রম্য কবিতা, পর্ব-৯/তথাগত বন্দ্যোপাধ্যায়

রম্য কবিতা, পর্ব-৯

তথাগত বন্দ্যোপাধ্যায়


গাড়িচোরের ভয়ে

‘দিমিত্রি জেলেপভ্‌’ ভয় পাচ্ছেন খুব,
যবে থেকে রাশিয়াতে সূর্য দিয়েছে ডুব।
গ্রীষ্মঘুমে ছিলো যে চোরগুলো এতদিন,
জেগে উঠে তারা নাকি আনিয়েছে দূরবীন।
নাছদুয়ারে বিজলি বাতি নেই, স্তব্ধ,
জানেন - চোরেরা চাপা, করেনাকো শব্দ।
‘চোরের হাঁড়ির কথা জানলেন কিকরে?’
তবে কি তিনিও!-থাক্‌ সেকথা হবে পরে।
মান্ধাতা-আমলের সাধের এক গাড়ি তাঁর,
হারানোর ভয় বাড়ে, বাড়লে অন্ধকার।
গাড়িটিও মাথামোটা - অঘটনে থাকে চুপ,
বাজায়না ভেঁপু দিলে দৃষ্টি কেউ লোলুপ।
নিজে থেকে এখনো সে জ্বলতেও পারেনা,
বেগতিক দেখলেও তেড়ে গুঁতো মারেনা।
ভয়ে- তা’র বাম্পারে আর লোহার বেড়ায়,
লোহার শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে - পাহাড়ায়।
“গাড়ি বেঁধে রেখেছেন! কি ভয় অতো?”-শুধাই,
বললেন, “এ আমার পোষা কুকুরের মতো, তাই।”



গরুচোর

ছুটির সন্ধ্যে ছিল, টিভিতেও ফুটবল,
ভুঁড়ি হাতে শাশুরিমা তাম্বুলে বিহ্বল।
বড়, মেজো, সেজো-বৌ গেছে জল আনতে,
তখনই তো চুপিসারে সবার অজান্তে-
লরি নিয়ে এসে থামে সরু সরু গরুচোর,
কর্কট-গতি দিতে মর্কটেরা তুখোড়।
মুখচোরা জাতভাই লরিটাতে দাঁড়িয়ে-
দেখে বেগতিক গরু ডাকে গলা ছাড়িয়ে।
ছোট-বৌ ছুটে আসে ছেড়ে-ছুড়ে চৌকি,
'হনুমান-টুপি' ভাবে- ‘কাঁদে কে ও বৌ কি!’
“তোর গরু নিয়ে যা না, খামোকা না কেঁচিয়ে”
বিনয়াবনতা যেই এগোয় না চেঁচিয়ে-
ছেঁচোড়েরা মুখ চেপে তুলে নেয় গাড়িতে,
ফাঁকা হাঁড়ি দেখে শুরু শোরগোল বাড়িতে।
‘বৌ তুলে নিয়ে গেছে, নিতে এসে গরু হায়!’
এ কথা বোঝার পরে সকলে পাগলপ্রায়।



বুদ্ধিচোর

চোরের সম্মেলনে দুনিয়ায় যতো চোর,
জড়ো হয়ে আলোচনা চালাচ্ছে রাত-ভোর।
উঁকি মেরে দেখি সেথা রকমারি চোর সব,
চিন্তিত খুবই তারা, নেই কোনও কলরব।
চিতচোর, ঠগি চোর, দাগি চোর, ঘাগিচোর,
কাঁচা পাকা সরু মোটা গরুচোর, জোচ্চোর,
জল-স্থল-দস্যুরা, লুঠেরা, পকেটমার,
ডাকাত, ঠেঙাড়ে, রাহাজান আর বাটপাড়,
এছাড়া ছিঁচকে চোর এবং সিঁধেল চোর,
শয়ে শয়ে ছেলেধরা, দেখা দিয়েছে ছ্যাঁচড়।
কান পেতে শুনে বুঝেছি তাদের চিন্তা,
কি তাদের সমস্যা, কি আগামী পন্থা।
নতুন এক চোর এসেছে বাজারে জঘন্য,
চুরি করে যে - বুদ্ধি বাড়ানোর জন্য।
অন্যের ঘটে ছোঁড়ে মনোসন্দংশ,
কাছে যে’ই যায় তারই কুবুদ্ধিভ্রংশ।
ললাটীয় খণ্ডক ও ধূসর পদার্থ-
বশ করে নিমেষেতে শোষে সে গূঢ়ার্থ।
কল্পনা, পরিকল্পনার স্থানান্তর,
অন্যের বোধ খেয়ে বাড়ে বোধি তড়তড়।
পুলিশের কাজে নাকি দিচ্ছে সে চক্কর,
দেওয়া যাচ্ছেনা তাকে কোনোমতে টক্কর।
অন্তর্যামী বোঝে সে চোরের গল্প,
আশু প্রয়োজন আনা অন্য প্রকল্প।



বইচোর

বইচুরি নিয়ে কিছু শুনিইনি কখনো!
তাই ভাবি কতকিছু দেখা বাকি এখনো।
সেদিনে বইমেলায় গেছি এক দোকানে,
আমি ছাড়া আরও জনা দশ ছিলো ওখানে।
পাশের জনকে দেখি দ্রুত চোখ বোলাতে,
চুপিচুপি, টপাটপ্‌ বই নিতে ঝোলাতে।
“বই এরও দাম দিতে হয় দাদা এ দেশে”-
বলতেই ঝোলা নিয়ে হাওয়া হলো নিমেষে।
যতখনে তাকে তাড়া করে লোকে ক্লান্ত,
প্রকাশক ‘দেউলিয়া-রোগে’ আক্রান্ত।
পরে যদি দেখা হয় জিজ্ঞেস করবোই-
“পড়তে না বেচে দিতে চুরি করা হয় বই?"
মলাটের শখ থাকা - টাকাহীন ললাটে-
প্রকাশনা উঠে যাবে দুদিনেই যে লাটে!


চাকরিচোর

যোগ্যের চাকরিও অযোগ্য লোককে,
অর্থের বিনিময়ে দিতে যারা দক্ষ,
খুঁজে পেলে তাদেরকে - আর নেই রক্ষে,
বেকারের ঘা'য়ে মরবে কর্তৃপক্ষ।

প্রথমেই নাম যার সফলের তালিকায়,
সাদা খাতা জমা দিয়েছিলো সে পরীক্ষায়,
এভাবেই কতো শতো চাকরি গেঁড়ালো হায়!
যোগ্য প্রার্থী কতো হয়েছে পাগলপ্রায়।

পরের চাকরি খেয়ে সাবধান - তুমিও,
বঞ্চিত মানুষেরা কেঁদে কেঁদে জেগে রয়,
পারো তো শিরস্ত্রাণ পরে রাতে ঘুমিও,
প্রতারিত অশ্রুরা ঢিলে পরিণত হয়।

আরও পড়ুন

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি