মাটিমাখা মহাপ্রাণ--৭/ শুভঙ্কর দাস
মাটিমাখা মহাপ্রাণ। সাত
শুভঙ্কর দাস
"জাগ্রত করো,উদ্যত করো,
নির্ভয় করো হে
মঙ্গল করো,নিরলস নিঃসংশয় করো হে।
অন্তর মম বিকশিত করো,
অন্তরতর হে"
এমন একটি ঘটনা,একই সঙ্গে আনন্দের আবার দুঃখেরও।এরকম কি হতে পারে কখনো? হ্যাঁ,তাই ঘটেছিল কুমারচন্দ্রের জীবনে!
সকালবেলায় উঠোনে বসে কুমার একটি বড় সূচ নিয়ে বই বাঁধানোর কাজ করছিল,বইটি ছিল কৃত্তিবাসী রামায়ণ। এটি অনেক কষ্টে জমিদারের বাড়ি থেকে তার দাদা দেবেন এনে দিয়েছেন। কিন্তু অব্যহারে এবং অপাঠ্যে বইটির অবস্থা করুণ।তারপর অসংখ্য পৃষ্ঠা আলগা হয়ে তার বৃহৎ আয়তনকে ক্ষীণকায় করে তুলেছে।কিন্তু কুমার সেই বইটিকে সোনার চেয়েও দামি মনে করে।তাই সযত্নে নিজেই সুতো দিয়ে বইটির আয়ু বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তার মা লক্ষ্মীদেবী রান্নাঘর থেকে তা লক্ষ্য করেছিলেন। ছেলেটি যেকোনো বই পেলে এমনভাবে পড়ে,যেন এই বইটি না-পড়লে তার পেটের ভাত হজম হবে না! এমনও দিন গেছে, হয়তো অসাবধানবশতঃ কোনো বই কুলুঙ্গির ভেতর রাখতে গিয়ে ছিঁড়ে গেছে,ব্যাস! সঙ্গে সঙ্গে চোখ থেকে বেরোবপ জল,এবং এক দৌড়ে ফাঁকা মাঠে এমনভাবে বসে থাকবে,যেন এইমাত্র কোনো পারিবারিক শোক ঘটে গেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত চলছে। কিছুতেই মুখে কিছু তুলবে না,ছেঁড়া বইটির দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠবে।
কী বাবা কুমার? এই বইটি কোথায় পেলি? এতো দেখছি, ছিঁড়ে-ছুঁড়ে একসা। বলে উঠলেন লক্ষ্মীদেবী।
আর বলো না মা,এই তো অবস্থা। তবে এর চেহারা আমি বদলে দেব.. কত দামী জানো, এই বই
তা না পড়েই জেনে গেলি,দামী খুব যে
কী যে বলো,আমি পড়েছি,এর কিছু পৃষ্ঠা আগে থেকেই আমার কাছে ছিল,এটি এখন যা পেয়েছি, প্রায় পুরোটা আছে... আর মনে করে দ্যাখো,এই কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকেই সন্ধার সময় পাঠ করতাম... গাঁয়ের কত লোক শুনত
আচ্ছা, নে, নে বাঁধানোর কাজ অন্ত করে নে,তারপর চাটি পান্তা খা,আজ আলুভাতে মেখেছি ,বেশ লাল লাল লঙ্কা দিয়ে..
আহ্, তোমার হাতে আলুমাখা খেতে এতো ভালো লাগে,কী বলব..
কুমারের সবুজ পাতায় রোদের মতো উজ্জ্বল মুখ দেখে লক্ষ্মীদেবী চোখের জল গোপন করেন।কত অল্পে সন্তুষ্ট তাঁর এই সরল-সাধাসিধে ছেলেটি।কত খেতে ভালোবাসে,অথচ কিছুই ভালোমন্দ মুখে তুলে দিতে পারেন না! প্রায় প্রতিদিন আলুমাখা, অথবা যেদিন সরষে তেল থাকে,একটু ভেজে দেওয়া, তাই কত খুশিমুখে খেয়ে নেয়,একবার যা দেওয়া হবে,তাই খেয়ে চুপচাপ উঠে যাবে,দ্বিতীয়বার চাইবে না,কারণ এই ছোট্ট বয়সে কুমার জানে,তারা গরীব,বড্ড গরীব,তাদের বেশি খেতে নেই!
আচ্ছা, মা
কী হল রে?
লেহ্য কথাটির মানে কী গো?
কী? লেজঝো! বাপরে! এসব লেজটেজ কোথায় পেলি?
কী নিয়ে কথা হচ্ছে, একটু শুনি,একথা বলতে বলতে ঢুকলেন ঠাকুরদাস।মাথার ঘাম গামছা দিয়ে ঘাম মুছে উঠোনে বসে পড়লেন।
সব শুনে জিজ্ঞেস করলেন,তা এই শব্দটি কোথায় পেলি?
তখন কুমার উচ্চকণ্ঠে শোনাল--
"ঘৃত দধি দুগ্ধ মধু পায়স।
নানাবিধ মিষ্টান্ন খাইল নানারস।
চর্ব চোষ্য লেহ্য পেয় সুগন্ধি সুস্বাদ।
যত পায় তত খায় নাহি অবসাদ।।
ওহ্ কৃত্তিবাসী পাঁচালি। আচ্ছা, ওরে লেহ্য মানে হল,যা চেটে খাওয়া যায়,যেমন তুই,পাতে করভাঙার চাটনি পড়লে,একেবারে চেটে পাতাটিও খেতে থাকিস, হাঃ হাঃ হাঃ
হেসে উঠলেন ঠাকুরদাস।
সেই হাসিতে যোগ দিল কুমারচন্দ্র।
শুধু লক্ষ্মীদেবী আঁচলে মুখ গোপন করলেন, তাঁর চোখে জল এসে গেল কী অপরিসীম বেদনায়,তাঁর অশ্রুসজল মুখখানি উনুনের অগ্নিদেব শুধু দেখতে পেলেন,আর কেউ নয়!
সহসা সদরদরজার কাছ থেকে একটি কথা ভেসে এলো।
শুধু করভাঙা নয়, তার আগে পায়েস খাওয়াতে হবে,কারণ একটা দারুণ খুশির খবর আছে।
একটি রোগা-পাতলা কুমারের সমবয়সী ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
আরে বিপিন,কী হল রে?
তুই মহিষাদল গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলি, সেই উচ্চ প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করে গেছিস...
এতো বড়ো ভালো খরব,বলে উঠলেন ঠাকুরদাস। তিনি জানেন,কতখানি কষ্ট ও পরিশ্রম করে কুমার এইসব পরীক্ষা দিয়েছে।
বিপিনের সঙ্গে আসা কুমারের দাদা দেবেন বলে উঠলেন,আরে শুধু পায়েস কেন? সঙ্গে সুতাহাটা থেকে মিষ্টি এনে খাওয়ার।
লক্ষ্মীদেবীর আবার চোখে জল এলো।এবার আনন্দে। মনে পড়ল,যেদিন পরীক্ষা, সেদিন কত কষ্ট করে কুমার ও দেবেন মহিষাদল গিয়েছিল। প্রথমে মাঠপথে হাঁটা,সেই সুতাহাটায় গিয়ে সেখানে গরুর গাড়ি ধরে মহিষাদল।সঙ্গে ছিল মুড়ি আর কাঁচালঙ্কা।তাই ছিল সারাদিনের আহার।
ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। লক্ষ্মীদেবী জিজ্ঞেস করেছিলেন,কী করে খুব খিদে পেয়েছে নিশ্চয়?
কিন্তু কুমার হাত-পা ধুতে ধুতে বলেছিল,মা,পরীক্ষায় এমন ভাবে লিখেছিলাম,সময়ের আগেই যখন কাগজ জমা দিচ্ছিলাম,সকলে খুব অবাক হয়েছিল!
একবারও খিদের কথা বলল না!
বিপিন বলে উঠল,আমি তো ছোটবেলা থেকেই কুমারের সঙ্গে পড়ছি,ও যখন পড়ে,তখন জগতের সবকিছু ভুলে যায়।এতো আগ্রহ আগে আমি এখানে কারও মধ্যে দেখিনি,যদি বিদ্যেসাগর বেঁচে থাকতেন,একেবারে কোলে তুলে নিতেন!
দেবেন বলল,সে যাই হোক,আমি একটু আসছি,কিছু গোবিন্দভোগের ব্যবস্থা করা যায় কিনা! ঘরে তো দুধের অভাব নেই। এখুনি আসছি...
বলেই দেবেন বেরিয়ে গেলো।
দুপুরের আহারের সময় একটা দারুণ দৃশ্য রচিত হল।
কুমার ও বিপিন পাশাপাশি ভাত খাচ্ছে। ভাত,ভাজা আর ডাল আর শাকের তরকারি।তারপরেই এলো পায়েস।লক্ষ্মীদেবীর হাতের রান্না খেয়ে বিপিন বলে উঠল,
খুড়ি,তোমার নাম হওয়া উচিত ছিল,অন্নপূর্ণা, এমন অন্নব্যঞ্জন রাঁধো,মনে হয় মা-শীতলার সুগন্ধি ভোগ,আহ্ পেটের সঙ্গে মন ভরে যায়,কী রে কুমার তোর তো দারুণ ভাগ্য, কত ভালো ভালো খাবার খেতে পাস...
কুমার পায়েসের বাটি নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।সে ভাবছে এবার কী হবে? কারণ বাসুদেবপুরে এরপর পড়ার কোনো বিদ্যালয় নেই। কিন্তু পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাবে,এটাই ভেবে তার মন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। ভালোভাবে পাশ করেছে শুনে যেমন আনন্দ পেয়েছে, তেমনই পড়াশোনা শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাই মন ভরে গেছে দুঃখে।
সে নীরব ছিল।
কীরে ভাই, তোর চোখে জল কেন? মা কী পায়েসেও লঙ্কা মুলে দিয়েছে! হাঃ হাঃ হাঃ হেসে উঠল দেবেন।
কী হল কুমার,বাবা আমার, পায়েস খাচ্ছিস না কেন? জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুরদাস।
আঙুল দিয়ে একটু খেয়ে বাটিটি নামিয়ে রেখে কুমার উঠে গেল,তারপর পুকুরঘাটে যাওয়ার আগে পেছন ঘুরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,এবার আমি কোথায় পড়ব মা?
লক্ষ্মীদেবী তা দেখে আঁচলে মুখ ডেকে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
সত্যি তো বিদ্যালয় যদি না থাকে তাহলে উচ্চশিক্ষা পাবে কী করে? অবশ্য এসব নিয়ে এখানকার কেউ সেভাবে মাথা ঘামায় না! গরীব পরিবারের ক্ষেত্রে শুধু নয়, ধনীগৃহের সন্তানরা পড়াশোনাকে একটা সময় কাটানোর অঙ্গ মনে করে।তাদের প্রচুর পরিমাণে অর্থ থাকলেও নানাধরণের সখ-আহ্লাদকে কাজ মনে করে করতে পছন্দ ,কিন্তু পড়াশোনা বা বিদ্যালয়ে যাওয়াটাকে তুচ্ছতম কোনো কাজ,এ নিয়ে আবার ভাবার কী আছে! সকালে যেমন গৃহে কোনো ভিখিরি এলে তাকে স্বভাবতই চাল বা পয়সা দেওয়া হয়,সে দিলেও হল,না দিলেও কোনো হোলদোল নেই,পড়াশোনা তেমনই,করলেও হল, না করলেও কোনো অসুবিধা নেই, মাথাব্যথা নেই!
কিন্তু কুমার সবার চেয়ে আলাদা।সে পিতার মুখ দিয়ে শুনেছে, কীভাবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু পড়াশোনার জোরে সমাজে দশজনের একজন হয়েছিলেন,তাই কুমারের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল। সে পড়াশোনা করতে চায়। হয়তো সে জানে, বিদ্যেসাগর হওয়ার ইচ্ছে তো সাধারণ ইচ্ছে নয়, তা কি সবাই হতে পারে? কিন্তু বই পড়লে,সে দেখেছে, ভেতরে একটা আলোর মানুষ জেগে ওঠে!
সেই আলোর মানুষটিকে সে সন্ধান করে আসছে,যাঁকে দেখলে সে নিজের পথ চলতে পারবে,কিন্তু পড়াশোনা ছাড়া সেই আলোকিত পথে আলোর মানুষকে খুঁজে পাবে কী করে?
একথা কাউকে কি বোঝানো যায়! শুধু তার মনের ভেতর আবদুল ফকিরের একটা গানের লাইন ভেসে ওঠে, কী সুন্দর করে বলেছিল,
"বল কি সন্ধানে যাই সেখানে মনের মানুষ যেখানে।
ওরে আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি দিবা রাতি নাই সেখানে।।"
সেই মনের মানুষ সন্ধান করছে কুমার। যিনি তাঁকে জীবনের পথ দেখাতে পারে! কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ হলে তো সব নষ্ট হয়ে যাবে।তার মতো দুঃখী এই মুহুর্তে কেউ নেই!
সন্ধ্যা নামার আগে সূর্য যেমন ক্লান্ত হয়ে দিগন্তের আঁচলে মুখ ঢাকে,তেমনি সেই দুপুর থেকে কুমার সদ্য বিচ্ছিন্ন হওয়া বিদ্যালয়ের চারপাশে ঘুরতে লাগল এবং তারপর মাঠে মাঠে ঘুরে একটি ঘনতৃণদলে পরিপূর্ণ আলে শুয়ে পড়েছিল।
চোখের ওপর হাত রেখে দিলেও তার চোখের জলের শুকনো রেখা এখনও প্রতীয়মান।
সহসা একটা হাতের স্পর্শে হাত সরিয়ে দেখল কুমার,তার পাশে এসে বসেছে লক্ষ্মীদেবী।
কী রে,দুঃখের শেষ হল?
কুমার নীরবে তাকিয়ে থাকল।
মনে রাখবি বাবা,দুঃখ হল সমুদ্দুর, যার কোনো ঢেউএর শেষ নেই, কত গুনবি,গুনে যা,এর কোনো শেষ নেই!
কথাটি শুনে উঠে বসল কুমার।
দ্যাখ বাবা,আমি অত পড়াশুনা করিনি,এইটুকু বুঝি, সংসারে দুঃখ তো আসবে, সহজে দুঃখ সকলকে ধরে ,কিন্তু দুঃখকে যে সহজে নিতে পারে, ভার বইতে পারে,সেই আসল মানুষ।
কুমার অবাক হয়ে গেল!
সত্যি, কী সুন্দর কথাটি। দুঃখের আসাটা তো সহজ,কিন্তু দুঃখকে সহজ করে নেওয়াটাই আসল কাজ।
কুমার শুধু উচ্চারণ করল,মা,আমার খুব পড়তে ইচ্ছে করে...
তোর কাছেই শুনি,স্বয়ং ভগবান রামচন্দ্র পড়াশুনা করার জন্য গুরুগৃহবাসী হয়েছিলেন।দ্যাখ, অত বড় রাজার পুত্র, তিনিও পড়ার জন্য বাইরে গেছিলেন।তুই তো যাবি,সেকথা তোর বাবাকে বলেছি..
কিন্তু বাইরে পড়ার জন্য টাকা লাগে মা
লক্ষ্মীদেবী হাসলেন।মুখে বললেন,ওরে টাকা তো লাগবেই, সেইসঙ্গে লাগবে খাটনি,আমাদের টাকা নেই, কিন্তু পড়াশোনার খাটনি তুই তো ভালোবাসিস, ঠিক কি না?
মা,আমি পড়ার জন্য সব কাজ করতে পারি।এমন কি লোকে পা-ও যদি ধুইয়ে দিতে বলে,তাই করব...
তাহলে চল, কাল সকালে তোর রামায়ণ-যাত্রা শুরু, পড়ার জন্য... নিজের দুঃখকে নিজের শক্তি করে তোলার জন্য...
কুমার সঙ্গে সঙ্গে কাদামাখা মায়ের পা-খানি ছুঁয়ে মাথায় ঠেকাল। মনে মনে ভাবল,আজ যা মায়ের মুখে শুনল,একদিন জীবনে সত্যি করে তুলবে।
পরের দিন ভোরে ঠাকুরদাস তার চোদ্দ বছরের বালক সন্তানকে নিয়ে গৃহের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঠাকুরদাস বললেন, কুমার,একটা কথা মনে রাখবি, ভগবান যে হাতে প্রতিদিন সূর্য তোলেন,সেই হাতে পিঁপড়েও পায়ের ধুলো মুছিয়ে দেন,কোনো ব্যতয় হয় না,তাই সে যে কাজ হোক,যেখানেই হোক,মন দিয়ে কাজ করবি।
কুমার মন দিয়ে কথাটি শুনল।সে বাবার মাথার পশ্চাতে নতুন সূর্যের আগমন আলোটুকু দেখতে পেল।সে অভিভূত হয়ে পড়ল।
ঠাকুরদাস হাঁটতে লাগলেন।তারপর মাঠে নেমে পড়লেন।কুমার দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন,কী অপূর্ব কথাটি।
সহসা ঠাকুরদাস হাঁটা থামিয়ে পেছন ঘুরে বলে উঠলেন,দাঁড়িয়ে থাকিস না,আয়, মনে রাখবি,আমাদের এই জন্ম খেটে খাওয়ার জন্ম,নিজেকে কোনোদিন অসহায় ও দুর্বল ভাববি না,খাটবি,মনে রাখবি,যতদিন তোর হাতে-পায়ে খাটার জোর থাকবে,ততদিন তুই তোর রাজা... মনে থাকবে?
হা
জোরে বল?
হা, বেশ জোরে বলল কুমার।
এই তো চল।
বাসুদেবপুর গ্রামের পাশের গ্রাম পরাণচক। সেই গ্রামে বসবাস করতেন ধনী পরিবার,কর্তার নাম ছিল গিরিশচন্দ্র জানা। ঠাকুরদাসের যোগাযোগ ছিল।সেখানেই কাজের সন্ধানে একদিন এসেছিলেন,তখন তিনি যুবক ছিলেন।আজ তিনি পুত্রকে কাজের জন্য নিয়ে এসেছেন।এবং সেই ধনীর বাড়ির কাছাকাছি একটি হরিমঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
কুমার,এইখানে তোকে সেবক হিসেবে থাকতে হবে,এবং তোকেই এখান থেকে নিজেকে পথ করে এগিয়ে যেতে হবে
তুমি ভেতরে যাবে না?
না,তোকে একাই তোর উদ্দেশ্য বোঝাতে হবে এবং আমি বলছি,তোর যা স্বপ্ন এখান থেকেই পূর্ণ হবে।
কুমার পিতার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।তারপর ধনী বাড়িটির দিকে এগিয়ে গেলো,একা।
ধনীপরিবারের গৃহটি ভিতর-বার প্যাটার্নের। সদর দরজা পেরিয়ে প্রথমেই একটি বৃহৎ কক্ষ।সেখানেই দুটি চেয়ারে দু'জন বয়স্ক মানুষ বসে আছেন। তাঁরা একে-অপরকে কী একটা প্রশ্নে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন। তাই কুমারের নিঃশব্দ উপস্থিতি তাঁরা লক্ষ্য করলেন না!
তাঁদের অবস্থান ছাড়িয়ে আবার একটি দরজা খোলা দেখা গেল।সেখান দিয়ে ভেতর মহলটি দেখা যাচ্ছিল। সেটি বেশ বড় উঠোন এবং পাকা।সেখানে বেশ কয়েকটি কুমারের চেয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করছে।ভেতরেই কেউ একজন সজোরে অথচ আদুরে গলায় বলেই চলেছেন," খেয়ে নে, বাপরে,পরে খেলা করবিখন, ক্ষীরটুকু পড়েই রইল যে "
কী হে, খোকন? কী চাই? এই সাতসকালে?
কুমার সেই খেলারত বাচ্চাদের দেখছিল। তারপর কখন দুজন বয়স্কলোক তাঁদের তর্ক থামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন,সে বুঝতে পারেনি!
সেগুনকাঠের ইজিচেয়ারে যিনি বসে আছেন,তিনি প্রশ্নটা করলেন।
কুমার থতমত খেয়ে পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বলে উঠল,আজ্ঞে, আমি কুমার।
সে তো দেখেই বুঝেছি,তোমার বিবাহ যে হয়নি,সে তোমার দাঁড়ানো দেখে বুঝে নিয়েছি, দেখছো না,আমরা কেমন বক্রশিরদাঁড়া, সোজা হয়ে বসতে পারি না,কারণ আমরা বিবাহিত। হেসে বলে উঠলেন,পাশের ছোট্ট খাটের ধারে বসা লোকটি বলে উঠলেন।
তা কুমার? কী কারণে হেথায় আগমন? ইজিচেয়ারে বসা লোকটি বললেন।
আমি বাসুদেবপুর থেকে আসছি,ঠাকুরদাস আমার পিতা...
তিনি বলেছেন, গিরিশবাবুর সঙ্গে...
আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝেছি,বলে উঠলেন সেগুনকাঠের চেয়ারে বসা লোকটি।তা তোমার বাপটি কই?
তিনি আসেননি ভেতরে,আপনাদের হরিমঞ্চের সামনে এসে বললেন,এবার নিজেই পথ করে এগিয়ে যাও...
বাহ্ এতো দারুণ কথা, কী বলো গিরিশচন্দ্র
তা ঠিক ক্ষীরোদ,এরকম তো আগে শুনিনি,অবশ্যই জানতাম আমাদের ঠাকুরদাস একটু আলাদা,কিন্তু তার পুত্রটিও দেখছি অন্যরকম,পিতৃাজ্ঞা মাথায় চলে এসেছে। তা বেশ,কিন্তু কাজ পেতে হলে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে,সঠিক উত্তর দিতে পারলে, কাজ পাবে।
বলুন? দৃঢ়কণ্ঠে বলে উঠল কুমার।
শুনেছি,তুমি নাকি বই পড়তে ভালোবাসো,আচ্ছা গীতা থেকে কোনোকিছু শোনাতে পারবে?
কুমার শুরু করে দিল,"যদ্ যদাচরতি শ্রেষ্ঠস্তত্তদেবতারো জনঃ/ স যৎ প্রমাণাং কুরুতে লোকস্তাদনুবর্ততে"
তা শুধু আওড়াতে পারো,নাকি মানে-টানেও জানে?
কুমার আবার শুরু করে দিল,"শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যেভাবে আচরণ করেন,সাধারণ মানুষেরা তার অনুকরণ করে।তিনি যা প্রণাম বলে স্বীকার করেন,সমগ্র পৃথিবী তারই অনুসরণ করে।"
বাহ্, এতো সুন্দর বলেছো,বলে উঠলেন গিরিশচন্দ্র। তারপর ক্ষীরোদের দিকে তাকিয়ে বললেন,কী হে,বন্ধু, তোমার পাঠশালায় এমন ছাত্র আছে?
তা আর কোনো পদ জানো?জিজ্ঞেস করলেন ক্ষীরোদবাবু।
কুমার আবার বলতে শুরু করল," যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত...
শেষ করার আগের ক্ষীরোদবাবু বলে উঠলেন,আচ্ছা, বেশ,এতো সবাই বলতে পারবে,কিন্তু কই বলো দেখি, এই কথা ভগবান কোন্ অধ্যায়ে বলেছেন?
আজ্ঞে, জ্ঞানযোগ।সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল কুমার।
বেশ,বেশ।আচ্ছা বলো তো,"বিদ্বান প্রশস্যতে লোকে বিদ্বান সর্বত্র গৌরবম্/ বিদ্যয়া লভতে সর্বম্ বিদ্যা,সর্বত্র পূজ্যতে" কার শ্লোক?
কুমার একটু চিন্তা করল।তারপর বলল,আজ্ঞে, এটি চানক্যের শ্লোক।
বাহ্ সত্যি সুন্দর, খুশিতে বলে উঠলেন ক্ষীরোদবাবু। একে দিয়ে বাড়িতে চাকরের কাজ করাবে না মাস্টারি করাবে,ভেবে দেখো...
আচ্ছা, সে দেখবখন,তোমার কাজ পাকা,যাও ভিতরঘরে যাও,আমি একটু পরে যাচ্ছি, এই কে আছিস,একে নিয়ে যা,গিন্নিমার কাছে।
কাছেই একটি লোক দাঁড়িয়ে সকালের প্রাতরাশ সাজাচ্ছিল, সেই কুমারকে ইশারায় ডেকে নিল। কুমার চলে যাচ্ছিল,আবার ঘুরে এসে দুইজন বয়স্কজনের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।
তখন গিরিশচন্দ্র বলছিলেন,জানো তো ক্ষীরোদ একসময় কী ইচ্ছে ছিল পড়াশোনা করার,কিন্তু সংসারের জোয়াল এসে পড়তেই আমি যেন কেমন বদলে গেলাম,তুমি তো প্রধানশিক্ষক পাঠশালার, তোমার পড়াশুনার ইচ্ছে ও উপায় দুই টিকে আছে,আমার অবস্থা কেমন জানো,সেই যে বলে না," যাবৎ জীবের সুখং জীবেৎ, ঋণং কৃ-কৃ, যেন ছিল?
আরে ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ/ ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতাঃ" তাই তো?
হা,হা,যেহেতু দেহ ভস্মে লীন হয়ে যাবে এবং ফিরে আসার কোনো উপায় নেই, তাই যতদিন বাঁচি ততদিন খেয়েদেয়ে বাঁচাই, ঋণ করে বাঁচা যাক... হা হা, আচ্ছা, এই সত্যিটি কে বলেছে বলতো?
হুম, কে বলেছে? কে বলেছে? মনে আসছে না তো! বাতাসে চোখ ঘোরালেন ক্ষীরোদবাবু।
তখনই কুমার সহসা পেছন ঘুরে মৃদুকণ্ঠে জানিয়ে দিল,মুনি চার্বাক।
বলে চলে গেল।
আর সেখানে দাঁড়াল না।
গিরিশচন্দ্র তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলেন এবং প্রধানশিক্ষক মহাশয় আপন মনে বিড়বিড় করে উঠলেন" যদ্ যদাচরতি শ্রেষ্ঠস্তত্তদেবেতরো জনঃ"...
ক্রমশ
Comments
Post a Comment