বিজয় চক্রবর্তী রচিত 'অনুভবে সুন্দরবন' /স্বপন কুমার দে

বিজয় চক্রবর্তী রচিত 'অনুভবে সুন্দরবন'

স্বপন কুমার দে


সম্প্রতি জ্বলদর্চির প্রকাশনায় প্রকাশিত হয়েছে বিজয় চক্রবর্তী রচিত 'অনুভবে সুন্দরবন '।গ্রন্থনামটি চমৎকার। অনুভূতির আলোয় সুন্দরবন। চোখের আলোয় তো বাইরের জগৎ দেখা যায় আর অনুভূতির আলোয় অন্তরের জগৎ। দেখার জগৎ আর অনুভূতির জগৎ--দুটো আলাদা। চক্ষুষ্মাণ মাত্রই দেখতে পায়,কিন্ত সেই দৃশ্যমান জগতকে অনুভবের জায়গায় নিয়ে যাওয়া ব্যক্তি বিশেষের ভাব জগতের আলোড়নকে শিল্পিতভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা সকলের থাকে না ।এইকাজে বিজয় চক্রবর্তী দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বন দফতরের সরকারি আধিকারিক হিসাবে বেশ কিছুদিন সুন্দরবনে থেকেছেন। নিজের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতাকে শিল্পসম্মত সাহিত্যের আকার দিয়েছেন। এ লেখায় তারই সন্ধান পাওয়া যায়।গল্পের ঢংয়ে বলা জীবনের এক একটি অভিজ্ঞতা নিপুণ ভঙ্গিমায় তিনি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সুন্দরবনের প্রকৃতি এবং জীবন -সেখানের হতদরিদ্র মানুষের জীবন সংগ্রাম -তাদের সুখ দুঃখের উপাদান -'অনুভবে সুন্দরবন '।

সাহিত্য রচনায় ভাষানির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।বিষয় এবং ভাব অনুযায়ী উপযুক্ত শব্দ চয়ন এবং সুচারুরূপে সেই শব্দ বয়ন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য রচনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই বিষয়ে লেখকের দক্ষতা লক্ষ্য করার মত। সাহিত্যের আর একটি শর্ত হল পরিমিতি বোধ। এখানে তথ্য আছে তবে তা কখনই রচনাকে ভারাক্রান্ত করেনি।বরং বিভিন্ন স্থানের পরিচিতি ও জীবিকার্জনের বিবিধ কৌশল আমাদের সমৃদ্ধ করে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন। সুন্দরবনকে ঘিরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। এই বনভূমিতেই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও ভয়ংকর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বাসস্থান। এছাড়াও খাল খাঁড়িতে রয়েছে অনেক অজানা রহস্য। ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকেরা ভিড় করেন তুলনামূলক কম বিপজ্জনক জায়গাগুলোতে ।কিন্তু, শ্রী চক্রবর্তী একজন বন আধিকারিক হিসাবে এই জলা জঙ্গল পরিবৃত বিপদসংকুল জায়গায় দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন।দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। জীবন যুদ্ধের এই অভিজ্ঞতার কথা কী অনায়াস ভঙ্গিমায় নিরাসক্তভাবে গল্পের ছলে বিবৃত করেছেন। সাহিত্যের নিয়মেই চরিত্রের নাম বদল করতে হয়েছে,কিন্তু কোথাও সাহিত্য রস ক্ষুণ্ণহয়নি।

যেমন, ''এ চাঁদনি রাতের বর্ননা দেওয়া সহজসাধ্য নয়।কোজাগরী চাঁদ। পূর্ণ গোলক।সমস্ত কলঙ্ক ঢেকে দিয়ে সেই স্বর্ণ গোলক থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে স্বপ্নীল স্বর্ণাভ আলো। মায়াবী আলোয় ভেসে যাচ্ছে বনভূমি।দূরে দিগন্তের কাছের বনকে কোন এক অশরীরী রূপে ভ্রম হচ্ছে ।''আবার কোথাও কোথাও লেখকের কবিসত্তা প্রকট হয়ে উঠেছে।

মোট ঊনচল্লিশটি পৃথক পৃথক গদ্য রচনায় সমৃদ্ধ এই গ্রন্থ। এদের কোন কোনটি ছোটগল্প, অণুগল্প অথবা অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিয়ে পাঠকের দরবারে উপস্থিত। পাঠকেরা ছোটগল্পের স্বাদ পাবেন-'দুখেযাত্রা',বাঘবন্দি খেলা ',মৃত্যু কিনারে',জন্মদিন ',প্রভৃতি। অণুগল্প হিসাবে রয়েছে-'স্বপ্ন ',বুড়ো বাড়ির ডিঙি',সকালের ছায়া',তরণীসেন', 'প্রায়শ্চিত্ত' প্রভৃতি।কখনো কখনো পরিজন বিচ্ছিন্ন হয়ে পুজোর দিনগুলোতে বেদনার ছায়া পড়েছে।

চরিত্র নির্মাণেও লেখকের নিজস্বতা লক্ষ্যণীয়। তিনি চরিত্রের গভীরে যান নি,শুধু ঘটনার প্রয়োজনে চরিত্রগুলোকে দাঁড় করিয়েছেন ঘটনার সাক্ষ্য প্রমাণে।তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলি বাস্তবের জল কাদা মাটি মাখা দারিদ্র্যজর্জর রক্ত মাংসের মানুষ। 'দুখেযাত্রা 'র গৌর,গোপাল, লক্ষ্মী,-'বাঘবন্দী খেলার 'হারাম,-'মৃত্যু কিনারে'র বনমালী, 'বনরক্ষী'তে রাঘব _এরা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত।

ভ্রমণ পিপাসু বাঙালি এবং সুন্দরবন সম্বন্ধে অনুসন্ধিৎসু মানুষের ক্ষেত্রে এই বইটি একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে একটা ত্রুটির কথা না বললেই নয়।কিছু কিছু বানান ভুল চোখে পড়েছে।এগুলো অনিচ্ছাকৃত মুদ্রণ প্রমাদ বলেই মনে হয়।আশাকরি,পরবর্তী সংস্করণে এগুলো সংশোধিত হবে।

জল -জঙ্গল এবং মনুষ্যভূমি _এই হল লেখকের বিচরণ ভূমি ,_পর্যবেক্ষণ এবং অনুভব এই তিন জায়গাকে ঘিরে। ছোট বড় অসংখ্য দ্বীপগুলিতে যোগাযোগের মাধ্যম হল বোট ও লঞ্চ। নদী, খাল, দুয়ানি,ভারানির জোয়ার ভাটায় নৌকা ভ্রমণের দৈনন্দিন চিত্র সহজ স্বাভাবিক ভাষায় চিত্রিত হয়েছে। জঙ্গলের রাজত্বে অরণ্যের অধিকার থেকে গেছে সবলের হাতে।সেই হিংস্র অথচ ক্রমহ্রাসমান প্রাণীদের বাঁচানোর জন্য অরণ্য কর্মীদের চেষ্টার ত্রুটি থাকে না।'বাঘবন্দী খেলা'য় তার পরিচয় পাই ।শুধুমাত্র রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ই নয়,নিরীহ হরিণ, লুপ্তপ্রায় প্রজাতির কচ্ছপ, মদনটাক পাখি প্রভৃতিদের বাঁচানোর জন্য বনকর্মীদের অক্লান্ত চেষ্টা লক্ষ্য করার মতো।

আর রয়েছেন সুন্দরবনের বাদা অঞ্চলের মানুষ। এঁদের প্রধান জীবিকা খাল, খালি থেকে মাছ কাঁকড়া সংগ্রহ এবং বিক্রি করা। মৃত্যু ভূমি সুন্দরবনের গভীরে গিয়ে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে কত মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়। তারও বর্ননা আছে।

আরও বিবরণ আছে অরণ্যে জাগ্রত দেবী বনবিবির কথা।গরিব জেলে মাঝি মধুসংগ্রহকারীরা জঙ্গল যাত্রার আগে ভক্তিভরে পূজা দেন।সব মিলিয়ে বইটি যে পাঠকের অনুভবের জায়গায় স্থান পাবে-এ বিশ্বাস রাখি।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি