লোটনষষ্ঠী /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব - ৩২

লোটনষষ্ঠী

ভাস্করব্রত পতি

শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে হয় লোটনষষ্ঠী। সন্তানের মঙ্গলকামনায় পালন করে লোটন বা লুণ্ঠনষষ্ঠী ব্রত। এই ব্রত পালনে মায়েরা পুত্রশোক পায়না। সেইসাথে সংসার সুখকর হয়ে ওঠে। গর্ভবতী মহিলা হলেও এটি করা যায়। তবে কোনো বন্ধ্যা বা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম মহিলা কিংবা বিধবা মহিলাদের এই লৌকিক উপচার পালন করার বিধান নেই। যেকোনো পুত্রবতী সধবা মহিলাদের একান্ত উৎসব এটি। নিজে অথবা পুরোহিত ডেকে পূজো করাতে হয়। কোনো কারণে দিনটি সোমবার, মঙ্গলবার, শুক্রবার কিংবা শনিবার পড়লে তবে সেদিন লোটনষষ্ঠীর পূজা করা যাবেনা। শুধুমাত্র নিয়মটুকু মেনে চলতে হবে।

'লোটন' ক্লী [√লুট্‌ + অন (ল্যুট্ )-ভা] বিচেষ্টন, গড়াগড়ি দেওয়া। 
'লুন্ঠন' অর্থে লুঠ করা বা হারক, নিরাসক বোঝায়। দস্যুবৃত্তি বা চৌর্য্যবৃত্তি বা অপহরণ বোঝায়। কথাসরিৎসাগরে আছে "দেশো মে লুন্ঠিতহনেন"! আবার 'লুন্ঠিত' অর্থে লুটিয়ে পড়া বোঝায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, "এই ছয়কোটি মুণ্ড ঐ পদপ্রান্তে লুন্ঠিত করিব"।

যিনি ব্রতীনী, তিনি সাতটি অথবা নয়টি নাড়ুতে গোবর মাখিয়ে মাটিতে ফেলে দেন। অর্থাৎ লুটিয়ে পড়ে নাড়ুগুলি। লুন্ঠিত হয় সেগুলি। এরপর চুলের সাহায্যে শালপাতার থালায় আবার এগুলিকে তুলে রাখেন। একেই বলা হয় 'লোটন তোলা'। ষষ্ঠীদেবীর পদতলে নাড়ু লুটিয়ে পূজো দেওয়া হয়। এই 'নাড়ু' আসলে সন্তান। দেবীর সামনে আত্মনিবেদন। সন্তানের যাবতীয় দায় দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হোলো এভাবেই। তাই 'লোটনষষ্ঠী'। ব্রতীনীরা পূজোর কাজ শেষ হলে পরে দিনের বেলায় লুচি, মিস্টি, তরকারি খেয়ে উপোস ভঙ্গ করতে পারে। তবে রাতের বেলায় কেবলমাত্র ফল, ডাব, মিস্টি খেতে পারে। অন্য কিছু খাবার খাওয়া চলবে না।
লোটনষষ্ঠী ব্রতের উপকরণ হল আতপ চাল, গুড়ের পিঠে, ছোট ছোট ক্ষীরের নাড়ু। আখের গুড়, ডাব, ঘি, ফল, মিস্টি, তরকারিও দেওয়া হয় কোথাও কোথাও। মেঝেতে আলপনা দিয়ে তার সামনে বটের ডাল রাখতে হবে। এবার তার সামনে ঘটস্থাপন করে তাতে দিতে হবে তেল, হলুদ বাটা এবং দই। এর সাথে সাতটি ( কোথাও কোথাও ৯ টি ) ক্ষীরের নাড়ু বা লোটন তৈরি করে ষষ্ঠীদেবীর কাছে নৈবেদ্য দিতে হয়। এই নাড়ুকেই 'লোটন' বলা হয়। পূজার শেষে দেবীকে প্রনাম করে লোটনষষ্ঠীর ব্রতকথা শোনার নিদান রয়েছে।

লোটনষষ্ঠীর ব্রত কাহিনীটা এরকম --- "এক দেশে এক ব্রাম্ভণী ছিল। তাঁর এক ছেলে, বৌমা আর একটি মেয়ে ছিল। বৌমার ছিল সাত ছেলে, আর মেয়ের তিন ছেলে। ব্রাম্ভণী ছিল বেশ অর্থবান। ছেলেও ছিল রোজগেরে। সে তাঁর মাকে খুব শ্রদ্ধা করত।

শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীর দিনে ঐ ব্রাম্ভণী ষষ্ঠী পূজোর আয়োজন করে। তাঁর নিজস্ব হেফাজতে ছ'খানা সোনার লোটন ছিল। কিন্তু একদিন সে জানতে পারলো যে সেই কৌটো থেকে তিনটি লোটন উধাও। তখন বউমাকে জিজ্ঞেস করলো যে কেউ তাঁর লোটন নিয়েছে কিনা। বৌমা তো অবাক! এই কথায় সে কাঁদতে কাঁদতে ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করে জানায় যে যদি সে লোটন চুরি করে থাকে তবে সে যেন তাঁর সাত ছেলের মাথা খায়। এরপর ব্রাম্ভণী তাঁর মেয়েকে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করায় মেয়েও বৌমার মতো কান্নাকাটি করে জানায় সেও নির্দোষ।

তখন বাধ্য হয়ে ব্রাম্ভণী আরো তিনটি ক্ষীরের লোটন গড়ে পূজো করা শুরু করে। এদিকে বৌমা সাত ছেলে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। রাতের বেলা তাঁর স্বামী এলে তাঁকে সব কথা জানায় তাঁর মা। তখন রেগে সে আর বৌয়ের কাছে শুতেই এলোনা। মায়ের কাছেই শুয়ে পড়ে। 

সকালে বৌমা ঘুম থেকে উঠে দেখে যে, তাঁর সাতটি ছেলেই মারা গিয়েছে। খুব কাঁদতে লাগলো সে।  তখন অবস্থা বুঝে ব্রাম্ভণীর মেয়ে তাঁর মাকে ও দাদাকে জানায় যে, এই লোটন চুরি করেছে তাঁর বৌদিই। তাই তাঁকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া উচিত।
এদিকে সন্তান হারিয়ে ব্রাম্ভণীর বৌমা সারাদিন দরজা বন্ধ করে কাঁদতে লাগলো। তা দেখে ষষ্ঠীদেবীর দয়া হল। রাতের বেলা বুড়ির ছদ্মবেশ ধরে এসে বকুনি দিয়ে বলে, সে কেন ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করলো। এটা শুনে বউটি তখন কাঁদতে কাঁদতে জানায় যে সে চুরি করেনি। ষষ্ঠীদেবী জানায়, চুরি যেই করুক, তবে কখনোই ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করা যাবেনা।এই বলে ষষ্ঠীদেবী ঐ মরা ছেলেদের উপর বাঁশপাতার জল ছড়িয়ে দিতেই সবাই আবার বেঁচে উঠলো। ছেলে ফিরে পাওয়ার আনন্দে বউটি তখন জীবিত ছেলেদের নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে স্বামী ও শাশুড়ীকে দেখালো এবং সব ঘটনা খুলে বললো।

অন্যদিকে ব্রাম্ভণীর মেয়ে ঘুম থেকে উঠে দেখলো যে, তাঁর তিন ছেলেই মারা গিয়েছে! স্বভাবতই তা দেখে তাঁর তো মুর্ছা যাওয়ার অবস্থা। তখন সে সেই মুহূর্তে শুনতে পেলো এক অমোঘ গর্জন। কে যেন বলছে, “জানিস্ না তুই, নিজেই লোটন চুরি করে পরের মেয়ের নামে দোষ দিয়েছিস! এখনি গিয়ে বৌদির পায়ে ধরে অপরাধ স্বীকার কর"।

ব্রাম্ভণীর মেয়ে সাত তাড়াতাড়ি বৌদির পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলে তাঁকে ক্ষমা করে বৌদি জানায় অবিলম্বে গিয়ে চুরি করে লুকিয়ে রাখা লোটনগুলো মায়ের হাতে তুলে দিতে। মেয়ে সব লোটন ফিরিয়ে দেয় তাঁর মাকে। ব্রাম্ভণীর বৌমা তখন ষষ্ঠীদেবীর দেওয়া বাঁশপাতার জল ননদের মরা ছেলেদের উপর ছড়িয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ননদের মৃত ছেলেরা বেঁচে ওঠে। এ ঘটনা জেনে সবাই ব্রাম্ভণীর বৌমাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেয়। আর ব্রাম্ভণীর মেয়েকে দুয়ো দিতে লাগে। এরপর থেকেই প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে শুরু হয় লোটনষষ্ঠী তথা লুন্ঠনষষ্ঠীর পূজা।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯