ স্থানে 'ধর্ম' শব্দটির উল্লেখ আছে। ক্লীবলিঙ্গ 'ধর্মণ' রূপে অধিকাংশ স্থলে- শুধুমাত্র দুই তিন স্থানে 'ধর্মণ' পাওয়া যায়। অকারান্ত পুংলিঙ্গ 'ধর্ম' শব্দ পাওয়া যায় পরবর্তী ব্রাহ্মণ ও আরণ্যকের যুগ থেকে। 'ধর্ম' শব্দের ব্যুৎপত্তি সবখানেই 'ধৃ' ধাতু থেকে করা হয়েছে। ঋকবেদে অধিকাংশ জায়গায় ক্লীবলিঙ্গ 'ধর্মণ' শব্দ যজ্ঞ অর্থে ব্যবহৃত। সুতরাং যাস্কের নিরুক্তে (৩.১৩) বলা হয়েছে, ধর্ম যজ্ঞেরই নাম ("ধর্ম ইতি যজ্ঞস্য")। যা ধৃত হয়, এই অর্থে 'ধৃ' ধাতু থেকে কর্মবাচ্যে 'মন' প্রত্যয় যোগে 'ধর্মণ' নিষ্পন্ন হয়। এই অর্থ ঋকবেদেরই যে সুক্তে দেখতে পাচ্ছি, তা হল-" যজ্ঞেন যজ্ঞম্ অযজন্তু্ দেবাস্থানি ধর্মানি প্রথমান্যাসন"। দেবতারা যজ্ঞ করলেন এবং সেগুলিই হল প্রথম ধর্ম। ক্লীবলিঙ্গ 'ধর্মণ' শব্দের আর এক অর্থে কয়েকটি জায়গায় প্রয়োগ আছে। অনেক জায়গায় সায়ন তার ঋকবেদের ভাষ্যে 'ধর্ম' ধারকং 'কর্ম' (৭.৮৯.৫) অর্থ করেছেন। ধারক অর্থে ক্লীবলিঙ্গ 'ধর্ম' শব্দের প্রয়োগ অগ্নির (৩.১৭.১) এবং সূর্যের (৮.৬.২০) প্রসঙ্গেও পাওয়া যায়। কিন্তু পুংলিঙ্গ 'ধর্মন' শব্দ ঋগবেদে শুধুমাত্র ধারক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে ("ধর্মা ভুবদ্ বৃজনস্য রাজা"- ৯.৯৭.২৩)। কালক্রমে ন-কারান্ত এবং ক্লীবলিঙ্গ রূপ লুপ্ত হয়ে অ-কারান্ত পুংলিঙ্গ 'ধর্ম' শব্দেরই প্রচলন হল এবং অর্থও ক্রমশ নির্দিষ্ট ও রুঢ় হতে লাগলো। 

  প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যনির্ভর মতে, বন্য পশু মানবকে ধর্ম সামাজিক মানুষে পরিণত করেছে। মানুষের ক্রমবিকাশের প্রধান শক্তি হিসেবে ধর্ম অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক সত্য। ধর্ম ব্যতীত মানুষের বর্তমান সমস্যার সমাধান করবার শক্তি আর কোন কিছুরই নেই। কারণ ধর্মই মানুষের মনুষ্যত্বের তথা সমাজের কর্তব্যবোধের ধারক ও চালক। ধর্ম জীবনের ক্রমবিকাশের বিজ্ঞান, এবং প্রকৃত জীবন যাপনের কৌশল। এই বিজ্ঞান ও কৌশল বংশ-পরম্পরা ও শিষ্যপরম্পরা আচরিত হয়। তার ফলে কতগুলি রীতি ও নীতির উদ্ভব ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে যখন এই রীতিনীতি মানুষের জীবনে ও সমাজে উন্নতি এবং কল্যাণের সহায়ক হয়, পরবর্তীকালে যখন এসব নিয়ে আর তর্কের বা সমালোচনার অবকাশ থাকে না, তখন এসব প্রথায় পরিণত হয়। একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আরও পরিস্কার হবে। যেমন বন্য মানুষ খাওয়ার পর থালাবাসন ধোয়া কিংবা খাওয়ার স্থান পরিষ্কার করা, বা মুখ ধোয়া তারও অভ্যাস ছিল না, পরবর্তীকালে যখন এই পদ্ধতি শুরু হয় দীর্ঘদিন তাদের উপকার সাধিত হলো, এবং তা নিয়ে তর্কের অবকাশ রইল না। এই পদ্ধতি তখন প্রথায় পরিণত হল। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কালে বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতির মানুষের মধ্যে বিভিন্ন প্রথার উদ্ভব হয়। এই বিভিন্ন প্রথা যখন দীর্ঘদিন কোনো সমাজের মধ্যে প্রবাহিত থাকে, তখন তা বিভিন্ন ধর্ম নামে আচরিত হয়। পরবর্তীকালে কোন সাধক বা মহাপুরুষের আবির্ভাব হলে, ঐ ধর্ম নতুন শক্তি লাভ করে, এবং তা বহু মানুষকে প্রভাবিত করে ও বহু দুর দুরান্তে তার প্রচার ঘটতে থাকে। ঐ সাধকের জীবনকে কেন্দ্র করে যে শক্তি সঞ্চিত হয়, তার ফলে বহু মানুষ তার দ্বারা আকৃষ্ট হয়। তারাই পরবর্তীকালে নিজেরা সংগঠিত হয়ে সেই ধর্ম প্রচার করতে থাকে। এই সংগঠিত মানুষ পরবর্তীকালে সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করে। এদের মতে সম্প্রদায় বলতে গুরুপরম্পরা আগত সদুপদিষ্ট ব্যাক্তি। এর মধ্যে কোন সঙ্কীর্ণতার  স্থান নেই। 
   পরবর্তীকালে জ্ঞান-গরিমাহীন কিছু মানুষ নিজের ধর্ম শ্রেষ্ঠ, এই মতবাদের মোহে- " আমার ধর্ম শ্রেষ্ঠ সত্য, আর সব মিথ্যা" তা প্রচার করতে থাকে। রাজনীতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোন দল বা নেতা, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার উদ্দেশ্যে ছলে বলে কৌশলে, মানুষের মধ্যে উন্মাদনার মাধ্যমে ধর্মের হিংসা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আবার কিছু সম্প্রদায় নিজেদের ধর্ম বিস্তারের জন্য, অপর ধর্মের মানুষকে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে তাদের ধর্মে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে। তার ফলেই সারা পৃথিবী জুড়ে সাম্প্রদায়িক হিংসা, এবং তার ফলে বহু মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। কিন্তু এটা কখনো ধর্ম নয়। এটি ধর্ম-সম্প্রদায়ের বিকৃত অবস্থা। পচে যাওয়া পায়েস কখনো আসল পায়েসের স্বাদ দিতে পারে না।       সাম্প্রদায়িকতা দোষের জন্য কোন ধর্মকে দায়ী করা চলে না, বরং বলা চলে ধর্ম নিয়ে যে রক্তপাত ও হিংসা, তার মূলে সমাজের অসাম্য, সেই অসাম্যের সুযোগে রাজনীতির প্রবেশ। আর এই রাজনীতিই দায়ী এই সাম্প্রদায়িক হানাহানি জন্য। ধর্মের উন্নতি ও সংরক্ষণের জন্য সম্প্রদায় প্রয়োজন, কিন্তু তাকে সাম্প্রদায়িকতা থেকে রক্ষা করতে হলে, ঘোচাতে হবে সমাজের অসাম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, আর মানুষকে দিতে হবে প্রকৃত জ্ঞান।
  এই মতে ধর্ম বলতে, যা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের অবশ্য পালনীয় নীতি বা সদাচার - যা না থাকলে মানুষকে মানুষ বলা চলে না। (ক্রমশ)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি