আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৪৮/ শ্যামল জানা

আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৪৮

শ্যামল জানা

সাররিয়েলিজম্ (ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব)

আমরা যখন কোনো কিছু দেখি, আমাদের অজান্তে আমাদের প্রাক্-সচেতন মন(Preconscious mind) নিমেষে একটা অবিশ্বাস্য কাজ করে ফেলে৷ যা কিছুই আমরা দেখি না কেন, হয় আমি সেটা আগে দেখিনি, না হলে আগে দেখেছি৷ আমরা যখন কাউকে বা কোনো দৃশ্যকে প্রথম দেখি, আমাদের প্রাক্-সচেতন মন নিমেষে, আমাদের সম্পূর্ণ অজান্তে, অজস্র ডেটা বা তথ্য  তৈরি করে ফেলে৷ সেটির উচ্চতা কত? দৈর্ঘ্য কত? প্রস্থ কত? তার রং কী? গঠন কীরকম? কঠিন, নরম, তরল, না বাষ্পীয়? সচল না স্থির? প্রাণ আছে না নেই? শব্দ করে কিনা? করলে তার মাত্রা কত? তার নাম কী? ইত্যাদি অজস্র ডেটা সে তৈরি করে তার অফুরন্ত স্মৃতির ভাঁড়ারে(Unconscious mind)জমা করে৷ পরে, আমরা যখন তাকে বা সেই দৃশ্যকে আবার দেখি, আর নতুন করে ডেটা তৈরি হয় না৷ কিন্তু, ওই স্মৃতির ভাঁড়ার থেকে নিমেষেই সবটা সাপ্লাই(Preconscious mind এটি করে)হয়ে যায়৷ আমাদের সবটা মনে পড়ে যায়৷ আমরা সেই বস্তুটিকে নিমেষে ওই ডেটার সাহায্যে চিহ্নিত করতে পারি৷ আর, মানুষ হলে, দেখামাত্র বলে উঠি— কী, অমুকবাবু, কেমন আছেন?
    আমরা যতক্ষণ জেগে থাকি, ততক্ষণই, সারাক্ষণই, দেখতে থাকি৷ এবং যা যা দেখি, তার সমস্ত ডেটা বা তথ্য স্মৃতির ভাঁড়ারে(Unconscious mind-এ)জমা হয়ে যায়৷ একটি তথ্য দিই— পূর্ণ ‘এনস্লাইকোপিডিয়া অফ ব্রিটানিকা’-র সমস্ত ভলিউম মিলিয়ে মোট যত তথ্য হয়, তাকে ১০০ দিয়ে গুণ করলে যা দাঁড়ায়, তা একজন মানুষের ২০/২১ বছর বয়েসের মধ্যেই স্মৃতির ভাঁড়ারে জমা হয়ে যায়৷ ভাবা যায়! এখানে আরও একটি ব্যাপার আছে৷ যার যত মেধা ও বুদ্ধিমত্তা বেশি, তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাও বেশি হয়৷ ফলে, তার ডেটা বা তথ্য চিহ্নিতকরণ ক্ষমতাও বেশি হয়৷
    আমরা যখন সাধারণভাবে ছবি আঁকি তখন অবচেতন মনের সাহায্যেই ছবি আঁকি৷ আবার সাররিয়েল চিত্রশিল্পীরা যখন ছবি আঁকেন তখনও অবচেতন মনের সাহায্যেই তাঁরা ছবি আঁকেন৷ কিন্তু তার মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকে৷ কী সেই ফারাক?
    আমরা যখন সাধারণভাবে ছবি আঁকি তখন অবচেতন মন কীভাবে কাজ করে? এককথায় তাকে বলে— Aesthetically arrengement of visual ৷ আর একটু ভেঙে বললে, আমরা আমাদের পছন্দমতো দৃশ্য স্মৃতির ভাঁড়ার(Unconscious mind)থেকে পেড়ে আনি, এবং সেই দৃশ্য ইচ্ছেমতো ক্যানভাসে সাজাই৷ তবে বিষয়টি অত সহজ নয়! এই যে চিত্রশিল্পীরা নিজের সৌন্দর্যবোধ অনুযায়ী দৃশ্যগুলিকে মনের মতো করে স্মৃতির ভাঁড়ার থেকে পেড়ে এনে ইচ্ছেমতো ক্যানভাসে সাজায়৷ এই সৌন্দর্যবোধটি তারা পেয়েছে বা এই সৌন্দর্যবোধের শিক্ষাটি তাঁরা পেয়েছেন প্রকৃতিতে আপনা থেকে অ্যারেঞ্জ হয়ে থাকা দৃশ্যগুলি থেকেই৷ অর্থাৎ সৌন্দর্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, চিত্রশিল্পীরা যে শুধু স্মৃতি থেকে ইচ্ছেমতো দৃশ্য পেড়ে এনে ক্যানভাসে সাজাল, আর, একটা পেন্টিং হয়ে গেল, তা একেবারেই নয়! যে দৃশ্যগুলি তাঁরা স্মৃতির তাক থেকে পাড়ছেন, সেগুলো ইচ্ছেমতো পাড়ছেন তাও নয়! মেধা, মনন, অভিজ্ঞতা ও সৌন্দর্যবোধের নিরিখে ক্যানভাসে কোন দৃশ্যের পাশে কোন কোন দৃশ্য থাকলে, এবং কীভাবে সাজানো থাকলে তা মানুষের চোখে সুন্দর লাগবে, এই জ্ঞান বা বোধ না থাকলে, সে, স্মৃতির ভাঁড়ারে থাকা অজস্র দৃশ্যের মধ্যে থেকে সঠিকগুলিকে বাছাই করতেই পারবে না!
    এই বাছাই করার ক্ষেত্রে যেটা ঘটে— প্রকৃতিতে থাকা দৃশ্যগুলিকে প্রাথমিকভাবে কোনো না কোনো সময়ে শিল্পীদের দেখতে হয়ই(কারণ, মানুষ যা দেখে না, তা স্মৃতিতে থাকে না)! তারপর, সেই দেখা দৃশ্যগুলি স্মৃতির ভাঁড়ারে(Unconscious mind-এ)জমা হয়৷ এবার, তিনি যখন ছবি আঁকতে বসেন, তখন তিনি তাঁর সৌন্দর্যবোধ অনুযায়ী পছন্দ করা দৃশ্যগুলিকে মনে মনে প্রাক্-সচেতন মন(Preconscious mind)-এর সাহায্যে স্মৃতির ভাঁড়ার থেকে পেড়ে আনেন (তবে, এক্ষেত্রে মডেল দেখে ছবি আঁকা, বা আউটডোর পেন্টিং-এর ধারণা প্রযোজ্য হবে না), যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে ক্যানভাসে৷ এক্ষেত্রে কিন্তু সামগ্রিকভাবে শিল্পীর অবচেতন মনই শিল্পীর অজান্তে শিল্পীকে ছবি আঁকার ক্ষেত্রে সমস্তটা গুছিয়ে দিল বলেই তিনি ছবিটা আঁকতে পারলেন৷
    এখানে একটি অবশ্যম্ভাবী প্রশ্ন আসবে— যে, কোনো সাধারণ ছবি আঁকার ক্ষেত্রে যদি অবচেতন মন কাজ করে, আবার সাররিয়েলিস্ট ছবি আঁকার ক্ষেত্রেও যদি অবচেতন মন কাজ করে, তাহলে, এই দুই ধরনের ছবির মধ্যে পার্থক্যটা হয় কোথায়? নাকি হয় না? বা পার্থক্য হলেও ঠিক কোন জায়গায় পার্থক্যটা হয়?
    আমরা আগে আলোচনা করেছি, যে— ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমোনো পর্যন্ত যতক্ষণ আমরা জেগে থাকি, সারাক্ষণই আমরা কিছু না কিছু করি৷ অর্থাৎ শরীর এবং মন সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকে৷ আমাদের শরীর— হয় খায়, না হলে কাজ করে, না হলে হাঁটে, কিংবা বিশ্রাম নেয় বা বসে থাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এবং তা করে অবচেতন মনের সাহায্যে৷ সাধারণভাবে শিল্পীরা যে সব ছবি আঁকে, সেগুলি সবই এই রকম কাজের আওতায় পড়ে৷ কিন্তু সাররিয়েলিস্ট শিল্পীরা যে ছবি আঁকে, সেগুলি কিন্তু এই সাধারণ কাজের আওতায় পড়ে না, অথচ সেটার পিছনেও অবচেতন মনের ভুমিকা থাকে৷ পার্থক্যটা কোথায় হয়?
    আমরা আগে অবদমিত আকাঙ্ক্ষা বোঝাতে আমার ছোটবেলার খেলার সাথী বড়কার ঘটনা বলেছি৷ তার গায়ের জোর আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল৷ যখন সে আমাদের ধরে ধরে মারত, তার প্রত্যুত্তরে আমরা তাকে মারতে চাইলেও পারতাম না! সেই মারার আকাঙ্ক্ষাটা অবদমিত হয়ে মনের ভেতরে থেকে যেত৷ ফলে, সেই অবদমনই অবচেতন মনের সাহায্যে স্বপ্নের ভেতরে পরাবাস্তব রাক্ষসের জন্ম দিয়েছিল৷ এই অবচেতন মন কীভাবে স্বপ্নের ভেতরে পরাবাস্তব ছবি তৈরি করে, আমার আর একটি ছোটোবেলার ঘটনা থেকে বোঝার চেষ্টা করছি৷
    আমাদের রান্নাঘরে মান্ধাতা আমলের একটা মিটসেফ ছিল৷ মা সেখানে রান্না করা খাবারগুলো রাখত৷ পায়েস বা ওই ধরনের মিষ্টিজাতীয় কিছু রাখলে মাঝে মাঝে বড় বড় কালো পিঁপড়ে আসত৷ আর, তারা এলেই মিটসেফের পিছন থেকে টিকটিকি বেরিয়ে এসে তার লম্বা জিভ দিয়ে সেই পিঁপড়েগুলোকে ধরে ধরে খেত৷ এটা দেখে নিরীহ পিঁপড়েগুলোর জন্য আমার খুব কষ্ট হত, পাশাপাশি, টিকটিকিদের ওপর খুব রাগও হত৷ মাঝে মাঝে ঝ্যাঁটা নিয়ে তেড়ে যেতাম, কিন্তু খুব বেশি জব্দ করা যেত না, তারা আবার আসত৷ তখন মনে মনে একটা অবদমিত আকাঙ্ক্ষা তৈরি হত— ইস্ পিঁপড়েগুলো যদি হাতির মতো বিশাল বড় হত? ঘোড়ার মতো শক্তিশালী হত? আর, পা-গুলো যদি ইয়া লম্বা লম্বা হত তাহলে টিকটিকিগুলো তাদের কিচ্ছু করতে পারত না! রণ-পায়ের মতো লম্বা লম্বা পায়ে তারা পালিয়ে যেতে পারত! এবার, এই অবদমিত আকাঙ্ক্ষাকে আমরা যখন স্বপ্নের মধ্যে দেখি, তখন ঠিক এই রকম ছবি তৈরি করতে গিয়ে আমাদের অবচেতন মন(Subconscious mind)-কে খুব পরিশ্রম করতে হয়৷ প্রথমে এই আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ঠিক যেরকম ছবি হতে পারে, সেরকম ছবি পাওয়ার জন্য তাকে স্মৃতির ভাঁড়ার(Unconscious mind)হাতড়াতে হয়৷ কিন্তু সে পায় না! কারণ, এরকম দৃশ্য বাস্তবে হয় না, ফলে আমরাও কখনো দেখিনি৷ ফলে, ঠিক সেই রকম দৃশ্য স্মৃতির ভাঁড়ারে থাকবে না৷ তখন আমাদের অবচেতন মন স্মৃতি থেকে একাধিক ছবি বার করে৷ পিঁপড়ের ছবি, হাতির ছবি, ঘোড়ার ছবি৷ তারপর পিঁপড়ের পা-গুলো নিয়ে শরীরটা ফেলে দেয়৷ তারপর ওই পা-গুলোকে লম্বা করে৷ তারপর হাতি আর ঘোড়ার ছবি থেকে তাদের পা-গুলোকে ফেলে দিয়ে, সেখানে পিঁপড়ের এই লম্বা পা-গুলো দিয়ে দেয়৷ এই হল অবদমিত আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ছবি(বড় হয়ে শিল্পী হওয়ার পর সালভাদোর দালি-র আঁকা হুবহু এরকম একটা পেন্টিং বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে পেয়েছি)(ছবি-১)৷ 

  আর, আমরা এই দৃশ্যটাই স্বপ্নে দেখতে পেলাম৷ আমাদের অবচেতন মন বাস্তব থেকে ছবি নিয়েই, এটার সঙ্গে ওটা জুড়ে, অতিরিক্ত অংশ ফেলে, এই পরাবাস্তব(Surreal)ছবি বানাল৷ এবং তা এত কম সময়ে, যে, আমরা বুঝতেই পারলাম না, আদৌ সময় লেগেছে কিনা! পরে, ঘুম থেকে উঠে, জেগে থাকা অবস্থায় আমাদের সচেতন মন(Conscious mind)ওই স্বপ্নে দেখা দৃশ্যটিকে স্মৃতির সাহায্যে মনে করতে পারে৷ এবং কাগজে বা ক্যানভাসে সেটি আঁকে৷
    কিন্তু, যখন শিল্পীরা সাধারণ ছবি আঁকেন, তখন স্বপ্নকে মনে করার প্রয়োজন পড়ে না৷ কারণ, সাধারণভাবে বাস্তবে আমরা ঠিক যে রকমটা দেখি, সেরকমটাই কাগজে বা ক্যানভাসে তাঁরা আঁকেন, বড় জোর একটু ভাঙচুর করেন, এই যা৷                   (ক্রমশ)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া