বারুণী স্নান /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব - পর্ব ৩

বারুণী স্নান

ভাস্করব্রত পতি

মকরবাহিনী গঙ্গাকে দেবাদিদেব মহাদেবের মাথার জটা থেকে মুক্ত করে মর্ত্যে এনেছিলেন ভগীরথ। সেই তিথিটি ছিল পৌষ সংক্রান্তি। আর এজন্য একে বলে ‘মকর সংক্রান্তি'।
মকর > মুখ + √ ক + অ (ক) – ক 
'মকর' নামের সাথেই ‘নদী’র সংযোগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। কেননা মকর হল সামুদ্রিক জলচর বিশেষ। কবিকঙ্কন চণ্ডীতে আছে ‘মকরে মানুষ কাটে’। আবার শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল-এ পাই ‘আমি মৎস্যতে মকর’।

এই মকর সংক্রান্তিতেই বিভিন্ন স্থানে হয় স্নান পর্ব। একে বলে 'মকর স্নান'। 'বারুণী স্নান'ও বলে। সংক্রান্তির দিন ভোরে স্নান করে লক্ষ্মী পূজা হয়। তাতে নৈবেদ্য থাকে ‘মকর’। এই ‘মকর’ এ থাকে নানা ফসলের সমাহার। বিশেষ করে চাল থাকবেই। স্বভাবতই মকরসংক্রান্তিকে উপলক্ষ্য করে উৎসবটি নদী কেন্দ্রিক ফসলের উৎসব। শষ্য ঘরে তোলার আনন্দে এই উৎসব। খনার বচনে আছে—‘যদি বর্ষে মকরে / ধান হবে টেকরে’। এই ‘মকর’ হল, মকর রাশিযুক্ত মাঘমাস। গীতাতে আছে ‘ঝর্ষানাং মকরশ্চাশ্মি'।

মকর সংক্রান্তির দিনেই বিভিন্ন এলাকায় বারুণী স্নান চলে। চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে এই মকর সংক্রান্তির দিনের স্নান সম্পর্কে মেলে—“মকরে প্রয়াগ স্নান'। আলোচিত মকর হল দশম রাশি বিশেষ। তিরিশ ডিগ্রি পরিমিত দশম বৃত্তখণ্ডকেও বলে মকর। মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাস্নানের পর স্ত্রীলোকের সতীত্বসূচক সম্বন্ধ বিশেষকেও বলে মকর। রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের লেখাতে পাই ‘ইহার হইয়া কহে উহার মকর'। মকর মাসে রৌদ্রের তাপ প্রখর। রামপ্রসাদ সেনের ‘বিদ্যাসুন্দর’ এ আছে ‘মকরে প্রখর রবি’। 

‘মকর সংক্রান্তি’ হল সূর্যের মকর রশ্মিতে গমন। মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাদিতে স্নানকেই বলে ‘মকরস্নান’। এই দিনেই হয় বারুণী স্নান। আর বারুণী স্নান উপলক্ষে বসে বারুণী মেলা। রাজ্যের অন্যান্য এলাকার মতো পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক শহরের পূর্ব প্রান্তে কপালমোচন ঘাট ও রূপনারায়ণ নদকে ঘিরে চলে বারুণী স্নান। অন্যান্য সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাতেও বারুণী স্নান জনপ্রিয় লৌকিক উৎসব।
বারুণ = বরুণ সম্বন্ধীয়
মনুসংহিতাতে পাই—‘পাশৈর্বধ্যতে বারুণৈঃ”।
বরুণ – √ বৃ উন (উনন্)-ৰ্ম্ম

অর্থাৎ যাঁহার কাছে দেবতারা বর প্রার্থনা করেন। এই 'বরুণ' হল প্রাচীন বৈদিক দেবতা। ‘মিত্র’ দেবতার সহিত এর উল্লেখ দেখা যায়। এই বরুণ দেবতার শক্তি হল ‘মায়া’ এবং অস্ত্র হল ‘পাশ’। ঋগ্বেদে ইনি ‘সিন্ধুপতি’ নামে অভিহিত হয়েছেন। অর্থাৎ নদীগণের পালয়িতা। তাই পুরাণ অনুসারে ইনি ‘জলাধিপতি’। গীতাতে পাই—‘বরুণ্যে যাদসামহম্'।

ভাগবতে পাই মহর্ষি বাল্মীকির স্ত্রী চর্ষনীর গর্ভজাত এই বরুণ। ইনি পশ্চিমদিকের দিকপাল এবং দ্বাদশ আদিত্যেবরুণ এর অন্যান্য অর্থ হল—জল, সমুদ্র, বৃক্ষ ইত্যাদি। ‘বরুণ গৃহ’ হল সমুদ্র।

বরুণ > বারুণ > বারুণি / বারুণী

‘বরুণ’ শব্দ থেকেই ‘বারুণী’ এসেছে। ‘বারুণী’ হল শতভিষানক্ষত্র যুক্ত চৈত্ৰকৃষ্ণ ত্রয়োদশী তিথি। এই তিথি শনিবারে হলে বলা হয় ‘মহাবারুণী’ এবং শুভযোগযুক্তা শনিবারে হলে ‘মহা মহাবারুণী’ হয়। অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত (‘চৈত্যনাব্দ-৪১৪) “চৈতন্যভাগবত’ এ পাই - ‘বারুণী বারুণী প্রভু ডাকে।' ঘনরাম চক্রবর্তীর ‘ধর্মমঙ্গল’-এ রয়েছে ‘খাওয়াইলে বারণে বারুণী।'

‘পরাশর সংহিতা’তে আছে ‘অবগাহ্যং তু বারুণাং (স্নানম)' জলে অবগাহন পূর্বক স্নানকে বলে ‘বারণ'। সেখান থেকে এসেছে ‘বারুণী’ শব্দটি। বারুণী মেলা হল স্নানের মেলা। অবশ্য বরুণের স্ত্রীর নাম ‘বরুণানী'। মহাভারতে আছে ‘যস্যামাস্তে স বরুনো, বারুণ্যা চ সমন্বিতঃ'। তবে শতাভিষানক্ষত্র যুক্ত কৃষ্ণাচতুৰ্দশী তিথিতে পুণ্যস্নানাদি দ্বারা পালনীয় পর্বকেই বলা হয় ‘বারুণী স্নান”।

পৌরাণিক কাল থেকেই ‘কপাল মোচন’ তীর্থ এর নাম রয়েছে। তমলুকের কপালমোচন তীৰ্থতে মকর সংক্রান্তীর দিন বারুণী স্নান করেন পুণ্য লোভাতুর মানুষজন। যদিও এই ‘কপাল মোচন' নামটি নিয়ে একটু ভিন্নতর তথ্য মেলে। আদৌ কি পুরাণ বর্ণিত কপাল মোচন তীর্থ এখানে? আসলে এই নাম ভারতের অন্যত্রও মেলে। ব্রহ্মপুরাণ অনুসারে তাম্রলিপ্তে মেলে কপালমোচন তীর্থ। প্রভাসখণ্ডের মতে গুজরাটের অন্তর্গত তীর্থস্থানে রয়েছে কপালমোচন তীর্থ। স্কন্দপুরাণের কুরুক্ষেত্র মাহাত্মতে মেলে কুরুক্ষেত্রে রয়েছে কপালমোচন তীর্থ। উৎকলখণ্ডের মতানুযায়ী উৎকল দেশে (ওড়িশা) রয়েছে কপালমোচন তীর্থ। আবার পদ্মপুরাণের উত্তর খণ্ডোক্ত মায়াপুরে পাওয়া যায় কপালমোচন তীর্থের নাম। এমনকি রেবাখণ্ডোক্ত রেবাতীরে একটি কপালমোচন তীর্থের সন্ধান মেলে।   সবংয়ের কপালেশ্বরী নদীর পাড়েও কপালমোচন নামের অনুষঙ্গ মেলে। যাইহোক, প্রকৃত কপালমোচন তীর্থ কোনটি সে বিষয়ে মতানৈক্য থাকলেও তমলুকস্থিত কপালমোচন তীর্থকেই মান্যতা দেন এরাজ্যের ভক্তকূল। 
কপালমোচন — কপাল মোচন।
কপাল অর্থে মাথার খুলি বা করোটি।
ক + পালি + অ (অন্) – ক (‘অমরকোষ’ টিকা) -
'মোচন’ অর্থে মুক্তিদান বা উন্মুক্ত করা বা দূরীকরণ করা। 
মূঢ় + নিচ্ + অন মোচন।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ' অনুসারে ‘কপালমোচন' হল কপালের মোচনস্থান। কাশীস্থ তীর্থ বিশেষ। এখানে তিনি এই তীর্থের মাহাত্ম্য সম্পর্কে ‘কাশী খণ্ড' এর ৩১ অধ্যায় উত্থাপন করে লিখেছেন— “মহাদেব ব্রহ্মার শিরশ্ছেদ করিয়া ব্রহ্মহত্যা পাপে লিপ্ত হন এবং নানা তীর্থ ভ্রমণ করিয়া অবশেষে এই স্থানে আসিয়া পাপমুক্ত হইলে ব্রহ্মকপাল হস্ত হইতে খসে পড়ে। তদবধি ইহার নাম ‘কপালমোচন'।”
উমাচরণ অধিকারী তাঁর ‘তমলুকের প্রাচীন ও আধুনিক বিবরণ' বইতে (১৮৭২ সাল) এই কপালমোচন তীর্থ সম্পর্কে লিখেছেন—“ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ্যন্তর্গত তমোলুক মাহাত্ম্য পুস্তকে লিখিত আছে যে, দক্ষযজ্ঞে সতী পরিনিন্দা শ্রবণে কলেবর পরিত্যাগ করিলে, মহাদেব ক্রোধ পরবশ হইয়া যজ্ঞ বিনষ্ট ও দক্ষের মস্তকচ্ছেদন করিয়াছিলেন। ব্রহ্মবধজনিত মহাপাপ বশতঃ সেই ছিন্ন মস্তক তাঁহার হস্তে অপরিভ্রষ্ট হইয়া রহিল। সেই পাপ হইতে বিনির্ম্মুক্ত হইবার মানসে ধূর্জ্জটি পৃথিবীর সমুদয় তীর্থদেশ পরিভ্রমণ করিলেন, কিছুতেই নৃমুণ্ড স্খলিত হইল না। তজ্জন্য একদা শোক-সন্তপ্তহৃদয়ে নির্জ্জন গিরি গহ্বরে শয়ন করিয়া আছেন, এমন সময় ভগবান্ নারায়ণ তাঁহার সমীপাগত হইয়া প্রথমত সাদর সম্ভাষাণাদি দ্বারা উমাপতিকে প্রীত করিলেন। পরে তাঁহার বিষাদ কারণ জিজ্ঞাসা করিলে কৈলাশনাথ সমস্ত আদ্যোপান্ত বর্ণন করিলেন। বৈকুণ্ঠপতি নারায়ণ এতচ্ছ্রবনে দুঃখিত হইয়া তাঁহাকে তাম্রলিপ্তী নামক পুণ্য তীর্থে গমন ও তথায় পাপ প্রণাশক সরোবরে স্নাত হইয়া জগৎপতি হরি ও বর্গভীমা দেবীকে সন্দর্শন করিতে উপদেশ দিয়াছিলেন -
কপালমোচনং নামে যৎসরঃ পরিকীর্তিতং
তদন্তু স্পর্শনান্মুক্তি নাত্র কার্য্যা বিচারণা। কপালমোচনে সনাত্বা মুখং দৃষ্টা জগৎপতেঃ।
বর্গভীমাং সমালোক্য পুনৰ্জ্জন্ম ন বিদ্যতে।

ভূত-ভাবন অনাদিনাথ ভগবান্ মহাদেব নারায়ণের এই বাক্য শ্রবণান্তর তাম্রলিপ্ত নগরে আগমন করিয়া পুণ্যাদি সরোবরে স্নান, দেব ও দেবী সন্দর্শন করিলে, পাপরাশি বিনষ্ট হইয়া নৃমুণ্ড স্খলিত হইয়াছিল। মহাদেবের হস্ত হইতে এইরূপে তাহা মুক্ত হইয়াছিল। মহাদেবের হস্ত হইতে ‘কপাল মোচন' নাম হইয়াছিল, কেহ কেহ এরূপও অনুমান করিয়া থাকেন।"

এই ধরণের কাহিনীর কথা উল্লেখ করেছেন উইলিয়াম উইলসন হান্টার তাঁর A Statistical Account of Bengal - Midnapur' বইতে (১৮৭৫-৭৭)। এখানে হান্টার বারুণী স্নানের ইতিহাস বর্ণনায় লিখেছেন (পৃষ্ঠা ৫৩) এইভাবে—

"Tamluk or Tamralipta, as it is called in Sanskrit, although orginally a centre of Buddhismm, was converted into a place of great sanctity when the latter religion was outstand by Brahmanism. Its very name bears withness to its ancient unorthodoxy, but even this has been distorted into a title of honour. Grammarians derive the word from Tamas + lipta, —literally, staned with darkness or sin. But a legend related that it took its name from the fact that Vishnu, in the form of Kalki, having got very hot in destroying the demons, dropped perspiration at this fortunate spot, which accordingly became stained with the holy sweat ( or dirt) of the god, anmd gave a sanctity and name to the place. A Sanskrit text speaks of it as a holy place in the following words-Tamralipta kastasyan, gurhtan tirthavaran baset; Tatra shanew chiradeva -samyak yasyeti malpurin'-I will tell you where yuour sins will be destroyed. There is a great place of pilgrimage on the south of India, an ablution in which saves a man from his sins. As an illustration of the great sancitity of the place, a Hindu legend relates that when the god Mahadeva destroyed Daksha, the son of Brahma the Creator, the severed head of -- Daksha became fixed in his hand, on account of his having 'murdered a Brahman, he asked the advice of he goods as to how he was to get rid of the head, and was told to pay a visit to all the places of pilgrimage in the world. He then visited the places, but was unable to release himself, and when employed in performining austerties in the Himalayas as a penance for his sin. Vishnu appeared to him and told him to visit the place of pilgrimage at Tamralipta, which he had formerly omitted. Mahadeva immediately set out, and on arriving at the place, bathed in a small pool between the temples of Barga-bhima and Jishnu-Narayan, and immediately Daksa's head fell from his hand. This place was hence called Kapal-mochan, or the Release of the Head, and became a great place of pilgrimage. In course of tiem, however, the river washed away the site. Pilgirms, however, stil bathe themselves in the river, on the spot where the old Vishnuvite temple formerly stood, during the Baruni festival."

‘তাম্রলিপ্তের কথা' বইতে গবেষক চিন্ময় দাশ লিখেছেন (পৃষ্ঠা-২৯৮) “চতুর্মুখ ব্রহ্মার কথাই আমরা জানি। তার নাকি আরও একটি মুখ ছিল। সে মুখটির সৃষ্টি হয়েছিল দেবগণের শক্তিহরণের উদ্দেশ্যে। মহাদেব শিব স্বয়ং সেই মুখটি ছেদন করে দিলে, মুখটি শিবের হাতে আটকে যায়। আটকে যাওয়া ব্রহ্মমুখ থেকে শিবের রক্ষা পাওয়ার উপায় হিসাবে তমলুকের ‘কপালমোচন’ তীর্থের সৃষ্টি।”

‘তমলুক শহরের ইতিকথা' তে হরিসাধন সরকার এই কপালমোচন তীর্থ সম্পর্কে লিখেছেন—“দক্ষ প্রজাপতির ছিন্নশির শিবের হাতে স্খলিত হয়নি। তখন বিষ্ণুর পরামর্শে শিব তমলুকে গুপ্ত ব্রহ্মকুণ্ডে স্নান করলে তার হাত হতে দক্ষের ছিন্নশির স্খলিত হয়ে যায়। সেইজন্য তমলুক ‘কপালমোচন’ তীৰ্থ নামে অভিহিত এবং সেইজন্য প্রতি মকর সংক্রান্তিতে প্রতি বৎসর নানা দেশ থেকে সহস্র পুণ্যার্থী শঙ্করআড়া খালে ও ভীমার কুণ্ডুতে পুণ্যস্নান করেন। ঐদিন বিরাট মেলা বসে। যাতে সারাদিন অসংখ্য দোকানী পশারীরা আসেন এবং বহু দুষ্প্রাপ্য ও দুর্লভ জিনিষপত্র নিয়ে আসেন। প্রায় পাঁচ সাত হাজার নর-নারী, শিশু সমাবেশ হয় এই মেলায়। আগে দেখা যেত দেশ দেশান্তর থেকে যাত্রীরা এসে আগের দিন থেকে হোটেল বা বাসাবাড়ি বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে এসে থেকে পরদিন মেলার উৎসব আনন্দে কাটিয়ে পরদিন যেত। এখন বাস ও যানবাহনের সুবিধা হওয়ায় মেলার দিনই প্রায় সবাই আসে। পৌষ বারুণীর মেলা তমলুকের একটি স্মরণীয় মেলা ছিল। আজও মনে সেই আনন্দের সুর বাজে। কিন্তু কালচক্রে ও ঘটনার বিপর্যয়ে সে সুর বেসুরো হয়ে গেছে—তবুও তমলুকের এটি একটি প্রসিদ্ধ পরিচিত।”

বাস্তবিকই, তমলুকের বারুণী মেলা কিংবদন্তীর মোড়কে থেকেও ফি বছর হয়ে ওঠে জনগণের মেলা। বারুণী মেলা উপলক্ষ্যে তমলুকের উত্তরচড়া শঙ্করচড়া গ্রামের ‘শান্তি সংঘ’ ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত হয় গঙ্গাপূজা। মন্দিরের গাত্রে টাঙানো বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় এটি শুরু হয়েছিল ১৩৭৮ বঙ্গাব্দে। 

১৯০৮ এর ৮ই মার্চ থেকে ১৯১১ এর ২রা মার্চ পর্যন্ত তমলুকের সাবডিভিশনাল অফিসার হিসেবে কাজ করেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তিনি তাঁর লেখা ‘একটি ক্ষুদ্র জীবনের কথা’ পুস্তকে উল্লেখ করেছিলেন এখানকার স্নানপর্বের কথা। তিনি লিখেছিলেন, ‘তমলুক শহরে সেরূপ উল্লেখযোগ্য উৎসব সে সময় দেখি নাই। তমলুকের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দুর্গোৎসব, শ্যামাপূজা ও অন্যান্য প্রতিমা পূজা নিষিদ্ধ। ঐ সকল পূজার সময় মা বর্গভীমারই পূজা একটু আড়ম্বরের সহিত হইয়া থাকে। পৌষ সংক্রান্তিতে মায়ের মন্দিরের সম্মুখস্ত পাকা রাস্তার দুই পার্শ্বে মিষ্টান্ন, খেলনা, কাপড়, বাসন, পাটী প্রভৃতির অনেক দোকান বসে। সাব ডিভিশনের এবং বাহিরের অনেক লোক ঐ সময় তমলুকে আসিয়া মন্দিরের পার্শ্ববর্তী খালে পুণ্য সঞ্চয় মানসে (পূর্বে রূপনারায়ণ নদই এই স্থানে প্রবাহিত হত) স্নান করিয়া থাকে।”

ড. সুকুমার মাইতি তার “তাম্রলিপ্তের সাংস্কৃতিক ইতিহাস" বইতে (২০১৩) লিখেছেন—‘ঐ কুণ্ডই কপালমোচন কুণ্ড নামে পরিচিত। তাই পবিত্র হওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর মকর সংক্রান্তিতে পুণ্যার্থীরা ঐ পবিত্র জলাশয়ে স্নান করেন। ড. প্রদ্যোৎকুমার মাইতি বারুণী স্নান সম্পর্কে লিখেছেন—“পৌষ সংক্রান্তির তমলুকের রূপনারায়ণের মোহনায় স্নান করে, শিব দক্ষকে হত্যার পাপ থেকে মুক্তি পান। এই বিশ্বাস থেকেই আজও প্রতিবছর ঐ দিনে নানা অঞ্চল থেকে সহস্র সহস্র মানুষ তমলুক শহরের পূর্বদিকে অবস্থিত শঙ্করআড়া এবং তার সংলগ্ন একটি ছোট পুকুরে স্নান করেন। এই উপলক্ষ্যে পৌর কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যাতে পুণ্যার্থীদের কোনরূপ অসুবিধা না হয়। এই উপলক্ষে মেলা বসে। পশ্চিমবাংলার অন্যত্রও বারুণী স্নানের মেলা বসে এবং মেলা উপলক্ষ্যে কোথাও কোথাও গঙ্গাপূজা হয়। তমলুকের বারুণী মেলা উপলক্ষে গঙ্গাদেবীর মূর্তি তৈরি করে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। আবার ঐদিন তমলুকের জাগ্রত দেবী বর্গভীমারও বাৎসরিক পূজা সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। বারুণীমেলা ও বর্গভীমা দেবীর বাৎসরিক পূজা উপলক্ষ্যে শহরে প্রায় ছয় সাত হাজার লোকের সমাগম হয়। পূণ্যার্থীরা এই দিন দরিদ্র নারায়ণকে দান করেন। মেলা উপলক্ষ্যে অস্থায়ী দোকানপাট বসে এবং স্থায়ী দোকানগুলিকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে করে মেলায় উপস্থিত ব্যক্তিদের দৃষ্টি সহজে আকর্ষণ করা যায়। মেলাটি একদিনের হওয়ায় আমোদ প্রমোদের তেমন ব্যবস্থা থাকে না। ইতিহাসে প্রসিদ্ধ বৌদ্ধতীর্থ তাম্রলিপ্ত পবিত্র তীর্থ রূপেও যে জনপ্রিয়, তা বারুণী স্নান উপলক্ষে সহস্র সহস্র পুণ্যার্থীর আগমনে প্রমাণিত।”

যোগেশচন্দ্র বসু, ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস' বইতে মন্তব্য করেছেন—“বহুকাল হইতে উহার অস্তিত্ব লোপ হইয়াছে। কাল সহকারে রূপনারায়ণ নদের স্রোতঃ প্রবাহে উপর্যুপ্ত স্থানটি বিলুপ্ত হইয়াছে কিন্তু এখনও প্রতিবর্ষে বারুণী স্নান উপলক্ষে বহু সংখ্যায় নরনারী উক্ত স্থানটির সন্ধান করিতে না পারিয়া বর্গভীমা দেবীর মন্দিরের পাদদেশস্থ নদসলিলে অবগাহনাদি পুণ্যকার্য্য সম্পাদন করিয়া থাকে।" 'তমলুকের ইতিহাস' বইতে (১৯১১) পাই, “বর্তমান জিষ্ণুহরির মন্দির ও ভীমাদেবীর মন্দিরের মধ্যবর্তী স্থানে এখনও কপালমোচন তীর্থের অবস্থান নির্দিষ্ট রহিয়াছে। তথায় এখনও বারুণী উৎসবে পুণ্য সঞ্চয় কল্পে বহু জনসমাগম হইয়া থাকে। সকলেই তাতে অবগাহন করিয়া পবিত্র হয়েন।” 'তাম্রলিপ্ত’ পত্রিকার সম্পাদক জয়দেব মালাকার তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন, 'একসময় এখানকার বারুণী মেলার প্রভাব প্রতিপত্তি এবং জনমানসে বেশ চিত্তাকর্ষক ছিল। এখন সেই দিন নেই।'

তাপস মাইতি সম্পাদিত ‘তাম্রলিপ্তের কথা' বইতে (২০১৪) চিন্ময় দাশ এই তমলুকের বারুণী মেলার বিবরণ দিয়েছেন এইভাবে—“কিংবদন্তী যাই হোক না কেন, যুগ যুগ কালব্যাপী এই তীর্থের উপর সাধারণ মানুষের গভীর বিশ্বাস। কালের আঘাতে সেই পবিত্র জলাশয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কিন্তু আজও পৌষের সংক্রান্তি তিথিতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে তাম্রলিপ্তে। পুণ্যলাভের আশায় সেদিন শঙ্করআড়া খাল, রূপনারায়ণ নদী কিংবা ছোট আকারের নির্দিষ্ট জলাশয়ে অবগাহন স্নান করতে দেখা যায় পুণ্যর্থীদের। এটিই ‘বারুণী স্নান' নামে খ্যাত।” 

কপালমোচন তীর্থতে তমলুকের এই অতি প্রাচীন বারুণী মেলা সম্পর্কে বিবরণ দিয়েছেন বিশিষ্ট গবেষক জয়দীপ পণ্ডা। তিনি তাঁর ‘তমলুকের সেকাল একাল' গ্রন্থে (২০১৩) লিখেছেন—“বারুণীমেলা জেলার অন্যান্য প্রাচীন মেলাগুলির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে।” এই বারুণী মেলার বিবরণ দিতে গিয়ে জয়দীপ পণ্ডা লিখেছেন—“মেলা উপলক্ষে প্রচুর দোকানপাট বসে। পার্শ্ববর্তী জেলা হাওড়া, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা থেকে দোকানদাররা ব্যবসার জন্য এখানে ভিড় জমান।” 

তমলুকের কপালমোচন তীর্থকে কেন্দ্র করে কি রকম মেলা বসত তার বিবরণ মেলে হরিসাধন সরকারের ‘তমলুক শহরের ইতিকথা’ বইতে। এখানে তিনি জানিয়েছেন—“চৈত্র সংক্রান্তি, মাঘী পূর্ণিমা, আষাঢ় তৃতীয়ার দিনেও পূর্বে প্রতি বৎসর পুণ্যর্থীদের ভিড় হোত এই কপালমোচন তীর্থে স্নানের জন্য এবং ছোটখাট মেলাও বসত। বিশেষতঃ চৈত্র সংক্রান্তির দিন চড়কের জন্য। আজ অবশ্য স্নানার্থীর ভিড় খুব কম তবে চড়কের সময় বৈকালে মেলার মত বিরাট নরনারীর সমাবেশ হয়ে থাকে ও দ্রব্যসম্ভারে মেলাপ্রাঙ্গণ ভর্তি হয়ে থাকে।”

বারুণী স্নান আজ হিন্দু বাঙালীদের কাছে এক অনন্য উৎসব। গভীর শ্রদ্ধায় তথাকথিত কপালমোচন ঘাটের দূষিত জলে অবগাহন করে নিজের দেহের কালিমা ধুয়ে ফেলে। নিজেকে শুদ্ধ করে তোলে। সন্তান কামনায় এবং পরিবার পরিজনের মঙ্গল কামনায় বারুণী স্নান হয়ে ওঠে অনন্য। এ এক অসাধারণ লোকাচার। অন্য ধরনের লোক উৎসব। বারুণী স্নান আসলে সামাজিক অপরাধ, গার্হস্থ্য অপরাধ এবং লৌকিক দোষাবলী মুছে নতুন করে দিন শুরু করার উৎসব।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া