মৃৎশিল্পী শিবু কুম্ভকারের সাক্ষাৎকার /শিবপ্রসাদ গরাই

            সাক্ষাৎকার মৃৎশিল্পী শিবু কুম্ভকার 

           সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শিবপ্রসাদ গরাই


প্রশ্ন:নমস্কার,আপনার নাম কী?
উত্তর: নমস্কার,আমার নাম শিবু কুম্ভকার। 

প্রশ্ন:আপনি একেবারে নবীন প্রজন্মের
প্রতিনিধি,আপনি মানে আপনারা কতদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন?
উত্তর:হ্যাঁ,বলতেই পারেন নবীন প্রজন্মের। সেই অর্থে একেবারে বংশানুক্রমিক বলতে পারেন। 

প্রশ্ন:আপনার বয়স কত? আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?
উত্তর: বয়স ৩৫ বছর।বারিতে এখন বাবা,মা,আমি,ভাই আর আমার গৃহিনী। 

প্রশ্ন:আপনি কতদিন এই পেশার সঙ্গে যুক্ত?  ছোটোবেলা থেকেই?
উত্তর:হ্যাঁ,সেই ছোটোবেলা থেকেই।তখন বাবার পাশে বসে মাটি নিয়ে মাটির জিনিস বানানো ছিল নেশা।এখন বলতে পারেন পেশা ও নেশা দুই-ই।প্রায় পঁচিশ বছর মাটি নিয়ে ছানাছানি করছি। 

প্রশ্ন:আপনি কিভাবে এই শিল্পকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হলেন?
উত্তর: উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শিল্পধ্বনি আর দৃশ্যতার পারস্পরিক বিনিময় থেকেই হয়তো আমার প্রথম শিল্পচৈতন্য হয়েছিল।তবে জন্মসূত্রে পাওয়া শিল্পকর্মের সীমাকে প্রসারিত করতে এি ভাস্কর্যরীতির প্রতি ছোটোবেলা থেকে অদম্য আকর্ষণ অনুভব করেছি। 

প্রশ্ন: আচ্ছা,বাঁকুড়া জেলার পাঁচমুড়ার পোড়ামাটির কাজের বিশেষত্ব কী একটু বলবেন।
উত্তর: সাবেকিয়ানার সঙ্গে নিত্য-নতুন ভাবনা জুড়ে দেওয়াই হল পাঁচমুড়ার পোড়ামাটির কাজের বিশেষত্ব।মনে হয় সে রহস্য ভেদ করতেই যেন দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকদের এখানে আনাগোনা। 



প্রশ্ন: আপনাদের এখানে পোড়ামাটির কী কী কাজ হয়?
উত্তর: একটা সময় ধর্মঠাকুর, মনসা ও অন্যান্য গ্রামীণ দেবতার পূজার্চনায় ঘোড়া, হাতি, মনসার চালা উৎসর্গ করা হতো।শতাব্দীর ব্যবধানে এই শিল্প প্রতীকী শিল্পের রূপ নিয়েছে।তাই চেনা আঙ্গিক থেকে প্রাচীন গ্রামীণ চাহিদার সাথে আধুনিক শহুরে রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেরাকোটার গহনা,দূপদানি,শঙ্খ,বিভিন্ন আর্ট মডেল থেকে আরম্ভ করে গৃহস্জ্জারনানারকম সুদৃশ্য উপকরণ তৈরি হয়। 

প্রশ্ন: বাঁকুড়ার হাতি ঘোড়া তো বিখ্যাত?
এই হাতি ঘোড়ার মধ্যে বিশেষত্ব কি আছে?
উত্তর: রাজাদের যেমন হাতিশালে হাতি,ঘোরাশালে ঘোড়া দাঁড়িয়ে থাকতো শয়ে শয়ে। তবে আমাদের এ হাতি - ঘোড়া নড়ে না,চড়ে না কিন্তু এদের জৌলুষ ঠিকরে পড়ে।শিল্পীর মুক্ত চিন্তাদারায় প্রবাহিত হয়ে এগুলো এক সুরুচিপূর্ণ ভঙ্গিমায় শিল্পের আঙ্গিকে ধরা দিয়েছে।এখানেই এর বিশেষত্ব। 

প্রশ্ন:পাঁচমুড়া ছাড়া আর অন্য কোনো অঞ্চলেকী পোড়ামাটির কাজ হয়?
উত্তর: পোরামাটির কাজ সর্বত্র হয়।শুদু বাঁকুড়ার কতাই যদি বলি,তবে পাঁচমুড়া ছাড়াও রাজগ্রাম,সেন্দরা,বিষ্ণুপুর,উলিয়াড়া,রুইশহর এই জায়গার কথাই বেশি বেশি মনে আসে টেরাকোটার কাজের জন্য।তবে প্রত্যেক জায়গায় নিজস্ব ধাঁচ বা ধরণ আছে।পাঁচমুড়ার ঘোড়া সকল ধাঁচের শ্রেষ্ঠ।ভারত সরকার কর্তৃক 'জি-আই' শিরোপা পাঁচমুরার মাটির ঘোড়াকে আমাদের নিজোদের সামগ্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

প্রশ্ন: একটি শিল্পকর্ম কীভাবে সৃষ্টি হয়ে ওঠে, তার প্রক্রিয়াটি যদি বিশদে বলেন?
উত্তর: সাধারণত তিনভাবে টেরাকোটার জিনিস তৈরি হয়-
১.চাকায় গড়া
২.ছাঁচে গড়া
৩. সম্পূর্ণ হাতে গড়া
তবে একের সঙ্গে অন্যের সংযোগেও তৈরি হয়। যেমন চাকায় এবং হাতে বা ছাঁচে। তৈরি হয়ে যাওয়া জিনিস ঢেকে রেখে শুকিয়ে নিতে হয়।এক্ষেত্রে রোদের খুব প্রয়োজন হয় না।পরে মাটির রং (গাছ এবং বনক) দেওয়া হয়।পোড়ানোর দিন অবশ্যই রোদে গরম করে নিতে হবে পোড়ানোর সামগ্রী। তারপর ভাটায় রেখে উপর থেকে ঢেকে একটানা পাঁচ- ছয় ঘণ্টা জ্বালানি দিয়ে পোড়ানো হয়।জ্বালানি হিসেবে কাঠ,পাতা প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়। লাল এবং কালো রঙের পোড়ানোর পদ্ধতি ভিন্ন।সবকিছুই অত্যন্ত যত্ন এবং ধৈর্য্য সহকারে করতে হয়। 

প্রশ্ন: এখন কি ভালো মাটি পাওয়ার সমস্যা আছে?শুনছিলাম এখন আর ভালো মাটি পাওয়া যায় না?
উত্তর: হ্যাঁ,ভালো মাটি পাওয়ার সমস্যা আছে।যেখানে মাটি নেওয়া হয় সেই জায়গার মাটি প্রায় শেষের দিকে।অন্য জায়গার মাটি গুণগত দিক থেকে তত ভালো নয়। 

প্রশ্ন:এই গ্রামের সবাি কি পোড়ামাটির কাজের সঙ্গে যুক্ত?
উত্তর: না, আমাদের গ্রামে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বাস।শুধুমাত্র 'কুম্ভকার' সম্প্রদায়ই মাটির কাজের সঙ্গে যুক্ত। 

প্রশ্ন: তাও কতজন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন?
উত্তর:প্রায়,আশিটি পরিবার এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। 

প্রশ্ন: এই শিল্প দ্রব্যের বাজার কেমন?
উত্তর: আশিটি পরিবারের অক্লান্ত পরিশ্রমে হরেক রকম শিল্প দ্রব্য তৈরি হয়।এই বিপুল পরিমাণ সামগ্রীর একটা চাহিদা না থাকলে শিল্পটি বিলুপ্ত হবে।ডাই বাজার মন্থর হলেও সেই অর্থে শিল্পটি কিন্তু গতিশীল। 

প্রশ্ন: একজন শিল্পীর রুজি-রুটির পুরো বন্দোবস্ত কি হয়ে যায় এখান থেকে?
উতৃতর: এমন অনেক পরিবার আছে যাঁদের পোরামাটির কাজের পাশাপাশি সামান্য কৃষিকাজও আছে।তাঁদের হয়তো তেমন অসুবিধে হয় না।কিন্তু পোড়ামাটির কাজকে পুরোমাত্রায় জীবিকা করে বেঁচে আছে যারা তাঁদের চালিয়ে নিতে হয় অধিক পরিশ্রমে। 

প্রশ্ন: পাঁচমুড়াকে  বিখ্যাত করেছেন এমন কয়েকজন টেরাকোটা শিল্পীদের নাম যদি বলেন?
উত্তর: বাঁকুড়ার ঘোড়া জগৎ বিখ্যাত।যেসব শিল্পীরা এই শিল্পকর্মকে জগৎসভায় তুলে ধরেছেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগন্য স্বর্গীয় রাসবিহারী কুম্ভকার।ইনি ঘোড়ার একটি বিশেষ শিল্পশৈলী সৃষ্টি করে ১৯৬৯ সালে জাতীয় পুরস্কার পান।এছাড়াও অরুণ কুম্ভকার, তাপস কুম্ভকার বাউল কুম্ভকার,বিল্টু কুম্ভকার,ভূতনাথ কুম্ভকার, মহাদেব কুম্ভকারের মতো শিল্পীর উদার শিল্পভাবনা এই টেরাকোটা শিল্পের অঙ্গনকে বৃহত্তর করেছে। 

প্রশ্ন: আপনি তো আধুনিক প্রজন্মের প্রতিনিধি, আপনার মতে আধুনিক প্রজন্মের আগ্রহ কেমন এই শিল্পকর্ম সম্পর্কে?
উত্তর: হ্যাঁ,আধুনিক প্রজন্ম খুব বেশি আগ্রহ দেখায় না টেরাকোটার কাজে।উপায়ান্তর না থাকলেন যেন একে পেশা হিসেবে বেছে নেয় তারা। 

প্রশ্ন: নবীন প্রজন্মের যুবক সম্প্রদায় কি এই শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত হতে আসছেন? না কী অন্য কোনো পেশায় চলে যাচ্ছেন?
উত্তর: আগেই বললাম নবীন প্রজন্ম এই শিল্পকর্মে( পেশায়) যুক্ত হতে চান না।তাঁরা বলেন - " এতে যত পরিশ্রম আছে, তত টাকা নেই।"তাই অনেকে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। 

প্রশ্ন:আচ্ছা বর্তমানে কোন কোন শিল্পকর্মের চাহিদা বেশি? মানে পূজার হাতি- ঘোড়া ছাড়া।
উত্তর: সত্যি বলতে কি বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, পুরুলিয়ার মতো রাঢ়বঙ্গের জেলাগুলিতে দেবদেবীর পুজোয় এই টেরাকোটার ঘোড়া- হাতির উৎসর্গ না হলে এই শিল্প অকালেই হারিয়ে যেত।কারণ উচ্চমানের সমস্ত শিল্পসামগ্রীর চাহিদা একেবারে হাতে গোনা। 

প্রশ্ন: আচ্ছা, এই অন্যধারার শিল্পকাজের বাজারদর কেমন?
উত্তর: প্রকৃতপক্ষে সেভাবে বাজারদর বলা যায় না।কারণ একই শিল্পকর্ম বিভিন্ন হাতের তারতম্য অনুযায়ী বাজারদর ভিন্ন- ভিন্ন হয়ে থাকে। 

প্রশ্ন:এগুলোর বিপণনের ব্যবস্হা কী আছে?
উত্তর: সরকারী- বেসরকাটী উদ্যোগে বিভিন্ন মেলা ও হাটে আমাদের শিল্পসামগ্রী বিক্রি হয়।এছাড়া পাইকারী ক্রেতার বাড়ি- বাড়ি গিয়ে শিল্পসামগ্রী সংগ্রহ করে।আগত পর্যটকরাও গৃহসজ্জার উপকরণ হিসেবে কিছু সামগ্রী নিয়ে যান। 

প্রশ্ন: এইসমস্ত শিল্পসামগ্রী কিনতে হলে কী পাঁচমুড়ার মেলা বা আপনাদের এখানে যে বিপণন আছে সেখানেই আসতে হবে? অন্য কোনো জায়গা থেকো কেনা যায় না?
উত্তর: গ্রাম থেকেই বেশিরভাগ শিল্পকর্ম বিক্রি করা হয়।আমাদের নিজস্ব কোনো স্হায়ী বিপনন কেন্দ্র গ্রামের বাইরে নেই।তবে পাইকারী ক্রেতারা তাদের নিজস্ব বিপণন কেন্দ্রে আমাদের সামগ্রী বিক্রি করেন।সেকান তেকে অনেকে আমাদের শিল্পসামগ্রী সংগ্রহ করেন। 

প্রশ্ন: কোনো অনলাইন স্টোরের ব্যবস্হা আছে কি?
উতৃতর: না,আমাদের নিজস্ব কোনো অনলাইন স্টোর নেই। 

প্রশ্ন:আপনাদের মানে পোড়ামাটির শিল্পীদের জন্য সরকারী ব্যবস্হাপনা কেমন?
উত্তর: সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন মেলায় ও হাটের  আয়োজন আমাদের সামগ্রী বিপণনের একটা সুযোগ, আবার শিল্পীদের নতুনত্ব সামগ্রী তৈরির উৎসাহ দিতে বিভিন্ন শিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে থাকে সরকার।তবে সরকারি বিভিন্ন সংস্হা (মঞ্জুষা,বঙ্গশ্রী) একসময় শিল্পসামগ্রী সংগ্রহ করত।এখন এই বিষয়ে তারা উদাসীন।আমাদের চাকা ও ভাটা তৈরিতে সরকার কিছু অর্থসাহায্য করেছে।তবে প্রয়োজনের সেটা খুবই কম। 


প্রশ্ন: আচ্ছা এই শিল্পে কিরকম সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়?
উত্তর: আমাদের শিল্পের স্বার্থে রয়েছে নিজস্ব সমবায় সমিতি।সমিতির মাধ্যমে শিল্পীদের কাছে শিল্পসামগ্রী সংগ্রহ করে।শিল্পের মূল উপাদান ' মাটি - এটি সমিতির নিজস্ব জমি থেকেই সংগ্রহ করতে পারি।তবে পর্যাপ্ত ভাটা,কাঁচামালের অভাব,আর্থিক অনটন,অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্হা আমাদের শিল্পবিস্তারে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

প্রশ্ন: আপনার মতে এই শিল্পকর্মকে বেশি করে ছড়িয়ে দিতে হলে কী কী ব্যবস্হা নেওয়া যেতে পারে? 
উত্তর: সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে আমাদের শিল্পশৈলীর গুরুত্ব অনেক বেশি প্রচার করতে হবে।সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে আমাদের সামগ্রী ছড়িয়ে দিতে হবে।যাতে করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে টেরাকোটার শিল্পসৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে।আর অনলাইন বিপণনের মাধ্যমে আমাদের শিল্পকর্ম শিল্পপ্রেমী মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছায় তার ব্যবস্হা করা দরকার। 

প্রশ্ন: পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আপনাদের এই শিল্পকর্মগুলিকে কিভাবে আকৃষ্ট করবে- সে সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
উত্তর: যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের রুচির পরিবর্তন হচ্ছে।এজন্য এই শিল্পে গতানুগতিকতা বর্জন করে তাকে যুগোপযোগী করে তুললে আধুনিক প্রজন্ম তাকে গ্রহন করবে বলে মনে হয়। 

প্রশ্ন: শিবুবাবু মৃৎশিল্প সম্পর্কে আপনার পরিস্কার মতামতগুলি জানতে পেরে খুবই ভালো লাগল,আপনি এই শিল্পকর্মকে আরও এগিয়ে নিয়ে চলুন, আপনার গ্রামকে বিশ্বের দরবারে উজ্জ্বল করে তুলুন - এই আশা রেখে আপনার মূল্যবান সময় আমাকে দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।
উত্তর: আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।ভালো থাকবেন।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া