প্রিয়ভাষী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু :এক পুনর্পাঠ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

প্রিয়ভাষী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু : এক পুনর্পাঠ

প্রসূন কাঞ্জিলাল

লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরী ছিলেন সুভাষচন্দ্র বিরোধী মানুষ, তথাপি সুভাষচন্দ্র বসুর মননের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে তাঁর কোনও সন্দেহই ছিলনা। তিনি বলেছিলেন- "সুভাষচন্দ্রের আসল গৌরব তাঁহার পূর্ণ বাঙালিত্ব। বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের শেষে আছে যে,---- গোবিন্দলালের ভাগিনেয় শচীকান্ত বারুণী পুষ্করিণীর পাড়ে আবার বাগান করিয়াছিল, এবং উহাতে একটি মন্দির নির্মাণ করিয়া, সেই মন্দিরে ভ্রমরের সুবর্ণ প্রতিমা স্থাপন করিয়া লিখিয়াছিল- 'যে, সুখে দুঃখে, দোষে গুণে, ভ্রমরের সমান হইবে, আমি তাহাকে এই স্বর্ণপ্রতিমা দান করিব।'.... আমার যদি অর্থ থাকিত, আমিও সুভাষচন্দ্রের একটি সুবর্ণপুত্তলিকা গড়াইয়া এই কথাই বলিতাম।"

২১ অক্টোবর ১৯৪৩, সিঙ্গাপুরের ক্যাথে সিনেমা হলে সেদিন বিশাল সংখ্যায় হাজির ভারতীয়রা। ‘‌অন্তর্বর্তীকালীন স্বাধীন ভারত সরকার’‌ বা আজাদ হিন্দ সরকার গড়ার ঘোষণা করলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। শপথ নিলেন সরকারের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপ্রধান ও সৈন্যবাহিনীর সর্বাধিনায়ক রূপে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে রইল পররাষ্ট্র ও যুদ্ধ বিষয়ক দপ্তর। পূর্ণ মন্ত্রিসভার ২১ জন সদস্য ও উপদেষ্টা শপথ নিলেন। অর্থমন্ত্রী হলেন মেজর জেনারেল এ সি চ্যাটার্জি, নারীবিষয়ক মন্ত্রী ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন, প্রচার দপ্তরের দায়িত্বে রইলেন এস এ আইয়ার ও আইন বিভাগের দায়িত্বে এন এন সরকার। প্রবল হর্ষধ্বনিতে সভাস্থল মুখরিত তখন।  ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগের সম্পাদক হিসাবে ক্যাপ্টেন এ সি চ্যাটার্জি ভাষণ দিলেন। এই ঐতিহাসিক ও পরমগর্বের ২১শে অক্টোবরের প্রাক্‌ ইতিহাসটা না জানলে বিষয়টা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই ১৯৪১–‌এর ১৭ জানুয়ারি সুভাষচন্দ্র গৃহত্যাগ করেন ও গোমো, পেশোয়ার, কাবুল হয়ে ইতালির দূতাবাসের সহায়তায় ‘‌অকল্যান্ড মাৎসোটা’‌ ছদ্মনামে পাসপোর্ট নিয়ে রাশিয়ার মধ্যে দিয়ে পৌঁছে গেলেন জার্মানি। বাড়ি থেকে ব্রিটিশ রাজশক্তির চোখে ধুলো দিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়েই পাহাড়–‌পর্বত পায়ে হেঁটে পৌঁছে গিয়েছিলেন কাবুল। সঙ্গে একমাত্র সঙ্গী ভগৎরাম তলোয়ার। জার্মানিতে গড়ে তুললেন ‘‌ইন্ডিয়ান লিজিয়ন’‌। কিন্তু উপলব্ধি করলেন, এত দূর থেকে সামরিক অভিযান সম্ভব নয়, তাঁকে যেতে হবে দক্ষিণ–‌পূর্ব এশিয়া। কিন্তু এই প্রবল যুদ্ধের ঘনঘটার মধ্যে যাবেন কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ?‌ তখন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল সুভাষকে "দেখামাত্র গুলি" করার নির্দেশ জারি করেছে। বিমানে যাওয়ার প্রস্তাব এলেও আপত্তি উঠল। একটি সাবমেরিনের ব্যবস্থা হল জার্মান সরকারের পক্ষ থেকে। ৮ ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩ জার্মানির কিয়েল বন্দর থেকে যাত্রা করেন ও তিন মাসেরও বেশি সময় সমুদ্রের তলা দিয়ে পেরিয়ে মাঝে ম্যাডাগাস্কার দ্বীপরাষ্ট্রের ৪০০ কিমি দূরে ‘‌পূর্ব নির্দিষ্ট’‌ স্থানে জার্মান ইউবোট থেকে জাপানের পাঠানো অন্য সাবমেরিনে চড়ে পৌঁছে গেলেন মালয়। তারপর বিমানযোগে টোকিও পৌঁছলেন ১৬ মে সকালে। নেতাজির এই অনন্য সাধারণ কর্মকাণ্ডের কথা জেনে দক্ষিণ–‌পূর্ব এশিয়ার সমগ্র ভারতীয় জনসাধারণ, যাঁরা ছড়িয়ে–‌ছিটিয়ে রয়েছেন এই সাত–‌আটটি দেশে, তাঁরা নেতাজিকে কাছে পেতে তখন অধীর হয়ে উঠেছিলেন। উনি তখন আক্ষরিক অর্থেই রূপকথার রাজপুত্র, যিনি সবাইকে দেবেন তাঁদের মাতৃভূমি। তাই মহানায়ককে বরণ করার অনুষ্ঠান হয়েছিল এই ক্যাথে সিনেমা হলেই। টোকিও–‌তে তখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু। রাসবিহারীর তখন বয়স হয়েছে, তবুও এই বয়সে "ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লিগ" এর সংগঠনকে ধরে রেখেছেন পূর্ব এশিয়ায়। বৃদ্ধ রাসবিহারী নেতাজিকে পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি ও সংগঠনের অবস্থা বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, "এবার আমার দায়িত্ব শেষ, আমি মুক্ত।"  ২রা জুলাই সিঙ্গাপুরে পৌঁছলেন নেতাজি সুভাষ এবং ৫ই জুলাই আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈন্যদের সমাবেশে ভাষণ দিয়ে বললেন, ‘" বর্তমানে আমি তোমাদের অন্য কিছুই দিতে পারি না— দিতে পারি শুধু ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কৃচ্ছতা, ক্লেশপূর্ণ অভিযান অথবা হয়তো মৃত্যু। তবু যদি জীবনে–‌মরণে তোমরা আমায় অনুসরণ করো.‌.‌.‌ আমি তোমাদের জয় ও মুক্তির পথে নিয়ে যাব "’‌। এবার নেতাজি যেখানেই গেলেন, পেলেন এক অকল্পনীয় সমাদর ও আনুগত্য। ২৫ আগস্ট ১৯৪৩ আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বময় কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিলেন। এরপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।  সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার পূর্ণ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরদিন মধ্যরাতে সিঙ্গাপুর রেডিও মারফত ইঙ্গ–‌মার্কিন রাজশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল আজাদ হিন্দ সরকার। যুদ্ধে এল প্রাথমিক জয়। ১৪ এপ্রিল ১৯৪৪ মণিপুরের মৈরাং শহরতলি দখল করে নিল আজাদ হিন্দ বাহিনী। স্বাধীন ভারত সরকারের হাতে চলে এল মূল ভূখণ্ডের একটি অংশ। এর আগেই আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপু্ঞ্জের শাসন অধিকার অর্জন করেছে স্বাধীন ভারত সরকার। প্রধানমন্ত্রী নেতাজি সুভাষচন্দ্র ৩০শে ডিসেম্বর ১৯৪৩ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন পোর্ট ব্লেয়ারের জিমখানা মাঠে।  তবুও শেষ রক্ষা হল না। মূলত জাপানে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করায় জাপানের পক্ষে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। প্রধান সাহায্যকারী জাপান এভাবে  কোণঠাসা হয়ে পড়ায় সর্বাধিনায়ক নেতাজি পশ্চাদ্‌পসারণের সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৪–‌১৫ আগস্ট, ১৯৪৫ প্রধানমন্ত্রী নেতাজি তাঁর সামরিক কাউন্সিলের সঙ্গে তিন ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করলেন। শেষে উনি নিজের আত্মগোপন করবার সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। 

এত দিনে তৃতীয় নেতাজি কমিশনের অনুসন্ধান রিপোর্টের মাধ্যমে আমরা জেনে গিয়েছি, পূর্ব পরিকল্পনামাফিক নেতাজি বিমান দুর্ঘটনার আড়ালে ব্রিটিশদের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত স্বাধীনতা লাভ করেছিল ওঁর দূরদর্শী ভাবনা অনুযায়ী, আর সে কথা অকপটে স্বীকার করেছেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট অ্যাটলি, যিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের দলিলে ব্রিটিশদের পক্ষে স্বাক্ষর করেছিলেন।  ‌‌

-----জিন্দাবাদ  নেতাজী ......

( কলমে --- সৈয়দ মুজতাবা আলী।) 

আমাদের মত সাধারণ লোকের পক্ষে সুভাষচন্দ্রের মত মহাপুরুষের জীবনী আলোচনা করা অন্ধের হস্তী-দর্শনের ন্যায়। তৎসত্ত্বেও যে আমরা সুভাষচন্দ্রের জীবনী দর্শনে প্রবৃত্তি হয়েছি তার প্রধান কারণ, আমাদের মত অর্বাচীন লেখকেরা যখন মহাপুরুষকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেবার জন্য ঐ একমাত্র পন্থাই খোলা পায়, তখন তার শ্রদ্ধাবেগ তাকে অন্ধত্বের চরমে পৌঁছিয়ে দেয় ----- শ্রদ্ধা ও ভক্তির আতিশয্যা তখন আমাদের চেয়ে সহস্ৰগুণে উত্তম লেখককেও বাচাল করে তোলে।

দ্বিতীয় কারণ, এক চীনা গুণী জনৈক ইংরেজকে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বুঝিয়ে বলছিলেন, ‘সরোবরে জল বিস্তর কিন্তু আমার পাত্র ক্ষুদ্র। জল তাতে ওঠে অতি সামান্য। কিন্তু আমার শোক নেই--- মাই কাপ ইজ স্মল-বাট আই ড্রিঙ্ক অফেনার ( My cup is small but I drink oftener )।’

আমাদের পাত্র ছোট, কিন্তু যদি সুভাষ-সরোবর থেকে আমরা সে পাত্র ঘন ঘন ভরে নিই তাহলে শেষ পর্যন্ত সরোবর নিঃশেষ হোক আর নাই হোক, আমাদের তৃষ্ণা নিবৃত্তি নিশ্চয়ই হবে। আমার পাত্রে উঠেছে দুই গণ্ডুষ জল, অথবা বলব, আমি অন্ধ, হাত দিয়ে ফেলেছি সৌভাগ্যক্রমে দুটি দাঁতেরই উপর। অবশ্য সব অন্ধই ভাবে, সেই সবচেয়ে মহামূল্যবান স্থলে হাত দিয়ে ফেলেছে, কাজেই এ-আন্ধের অভিমত আত্মম্ভরিতাপ্রসূতও হতে পারে।

প্রথম, ----  বর্মায় সুভাষচন্দ্ৰ কি কৌশলে হিন্দু-মুসলমান-শিখকে এক করতে পেরেছিলেন?   এবং শুধু তাই নয়, ভারতবর্ষে ফেরার পরও এদের অধিকাংশ অখণ্ডবাহিনীরূপে আত্মপরিচয় দিতে চেয়েছিলেন। আমরা জানি, সুভাষচন্দ্রের সাইগন আসার বহুপূর্বে রাসবিহারী বসু অনেক চেষ্টা করেও কোনো আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে তুলতে পারেন নি। অথচ রাসবিহারী বসু, সুভাষচন্দ্রের তুলনায় জাপানীদের কাছে অনেক বেশি পরিচিত ছিলেন—জাপান-ফের্তা ভারতীয়দের মুখে শুনেছি। রাসবিহারী বসুকে জিজ্ঞাসা না করে জাপান সরকার কখনো কোনো ভারতীয়কে জাপানে থাকবার ছাড়পত্র মঞ্জুর করত না।

একদিকে যেমন দেখতে পাই, সুভাষচন্দ্ৰ ‘আজাদ হিন্দ’ নামটি অনায়াসে সর্বজনপ্রিয় করে তুললেন, অন্যদিকে দেখি, কৃতজ্ঞ মুসলমানেরা তাঁকে ‘নেতাজী’ নাম দিয়ে হৃদয়ে তুলে নিয়েছে ----- ‘কাইদ-ই-আকবর’ বা ঐ জাতীয় কোনো দুরূহ আরবী খেতাব তাঁকে দেবার প্রয়োজন তারা বোধ করে নি।  পাঠকের স্মরণ থাকতে পারে, তখন এ-দেশে হিন্দি-উর্দু সমস্যা কংগ্রেসকে প্রায়ই বিচলিত করত, অথচ দেখি সুভাষচন্দ্ৰকে এ সমস্যা একবারের তরেও কাতর করতে পারে নি। বেতারে আমি সুভাষচন্দ্রের প্রায় সব বক্তৃতাই শুনেছি এবং প্রতিবারই বিস্ময় মেনেছি হিন্দি-উর্দুর অতীত এ ভাষা নেতাজী শিখলেন কি করে? নেতাজী তো শব্দ তাত্ত্বিক ছিলেন না, ভাষার কলাকৌশল আয়ত্ত করবার মত অজস্র সময়ও তো তাঁর ছিল না। এ-রহস্যের একমাত্র সমাধান এই যে, --- রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি যে মহাত্মার থাকে, দেশকে সত্যই যিনি প্রাণ মন সর্বচৈতন্য সর্বানুভূতি দিয়ে ভালোবাসেন,   সাম্প্রদায়িক কলহের বহু ঊর্ধ্বে নিৰ্দ্ধন্দ্ব পূণ্যলোকে যিনি অহরহ বিরাজ করেন, যে মহাপুরুষ দেশের অখণ্ড সত্যরূপ ঋষির মত দর্শন করেছেন, বাক্যব্ৰহ্ম  তাঁর ওষ্ঠাগ্রে বিরাজ করে।    

 তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেন,   সে-ভাষা সত্যের ভাষা,   ন্যায়ের ভাষা,   প্রেমের ভাষা।    সে-ভাষা শুদ্ধ হিন্দি অপেক্ষাও বিশুদ্ধ হিন্দি, শুদ্ধ উর্দু অপেক্ষাও বিশুদ্ধ উর্দু। সে-ভাষা তার নিজস্ব ভাষা। এই ভাষাই মহাত্মাজীর আদর্শ ভাষা ছিল।

নিজের মনকে বহুবার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছি, সুভাষচন্দ্র না হয় সর্বদ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উড্ডীয়মান ছিলেন, কিন্তু সাধারণ সৈন্যকে তিনি কি করে সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত করলেন? যে উত্তর শেষ পর্যন্ত গ্ৰহণ করেছি, সেটা ঠিক কি না জানি না ;  আমার মনে হয়, সুভাষচন্দ্ৰ শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িকতা দূর করার জন্য কখনো কোমর বেঁধে আসরে নামেন নি। আমার মনে হয়, সুভাষচন্দ্র এমন এক বৃহত্তর জাজ্জ্বল্যমান আদর্শ জনগণের সম্মুখে উপস্থিত করতে পেরেছিলেন, এবং তার চেয়েও বড় কথা, এমন এক সৰ্ব্বজনগ্রহণীয় বীর্যজনকাম্য পন্থা দেখাতে পেরেছিলেন যে, কি হিন্দু, কি মুসলমান কি শিখ সকলেই সাম্প্রদায়িক স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে যোগদান করেছিলেন। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পাই, সুভাষচন্দ্র বলছেন, ‘আগুন লেগেছে, চল আগুন নেভাই, এই আমার হাতে জল। তোমরাও জল নিয়ে এসো।’     সুভাষচন্দ্ৰ কিন্তু এ কথা বলছেন না, ‘আগুন নেভাতে হলে হিন্দু-মুসলমানকে প্রথম এক হতে হবে, তারপর আগুন নেভাতে হবে। এস প্রথমে মিটিং করি, প্যাক্ট বানাই, শিলমোহর লাগাই তারপর স্বরাজ।’

বৃহত্তর আদর্শের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ ক্ষুদ্র স্বাৰ্থ ত্যাগ করেছে—তা সে ব্যক্তিগত স্বাের্থই হোক আর সাম্প্রদায়িক স্বার্থই হোক-এ তো কিছু অভূতপূর্ব জিনিস নয়। স্বীকার করি এ জিনিস বিরল। তাই এ রকম আদর্শ দেদীপ্যমান করতে পারেন অতি অল্প লোকই, তাই সুভাষচন্দ্রের মত নেতা বিরল।

দ্বিতীয় যে গজদন্ত আমি অনুভব করতে পেরেছি, সেটি এই :–

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি তিনজন নেতা স্বেচ্ছায় নির্বাসন বরণ করে দেশোদ্ধারের জন্য মার্কিন-ইংরেজের শত্রুপক্ষকে সাহায্য করতে প্ৰস্তুত ছিলেন। এদের মধ্যে প্রথম জেরুজালেমের গ্র্যান্ডমুফতী এবং দ্বিতীয় ইরাকের আবদুর রশীদ। এদের দুজনই আপন আপন দেশের একচ্ছত্র নেতা ছিলেন। তৃতীয় ব্যক্তি আমাদের নেতাজী। তিনি ভারতবর্ষের সর্বপ্রধান নেতা ছিলেন না। তিনজনই কপৰ্দকহীন, তিনজনই সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন আপন আপন যশ এবং চরিত্রবল। প্রথম দুজনের স্বজাতি ছিল উত্তর আফ্রিকায়, অথচ শেষ পর্যন্ত দেখা গেল এঁদের কেউই কোনো সৈন্যবাহিনী গঠন করে তুনিসিয়া আলজেরিয়ায় ইংরেজের সঙ্গে লড়তে পারলেন না; শুধু তাই নয়, জর্মন রমেল যখন উত্তর আফ্রিকায় বিজয় অভিযানে বেরুলেন, তখন এঁদের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাবারও প্রয়োজন তিনি অনুভব করলেন না। এদের কেউই জর্মন সরকারকে আপন ব্যক্তিত্ব দিয়ে অভিভূত করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত তাদের গতি হল আর পাঁচজনের মত ইতালি থেকে বেতারযোগে আরবীতে বক্তৃতা দিয়ে ‘প্রোপাগ্যান্ডা’ করার।

অথচ, সুভাষচন্দ্ৰ কি অলৌকিক কর্ম সমাধান করলেন। স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণ করে, ইংরেজের ‘গৰ্ব্ব ভারতীয় সৈন্যদের' এক করে, আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে তিনি ভারতবর্ষ আক্রমণ করলেন। বর্মা-মালয়ের হাজার হাজার ভারতবাসী সর্বস্ব তাঁর হাতে তুলে দিল, স্বাধীনতা-সংগ্রামে প্রাণ দেবার জন্য কড়াকড়ি পড়ে গেল।

আমরা জানি, জাপান চেয়েছিল সুভাষচন্দ্র ও তাঁর সৈন্যগণ যেন জাপানী ঝাণ্ডার নীচে দাঁড়িয়ে লড়েন (মুফতী এবং আবদুর রশীদ জর্মনীকে সে সুযোগ দিয়েও বাধ্য করাতে পারেন নি)। সুভাষচন্দ্ৰ জবাব দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আজাদ হিন্দ ও তার ফৌজের নেতা। আমার রাষ্ট্র নির্বাসনে বটে, কিন্তু সে রাষ্ট্র স্বাধীন এবং সার্বভৌম! যদি চাও, তবে সে রাষ্ট্রকে স্বীকার করার গৌরব তোমরা অর্জন করতে পারো। যদি ইচ্ছা হয়, তবে অস্ত্রশস্ত্ৰ এবং অর্থ দিতে পারো --- এক স্বাধীন রাষ্ট্র যে রকম অন্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে মিত্রভাবে ধার দেয়, কিন্তু আমি কোনো ভিক্ষা চাই না এবং আমার সৈন্যগণ আজাদ হিন্দ’ ভিন্ন অন্য কোনো রাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করে যুদ্ধ করবে না।’

এই ইন্দ্রজাল কি করে সম্ভব হল ? সুভাষচন্দ্রের আত্মাভিমান যেমন তাঁকে বাঁচিয়েছিল জাপানের বশ্যতা না করা থেকে, তেমনি তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, জাপান তার কথামত চলতে বাধ্য হবে। তার সঙ্গে সঙ্গে আরো কত গুণ, কত কুটবুদ্ধি, কত দুঃসাহস, কত নির্বিকার ধৈর্য, কত চরিত্রবলের প্রয়োজন হয়েছিল, আমাদের মত সাধারণ লোক কি তার কল্পনাও করতে পারে !

কপর্দকহীন, সামৰ্থ্যসম্বলহীন সুভাষচন্দ্ৰ টোকিয়োতে একা দাঁড়িয়ে ----  প্রথম দেখি এই ছবি। তারপর দেখি, সেই সুভাষচন্দ্ৰ নেতাজীরূপে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীন সৈন্যবাহিনীর পুরোভাগে দাঁড়িয়ে, ভারতেরই এক কোণে।

যতই বিশ্লেষণ করি না কেন, এই দুই ছবির মাঝখানের পর্যয়গুলো ইন্দ্ৰজাল–ভানুমতীই থেকে যায়। এ যুগে না জন্মে, এ কাহিনী ইতিহাসে পড়লে কখনই বিশ্বাস করতুম? "

পরিশেষে বলা যায় -----

তাঁকে দেবার মতো কোনো পদ ছিলো না মন্ত্রীসভায়,
তাঁর মুখোমুখি বসার মতো ব্যক্তি ছিলেন না রাজনীতিতে,
কোনো আদর্শবান ছিলেন না, তাঁর পথে চলার জন্য,
কোনো সিংহাসন ছিলো না, তাঁর যোগ্য মর্যাদার,
কোনো কারাগার ছিলো না,যাতে তাঁকে বন্দী করা যায়,
তাঁকে সম্মানিত করার মতো কোনো সম্মান ছিলো না সরকারের হাতে,
এমন অমূল্য কোনো নোট ছিলো না,যাতে তাঁর ছবি ছাপানো যায়,
কোনো চোখ ছিলো না দেশে,যা তাঁর চশমা ধারণ করে,
এতো উন্নত শির ছিলোনা জাতিতে,যিনি তাঁর টুপি পরতে পারেন,
কোনো ইস্পাত বা কংক্রিট নেই,যা তাঁর মূর্তি গড়তে পারে,
এমন কোনো নেতা ছিলো না,যিনি তাঁর সামনে বসে দেশ ভাগের বখরা করেন,
কোনো কমিশন ছিলোনা দেশে, যারা তাঁর রহস্য ভেদ করে,
তাঁর ছবিকে দেওয়ালে টানানোর,সাহস ছিল না কারোর,
তাই তো নির্দেশ যায়, ওই প্রখর তেজকে চোখের সামনে না রাখার।
কোনো কলম ছিলো না বিশ্বে,যা তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে পারে।
এমন কোনো দিন ছিলো না ক্যালেন্ডারে, যেটা তাঁর মৃত্যু সূচিত করতে পারে।
তাই তো তিনি ফিরলেন না, হারিয়ে গেলেন কুয়াশার অভ্যন্তরে।
ফেরানো হলো না তাঁকে।

তবু তিনি ছিলেন, আছেন। 
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পাতায় পাতায় ছিলো তাঁর আপোষহীন লড়াই,
বিতাড়িত ইংরেজের দুঃস্বপ্নে আঁকা ছিলো তাঁর ছবি।
তাঁর ফেরার স্বপ্নে বিভোর ছিলো কতো চোখ,
কতো হৃদয়ে ছিলো তাঁর সিংহাসন পাতা,
কতো অত্যাচারিত শোষিত মানুষ, বেঁচেছিলো তাঁর পথ চেয়ে,
ঘুমের মধ্যে ভেসে আসতো তাঁর বাহিনীর সমবেত বুটের আওয়াজ,
ভারতের প্রতি ধূলিকণায় ছিলো আকুতি, একদিন সুভাষ আসবে, সুদিন আসবে।

তিনি ফেরেন না,ফিরে ফিরে আসে তাঁর জন্মদিন।
ফিরে আসে,ফুল মালা,সম্মানের ঢক্কানিনাদ।ফিরে আসে তাঁকে দলে টানার প্রতিযোগিতা।
কিন্তু তিনি ফেরেন না।
ফেরাতে পারবো কি তাঁকে? আপোষহীন সংগ্রামের পথে,হার না মানা মানসিকতায়, সর্বত্যাগী দেশপ্রেমের আদর্শে?
যদি পারি, তাঁর স্বপ্নের ভারত ফিরবে,সুদিন ফিরবে,নেতাজি  ঘরে ফিরবে।। 

             জয়হিন্দ

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Post a Comment

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া