যেতে যেতে পথে-২৬/রোশেনারা খান

যেতে যেতে পথে

রোশেনারা খান

পর্ব ২৬

বাবার মৃত্যুর দিন ১৫ পরে যথারীতি শাশুড়িমাকে দেখতে গেলাম। উনি আমার বাবা-মা কেমন আছেন জানতে চাইলেন। আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে বাবার চলে যাওয়ার কথা বললাম এবং এও বললাম আমাকে কয়েকদিন আগে যেতে দিলে বাবাকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পেতাম। সব কথা শুনে উনি ছেলের ওপর খুব রেগে গেলেন, পরক্ষণেই পরম মমতায় আমার মাথায় হাত রেখে চোখ মুছতে  মুছতে বললেন, ‘কী করবি মা? মেয়েদের পরের ঘরে অনেক কিছুই যে বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয়। এই একই গ্রামের মেয়ে ও বৌ হওয়া সত্ত্বেও গ্রাম্য বিবাদের কারণে আমিও আমার মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর শিয়রের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে  পারিনি। সেদিনের সেই বেদনাঘন মুহূর্ত থেকে সব ব্যবধান ঘুচে গিয়ে আমরা  অসমবয়স্ক ও অসম মানসিকতার দুটি নারী পরস্পরের সমব্যথী হয়ে উঠলাম। 

      সময়ের সাথে অনেককিছুই বদলে যায়, বদলে যায় পরিস্থিতি,বদলে যায় মানসিকতা ও চিন্তাধারা। আমার শাশুড়িমাও এখন অনেককিছু বুঝতে শিখেছেন। আমিও অনেককিছু মানিয়ে নিতে শিখেচ্ছি। যে সময় আমাদের কাছে আসতে দেয়নি, সেই সময়ই আমাদের দু’জনকে অনেকটাই মনের কাছাকাছি এনে দেয়।        ধিরে ধিরে খুলে যায় তাঁর মনের গোপন কুঠু্রির মরচে ধরা দরজা। জীবনের এই শেষবেলা পর্যন্ত যেখানে লুকোনো ছিল এক গ্রাম্য বধূর, এক অসহায় মায়ের লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও অপমানের করুণ কাহিনী। সেই সময়ে কেশপুর থানার অন্তর্গত  আমার শ্বশুরবাড়ির গ্রামের মোল্লাতান্ত্রিক সমাজের রীতি-নিয়ম ছিল অনেকটা পাকিস্তান, আফগানিস্তান ইত্যাদি ইসলামিক রাষ্ট্রের মত। সামান্য কারণে তালাক, পুরুষের বহুবিবাহ, স্ত্রী-পীড়ন ইত্যাদি ছিল খুব সবাভাবিক ঘটনা। গত শতাব্দীর ৭ এর দশকেও আমি একজন পুরুষকে একসঙ্গে তিনজন স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করতে।

    মোল্লাদের ফতোয়া অনুযায়ী গানবাজনা, সিনেমা-থিয়েটার, এক কথায় বিনোদন মানেই ‘হারাম’। তাই পুরুষেরা ইন্দ্রিয় সুখের উপকরণ হিসেবে নারী  শরীরকেই বুঝত। তবে পাপের পথে নয়, কামার্ত পুরুষ যাতে ব্যাভিচারী না হয়  সেই জন্যই তার একাধিক বিয়ের অধিকার রয়েছে। স্ত্রীর ব্যভিচারী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সে কী করবে? ধর্মে সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। বরং স্বামীর ডাকে সাড়া না দিলে ফেরেস্তারা(দেবদূত)সারারাত ধরে অভিশাপ দেবে, দোজখের আজাব ভোগ করতে হবে, এই ভয় দেখানো হয়। শাশুড়ি মায়ের ক্ষেত্রেও তার খুব একটা ব্যতিক্রম ঘটেনি। সারাদিন সংসারে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর দু’বছর অন্তর সন্তানের জন্ম দেওয়া, এভাবে যে কত মাস, কত বছর কেটে গেছে, তা তিনি নিজেই ভুলে চগেছেন। ভুলে গেছেন নিজেকে। জানেন না কোন সন্তানের কত বয়স?  কোন মাসে জন্মেছে? সারাটা জীবনধরে সংসারের কাজ আর স্বামীসেবা  করে গেছেন। বিচ্যুতি ঘটলে শাসনও সহ্য করতে হয়েছে। সেই সময়কার বাড়ির বৌদের কাহিনী লিখলে আর একটা মহাকাব্য হয়ে যাবে।

    সংসারের সর্বময় কর্ত্রী ছিলেন খান সাহেবের তৃতীয় ঠাকুমা। ঠাকুরদার তিন  স্ত্রীর মধ্যে প্রথমা একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে মারা গেলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর একমাত্র সন্তান আমার শ্বশুরমশাই ওয়ারিশ খান। আরও সন্তানের আকাঙ্ক্ষা থাকায় ঠাকুরদা তৃতীয় বিয়ে করেন। এই স্ত্রী এক পুত্র ও তিন কন্যা উপহার দিয়ে স্বামী ও সংসারকে নিজের আঁচলে বেঁধে ফেলেছিলেন। স্বভাবতই তাঁর নিজের ছেলের বউ, মানে ছোটবৌ ছিলেন ‘পটেরবিবি, গয়নাতে গা ঢাকা’। আর বড়বৌ, মানে আমার শাশুড়িমা বিনে পয়সার বাঁদি। ১৯ শতকের ৪/৫ এর দশকে গ্রামের নিরক্ষর মানুষেরা জমানো টাকাপয়সা ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসে রাখতেন না। ঠাকুরদার চাষআবাদ ছাড়াও তেজারতি ব্যবসা ছিল। ইসলামে সুদ নেওয়া হারাম, তাই টাকা ধার দিয়ে তিনি সুদ নিতেন না। তখন গরিবদের ব্যাঙ্ক থেকে  ঋণ পাওয়ার এত সুবিধা ছিল না। ঠাকুরদা এই গরিব চাষিদের ঋণ দিতেন ধানের আগাম দাম হিসেবে। পৌষমাসে ধান উঠলে বাজারের থেকে কম দামে সেই ধান আদায় করে মরাইয়ে তুলে রেখে শ্রাবণ-ভাদ্রতে চড়া দামে বিক্রি করতেন। লাভের টাকা ও গয়না চিলেকোঠায় সিন্দুকে এবং পিতলের কলসিতে জমিয়ে রাখতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের সবার সামনে সেই সিন্দুক খোলা হলে দেখা গেল তাতে সামান্য কটা খুচরো পয়সা ছাড়া কিছুই নেই। শ্বশুর মশাই সবই বুঝতে  পারলেন, ছোটমা আর ভাই মিলে সমস্ত টাকাপয়সা আত্মসাৎ করেছে। তবুও তিনি চুপ থাকলেন। কিন্তু ছোটমা আর ভাই চুপ থাকলেন না।  ওঝা ডেকে শাশুড়িমা ও তাঁর  ১০ বছরের ছেলেকে(আমার স্বামী) চোর সাব্যস্ত করলেন। স্ত্রী ও ছেলের  এই মিথ্যে অপবাদ শ্বশুরমশাই নীরবে মেনে নেওয়াতে শাশুড়িমা প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিলেন। শ্বশুর মশায়ের প্রতিবাদ করার কোনো উপায় ছিলনা। তাঁর নিজস্ব কোনো রোজগার ছিল না। ছিল মামলা-মকদ্দমা করার নেশা। নিজের পরিবারটিও বেশ বড়। তাই সবসময় সৎমা, ভাই ও ভাইবৌয়ের মনজুগিয়ে চলার চেষ্টা করতেন। কোনোদিন জানার চেষ্টা করেননি নিজের স্ত্রীর কোনো সাধ বা ইচ্ছে আছে কিনা। পেটে সামান্য ভাত, আর পরনে মোটা কাপড় এ নিয়েই তাকে খুশি থাকতে হত। তবুও একদিন সংসার ভাগ হয়ে গেল।  শ্বশুরমশাইয়ের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে উঠল। মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল থেকে বড়ছেলে পাশ করে বেরিয়ে কলেজে ভর্তির ফিয়ের জন্য শাশুড়ি মায়ের যেটুকু গয়না ছিল, তাও বিক্রি করতে হল।

      হয়ত এরকম আরও অনেক বেদনাদায়ক ঘটনা শাশুড়ি মায়ের জীবনে ঘটেছিল, যা আর আমার জানার সুযোগ হয়নি। বাবার মৃত্যু হয়েছিল ১৯৯৭ এর ২৭ নভেম্বর। তার ঠিক পরের বছর স্ট্রোক হয়ে একমাস মত কোমায় থেকে  ১৯৯৮ এর ২৮ নভেম্বর এই পৃথিবী থেকে তিনি চির বিদায় নিলেন। সাথে সাথে  আমার  শ্বশুর বাড়ির প্রতি আকর্ষণ কমতে লাগল। শাশুড়িমা কী যত্ন করে খেতে দিতেন। এতটা আদর অন্য বৌরা কেউ পাইনি। আমার ছোট পিসিশাশুড়ি বলতেন, বৌ, তোমাকে দেখে যে ভক্তি ভালবাসা মনে জাগে, অন্য বৌদের দেখে তা হয় না।

    যাইহোক, সেদিন শাশুড়ি মায়ের মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে  প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, নারীর ওপর, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে নারীর ওপর এই শোষণ পীড়ন ও বঞ্চনার প্রতিবাদ জানাতে হবে। কিন্তু কীভাবে? আমিও যে এক অদৃশ্য শিকলে বাঁধা! তাই একদিন অপটু হাতে প্রতিবাদের কলম ধরলাম। এই কলম ধরতে আমাকে সাহস জুগিয়েছেন যে দু’জন মহীয়সী নারী, তাঁরা হলেন বেগম রোকেয়া ও আশাপূর্ণা দেবী। ওঁদের জীবন কথা আমাকে সব বিষয়েই অনুপ্রাণিত করেছে, এখনও করে চলেছে। তবে সমাজের রীতি নিয়ম বদলে ফেলা এত সহজ নয়, প্রতিবাদে প্রতিকার না হলেও এই একবিংশ শতাব্দীতেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা(মুসলিম মহিলারা) যে ১৪০০ বছর পূর্বের অবস্থায় রয়ে গেছি, এবং সেই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া যে খুব জরুরি তা অনেক সংস্কার মুক্ত মানুষ উপলব্ধি করতে পারছেন। আজ আমাদের বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি হচ্ছে, আমি নিজেও এসব বিষয়ে  লেখার সুযোগ পাচ্ছি, কলকাতা দূরদর্শনে ও অন্যান্য টিভি চ্যানেলের টকশোতে অংশগ্রহণ করছি, যার বেশিরভাগ বিষয়ই হল এদেশে মুসলিম নারীর অবস্থা। 

    এই পরিচিতি, এই সম্মান আমার কাছে তুচ্ছ মনে হয় যখন আমি আমার ঘর ভর্তি সুখের সরঞ্জামের দিকে তাকায়, তখন মনে হয় ওরা আমাকে বিদ্রুপ  করে বলছে, তোমার এই সুখ ভোগের  কোনও অধিকার নেই, যার জীবনভর  ত্যাগের বিনিময়ে এসব পেয়েছ, তাঁর জন্য তুমি কী করেছ? সত্যিই আমি এখন পর্যন্ত তাঁর জন্য কিছুই করতে পারিনি। এ আমার জীবনের চরম পরাজয়। তবে এ  পরাজয়ে কোনো আপমান নেই। আছে বেদনা, বুক ভরা বেদনা। এর পরেই ধিরে ধিরে আনন্দবাজার, আজকাল, সংবাদ প্রতিদিন, বর্তমান, দেশ, নবকল্লোল ইত্যাদি পত্রপত্রিকায় এই সমস্ত বিষয়ের ওপর চিঠি লেখা শুরু করি। চিঠি থেকেই নিবন্ধ ও প্রবন্ধ লেখায় অভ্যস্থ হয়ে উঠতে থাকি।        
 
                                    ক্রমশ


জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি