ইউ জি সির সাম্প্রতিক নির্দেশিকা - সমতা না সমস্যা?/সজল কুমার মাইতি

ইউ জি সির সাম্প্রতিক নির্দেশিকা  - সমতা না সমস্যা?
সজল কুমার মাইতি

এই অতিমারির প্রকোপ শেষ হতে না হতে নতুন ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের হাত ধরে আবার প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। ফেজ ওয়ান থেকে ফেজ টু প্রবলতর হয়ে দেখা দিচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা সবেতেই আগের রেকর্ড ভেঙে ugc-recent-guidelines-equality-or-problems নতুন রেকর্ড গড়ে তুলছে।  দিশাহারা মানুষ। ধনী দরিদ্র এক সারিতে এসে দাঁড়িয়েছে। ধনী দেশকে ও অসহায় লেগেছে। দরিদ্র দেশের কথা যত কম বলা তত ভাল। আমাদের দেশে উচ্চ শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে নীতি নির্ধারণ ও প্রয়োগের সর্বোচ্চ সংস্থা ইউ জিসি বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগ। সময় সময় এই আয়োগ উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি ও নির্দেশকা প্রকাশ করে। দেশের সকল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় তা মেনে চলে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ক্ষেত্রে অটোনমি বা স্বাধিকার বজায় রাখার কথা বলা হয়ে থাকে। বাস্তবে তার প্রয়োগ হতে খুব একটা দেখা যায় না। তবে ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।

সমতার সুযোগ 
16 জুলাই, 2021 শে ইউ জি সি পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে যে নতুন নির্দেশকা বের করেছে সেটাই এই বিষয়ে সাম্প্রতিকতম নির্দেশকা। সেই নির্দেশকায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগ পরীক্ষা বিষয়ে যা বলেছে তা 2020 র মূল নির্দেশকার মোটামুটি প্রতিরূপ। ব্যতিক্রম মূলত প্রান্তিক পরীক্ষাগুলির বিষয়ে। এই প্রান্তিক পরীক্ষাগুলি অর্থাৎ ইউ জি লেভেলের সিক্স সেম ও পি জি লেভেলের ফোর্থ সেম পরীক্ষাগুলি 31 আগষ্টের মধ্যে নিতে হবে। তার মূল কারণ, এই প্রান্তিক সেমগুলির পরীক্ষার্থীরা তাদের উচ্চতর শিক্ষা বা গবেষণায় যাতে সঠিক সময়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। সমতা হয়তো লক্ষ্য ইউ জি সির। সেটা কাম্য ও বটে। তবে ' শত সহস্র পুষ্প প্রস্ফুটিত হোক', সেটা ও দরকার। এই সমতার লক্ষ্যে ইউ জি সি যখন নির্দেশকা জারি করলো, সারা দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় একইরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কিছুটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল। এই অতিমারি সবাইকে এই সিদ্ধান্তহীনতার মাঝে ঠেলে দিচ্ছিল। ইউ জি সির এই নির্দেশকা তাদের সেই সমস্যা থেকে বের হতে সাহায্য করেছে বলাই বাহুল্য।

সমস্যার কারণ 
সমস্যার প্রথম কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে ইউ জি সির বিলম্বিত নির্দেশকা প্রকাশ। এর ফলে আমাদের রাজ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে তাদের প্রান্তিক ও মধ্যবর্তী সেমিস্টারগুলির চূড়ান্ত পরীক্ষা নিয়ে নিয়েছে। আবার কিছু  বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের অন্তর্ভুক্ত কলেজগুলিতে পরীক্ষা না হলেও পরীক্ষা সংক্রান্ত নোটিফিকেশন জারি হয়ে গেছে। ছাত্র শিক্ষক সবার জানা হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ সবক্ষেত্রে প্রস্তুতি পূর্ণমাত্রায় শুরু হয়ে গেছে। যত বিপত্তি শুরু ইউ জি সির এই অকস্মাৎ ও বিলম্বিত নির্দেশকা প্রকাশ। ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে বিভ্রান্তি চরমে পৌঁচেছে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো এই বিভ্রান্তি বহুগুন বেড়ে যায় যখন সরকারি উচ্চতর কর্তৃপক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় সব সেমিস্টারে চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাধিকার আছে। তারা এই সিদ্ধান্ত নিতেই পারে।

 আসলে এই ঘোষণায় কোনো ভুল বা ত্রুটি আছে বলা যায় না। তবে ইউ জি সির সব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাম্য বা সমতা আনার প্রয়াস নিয়ে প্রশ্ন তোলাও কোন যুক্তিসংগত বক্তব্য বলে মেনে নেওয়া যায় না।  কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে যেগুলির সব সেমিস্টারে চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পূর্ণ হয় নি, তারা মধ্যে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাদের প্রান্তিক সেমিস্টারগুলির চূড়ান্ত পরীক্ষা চলাকালীন নতুন নির্দেশকা প্রকাশ করে বসে। এই নতুন নির্দেশকায় বলা হয় ইউ জি সির নির্দেশকাকে মান্যতা দিয়ে সকল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা বজায় রাখার খাতিরে ইউ জি সির নির্দেশকা মান্যতা দেওয়া হল। অর্থাৎ প্রান্তিক সেমিস্টারগুলির কেবলমাত্র চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া হবে। কিন্তু মধ্যবর্তী সেমিস্টারগুলির ক্ষেত্রে পঞ্চাশ শতাংশ নেওয়া হবে কলেজ  বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা থেকে ও বাকি পঞ্চাশ  শতাংশ আসবে ছাত্রের পূর্ববর্তী পরীক্ষার রেজাল্ট থেকে।

  কিন্তু বাস্তবে ইতিমধ্যে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যবর্তী সেমিস্টারের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। কিছু কিছু বাকি ও আছে। প্রশ্ন হল তাহলে এই পরীক্ষাকে কি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন বলা যায়? কারণ প্রশ্নপত্র দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু কলেজের নিজ শিক্ষকরা মূল্যায়ন করেছে। যেহেতু মূল্যায়িত হয়েছে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক দ্বারা, অতএব এটা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা কোন গুলি? এই বিভ্রান্তির জন্য ছাত্রছাত্রীরা মানসিকভাবে দোদুল্যমান অবস্থায় আছে। আবার ও বাকি পরীক্ষা গুলি দিতে হবে কি? শিক্ষকরা বিভ্রান্তির মধ্যে আছে পরীক্ষা হওয়া খাতাগুলির মূল্যায়ন দরকার না দরকার নেই? এই প্রশ্নের উত্তর কারুর কাছেই নেই। হয়তো থাকলে ও তার উত্তর দেওয়ার সাহস কারুর নেই। 

  এরপর আসছে উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিষয়। এমনিতে এই অতিমারিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় দায়িত্ব ও কাজ বহুলাংশে কমে গেছে। ততোধিক বেড়ে গেছে কলেজের ও কলেজ শিক্ষকদের ও কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ামক বিভাগের কাজ বহুলাংশে কমে গেছে। এখন কেবল ফর্ম ফিলাপ যার বেশিটা ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ কলেজই করে থাকে। নিয়ামক বিভাগ পোর্টাল খুলে রাখে আর নির্দিষ্ট সময় পরে তা বন্ধ করে। এরপর প্রশ্নপত্র কালেক্ট করে মডারেট করিয়ে পরীক্ষার দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে সেই প্রশ্নপত্র আপলোড করে দেওয়া। এর আগে পরীক্ষার একটি নির্ঘন্ট বের করা ও অ্যাডমিট কার্ড প্রেরণ করার দায়িত্ব অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ামক বিভাগের। এরপর মার্কস আপলোডের জন্য পোর্টাল খুলে দেওয়া। 

 এই সংক্ষিপ্ত হওয়া কাজের মধ্যে ও নিয়ামক বিভাগ চরম অনৈতিক ও দায়িত্ব জ্ঞানহীন কাজের পরিচয় রাখে যখন পরীক্ষা শেষের দুদিনের ও কম সময়ের মধ্যে পোর্টাল বন্ধ করে দেয়। একবার ও চিন্তা করা হয় না যে একজন শিক্ষকের পক্ষে এত খাতা দেখে এই অল্প সময়ের মধ্যে মার্কস জমা দেওয়া কিভাবে সম্ভব? আবার এই বাড়িতে বসে পরীক্ষায় পাতার পর পাতায় লেখার ব্যাপারে ছেলেমেয়েদের কোন কার্পণ্য নেই। অফলাইন পরীক্ষায় যারা চার পাঁচ পাতা লিখতে চার ঘন্টা কাটিয়ে দিত তারা গড়ে পঁচিশ তিরিশ পাতা ভরিয়ে দিচ্ছে।

  মূল্যায়নের প্রতি ন্যায়বিচার করতে গেলে এই দুদিন কি যথেষ্ট? না পরোক্ষভাবে বলে দেওয়া হল বা বুঝিয়ে দেওয়া হোল মূল্যায়নের দরকার নেই? কেবলই মার্কস আপলোড করলেই চলবে। যে শিক্ষকরা এই বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করতে পারেন না, তাদের কথা চিন্তা করুন। নাওয়া খাওয়া ভুলে রাত জেগে কি অমানুষিক পরিশ্রম করে দায়িত্ব পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত রূপায়নের জন্য। এই অমানুষিক পরিশ্রমের পর ও কি সবক্ষেত্রে সমান ন্যায়বিচার সম্ভব? এতদসত্ত্বেও মার্কশীটে ভুরি ভুরি ভুলের অভিযোগ আসে। 

  এই বিলম্বিত ও অকস্মাৎ নির্দেশকা সকল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা আনতে সমর্থ হয়েছে কিনা তা এই মূহুর্তে বলা কঠিন। তবে এই নির্দেশকা যে বহু বহু  সমস্যার জন্ম দিয়েছে সে ব্যাপারে আমরা সবাই মনে হয় নিশ্চিত।
-----------------------------------------

সজল কুমার মাইতি।
প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, বানিজ্য বিভাগ, হুগলী মহসীন কলেজ। পূর্বতন অধ্যাপক, গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স এ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন, কলকাতা। চৌত্রিশ বছরের অধিক কাল ইউ জি ও পি জি শিক্ষা দানের অভিজ্ঞতা। বতর্মানে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কলেজের বানিজ্য বিষয়ে সিনিয়র সার্ভিসের একমাত্র অধ্যাপক।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি