পথরেখা গেছে মিশে - পর্ব ৫(প্রাপ্তির খাতায়)মিলি ঘোষ

পথরেখা গেছে মিশে - পর্ব ৫

প্রাপ্তির খাতায়

মিলি ঘোষ

 অপার বিয়ে হয় এক সরকারি ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। নাম অক্ষয়। অক্ষয়ের যখন বাবা মারা যান, অক্ষয় আর তার দুই বোনের তখন ছাত্রজীবন চলছে। এক মামা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ওই বিপর্যয়ের সময়। মামার বাড়িতেই মানুষ হয় তারা। স্বাভাবিকভাবে অক্ষয়ের, সেই মামার প্রতি ছিল অশেষ কৃতজ্ঞতা। পরে অবশ্য অক্ষয় মামার বাড়ির কাছেই নিজের বাড়ি করে। অপাও বিয়ের পরে মামা শ্বশুরের বাড়িতেই থাকতে শুরু করে, যতদিন না তাদের বাড়ি হয়। প্রস্তাবটা ছিল মামারই। 
 
শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত বললে যা যা আসে মানুষের মনে, অপার শ্বশুরবাড়ি মোটামুটি সবই কভার করেছিল। বড়ো বাসন কোসোন দেখে ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই। অপা বড়ো সংসার থেকেই এসেছে। কাজকে ভয় কীসের ? কিন্তু বোনাস পয়েন্ট হিসেবে যা জুটত, সেগুলোই সহ্যের বাইরে যেত। বোনাসের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না যাওয়াই ভালো। 
কিন্তু দৈত্যকূলে প্রহ্লাদ ছিলেন ওই মামাশ্বশুর। অপার তাঁকে সংসারে একমাত্র প্লাস পয়েন্ট বলে মনে হতো। 
অফিস থেকে ফিরে বেহালা বাজাতেন মামা। মাঝেমাঝে অপাকে ডেকে নিতেন। 
বাজিয়ে শোনাতেন আর বলতেন, "বলো তো এটা কোন রাগ ?" 
আরো বলতেন,"এরপর মায়ের কাছে যেদিন যাবে, হারমোনিয়ামটা নিয়ে আসবে। বিকেলের দিকে রেওয়াজ করবে।"
সেটা বাস্তবায়িত হবে না বুঝেও অপা ঘাড় কাত করত। নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছা করত অপার।
পরে অক্ষয় বাড়ি করলে অপার এক দাদা এসে হারমোনিয়াম দিয়ে যায়। ততদিনে অপার বাথরুমে গান গাইবার ইচ্ছাটুকুও চলে গেছে।  

মামা বিয়ে করেননি, অথচ বাড়ি করেছেন। কাজেই বারো ভূতের সংসার। অক্ষয় আর তার মামা অফিসে বেরিয়ে গেলেই শুরু হতো পরিবারের বাকি সদস্যদের কদর্য রূপ দেখানোর প্রতিযোগিতা। 
সব কাজ সেরে অপা দুপুরে একা খেতে বসত টেবিলে। পরিস্থিতি যেদিন চরমে যেত, না খেয়েই থাকত।
ওপর মহলে যতই আপত্তি থাক, মামা চাইতেন অপা চাকরি করুক। তাঁর ইচ্ছাতেই রাত বারোটার পর বই নিয়ে বসার সুযোগ হতো অপার। তবে শক্তিই শেষ কথা, সে সৎ হোক বা অসৎ। অসৎ শক্তির সৈন্য সামন্ত বেশি হলে একা মামাশ্বশুর আর কী করবেন ? একবার পরীক্ষার দিন বিভিন্ন কাজে অপাকে আটকে রেখে সময়টা পার করে দেওয়া হয়েছিল। আর একবার প্রকৃতি অপার বিরুদ্ধে গেছিল। বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। বলা হলো, "পাগল না কি, এর মধ্যে কেউ বেরোয় ? যারা ইন্টারভিউ নেবে, তারাই আসতে পারবে না।"
অফিসের পদোন্নতির জন্য অক্ষয়কে পড়াশুনা করতে হতো অফিস থেকে ফিরে বা ছুটির দিনে। ক্যালকুলাস আটকালে অপা তো আছেই। রাত জেগে অপা সাহায্য করত অক্ষয়কে। 
প্রোমোশন হতো অক্ষয়ের। গর্বিত মায়ের হাঁটাচলা পাল্টে যেত। 
পায়ের তলায় থেকে যেত অপা।


অপার বাবা তখন অসুস্থ, নার্সিংহোমে। ওপর মহল থেকে অপাকে যেতে বাধা দেওয়া হলো। সব ক্ষেত্রে তো আর ঘাড় কাত করা যায় না। জীবনে কিছু পরিস্থিতি আসে, যখন বাঁধন কেটেই বেরোতে হয়। 
মা'র কাছে একটা দিন যেতে চাইলে আজ ওমুক,  তাই যেতে নেই, কাল তমুক, তাই যেতে নেই। মনুষ্যসৃষ্ট হাজারো নিয়মের বেড়াজালে অপাকে আটকে দেওয়া হতো। অথচ বাড়ির ছেলে রাত এগারোটা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে ফিরলেও, সে নিয়মের ঊর্ধে। 
বাড়িতে কেউ এলে অপাকেই তার বিছানার দখল ছেড়ে দিতে হতো। কোথাও একটা জায়গা করে নিতে হতো তাকে। 
অপা ভাবত, "এই খাটটা তো সবেই এসেছে বাড়িতে, তার বাবা দিয়েছে বিয়েতে। এর আগে লোকজন এলে কোথায় শুতে দিত এরা ?"
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অক্ষয় নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকত। তবে অপার চাকরি করার বিষয়ে মামার সাথে কখনও সখনও গলা মিলিয়েছে সে। শেষমেশ বিশাল সেনাবাহিনীর কাছে হাত তুলে দিয়েছে। 

এদিকে অক্ষয়ের মা মাঝেমাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। অক্ষয় আর অপা দৌড়দৌড়ি করত। পাড়ার ছেলেরা হাসপাতালে রাত জাগত পালা করে। বাকি আত্মীয়রা বেপাত্তা। এটা প্রায়ই হতো। মামা শ্বশুরের বয়স হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত। তাঁর কথা আলাদা। কিন্তু যতবারই অক্ষয়ের মা অসুস্থ হয়েছেন, ততবারই আত্মীয়দের নানান সমস্যা দেখা দিত। ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ত তারা, নিজ নিজ সংসারে। কারোর বরের জ্বর, কারোর মেয়ের। কারোর অফিসে এত কাজ, মুখ তোলার সময়ই পেত না। প্রতিবারই হতো একদম নিয়ম করে। 
ইতিমধ্যে সকলের আশায় জল ঢেলে অপা একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। ক্ষোভে ফেটে পড়েন অক্ষয়ের মা। আর খুশির সাগরে পাল তুলে দেয়  অক্ষয় ও অপা। 
দু'জনের ইচ্ছাতেই মেয়ের নাম রাখা হয়, অরুনিকা।  

অক্ষয়ের তৈরি করা বাড়িতে গুছিয়ে উঠতে না উঠতে অক্ষয়কে অফিস থেকে শিলিগুড়ি পাঠানো হলো দু'বছরের জন্য। অরুনিকাকে তখন একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে। উপায় নেই। ইঁদুর প্রতিযোগিতায় নাম লেখাতে হবে। তাই অপা মেয়েকে নিয়ে থেকে গেল বাড়িতে।  
শাশুড়ি মায়ের হঠাৎ স্ট্রোক। মেয়েকে পাশের বাড়িতে রেখে এম্বুলেন্স ডেকে ক্লাবের ছেলেদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটল অপা। কোনও আত্মীয়কে পাশে পেল না। যিনি অসুস্থ, তাঁর একেবারে নিকটজনেরা যে যার মতো সরে গেল। যে বাড়িতে অরুনিকাকে রেখে গেছে, হাসপাতাল থেকে মাঝেমাঝে অপা সেখানে ফোন করে ওর সাথে কথা বলত। 
অরুনিকার একটাই কথা, "মা, তুমি কখন আসবে ?" বেলার দিকে শাশুড়ির জন্য রান্না করে নিয়ে যাওয়া, বিকেলে ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলা, কখন কী টেস্ট করতে হবে ইত্যাদি সব কিছু একা অপা নিজের দায়িত্বে করত।  
খবর পেয়ে ছুটে আসে অক্ষয়। ওর মা'ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। তবে একটা দিক অবশ হয়ে গেছে তাঁর। ফিজিওথেরাপী করাতে হবে। কিন্তু অক্ষয়কে ফিরে যেতে হবে তার কর্মক্ষেত্রে। সব ব্যবস্থা করল অপা। ধীরে ধীরে শাশুড়ি মা উঠে বসলেন। অল্প স্বল্প হাঁটাচলাও শুরু করলেন।     

দেখতে দেখতে অক্ষয় এক বছর চার মাস কাটিয়ে দিল শিলিগুড়িতে। আর আট মাস হয়ে গেলেই কোলকাতায় চলে আসতে পারবে। এই আনন্দে সবাই দিন গুণছে। 
অপার ছোট্ট মেয়ে বলে, "মা, আর মাত্র আট মাস ? তারপরেই বাবা একেবারে চলে আসবে ?"
অপা বলে, "হ্যাঁ, একেবারে।"
আনন্দ যেন ধরে না আর তাদের। অক্ষয়ও আসতে পারলে বেঁচে যায়। সংসার ফেলে রেখে কার আর ভালো লাগে দূরে কোথাও পড়ে থাকতে। 

এপ্রিলের শেষ শনিবার। ছুটি ছিল অক্ষয়ের। শরীরটা সকাল থেকে ভালো লাগছিল না তার। তেমনভাবে কিছু বলেনি কাউকে। রুমমেটদের অনুরোধে চা খেতেও বেরোয়নি সে সন্ধ্যেবেলা। শিলিগুড়ির বাড়িতে একাই ছিল সে। বন্ধুরা ফিরে এসে অক্ষয়কে খুঁজে পায় না। কিন্তু বাথরুম থেকে একটা গোঙানির শব্দ আসে। দরজা ভেঙে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে সব শেষ। হাসপাতালে ডক্টর বললেন, "ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।" 
অরুনিকার তখন ছয় বছর বয়স। 

 জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
                                     .

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯