আফ্রিকার (তাঞ্জানিয়া) লোকগল্প /(সিংহ-ভাগ)/ চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প—৪৯ : 
আফ্রিকা (তাঞ্জানিয়া) 
সিংহ-ভাগ 
চিন্ময় দাশ 


আফ্রিকা মানেই বন-পাহাড়ের দেশ। আর সে দেশের তাঞ্জানিয়ার কথা আমরা অনেকেই জানি। সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক, আর আফ্রিকার সবচেয়ে উঁচু ও বিখ্যাত কিলিমাঞ্জারো পাহাড়ের জন্য এই রাজ্যটি সারা পৃথিবীতে বেশ জনপ্রিয়। হাতি, সিংহ, চিতাবাঘ, বুনো মহিষ, গন্ডার, লম্বা গলা জিরাফ -- এইসব বড় চেহারার জীব দেখা যায় তাঞ্জানিয়ায়। 

কিন্তু বড়রা আছে বলে, ছোটরা কি নেই সেখানে? আছে, আছে-- সবাই আছে। বরং সংখ্যায় একটু বেশিই আছে এই ছোটরা। তা, সবার কথা এখানে বলে আর কী হবে? আমরা বরং শেয়ালের কথাই বলি। 

সবাইকে ছেড়ে, শেয়াল কেন-- এমনটা কেউ বলে যদি, উত্তর ভারী সোজা। শেয়ালের বুদ্ধি যেমন বেশি, তেমনি ধূর্তামিও। ধূর্তামীতে শেয়ালের জুড়ি মেলা ভার। তবে, কখনও কখনও তাকেও ফাঁদে পড়ে যেতে হয়। একদিনের কথা বলি।

কিলিমাঞ্জারো পাহাড়ের তলায় এক বন। একেবারে পাহাড়ের গা ঘেঁষে। সেখানে পাথরের খোঁদলে থাকত একটা শেয়াল। একটা বুনো গাধাও থাকতো কাছাকাছি। দুজনেরই হয়েছে ভারী ফ্যাসাদ। খাবারের জন্য বনের ভিতরে ঢুকতে সাহস হয় না তাদের। কিছুদিন হল এক সিংহ এসে ডেরা গেড়েছে সেখানে। যা বিশাল চেহারা রাজামশাইয়ের! দেখলেই ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। 
গাধার সাথে একটু ভাবসাব আছে শেয়ালের। পড়শির সাথে এমনটা কার না থাকে! একদিন গাধাকে ডেকে শেয়াল বলল-- চলো, সিংহের সাথেই একটা রফা করি। 
গাধার তো পিলে চমকে গেল শুনে। কোনরকমে বলল-- মাথা খারাপ হল না কি তোমার? রাজার সাথে রফা করতে যাবে?

শেয়াল মুচকি হেসে বলল-- আরে ভায়া, চলোই না। একটা বুদ্ধি বের করেছি। কিছু একটা তো করতেই হবে। নইলে যে না খেয়ে শুকিয়ে মরতে হবে আমাদের। 
অগত্যা রাজি হল গাধা-- তবে ভাই, আগেভাগে একটা কথা বলে রাখি। আমি কিন্তু সামনে যাব না। ঝামেলা হলে, তুমি তো সুড়ুৎ করে কেটে পড়বে। আমি কি আর তোমার মত দৌড়াতে পারব? 

শেয়াল লাল-- ঠিক আছে, চলো। দূরেই থাকবে তুমি।
সেদিন বিকেল বেলা। সিংহ বেশ আয়েশ করে গড়িয়ে নিচ্ছে। দুজনে এসে হাজির। পেল্লাই সাইজের একটা সেলাম ঠুকে, শেয়াল বলল-- পেন্নাম হই, রাজামশাই!
চোখ দুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিংহ দেখলো দুজনকে। শুয়ে থেকেই বলল-- কী খবর, পন্ডিত? কিছু বলবে?

রাজার মুখে পন্ডিত সম্বোধন! বেশ গুমোর হল শেয়ালের মনে। সে সাহস করে বলল-- অনেক দিন ধরে বলব ভাবছি। আসবার সময় হয়ে ওঠে না।

সিংহ বিরক্ত হয়ে বলল-- জ্বালাতন করিস না তো। ভণিতা ছেড়ে, যা বলবার সোজাসোজি বল।
শেয়াল বলল-- আপনাকে কষ্ট করে শিকার ধরতে হয়। দেখে ভারী খারাপ লাগে আমাদের। যতই হোক, আপনি হলেন আমাদের রাজা।

সিংহ একটা আড়মোড়া ভেঙে বলল-- কী আর করা যাবে বল? পেট ভরাতে গেলে, এটুকু কষ্ট তো করতেই হবে।
শেয়াল বলল-- কিন্তু যদি আমরা তিনজনে মিলে শিকার করি? মনে হয়, তাতে আপনার ঝামেলা অনেকটাই কমে যাবে। 
-- তাতে তোদের লাভ কী? সিংহ কেশর ঝাঁকিয়ে জানতে চাইল। 
শেয়াল বলল-- যা শিকার হবে, ভাগ করে খাওয়া হবে। 
সিংহ বলল-- তা, শিকারটা হবে কীভাবে? 
গাধা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। কিচ্ছুটি বলেনি। সে ভাবল, ভাগাভাগির কাজ। আমারও কিছু একটা বলা দরকার। সে বলতে গেল-- বলছিলাম কী, রাজামশাই ...।

এক ধমকে সিংহ চুপ করিয়ে দিল তাকে-- তুই চুপ কর, হতভাগা। বোকা হাঁদা কোথাকার।
শেয়াল জবাব দিল-- সে আপনাকে ভাবতে হবে না, হুজুর। কাল আমরা দুজনে আসব আপনার এখানে। একসাথে শিকারে বেরোব।
রাত যেন কাটতে চায় না গাধার। কী দারুণ ব্যাপারটাই না হবে কাল! সিংহের পাশে পাশে হাঁটবে সে! হাঁ করে চেয়ে চেয়ে দেখবে বনের সবাই। ইজ্জত বেড়ে যাবে তার। 

পরদিন সকালে দুজনে এসে হাজির হল সিংহের কাছে। বনের গভীরে রওনা দিল তিনজনে। কতটা পথ গিয়ে, সিংহ খেঁকিয়ে উঠল-- কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে। মাথায় বদ মতলব কিছু চেপেছে নাকি?
লম্বা জিভ কেটে শেয়াল বলল-- কী যে বলেন, রাজামশাই! আপনি হলেন আমাদের মা-বাপ। আপনার সাথে চালাকি? আর একটুখানি চলুন। নিজেই বুঝতে পারবেন। 

আরও খানিক এগিয়ে একটা ঝর্ণার কাছে এসে থামল তিনজনে। জল জমে জমে বেশ একটা জলাশয়ের মত হয়েছে সেখানে। একদিকের পাড়ে খানিকটা খোলা যায়গা। সেখানটিতে এসে থেমেছে শেয়াল। 

শেয়াল বলল-- এই হল আমাদের শিকারের জায়গা। রাজমশাই, আপনি একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে বসে থাকুন চুপটি করে। কারও যেন চোখে না পড়ে। 
শেয়াল এবার গাধাকে বলল-- শোন বন্ধু, তুমি ঐ দিকটায় যাও। বেলা বাড়লে অনেকেই আসবে এখানে জল খেতে। যেই দেখবে পছন্দমত কেউ একটা এসেছে, অমনি তুমি গিয়ে তার সাথে গালগল্প জুড়ে দেবে। 
গাধা কিছু বুঝতে পারল না। বলল-- তাতে কী হবে?
-- তোমার গলা শুনলেই, আমি গিয়ে হাজির হয়ে যাব। রাস্তা আটকে ঝামেলা শুরু করে দেব তার সাথে। সে বেচারা তখন কী আর করবে? এ দিকের খোলা জায়গাটা দিয়ে পালতে যাবে। অমনি রাজমশাই এক লাফে এসে পড়বেন তার ঘাড়ে। কাজ শেষ। কোন মেহনত করতে হবে না রাজামশাইকে।

সিংহেরও বেশ মনে ধরল ফন্দিটা। একটা ছোটমটন শিকার করতেও যা দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। ভারি ঝক্কির কাজ। এই বয়সে আর পোষায় না। এখানে তো মনে হচ্ছে, বেশি কসরত করতে হবে না। বুদ্ধি আছে বটে পন্ডিতের মাথায়।

যেমন ফন্দি, তেমন কাজ। বিকেলের মধ্যেই শিকার শেষ। বেছে বেছে কয়েকটা হরিণ, আর বুনোশুয়োর মারা হয়েছে। শিকারগুলো সিংহের ডেরায় এনে জড়ো করা হল। সিংহ গাধাকে বলল-- সারা দিন তো কেবল সবার সাথে গল্পগুজব করেই কাটালি। নে, তুই এবার ভাগের কাজটা করে ফ্যাল। দেখি তোর বুদ্ধি।
রাজামশাই শেয়ালকে ছেড়ে, তাকে কাজের ভার দিয়েছেন, মনে গর্ব ধরে না গাধার। সে বসে গেল মাংস ভাগ করতে। 

সমান সমান তিনটে ভাগে ভাগ করে, রাজাকে বলল-- হয়ে গেছে, হুজুর। ভাগ করে দিয়েছি। এবার যে যারটা নিয়ে নিলেই হল।

সিংহ বসে বসে দেখছিল গাধার কাজ। দেখছিল আর চড়চড় করে রাগ চড়ছিল তার মাথায়। গাধার কথা শেষ না হতে, আর সামলাতে পারল না নিজেকে। ভয়ানক এক গর্জন করে উঠল সিংহ। সারা বন পাহাড় ঝর্না-- সব কেঁপে উঠল সেই শব্দে। সিংহ বলল-- শেয়ালের তো ঐটুকু পেট। অতটা মাংস নিয়ে ও করবেটা কী শুনি। তাছাড়া, এর ওর সাথে একটু ঝামেলা করা ছাড়া, ও করেছেটাই বা কী? আর তুই। সারাদিন আমার চোখের সামনে গপ্পো করে কাটালি। তোরও সমান ভাগ? হতভাগা, রাজাকে বোকা বানানো?

বলেই, সিংহ একলাফে ঝাঁপিয়ে পড়ে, টুঁটি কামড়ে ধরল গাধার। একটুখানি চার পা ছুঁড়ে, নেতিয়ে গেল বেচারা। 
শেয়াল তো লেজটি গুটিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। এবার নিশ্চয় তার পালা। কেন যে এমন দুর্মতি চেপেছিল মাথায়। আজ আর রেহাই নাই। 
সিংহ বলল-- পন্ডিত, তুমিই ভাগ কর। দেখি, কেমন মগজ তোমার। 

শেয়াল তাড়াতাড়ি তিনটা ভাগকে এক জায়গায় জড়ো করে ফেলল। তারপর তা থেকে সামান্য একটু নিজের জন্য সরিয়ে রেখে, বলল-- নিন, রাজামশাই! হয়ে গেছে ভাগ। 


সিংহ মনে মনে ভারী খুশি। এখন শুয়ে বসে কয়েকটা দিন চলে যাবে এই দিয়ে। মুখে বলল-- এটা কেমন ভাগ হল হে? 

শেয়াল তো মুখিয়েই ছিল সিংহ সন্তুষ্ট হয়, এমন কিছু বলবে বলে। সুযোগ পেয়ে বলল-- কেন হুজুর, ভুলটা কী হয়েছে? যখনই কোন কিছু ভাগ হবে, সিংহভাগ তো রাজারই পাওনা, তাই না? আমার বিচার তো তাই বলে। আপনি আমাদের রাজা। তাছাড়া... 
তাকে থামিয়ে, সিংহ হাসিমুখে বলল-- থাক, আর বলতে হবে না। ভাগ করবার কাজটা ভালোই শিখেছে দেখছি। তা বাপু, শিখলে কোথায় কাজটা?
শেয়াল আমতা আমতা করে বলল-- আজ্ঞে, ওই হতভাগা গাধাটার কাছেই শিখলাম। 

সিংহও বুঝে গেল কথাটার মানে। বেশ খুশির গলায় বলল-- বেশ, বেশ, সুন্দর শিক্ষা। আজ থেকে তোমাকে আমার মন্ত্রী করে দিলাম। সবসময় আমার পাশে পাশে থাকবে। একটা মন্ত্রী না হলে, রাজার চলে কখনও? 
শেয়াল হাসি মুখ করে মাথা নেড়ে দিল-- সে তো ঠিক। বলল বটে, কিন্তু মনে মনে জানে, তাকে কী করতে হবে। আবার লম্বা একটা সেলাম ঠুকল রাজাকে। তারপর কোনরকমে নিজের ভাগটা নিয়ে, সরে পড়ল সিংহের সামনে থেকে। 

সেই থেকে আর সিংহের কাছাকাছিও যায় না শেয়াল।

(জনান্তিকে একটি কথা বলে রাখি-- গাধা কি আদৌ মাংসাহারী না কি? এমন বেমক্কা ভাবনা মাথায় আসে যদি, তাহলে লোকগল্প পড়ে, সময় নষ্ট করা কিন্তু আদৌ কাজের কাজ নয়।)

আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি