নেপালের লোকগল্প (চড়ুই পাখির জলখাবার)/ চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প— ৭০
নেপালের লোকগল্প 

চড়ুই পাখির জলখাবার 

চিন্ময় দাশ 
 
দেখতে ছোট্টটি, কিন্তু চড়ুই পাখির হালচাল অনেক বড় পাখিকেও টেক্কা দিতে পারে। পাখিটা থাকে বেশ কেতাদুরস্ত। বাসাটিও তার ঠিক তেমনি সাফসুতরো। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা হোল চড়ুইয়ের স্বভাব। 
সেদিন সবে সকাল হয়েছে। বাসা থেকে বেরিয়েছে পাখিটা। সামনে একটা স্কোয়াশের মাচা। উড়ে গিয়ে মাচাটায় বসল চড়ুই। একটু আড়মোড়া ভেঙে নেওয়ার ইচ্ছে। সেই তো খাবারের খোঁজে বেরুতে হবে। সারাদিন কেবল ওড়াউড়ি আর কিচির মিচির।  

মাচায় বসে আছে চড়ুই। হঠাতই চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল। নীচে ওটা কী দেখছে সে? ভুল হচ্ছে না তো? সাত সকালে বাসা থেকে বেরিয়েছে সবে। আর, আহা! প্রথমেই এমন জিনিষ চোখে পড়ে গেল!
হয়েছে কী, একটা কড়াই সুঁটি পড়ে ছিল মাচাটার নীচে। সেটা দেখতে পেয়েই, চড়ুই তো আনন্দে আত্মহারা। 
আনন্দের ঘোর কাটিয়ে, ঝুপ করে নেমে গেল মাচা থেকে।

কড়াইসুঁটিটা তুলে নিয়ে ডানা মেলে দিল বাতাসে। 
চলল কোথায়? ঐ যে বলে, চড়ুই সব সমইয় সাফসুতরো থাকে। সকাল বেলার প্রথম জলখাবার হবে কড়াইসুঁটিটা দিয়ে। তার আগে ঠোঁট দুটো ভালো করে ধুয়ে না নিলে চলে? তাই নদীর দিকে চলেছে পাখিটা। 
নদী মানে, অনেক বড়ও নয়। অনেকখানি দূরেও নয়। নদীটা তার বাসা থেকে একেবারে কাছেই। আর বলতে কী, নামেই নদী। পাহাড়ী নদী, চেহারায় একেবারে বড়সড় একটা খালের মতো। সেদিকেই চলেছে চড়ুই। 
নদীর ওপরে একটা কাঠের সাঁকো। তো, সেই সাঁকোর ওপরে কড়াইসুঁটিটা রেখে, চড়ুই গেল নদীতে ঠোঁট ধুতে। 
সাত সকালে কপালে এমন আনন্দ লেখা ছিল, কে জানতো। তাই মেজাজটা এখন তার বেশ ফুরফুরে। নদীতে ঠোঁট দুটো ধুয়ে, সাঁকোয় এসে বসল চড়ুই। অমনি আকাশ ভেঙে পড়ল মাথায়। চক্ষু চড়কগাছ। কড়াইসুঁটিটা বেপাত্তা। 
হোলটা কী? গেল কোথায়? এখানেই তো রাখা ছিল। খোঁজ খোঁজ। এপাশ ওপাশ, উপরে নীচে কোত্থাও নাই জিনিষটা। 

ভেবে ভেবে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। এমন সময় একজন লোককে আসতে দেখল সাঁকোটার উপর দিয়ে। কাঁধে একখানা কুঠার নিয়ে হেঁটে আসছে। নিশয়ই কাঠুরিয়া। বনে কাঠ কাটতে চলেছে। 
লোকটাকে দাঁড় করিয়ে, চড়ুই বলল—হ্যাঁগো, ভালোমানুষ। আমার কড়াইসুঁটিটা কোথায় হারিয়ে গেল। পাচ্ছি না কোথাও। খুঁজে দেবে একটু? 
কথা জোগাল না লোকটার মুখে। বাপ-ঠাকুর্দার জন্মে এমন কাজের কথা কেউ বলেনি তাকে। সম্বিত ফিরে পেয়ে, সে খেঁকিয়ে উঠল—ধ্যাৎ। সাত সকালে যত উটকো আপদ। ভাগ এখান থেকে। 
বলেই বিরক্ত মুখ করে হন হন করে নিজের কাজে চলে গেল লোকটা।

চড়ুই তো অবাক। হলামই বা ছোট। মুখের খাবার হারিয়ে গেছে বলেই না অনুরোধ করা। খাবারটা খুঁজে দিতে একটু সাহায্য করবে না? কেমন মানুষ বাপু তুমি? 
খানিক বাদেই দেখল, আবার একজন লোক চলেছে সাঁকো পেরিয়ে। উর্দি দেখেই বুঝে গেল, লোকটা সেপাই। চড়ুই তাকে বলল—আমার কড়াইসুঁটিটা হারিয়ে গেছে। একটু খুঁজে দেবে গো? 
--কী বললি? আমি যাবো তোর কড়াইসুঁটি খুঁজতে। কাজ নাই আমার? রাজার কাজে চলেছি আমি। বুঝলি হতভাগা? য-ত্ত-স-ব।
গজগজ করতে করতে লোকটা চলে গেল। খানিক বাদেই আবার যে লোকটা এল, সে চলেছে ঘোড়ায় চেপে। তার গায়েও উর্দি। কোমরের খাপে তলোয়ার। মাথায় পাগড়ি। ইয়া গোঁফজোড়া। 
একটুও ভয় পেল না চড়ুই। তাকেও বলল—খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে। আমার কড়াইসুঁটিটা হারিয়ে গেছে। খুঁজে দাও না গো। 

লোকটার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল—ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়ে বেড়াস। কত যায়গায় তো যাস। দেখিসও কত কিছু। তোর কী করে মনে হোল, একজন সেনাপতির কাজ তোর মতো একটা পুঁচকে পাখির দানা খুঁজে দেওয়া? ভাগ এখান থেকে। 
চলেই যাচ্ছিল সেনাপতি। হঠাৎ কী মনে হোল, ঘোড়ার লাগাম টেনে দাঁড়িয়ে গেল। বলল—একটা কথা বলি তোকে। একটু বাদেই দেশের রাজা আসছে এই পথে। তুই বরং রাজাকেই বল। রাজা নিশয়ই তোর কড়াইসুঁটি খুঁজে দেবে। 
মস্করা নয়। সত্যি সত্যিই খানিক বাদেই রাজার আবির্ভাব। 
বড়সড় একটা হাতি। তার পিঠে ঝলমলে হাওদা চাপিয়ে রাজা চলেছে দুলতে দুলতে। গায়ে আচকান। মাথায় মুকুট। একেবারে চাঁদের পারা মুখখানা। দেখলেই মনে হয় কী ভালোমানুষ, কী ভালোমানুষ! 
মনে বেশ আশা নিয়ে চড়ুই  রাজাকে বলল—কোথায় যে হারিয়ে গেল। আমার কড়াইসুঁটিটা খুজে পাচ্ছি না। একটু খুঁজে দেবে? 
রাজা একবার খালি তাকালো পাখিটার দিকে। ভালো করে শুনলই না কথাটা। যেমনটি বসে ছিল, হাতির পিঠে তেমনি নির্বিকার বসে থেকে, চলে যেতে লাগল সাঁকো পেরিয়ে।

চড়ুই মনের দুঃখে মুখ ভার করে বসে আছে, কোথা থেকে একটা কাঠপিঁপড়ে এসে হাজির। বলল—কী হয়েছে গো? রাজার সাথে তোমার কী কথা? 
ভারি দরদ পিঁপড়ের গলায়। চড়ুইর খুব ভালো লাগল। কেউ একজন অন্তত তার কথা শুনতে চেয়েছে। 
সকাল থেকে যা যা ঘটেছে, সব গড়গড় করে বলে গেল চড়ুই। একজনও কান দেয়নি তার খাবারটা খুঁজে দেওয়ার কথায়। পিঁপড়ে বলল—দাঁড়াও এক্টুখানি। আমি দেখছি। বসে থাকো এইখানটিতে চুপটি করে। চলে যেও না যেন। আসছি আমি। 

পিঁপড়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল। বেয়ে বেয়ে গিয়ে হাজির হয়ে গেল একেবারে হাতির কানে। 
হাতিকে বলল—বেশ তো কুলোর মত কান দুটি দুলিয়ে দুলিয়ে দুলকি চালে চলেছ। এক্ষুনি তোমার রাজাকে বলো, চড়ুইয়ের কড়াইসুঁটিটা খুঁজে দিতে। ভালোয় ভালোয় না যদি দিয়েছে, তোমারই আজ দফারফা করে ছাড়ব আমি। সুড়সুড় করে সেঁধিয়ে যাবো কানের মধ্যে। তার পর ছোট্ট করে একটা রামকামড়। বুঝতে পেরেছো ব্যাপারটা? 
শুনে, হাতি তো গেল বেদম চমকে। তোতলাতে লাগল—কী বললে?  
--কী আর বলবো? বলছি, কাঠপিঁপড়ের কামড় খেয়েছ কোন দিন? আজই বুঝিয়ে দেব তোমাকে। প্রাণটি বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হবে। অত বড় বপুটি নিয়ে আছাড়ি-পিছাড়ি গড়াগড়ি খাবে মাটিতে। আছাড় খেয়ে হাত-পা ভাঙবে তোমার রাজারও। তখন বুঝবে, ছোটদের কেরামতি। 
হাতি তো আঁতকে উঠল এমন ধমক খেয়ে। সতিই তার প্রাণ খাঁচা ছাড়া হওয়ার জোগাড়। একটুও এগোল না আর হাতি। হাতিকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে, রাজা বলল—হোলটা কী? দাঁড়িয়ে পড়লি যে বড়! 
হাতি বলল-- তাড়াতাড়ি কড়াইসুঁটি খুঁজে দাও চড়ুইটার। নইলে আমিই তোমাকে ফেলে দেব পিঠ থেকে। 
হাতির হুমকি শুনে রাজা গেল ঘাবড়ে। কিন্তু তাই বলে, দেশের রাজা হয়েও, শেষে কি না একটা চড়ুই পাখির কড়াইসুঁটি খুঁজতে হবে? তাই আবার হয় নাকি কখনও! মান সম্মান নাই রাজার? 
রাজা একটা জোর হাঁক ছাড়ল সেনাপতিকে। সে যাচ্ছিল সামনে সামনে। ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে, চটপট ফিরে এসে হাজির। 
রাজা বলল—চড়ুই তোমাকে কড়াইসুঁটি খুঁজে দিতে বলেছিল। কথাটা কানে যায়নি বুঝি? এক্ষুনি খুঁজে এনে দাও। নইলে আমি মুণ্ডুটাই কেটে নেব তোমার। এই বলে রাখলাম। 

সেনাপতি চটপট সরে পড়ল রাজার সামনে থেকে। মনে ভাবতে লাগল-- রাজার সেনাপতি হয়ে, আমি যাবো পাখির জন্য দানা খুঁজতে? তাতে মান থাকবে আমার? সে জোরে হাঁক পাড়ল সেপাইটাকে—হতভাগা, চড়ুই তোকে কত কাকুতি মিনতি করে কড়াইসুঁটি খুঁজে দিতে বলেছিল। কানে তুলিসনি কথাটা? এক্ষুনি গিয়ে তার কাজটা করে দে। নইলে এই সাঁকোতেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেব তোকে। যা এক্ষুনি। 
সেপাই লোকটারও দেমাক কম নয়। সে হোল রাজার খাস লোক। রাজা যেখানে যায়, তাকেই সাথে নেয়। তাতেই তার ভারি গুমোর। আর, এখন তাকে যেতে হবে সাঁকোর তলায় পাখির হারাণো খাবার খুঁজতে? মুখ দেখাবে কী করে পাঁচজনের সামনে। 
সে চিৎকার করে কাঠুরিয়াকে ডেকে আনল—ভেবেছিসটা কী হতভাগা? দেশে রাজা নাই না কি? নাকি তার বিচার নাই? পাখিটা তোকে তার কড়াইসুঁটি খুঁজে দিতে বলেছিল। আর তুই কি না সেটা গ্রাহ্যই করিসনি? এবার বোঝ মজা। পাখি গিয়ে বিচার দিয়েছে রাজার কাছে। আমাদের রাজামশাইকে তো চিনিস? তাঁর কাছে ছোটবড় ভেদাভেদ নাই কোন। তাঁর রাজ্যে সবাই সমান। আর তুই কি না…। এক্ষুনি যা হতচ্ছাড়া। কড়াইসুঁটিটা খুঁজে দে চড়ুইকে। আমি দেখছি, রাজামশাই যাতে তোকে শূলে না চড়ায়।   

 লোকটার তো হাত-পা কাঁপতে লাগল শুনে। গরীব-গুবরো মানুষ। তার মেহনতেই সংসার চলে। তাকেই শূলে চড়িয়ে দিলে, বাকিরাও যে মারা পড়বে। সে দৌড়ল কড়াইসুঁটি খুঁজতে। প্রায় দুপুর পর্যন্ত হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল বেচারা কাঠুরিয়া। কোথাও চোখেই পড়ছে না। হাওয়ায় মিলিয়ে গেল না কি? 
অবশেষে দুপুর নাগাদ সমস্যার সমাধান হোল। সাঁকোতেই পাওয়া গেল কড়াইসুঁটিটা। সাঁকোটার উপরেই। দুটো তক্তার ফাঁকে ঢুকে গিয়েছিল। 
পাঁচজনেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল এ যাত্রায়।
কাঠপিঁপড়েটা ফিসফিস করে হাতির কানে বলল—এ বারের মত পার পেয়ে গেলে। তোমার রাজাকে বলে দিও, বেশি দেমাক ভালো নয়। এবার থেকে ছোটদের কথা কানে না তুললে, বড়ো বিপত্তি হয়ে যেতে পারে। সাবধানে থাকে যেন। 
যে যার মত কাজে চলে গেল।

ঠোঁট তো ধোওয়াই ছিল। মনের আনন্দে কড়াইসুঁটি ঠোকরাতে বসে গেল চড়ুইটা। সকালের জলখাবার দুপুরবেলায় খেতে হচ্ছে, মনেই রইল না তার সে কথা।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া