দূরদেশের লোকগল্প-- এশিয়া (চীন)/তিনটি প্রজাপতি /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প-- এশিয়া (চীন)

তিনটি প্রজাপতি 
চিন্ময় দাশ


পুরো এলাকাটা পাহাড়, বন আর নদী দিয়ে মোড়া। যে দিকে দু'চোখ মেলো, শুধু সবুজ আর সবুজ। শেষ নাই যেন সবুজের।  জনমনিষ্যি নাই ধারে কাছে। প্রকৃতিও দু'হাত উপুড় করে ঢেলে দিয়েছে তার সবুজ রঙের ভাঁড়।  ছোটখাটো কোনও গ্রামও নাই এলাকায়। শহর তো সেই অনেক দূরে। জিয়াও বলো, কি জিদিকুন-- দুটো শহরই অনেকটাই দূরে।  কেবল নদীটাই যা কাছে। পাহাড়ের একেবারে গা ছুঁয়েই বয়ে যাচ্ছে জিয়াওলিং নদীটা। 

  তো, সেখানে সেই বনে ছিল তিনটি প্রজাপতি। তিন ভাই তারা। একই মায়ের পেটে জন্মানো--  বড়, মেজো আর ছোট।  তিনজনকে আলাদা করে চেনা যেত তাদের ডানার রঙ দিয়ে। বড় ভাইয়ের রং সাদা। মেজো ভাইয়ের রঙ লাল। আর,  ছোটটির হলুদ। 

  ভারি ভাব তিনটিতে। সারাদিন রোদে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় তারা দল বেঁধে। ফুলে ফুলে নেচে বেড়ায়।  কোন কিছুতেই ক্লান্তি নাই তাদের। তাদের  অবিরাম চঞ্চল ডানা ঝাপটানো বলে দেয়, সব সময়ই আনন্দে ভরে থাকে তারা। 

  একদিন এক ঘটনা ঘটল। সবে বিকেল হচ্ছে তখন। বাড়ি থেকে অনেকটাই দূরে চলে এসেছে তারা। এবার ফেরার পালা।  হঠাৎই আকাশ কালো করে মেঘ উঠল ঈশান কোণে। সুয্যিদেব ঢাকা পড়ে গেল তার আড়ালে। শোঁ-শোঁ  করে হাওয়া বইতে লাগল ঝড়ের মত। তার সাথে এল বৃষ্টি। সে কী বড় বড় ফোঁটায়! 

  তিন ভাইয়ের তো নাজেহাল অবস্থা। পড়ি-মরি করে, বড় একটা পাতার আড়ালে গিয়ে ঠাঁই নিল তিনটিতে।  কিন্তু ভেজার হাত থেকে বাঁচা যাচ্ছে না তাতেও। বৃষ্টির সাথে বাতাসও আছে যে! জলের ছাঁট লাগছে এসে। 
তখন চোখে পড়ল সামনে কয়েকটা টিউলিপ গাছ। লাল আর হলুদ রঙের ফুল ফুটে আছে গাছে গাছে।  তারা গিয়ে ফুলগুলোকে বলল-- টিউলিপ বন্ধুরা, একটু সাহায্য করো আমাদের। 

  ফুলেরা বলল-- বলো, কী সাহায্য চাই?  
-- ভিজে একশা হয়ে যাচ্ছি। একটু ঠাঁই না পেলে, মারা পড়ব একেবারে। একটি করে পাপড়ি খোল তিনজন কেউ।  একটু ভিতরে ঢুকে বসি। বেশি সময় থাকব না। বৃষ্টি থামলেই চলে যাবো।
 
  ফুলেরা বলল—কোন অসুবিধা নাই। তবে কেবল দু'জন আসতে পারবে।

  প্রজাপতিরা বলল-- কেনগো, দু'জন কেন? 
ফুলেরা বলল—তোমাদের মধ্যে যারা লাল আর হলুদ, সেই দু'জনই এস কেবল। কেননা, ঐ দুজনের সাথেই আমাদের পাপড়ির রঙের মিল। অন্যজনকে নিলে, রঙ নষ্ট হয়ে যাবে আমাদের। 

  প্রজাপতিরা তো অবাক। এ আবার কেমন কথা? বিপদের সময় আবার রঙের মিল অমিল কী? এমনটা আবার করতে হয় নাকি? তারা জবাব দিল-- ধন্যবাদ, বন্ধুরা। দরকার নাই তোমাদের সাহায্যের। এই বিপদের সময় আমরা একজনকে বাইরে রেখে, যেতে পারব না। তার চেয়ে, তিনজনেই বাইরে থাকব। তিনজনেই ভিজব। 
  খানিক বাদে বৃষ্টি বাড়তে লাগল আরও। বড় বড় হতে লাগল বৃষ্টির ফোঁটাও। এবার ডানাগুলোও ভারি হয়ে উঠছে একটু একটু। এর পরে আর ওড়াও সহজ হবে না। 

  এমন সময় একটা সাদা লিলিফুল দেখতে পেল তারা। লিলির কাছে গিয়ে বলল-- শোনগো, লিলিভাই!  ভিজে চুপসে গেছি একেবারে। মারা পড়বার জোগাড় হয়েছে। তোমার পাপড়ির ভিতরে একটু থাকতে দেবে আমাদের? বৃষ্টি থামলেই চলে যাব। 

  লিলি বলল-- কেন নয়, কেন নয়? তবে সাদা রঙ যার ডানায়, কেবল সে-ই আসতে পারো।
-- কেন, শুধু সাদা কেন? 

-- কেন না, আমার রঙও যে সাদা। অন্য রঙের ডানা লাগলে, রঙ নষ্ট হয়ে যাবে আমার পাপড়ির। তাই বাকি দুজনকে বাইরে থাকতে হবে। 

  সাদা প্রজাপতি বলল-- তা কী করে হয়, বন্ধু? আমার ছোট দু'ভাইকে বাইরে রেখে কী আমি ভিতরে যেতে পারি? ভিজতেই যদি হয়, তিনজনেই ভিজব আমরা। কাউকেই আলাদা করব না।

  ভিজতে ভিজতে আবার সেই পাতার আড়ালে ফিরে গেল তিনজন।  

  বৃষ্টি পড়ছে মূষল ধারে। কালো করে আঁধার নেমেছে চরাচর জুড়ে। আলো থাকবেই বা কী করে? কালো মেঘের চাদরে আকাশ ঢাকা। সূয্যি ঠাকুরের মুখটিও দেখা যায় না। 

  সূর্যকে দেখা যাচ্ছে না, এটা সত্যি। কিন্তু সূয্যিদেব নিজে সবই দেখছিল মেঘের আড়াল থেকে। ফুল আর 
 প্রজাপতিদের কথাবার্তাও শুনতে পাচ্ছিল সব। শুনে ভীষণ ভালো লাগছিল তার। কী ভালো এই তিনটি পতঙ্গ! কী অদ্ভুত মিল তিনটির! কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। মাথায় বিপদ জেনেও, ছেড়ে যাবে না কেউ কাউকে!  

  মন ভরে গেল সূয্যিঠাকুরের। এমনিতে অবশ্য মেঘ, ঝড় আর বৃষ্টি এলে, মন্দ লাগে না সূর্যদেবের। একটু জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ হয়। এতক্ষণ তাই করছিল। একটা পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে, একটু আরাম করে নিচ্ছিল। 
  কিন্তু প্রজাপতি তিনটির জন্য ভয় হল সূর্যের। আরও ভিজে গেলে, বিপদে পড়তে হবে ওদের। উড়তে পারবে না ভারী ডানা নিয়ে। অমনি তার মন বলল-- অনেক হয়েছে, আর নয়। মাথার উপর দু'হাত উঁচিয়ে একটু আড়মোড়া ভেঙে নিল সূর্য। 

   সেই হাতের ধাক্কায় ঠেলে সরিয়ে দিল মেঘেদের। সূর্যের তাড়া খেয়ে, ঝটপট সেখান থেকে সরে পড়ল কালো মেঘের দল। গনগনে চোখে ঝড়ের দিকে এমন কটমট করে চাইল সূর্য, নিমেষ না ফেলতে, ঝড়ের সব দাপট কোথায় উধাও। 

  আকাশে আবার দেখা গেল সূয্যিঠাকুরকে। বিকেল গড়িয়ে এসেছে। সূর্য ঢলেও পড়েছে অনেকটা পশ্চিমে। কিন্তু মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়ল আবার গাছে-পাতায়। কমলা রঙের আলোয় ভরে গেল চারদিক।

  তিনটি প্রজাপতির তো আনন্দ ধরে না। টানটান করে ডানা ছড়িয়ে দিল তারা। রোদের ছোঁয়ায় ভিজে ভারী হয়ে ওঠা ডানা শুকোতে লাগল তিনজনে। রোদের মিষ্টি ওম লাগল তাদের সপসপে ছোট্ট শরীরগুলোতে। 

  এক সময় চাঙ্গাহয়ে উঠল তিনটিতে। ভয়ও কেটে গেল মন থেকে। শরীর শুকনো। ডানাও হালকা। মনের আনন্দে ডানা মেলে দিল বাতাসে। ফুলে-ফুলে, পাতায় পাতায় উড়তে উড়তে ঘরে ফিরে চলল তিন ভাই-- তিনটি প্রজাপতি। পশ্চিমের আকাশ থেকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল সূর্যদেব। 

  তখুনি মনে ভারী রাগও এসে গেল সূর্যের । ফুলেদের দিকে চেয়ে বলল-- যতই না কেন রঙের বড়াই করো,  তোমাদের পাপড়ির আয়ু কিন্তু বেশি সময় নয়। ঝরে পড়তেই হবে কিছু বাদে।

  মুখ ফিরিয়ে প্রজাপতিগুলোর দিকে চেয়ে দেখলসূর্য। অনেকটা দূরে চলে গেছে তিনটিতে। সেদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল সূর্য-- আবার এসো, বন্ধুরা! আমি তো আছিই।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া