অরন্ধন /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব পর্ব -- ৩৮

অরন্ধন

ভাস্করব্রত পতি


সাপের কামড় থেকে বাঁচতে লৌকিক দেবী মনসার পূজার প্রচলন। আর মনসার পূজার একটি অন্যতম লৌকিক আচার হল 'অরন্ধন'। সাপের আস্তানা মাটির ঢিবি বা ঢেলাতে ফনীমনসা গাছের উদ্দেশ্যে মনসা জ্ঞানে পূজা করা হয়। জৈষ্ঠ্যের দশহরা থেকে শুরু হয় এই উপলক্ষে অরন্ধন উৎসব। চলে ভাদ্র সংক্রান্তি পর্যন্ত। এই সময়েই গ্রামবাংলার বুকে বর্ষাকাল। আর সাপের উৎপাত বাড়ে। তাই বেড়ে যায় সর্পদেবীর পূজার ধুম। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে পালিত হয় এই উৎসবটি। শ্রাবণ সংক্রান্তিতে পালিত হয় "ঢেলাফেলা"। যা বর্ধমানে পরিচিত 'খইদই' এবং বাঁকুড়াতে পরিচিত 'খইধারা' নামে। শ্রাবণ, ভাদ্র মাসের প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার পালিত হয় মনসা পূজা। আবার কোনো কোনো এলাকায় দশহরা থেকেই শ্রাবণের সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতি পঞ্চমীতে অরন্ধন উৎসব পালিত হয়। একে বলে 'ইচ্ছে অরন্ধন' বা 'আরন্ধ'। আর ভাদ্র সংক্রান্তিতে দক্ষিণ বঙ্গের জেলাগুলিতে পালিত হয় 'অরন্ধন'।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, "অরন্ধন কন্যাসংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হইলে 'বৃদ্ধারন্ধন' এবং ভাদ্রের যে কোনও দিনে হইলে 'ইচ্ছারন্ধন' বলে। এই দিনে রন্ধন নিষিদ্ধ, পর্য্যুষিত অন্ন ব্যঞ্জন প্রভৃতি মনসাদিকে উৎসর্গ করিয়া ভক্ষণ করিতে হয়"। উল্লেখ্য যে ভাদ্রের সংক্রান্তিকে বলে 'কন্যাসংক্রান্তি'। আর পুরাণ অনুসারে এইদিন বিশ্বকর্মার জন্মদিবস। বিশ্বকর্মা হলেন সৃষ্টি শক্তির অনন্য রূপ। বিশ্বদ্রষ্টা, প্রজাপতি এবং ধাতা। সর্বজ্ঞ। দেবতাদের নামদাতা। মর্ত্যজীবের অনধিগম্য। ইনি আসলে বাচস্পতি, বদান্য, কল্যানকর্মা, বিধাতা এবং মনোজব। ইনিই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। বৃহস্পতির বােন যােগসিদ্ধা এঁর মা। অষ্টম বসু প্রভাস হলেন বাবা। আমরা চিনি দেবশিল্পী হিসেবে। ইনি যাবতীয় শিল্প সমূহের রচয়িতা এবং অলঙ্কারের স্রষ্টা। দেবতাদের বিমান নির্মাতা। দশাননের লঙ্কানগরীর প্রতিষ্ঠাতা ইনিই আমাদের দেবশিল্পী 'বিশ্বকর্মা'। আর এই দিনেই মনসার পূজা হয় অরন্ধনের মাধ্যমে।


অরন্ধন উৎসবের দিন উনুন জ্বলবেইনা। তাই 'অরন্ধন'। এদিন উনুনের চারপাশে আবারও ভালো করে নিকোনো হয় গোবর মাটি দিয়ে। শুকিয়ে গেলে সেখানে চালবাটা দিয়ে নানা ধরনের আলপনা আঁকা হয়। উনুনের সামনে মনসার ঘট বসিয়ে তাতে একটি মনসার ডাল রাখা হয়। তাতে কাশফুল, শালুকের মালা, চাঁদমালা, ফুলের মালা দেওয়া হয়। আর ঘট সহ মনসা তথা সিজগাছের পাতায় সিঁদুর লাগানো হয়। এবার ঘটের চারিপাশে আগের দিনের রান্না করা খাবারগুলি কলাপাতায় কিংবা পাথর বা পেতলের পাত্রে নৈবেদ্য আকারে সাজিয়ে নিবেদন করা হয়। উনুনের চারপাশে নয়টি কচুপাতা পেতে দেওয়া হয়। তাতে থাকে আতপ চালের ছোট ছোট পিঠে এবং চিড়ে। এবার বাড়ির গিন্নি মহিলারা সেখানে পূজা করেন। অনেকে তুলসি মন্দিরের সামনে থাকা মনসা গাছের তলায় এই পূজার আয়োজন করেন। তারাপদ সাঁতরার মতে, "সব অরন্ধন অনুষ্ঠানেই সিজ মনসার ডালে দেবী মনসার পূজা হয়ে থাকে এবং এই উৎসবটি মূলতঃ নিম্নবর্ণের জাতি গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই মনসার পূজার্চনা অনেক সময় নিজেদেরই করতে হয়, ব্রাম্ভণ পুরোহিতের প্রয়োজন পড়ে না"। আসলে এই পূজায় অষ্টনাগের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা হয় সংসারের আবালবৃদ্ধবনিতার মঙ্গল কামনায়। অষ্টনাগ তথা কুলীর, অনন্ত, বাসুকি, তক্ষক, শঙ্খ, কর্কট, মহাপদ্ম এবং পদ্ম নামধারী সাপেদের পূজা করা হয়। পদ্মাপুরাণ অনুসারে -- "অষ্টনাগ যথা—অনন্তো বাসুকি: পদ্মে মহাপদ্মশ্চ তক্ষকঃ। / কুলীর: কর্কট: শঙ্খো হ্যষ্টৌ নাগাঃ প্রকীর্তিতাঃ।।" এই অষ্টনাগের মধ্যে অনন্ত ও কুলির হল ব্রাম্ভণ, বাসুকি ও শঙ্খপাল হল ক্ষত্রীয়, তক্ষক ও মহাপদ্ম হল বৈশ্য এবং কর্কট ও পদ্ম হল শূদ্র।

ভাদ্র সংক্রান্তির এই অরন্ধনকে অনেক যায়গায় বলে 'পান্না'। আসলে এটা উচ্চারনের দোষে সৃষ্ট। কেননা এদিন পান্তা ভাত দেবীকে নিবেদনের নিয়ম আছে। তাই তৈরি হয় পান্তাভাত বা বাসি ভেজানো ভাত। এই 'পান্তা' থেকেই এসেছে 'পান্না' শব্দটি। 
    পানিভাত > পান্তা > পান্না

ড. শীলা বসাক লিখেছেন, "এই পুজো দুভাবে হয় অর্থাৎ ‘ইচ্ছা রান্না' এবং 'বুড়ো রান্না’। ‘ইচ্ছা রান্না’ ভাদ্র মাসের যে-কোনও মঙ্গলবার বা শনিবার দিন পালন করা হয়। এই পুজো বা ব্রতের বিধি-নিষেধ হলো যদি ঐ পুজোর দিন ব্রতীদের বাড়িতে কোন মৃত্যু বা বাধা সৃষ্টি হয় তাহলে তাঁরা এই পুজো করতে পারে না। ‘বুড়ো রান্না' পুজো অনুষ্ঠিত হয় ভাদ্রমাসের সংক্রান্তির দিন। এই দিন সন্ধ্যাবেলা মনসা পুজো করে রাত্রে নতুন হাঁড়িতে শুদ্ধ কাপড়ে মনসার উদ্দেশে রান্না করা হয়। এর পর ভাতে জল দেওয়া হয়। এই রান্নার কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যেমন কচুশাকের তরকারি, ওলভাজা, টক, ইলিশ মাছ ও চিংড়ি মাছ (সম্ভব হলে) রান্না করা হবেই। পরের দিন পান্তাভাত এবং বাসি তরকারি প্রসাদ হিসেবে ব্রতীরা খায় এবং আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের খাওয়ানোর রেওয়াজ আছে"। 

'অরন্ধন' হল মনসা পূজার অঙ্গ। আগের দিন সন্ধ্যায় রান্না করে নেওয়া হয় সবকিছুই। তারপর তা ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় মনসা দেবীকে। আর সংক্রান্তির দিন উনুন জ্বালানো নিষিদ্ধ। রান্নাপূজার আগে বাড়ির বৌঝিরা ঘর দুয়ারের সর্বত্র পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে ঝাঁট দিয়ে গোবর মাটি দিয়ে নাতা দেয়। রান্না পূজার জন্য নতুন মাটির পাত্র কিনে আনা হয়। এখন অবশ্য মাটির বাসনের চল নেই তেমন। তাই রান্নাঘরের বাসনপত্রগুলিকেই খুব সুন্দর করে মেজেঘষে পরিস্কার করা হয়। বিশেষ করে শিল নোড়া, বঁটি, মশলার কৌটা ইত্যাদি। আর উনুনটিকে খুব সুন্দর করে নাতা দেওয়া হয়। ঝিঁটগুলোর ভাঙা অংশতে কাঁচা মাটির প্রলেপ দিয়ে ঝকঝকে করে তোলা হয়। আসলে বর্ষার অপরিচ্ছন্ন এবং পাতা পচা জমে জলকাদা হয়ে যাওয়া উঠোনকে একটু সাফসুতরো করা হয়ে যায় এই অবসরে। আর সংক্রান্তিতে উনুন না ধরানোর বিষয়েও একটি মতামত মেলে। সাধারণত বলা হয় যে ভাদ্র শেষ হলে সাপ চলে যায় শীতঘুমে। এসময়ে হয়তো উনুনের মধ্যে সাপ লুকিয়ে থাকতে পারে। তখন উনুন জ্বালানো হলে পুড়ে যেতে পারে। এতে মনসাদেবী রুষ্ট হতে পারে। তাই অন্ততঃ একদিনের জন্য উনুন জ্বালানো হয়না। 

উনুনের পাশে এই অরন্ধন উৎসবকে 'উনুন পূজা'ও বলে। একে 'বুড়োবুড়ির ভাত দেওয়া'ও বলা হয়। মহাভারতের উল্লিখিত জগৎকারু মুনি তথা মনসার স্বামী হলেন 'বুড়া' এবং স্বয়ং মনসাদেবী হলেন 'বুড়ি'। আসলে মানুষের বিশ্বাস 'বুড়াবুড়ি' হলেন পরিবারের পূর্বপুরুষ। সারা বছর সুখে শান্তিতে থাকার জন্য সেই পূর্বপুরুষদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করা হয় এভাবেই।

সংক্রান্তির আগের দিন সূর্যাস্তের পর বাড়ির মহিলারা নিকোনো উনুনে প্রনাম করে শুদ্ধ বসনে রাঁধতে বসেন। তখন শঙ্খধ্বনি করা হয়। ভাত ফোটানোর সময় ভাত হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য খেজুর ডাঁটা ব্যবহার করা হয় খুন্তির বদলে। আর যাবতীয় রান্নার অল্প কিছু অংশ উনুনে নিবেদন করা হয় ব্রম্ভাকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে। রান্নার পাট চুকে গেলে ফের শঙ্খ বাজানো হয়। রান্নার শেষে তা ঢেকে রাখা হয়। লক্ষ্য রাখতে হয় যাতে সেগুলি নষ্ট না হয়ে যায়। আর পান্তা ভাত বানাতে আলাদা পাত্রে গরম ভাত ঢেলে তাতে জল দেওয়া হয়। সবকিছুই ঢাকনা দিয়ে চাপা থাকে। লক্ষ্য রাখতে হয় দেবীকে নিবেদনের আগে ঐসব খাবারের কাছেপিঠে যেন কোনো পোকামাকড় না আসে। এটা নাকি অমাঙ্গলিক এবং অনাচারের লক্ষণ। সেক্ষেত্রে ঐ পরিবারের ঐ বারের জন্য অরন্ধন উৎসব বন্ধ করে দিতে হয়। অনেক পরিবারের রীতি রয়েছে রান্নাপূজার সময় মনসামঙ্গল বা মনসার পাঁচালী পাঠ করার।

পূজার শেষে নৈবেদ্যর কিছু কিছু অংশ কলাপাতায় করে জলাশয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বাস যে তা পূর্বপুরুষরা খাবে। এরপর ঐ খাবার সবাই মিলে খাওয়া হয় সারাদিন ধরে। এই পান্তা ভাতের জল তথা 'আমানি' ছেটানো হয় বন্ধ্যা গাছের গায়ে। এর ফলে নাকি ঐ গাছে ফল ধরবে। অসুস্থ ব্যক্তিদেরকেও আমানিটা দেওয়া হয় রোগমুক্তির জন্য। 

রান্নাপূজায় ভাজার আধিক্য লক্ষ্য করার মতো। কুঁদরি, চিচিঙ্গা, নারকেল, কুমড়ো, ঢেঁড়স, করলা, আলু, পটল, বরবটি, কাঁচকলা, উচ্ছে, বেগুন ইত্যাদি ভাজা হয়। সেদ্ধ ওলের সাথে গুড় মিশিয়ে একধরণের বড়া ভাজা করা হয়। এছাড়া মটর ডাল সেদ্ধ করে কাঁচা লংকা, সর্ষের তেল মিশিয়ে এক বিশেষ স্বাদের ডাল বানানো হয় এদিন। একে অনেকে বলেন 'ডাল চচ্চড়ি'। আর মাছ হিসেবে থাকে চিংড়ি, ইলিশ সহ পোনা মাছের পদ। ভাজা এবং ঝাল এই দু ধরনের পদ হয় মাছের। কচুর ঘন্ট এবং চালতার টক থাকবেই। যে যে শাক মেলে এইসময় তা দিয়ে রান্না হয়। বেশি বেশি ভাজাভুজি করার কারন অন্যান্য তরকারি নষ্ট হয়ে যেতে পারে পান্তা ভাতের সঙ্গে পরের দিন খাওয়ার সময়। তবে অনেক যায়গায় নিরামিষ পদ রান্না হয়। এসময় ইলিশ মাছের দাম বেশি থাকার জন্য অনেক পরিবার হয়তো তাই রান্নাপূজার মেনু থেকে ইলিশকে বাদ দিয়েছে।

হাওড়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক তথা শিক্ষক সায়ন দে'র বাড়িতেও পালিত হয় অরন্ধন উৎসব। তাঁদের কাছে এটি 'বুড়ো রান্না'। সংক্রান্তির আগের দিন রাতে সব রান্না করে ফেলা হয়। সংক্রান্তিতে উনুন জ্বলবেনা। অর্থাৎ 'অরন্ধন'। এর দুদিন আগে পালিত হয়েছে 'গাবড়া রান্না'। এর আগে তাঁরা আয়োজন করেছিলেন 'ইচ্ছে রান্না'। অর্থাৎ ইচ্ছেমতো উপাদেয় সামগ্রী দিয়ে তরিতরকারি। আর বুড়ো রান্নার মেনু তালিকায় থাকছে পান্তা ভাতের সাথে গরম ভাত, নানা রকম ভাজাভুজি, শাকের তরকারি, মাছের ডিম দিয়ে টক, চালতার টক, পোনা মাছের দুখানা পদ, ইলিশ মাছের তরকারি, নারকেল কুরো ভাজা, গোটা নারকেল কুচোনো ভাজা সহ নানা জিভে জল আনা খাদ্য সামগ্রী। এইসব খাবার পরিবারের লোকজন তো বটেই কিছু আমন্ত্রিত অতিথিদের ডেকে কিংবা হঠাৎ বাড়িতে চলে আসা মানুষজনকে খাওয়ানো হয় প্রসাদ হিসেবে। আগে কেবল পান্তা ভাতের চল ছিল। এখন গরম ভাত এর সাথে মেশানো হচ্ছে। পূর্ব মেদিনীপুরের সুতাহাটার গুয়াবেড়িয়া অঞ্চলের খড়িবেড়িয়া গ্রামে রান্না পুজার আয়োজন হয় 'লাবণ্যসঙ্ঘে'র উদ্যোগে। আগেরদিন সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত চলে রান্নাবান্না। শাকসবজি, ডাল, মাছ, নারকোল, চালতার চাটনি, পায়েস রান্না হওয়ার পর হাঁড়িতে সিঁদুর দিয়ে শালুক ফুলের মালা ঝোলানো হয়। এরপর ভাদ্র সংক্রান্তির সকালে গোটা গ্রাম জুড়ে সেগুলো পরিবেশন করার রীতি। এদিন গ্রামে কারোর বাড়িতে উনুন জ্বলেনা। কুইজ মাস্টার তথা শিক্ষক সন্দীপন দাস জানান, এ এক সম্প্রীতির লৌকিক উৎসব। এই বুড়ো রান্নাকে ধরাটে রান্না বা আটাশে রান্নাও বলে। অসম্ভব জনপ্রিয় লোকাচার এখনও কিছু সুস্থ মানসিকতার মানুষের সৌজন্যে এই বাংলায় টিকে আছে।

মনসাকে 'শাকম্ভরী' বলে উল্লেখ করা হয়েছে মার্কণ্ডেয় পুরাণে। এ প্রসঙ্গে তারাপদ সাঁতরা উল্লেখ করেছেন, "পৌরাণিক দেবী শাকম্ভরী একদা ছিলেন আদিম কৃষিভিত্তিক মাতৃতান্ত্রিক সমাজেরই অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং তুলনামূলক ভাবে বলা যেতে পারে যে, প্রাগ্‌বৈদিক যুগে প্রচলিত মাতৃকাপূজারই এক কালান্তরিত রূপ বাংলাদেশের সর্পদেবী মনসার মধ্যে বিকাশ লাভ করেছে। কালক্রমে হয়তো কোনও বৃক্ষোপাসক জাতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে এ দেশেও বৃক্ষের মধ্যে সর্পপূজার রীতি প্রবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে এই বৃক্ষ হল মনসা বৃক্ষ এবং সংস্কৃতে একেই বলা হয়েছে স্নুহীবৃক্ষ। স্নুহীবৃক্ষের কতগুলো রোগ প্রতিষেধক ও বিষ প্রতিষেধক গুণ আছে। সেই জন্যেই হয়তো আদিম সমাজের মানুষেরা এই বৃক্ষকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতেন, আর তাই পরবর্তী কালে এই বৃক্ষের মধ্যেই সর্পপূজার ধারাটি মিশে যায়। কিন্তু সেই আদিম ক্রিয়াচারের কোনও রূপান্তর ঘটেনি বলেই সিজ-মনসা বৃক্ষের ডালই কালান্তরে সর্পদেবী হিসেবে গণ্য হয়েছে। মূলত সেই অনার্যসম্ভূত মাতৃকা পূজারই বিকাশ লাভ ঘটেছে বাংলাদেশের সর্পদেবী এই মনসার পরিকল্পনায়। পরবর্তী কালে বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম ও তন্ত্রমন্ত্রের সংঘাতে মনসার বিচিত্র রূপ কল্পিত হয়ে এক জটিল সমস্যার সূত্রপাত করেছে— যা সংস্কৃতি বিজ্ঞানীদের একান্ত গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে"।

অরন্ধন পালনের পেছনে আরো কয়েকটি সামাজিক কারণ লক্ষ্য করা যায়। এ সময় চাষের কাজ শেষ হয়ে যায়। চূড়ান্ত হাড়ভাঙা খাটুনির পর ভাদ্র এলে একটু স্বস্তি মেলে। শুরু হয়ে যায় ইলিশের মরশুম। ফের কাজে লেগে পড়তে হয়। তাই এদিন বাড়িতে নানা ধরনের পদ রান্না করে নিজের পরিবারের সাথে পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনকে ডেকে খাওয়ানোর মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা। আর শারীরিক পরিশ্রম লাঘব করতে এদিনের খাবারগুলির পুষ্টিগুণও খুব বেশি। তাছাড়া সারাবছর মহিলাদের হেঁসেল সামলাতে হয়। এদিন একটু বিশ্রামও মেলে উনুনের উত্তাপ থেকে।

হলদিয়ার ছবিগুলো তুলেছেন -- পম্পা মণ্ডল

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Post a Comment

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন