তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী/ পঞ্চম পর্ব/দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী     
          
পঞ্চম পর্ব         

দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী


হরিদাস স্বামী
পরের দিন ভোরবেলায় তানসেন প্রাসাদের গবাক্ষ থেকে দূরে দেখলেন যমুনা নদীর বক্ষ থেকে অরুন রঙে রাঙা সূর্য উদিত হচ্ছেন। সেই দৃশ্য দেখে তাঁর মনে পড়ে গেল বৃন্দাবনের কথা। এমন সময় বীরবল তাঁর পাশে এসে জিজ্ঞেস করলেন "গুরুজি, এই সময়ে আপনি এমন নিশ্চুপ হয়ে কি ভাবছেন"? 

তানসেন বললেন "কবিবর, দেখুন ধীরে ধীরে কেমন প্রভাতসূর্য যমুনার বক্ষ থেকে উদিত হচ্ছেন। এই সূর্যকে বালসূর্য বলে। একটু পরেই সূর্যদেব অরুণ নামে ভূষিত হবেন, আবার মধ্যাহ্নে তাঁর নাম মার্তণ্ডদেব। আমার মনে পড়ে যাচ্ছে শৈশবের কথা যখন আমার গুরুজি হরিদাস স্বামীর কাছে বৃন্দাবনে ছিলাম। গুরুর নির্দেশে ব্রাহ্ম-মুহূর্তে যমুনা কিনারে গিয়ে সূর্যদেবের ধ্যান করতাম, তারপরে স্নান করে ফিরে এসে গুরুর সেবা করে রেওয়াজ করতে বসতাম। গুরুজি আমাকে আর বৈজুকে সংগীতের সমস্ত ভান্ডার উজাড় করে দিতেন"। 

কবিবর বললেন "দেখুন আপনার গুরুজি নিশ্চয়ই আপনাকে সব উজাড় করে দিয়েছিলেন কিন্তু আপনার যদি সাধনা না থাকতো তাহলে কিন্তু আমরা আজকের এই তানসেনকে পেতাম না"।                    

তানসেনের গানে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট আকবরের মনে প্রশ্ন জেগেছিল যে তাঁর থেকে গুণী আর কেউ আছেন কিনা তামাম হিন্দুস্তানে? সেই প্রশ্নের উত্তরের আশায় একদিন তিনি তানসেনকে জিজ্ঞাসা করতে তানসেন বললেন "সম্রাট, আমার এই সম্পদ আমি যাঁর কাছ থেকে পেয়েছি তিনি আমার গুরুজি হরিদাস স্বামী, যাঁর নির্দেশে যমুনা নদী প্রবাহিত হয়। তাঁর সুমধুর কন্ঠের শাসনে যমুনামাঈ বাঁধা হয়ে পড়ে আছেন বৃন্দাবনে। 

তানসেনের কথা শুনে আকবর তাজ্জব হয়ে গেলেন। কেমনতর সঙ্গীত সাধক তিনি যাঁর কন্ঠের শাসনে নদীর প্রবাহপথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। সেই সংগীত সাধকের দেখার জন্য আকবর পাগল হয়ে গেলেন।                                          

একদিন আকবর বীরবলকে বললেন "গুরুজীকে বলুন না আমাকে ওঁর গুরুদেব হরিদাস স্বামীর কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য অথবা তিনি যদি বলেন তাহলে তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে আমি এখানে নিয়ে আসব"। বীরবল সেই কথা তানসেনকে বলতে তানসেন সরাসরি সম্রাটকে বললেন "আমার গুরুজীর কাছে যেতে গেলে আপনাকে এই বৈভবের প্রাসাদ ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের বেশে তাঁর কাছে যেতে হবে"। এই কথা শুনে একদিন আকবর স্থির করলেন বৃন্দাবনে যাবেন। সম্রাট মীর বকশীকে নির্দেশ দিলেন তাঁর নিরাপত্তার জন্য তিনি সম্রাটের সাথে যেতে পারেন কিন্তু বৃন্দাবনে হরিদাস স্বামীর আশ্রমে প্রবেশ করতে পারবেন না। সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের মতো গুরুজীর কাছে যাবেন এবং তাঁকে দর্শন করবেন।                                       

শীতের শেষে একদিন তানসেন সম্রাটকে নিয়ে চললেন বৃন্দাবনে হরিদাস স্বামীর সন্নিধানে। আকবর তাঁর সম্রাটের মহার্ঘ বেশ ও বহুমূল্য তাজ ত্যাগ করে শুধু একখানি মুক্তোর মালা নিয়ে হরিদাস স্বামীর কাছে চললেন। সম্রাট এগিয়ে যাচ্ছেন তানসেনের সাথে যমুনা কিনার ধরে হরিদাস স্বামীর আশ্রম নিধুবনের দিকে। নিধুবনের বহু আগে থেকে আকবরের কানে ভেসে এল সুমধুর সঙ্গীতের আওয়াজ। সংগীতের সেই আওয়াজে আকবর মৃদু পদচারণায় অবশেষে যেয়ে পৌঁছালেন হরিদাস স্বামীর আশ্রমের মন্দির প্রাঙ্গণে। আকবরকে দেখে শ্রীকৃষ্ণের দাস হরিদাস স্বামী তাঁর গান শেষ করে জিজ্ঞেস করলেন "মহামান্য ভারত সম্রাট আকবর, আপনি যমুনাতীরে আমার আশ্রম এসেছেন এ আমার পরম সৌভাগ্য। বলুন কি আপনার প্রয়োজন"? 

হরিদাস স্বামীর কথা শুনে আকবর তাজ্জব হয়ে প্রশ্ন করলেন "আমি সাধারন বেশে আপনার আশ্রমে এসেছি আপনার গান শুনতে, কিন্তু আপনি আমার পরিচয় পেলেন কি করে? আমিতো আমার রাজবেশ বা সম্রাটের তাজ পরে আসিনি, অঙ্গে নেই কোন বহুমূল্য অলঙ্কার"। 

ঈষৎ হাস্যে হরিদাস স্বামী বললেন "মূল্যবান বসন ত্যাগ করে ভাবলেন আপনি সাধারণ মানুষ হয়ে গেছেন, আপনার কপালের রাজ তিলকও মুছে এসেছেন কিন্তু রাজতিলকের আভা তো এখনো মুছে ফেলতে পারেননি"? আকবর লজ্জিত হয়ে বললেন "আমি আপনার গানের সুখ্যাতি শুনেছি। তাই দিল্লীর দরবার ছেড়ে আপনার আশ্রমে এসেছি আপনার সেই সুললিত গান শুনতে"।                   

হরিদাস স্বামী বললেন "আমিতো হরির দাস, আমি তাঁরই গান গাই"। এই বলে হরিদাস স্বামী একটি একটি করে শ্রীকৃষ্ণের ভজন গান গাইতে লাগলেন। গান শুনে আকবরের চোখ দিয়ে প্রেমের অশ্রু ধারা বইতে লাগলো। এ তিনি কি গান শুনছেন? এযে হৃদয় নিংড়ানো গান। এক একটি গান যেন বিশ্বপিতার চরণতলে পুষ্পস্তবক হয়ে ফুটে উঠছে। অন্তর তাঁর দিব্য আনন্দে পূর্ণ হয়ে গেল। অনাবিল প্রশান্তিতে তাঁর মন প্রাণ ভরে উঠলো, সার্থক হলো তাঁর বৃন্দাবনে আসা। গানের শেষে আনন্দে আপ্লুত হয়ে মহামান্য সম্রাট তাঁর গলার মুক্তোর মালা খুলে হরিদাস স্বামীর চরণতলে নিবেদন করলেন। কিন্তু একি কাণ্ড করলেন হরিদাস স্বামী? মুক্তোর মালা হাতে তুলে তিনি সেটি যমুনার জলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। এই দৃশ্য দেখে সম্রাট রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন "আপনার দুঃসহ স্পর্ধা দেখে আমি স্তম্ভিত। ভারত সম্রাটের কাছে অন্য কেউ এই স্পর্ধা দেখালে এতক্ষণে তার শরীর থেকে মস্তক বিচ্যুত হয়ে এখানে লুটিয়ে পড়ত। 

এমন সময়ে হরিদাস স্বামী পূরবীতানে গান ধরলেন। তাঁর গান শুনে আশ্রমের প্রাঙ্গণে দেখা গেল তিনটি মৃগ কোথা থেকে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তাদের প্রত্যেকের গলায় একটি করে মুক্তোর মালা, ঠিক যেমনটি সম্রাট হরিদাস স্বামীকে দিয়েছিলেন। এরপরে দেখা গেল যতগুলি হরিণ নিকটস্থ অরণ্য থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল প্রত্যেকের গলাতে একইরূপ মুক্তোর মালা। আকবর দেখে ভাবলেন 'তাজ্জব কি বাত। আমিতো একটি মালা এনেছিলাম তাহলে এতগুলি মালা এলো কোথা থেকে? একি আমার দৃষ্টি বিভ্রম? আমি কি সুষুপ্তিতে না জাগরণে আছি'? 
হরিদাস স্বামী সম্রাটকে বললেন "ভারত সম্রাট, আপনার দেওয়া মালাটি আপনি নিয়ে যান"। আকবর নিজেই বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলেন 'সকলের গলায় তো একই রকম মালা, তাহলে কোন মালাটি আমার গলায় ছিল?'। আকবর নিজের অহংবোধ ত্যাগ করে হরিদাস স্বামীর চরণ ধরে বললেন "প্রভু আমি বুঝতে পারিনি আমার মধ্যে যে অহংবোধ ছিল তার জন্য আমি আপনাকে রূঢ় বাক্য বলেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করছি আপনি যে তামাম হিন্দুস্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীতসাধক সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমি রাজদম্ভে ও রাজকোষের মোহে বুঝতে পারিনি। আপনার সংগীতের অনুরাগে আমার কৃপণের ধন শূন্য হয়েছে। আমার রাজ ঐশ্বর্যের অহমিকা আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। সুলতানী তাজের ভারে যে দুর্গতি হলো তার জন্য আমার লজ্জার শেষ নেই। আমার যা কিছু আছে সমস্ত আপনার চরণ কমলে সমর্পন করলাম"। এই কথা বলে সম্রাট আকবর হরিদাস স্বামীর সামনে লজ্জায় অধোবদন হয়ে রইলেন। 
                                                                   ক্রমশঃ

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন